default-image

তখনো আমার জ্ঞান আছে। দেখলাম আমার ডান হাত ক্রমশ ঝুলে পড়ছে নিচের দিকে। একজন হাবিলদার তার লুঙ্গি ছিঁড়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে... গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমাকে গরুর গাড়িতে নিয়ে যায়। ক্রমাগত রক্তক্ষরণের ফলে আমার মুমূর্ষু অবস্থা। গুলি যে লেগেছে তা কিন্তু তখন আমি টের পাইনি। কিন্তু হাত তুলতে পারছি না, সেটা বুঝতে পারছি। আমাদের সঙ্গে এলাকার একজন ডাক্তার ছিলেন, পাস করা ডাক্তার অবশ্য নন। তিনি এসে গাছের পাতার রস দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেন। গরুর গাড়িতে আমাকে বলদিঘাট নেওয়ার কথা হয়। তারপর আর মনে নেই, অর্থাত্ আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।—এভাবেই যুদ্ধদিনের কথা স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে হাবিবের আত্মকথনে।

মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানের কাছে যুদ্ধের সেই ৯ মাস এখনো অমলিন। ’৭১ সালে ছিলেন ১৪ বছরের কিশোর। ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠেছেন। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে যুদ্ধে যাওয়া কাওরাইদ গ্রামের কিশোরটি এখন প্যারিস প্রবাসী। বলা যায়, এটা তার এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন। ’৭৫-এর পর পরিবর্তিত বাংলাদেশ ও ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিপর্যয়ের কারণে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন শামুকের মতো। কিন্তু দেশের সংবাদ, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গে এখনো তিনি ’৭১-এর উত্তাল দিনগুলোর মতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

স্বাধীনতার ৩৪ বছর পর এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে হাবিব স্মৃতির হাত ধরে ফিরে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে। ’৭১-এর ২৬ মার্চ তিনি ছিলেন শ্রীপুর থানার কাওরাইদ গ্রামে। মার্চের শেষদিকে বাঙালি সৈন্যরা জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্র লুট করেছিল। পরে হেঁটে যুদ্ধে যাওয়ার সময় এসব ভারী অস্ত্র কিছু গ্রামে রেখে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এ সময় জয়দেবপুরে আওয়ামী লীগের এমপি সামসুল হক সাহেব শ্রীপুর-গফরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রেনিংয়ের জন্য লোক পাঠাতে বলেন।

হাবিব ভারত গিয়েছিলেন। কাওরাইদ থেকে নৌকায় কাপাসিয়া, ওখান থেকে কুমিল্লা হয়ে মাধবপুর, পরে হাকানিয়া ক্যাম্পে যান তিনি। ছয়জনের দলে হাবিব ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। অনেকেই ‘তোমার বয়স কম’, ‘যাওয়া উচিত নয়’—এসব বলেছেন। হাবিব শোনেননি। ক্যাম্পে সাত-আট দিন ছিলেন। হাবিবের ভাষায়: আমাদের পাঠানো হয় লেম্বুচোরা ট্রেনিং ক্যাম্পে। সফিউল্লাহ সাহেবের আন্ডারে। লেম্বুচোরা আগরতলার কাছে। মাধবপুর থেকে বেশি দূরে নয়। মাধবপুর বর্ডারে আমাদের ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের ওখানে শর্ট ট্রেনিং দেওয়া হয়, মোট ১৮ দিনের ট্রেনিং। এরপর ভারতীয় কর্নেল কেভিন সিং এলেন। আমাকে দেখে ডেকে বললেন, ‘তুমি সবচেয়ে ছোট, যুদ্ধ করতে যাচ্ছ। টেক কেয়ার।’

উত্তরে বলেছিলাম, ‘আমি বয়সে ছোট। কিন্তু আমার লাইফ, ক্যাপাসিটি অনেক বড়।’

তিনি হঠাত্ সবার সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘তুমি সেকশন কমান্ডার।’

আমাদের দলে মশাখালীর (গফরগাঁওয়ের আগের স্টেশন) একজন ছিলেন সেনাবাহিনীর, উনি আমাকে বললেন, ‘দেখো, তুমি কী করে কন্ট্রোল করবে? আমরা ১৩ জন।’ তখন আমিই আবার কর্নেল সিংকে বললাম, ‘সৈন্য ভদ্রলোকও দলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’ তিনি একমত হয়ে তাকে টুআইসি করেন।

