default-image

রংপুর শহরের রামপুরায় মুক্তিযোদ্ধা আফসার আলীর বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধ করতে গিয়ে পাকিস্তানি আর্মির গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে দুই চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি যুদ্ধের সময় থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ৪০ বছর ধরে তিনি এর-ওর কাছে হাত পেতে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।

ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখ। সকাল আটটা। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী নাকেরগঞ্জ এলাকা। যুদ্ধের শেষ দিন। আমিসহ ১৪ জন নাকেরগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে অবস্থান নিই। চারদিকে গোলাগুলির শব্দ। খবর পেলাম, পাকিস্তানি আর্মিরা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এমন এক অবস্থায় আমরা সেই স্কুলের আশপাশে আগে থেকে খনন করা বাংকারে অবস্থান নিই। সেখানকার এক বাড়িতে নাশতা খাওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। জানতে পারি, স্থানীয় রাজাকারের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা অনবরত গুলি ছুড়ছে। আমরাও সবাই আলাদা হয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিই। একটি-দুটি করে গুলি ছুড়ে পাল্টা জবাব দিই। দুপুর পর্যন্ত এ অবস্থা চলার পর তাদের গুলির তীব্রতা আরও বাড়তে থাকে।

এমন এক অবস্থায় আমরা চারদিক থেকে একসঙ্গে অনবরত গুলি চালাতে থাকি। পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে আমার এক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আমার পাশেই মারা যান। আমি তাঁর জন্য কিছুই করতে পারিনি। কেননা, আমরা পাকিস্তানি আর্মিকে ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। বিকেল হতে না-হতেই পাকিস্তানি আর্মির আর গুলির শব্দ না পেয়ে বুঝতে পারি, তারা পিছু হটেছে। এরই মধ্যে হঠাত্ রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি আর্মিরা আবারও সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণে চলে আসে। তারা গুলি করে আমাদের দমাতে না পারায় এবার ছুড়তে থাকে হাতবোমা ও গ্রেনেড। আমরা অপ্রস্তুত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকি। এমন সময় গ্রেনেডের স্প্লিন্টার আমার দুই চোখে আঘাত হানে। আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। পরবর্তী সময়ে আমার চোখ দুটোই নষ্ট হয়ে যায়। তখন থেকেই আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।

বিজ্ঞাপন

এর আগের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক দিনের ঘটনা। আমার প্লাটুনের ৪৫ জন ভূরুঙ্গামারীর নাকেরগঞ্জ এলাকায় অবস্থান করি। পুরো এলাকা আমাদের দখলে। এমন সময় জানতে পারি, এলাকায় পাকিস্তানি আর্মিদের সাঁজোয়া গাড়ি আসবে। আমিসহ অন্য সহযোদ্ধারা মিলে সারা রাত রাস্তার মাটি কেটে বাঁশের সেতু নির্মাণ করি। যেন বোঝা যায় যে এখানে একটি সেতু আছে। পাকিস্তানি আর্মির গাড়ি যাতে এই এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে, এ জন্যই এমন ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন পাকিস্তানি সেনারা আসছে, এই সংবাদ শুনে আমরা ওত পেতে থাকি। আমাদের বানানো সেতুর ওপর পাকিস্তানি আর্মির গাড়ি উঠতেই তা ভেঙে পড়ে। সেই সঙ্গে আমরা চালাতে থাকি গুলি। এমন সময় দুজন পাকিস্তানি সেনাকে ধরে আনা হয় গ্রামে। গ্রামের লোকজনের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি পাকিস্তানি আর্মিদের গুলি করতে করতে ধাওয়া করা হয়। তারা তাদের গাড়ি ও গোলাবারুদ ফেলে পালিয়ে যায়।

আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই ১৯৭১ সালের মে মাসে। তখন বসবাস করি কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার সাতভিটা গ্রামে। উলিপুরের আবুল হোসেন, আবদুর রহমান, ছক্কু মিয়া, কানু বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাদের হাত ধরে ২৫ মে আমি যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের জন্য অংশ নিই। রৌমারী সীমান্ত দিয়ে ভারতের মাইনকার চার চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই, দেশের অনেকেই যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছেন। প্লাটুন কমান্ডার আবদুল মজিদ মাইনকার চর থেকে ভারতের ধুপড়ি নিয়ে যায়। সেখানে এক দিন থাকার পর কোচবিহারের রাজগঞ্জ এলাকায় সেন্ট্রাল ইয়ুথ ক্যাম্পে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে আমি দুই দিন অবস্থান করে দার্জিলিং শহরের বাগডোহরা মুজিব ক্যাম্পে ২১ দিন ট্রেনিং করি। আমাদের ট্রেনিং দলে ছিলেন ৪৫ জন। সেখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে জুলাই মাসের শুরুর দিকে লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে যুদ্ধ করি। এরপর বুড়িমারী দিয়ে দুধখাওয়া, মোগলহাট সীমান্ত এলাকা দিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী এলাকায় আমার দায়িত্ব পড়ে। আমি ওই এলাকায় পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই।

মুক্তিযুদ্ধে আমার সহযোদ্ধাদের মধ্যে উলিপুরের এলাহী মাস্টার, কপিল আমিন, আবদুল মজিদ, বাশার আলী, কাশেম আলী, দিনাজপুরের আজিমউদ্দিন, দছির আলীর নাম মনে আছে।

আমার মুক্তিযোদ্ধা নম্বর ম-৩০৩৬৯। মুক্তিযোদ্ধার এলাকা ৬ নম্বর সেক্টর। আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মোজাহার আলী। আর প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন আবদুল মজিদ।

যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। যুদ্ধ করতে গিয়ে আমার দুই চোখ হারিয়েছি। দেশ স্বাধীনের পর থেকে গত ৪০ বছরে চোখ দুটো দিয়ে কিছুই দেখতে পারি না। জীবন চালাতে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছি। এখন মাসে দুই হাজার করে টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই।

অনুলিখন: আরিফুল হক, রংপুর

বিজ্ঞাপন