ট্রেনিং শেষে শ্রীপুরে ৭৩ জনকে পাঠানো হয়, এর মধ্যে ছয়জন সেকশন কমান্ডার। আমাদের গ্রুপে কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। দেশেও ঢুকি একইভাবে, মাধবপুর-কাপাসিয়া হয়ে শ্রীপুরে আসি। ময়মনসিংহের সব স্টেশনে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। শ্রীপুর থেকেই আমরা আলাদা হয়ে যাই সেকশন অনুযায়ী। দুই সেকশন যায় গফরগাঁওয়ে, এক দল যায় শ্রীপুর, দুই সেকশসহ আমি চলে যাই কাওরাইদ। দেশে যেসব বাঙালি সৈন্য ছিলেন তারাও আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেন।

প্রথম আক্রমণ করি শ্রীপুর থানা। ওখানে বহু অস্ত্র পেয়েছিলাম। এ যুদ্ধের পর দেশের ভেতরের পুলিশ বিভাগের সদস্যরাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এমনকি যেসব ছাত্র ভারতে ট্রেনিং নিতে যেতে পারেনি তারাও আমাদের সঙ্গে কাজ করেছিল। আমরা হেরেছি যেমন, বিজয়ী হয়েছিও বহুবার।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধদিনের স্মৃতির সাদা, কালো, লাল অনেক রঙ হাবিবের মনের গভীরে। চেতনার স্বচ্ছ আলোয় তারা ধরা দেয়। বিশেষভাবে তার মনে পড়ে তিন সহযোদ্ধার মৃত্যুর কথা। তার মধ্যে মান্নান বলে এক তরুণ অ্যান্টি ট্যাঙ্ক মাইন বসাতে গিয়ে মারা যায়। ব্রিজটা ছিল কাওরাইদ আর মশাখালীর মাঝামাঝি। এই ব্রিজ দিয়েই পাকিস্তানি হানাদাররা ময়মনসিংহ-জামালপুর-রংপুর হয়ে ভারতের সীমান্তে যেত। এটা ছিল হাবিবের দলের প্রথম দুর্ঘটনা। পরে শ্রীপুর থানা আক্রমণের সময় মারা যায় আরেকটি ছেলে। সে ছিল স্থানীয় যোদ্ধা, তার ট্রেনিং ছিল না। হাবিবদের সাহায্যকারী হিসেবে ওদের পেছনে থাকত, অস্ত্রশস্ত্র বহন করত। ২২-২৩ বছর বয়সী ছেলেটি পড়ত কলেজে। গফরগাঁও থানা আক্রমণ ও যুদ্ধের সময় বহু যোদ্ধা মারা যান।

অক্টোবর-নভেম্বর মাস, দেশে পুরোদমে যুদ্ধ চলছে। প্রশিক্ষণ শেষে সব মুক্তিযোদ্ধা দেশে ফিরে এসেছেন। হাবিবের কথা, ‘আমাদের মনোবল যত বাড়ছে পাকিস্তানি সৈন্যরা তত পর্যুদস্ত হচ্ছে, দুর্বল হচ্ছে মানসিকভাবে।’

নভেম্বরে শ্রীপুর-গাজীপুর ছেড়ে জয়দেবপুর অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে হাবিবসহ প্রায় ৪০০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। এই বিশাল বাহিনীর কেউ কাউকে চিনতেন না। কিন্তু অদ্ভুত একটা প্রেম ও আদর্শে তারা সবাই একাত্ম হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে মশাখালীতে বর্ডারে যাওয়ার পথে পাকিস্তানিদের একটা ট্রেন আক্রমণ করে হাবিবের দল। সংগ্রহ করেন প্রচুর গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র। এই গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র দলের যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

হাবিব বলেন, আমাদের গন্তব্য এখন ঢাকার দিকে। শ্রীপুর থেকে গফরগাঁও পুরোটা অঞ্চল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে। বাঙালি সৈন্যরাও অনেক সাহায্য করেছেন তখন। ডিসেম্বর মাসেই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় গোলাঘাট ব্রিজটা উড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আমাদের কমান্ডারের ভাই ছিলেন কর্নেল নুরুজ্জামানের (পরে রক্ষীবাহিনীর প্রধান) আত্মীয়। তিনি কাওরাইদ বা গোলাঘাট ব্রিজ ধ্বংসের কথা বলেন। কারণ, গোলাঘাট ব্রিজ ভরা ছিল পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারে।

গোলাঘাটে চার দিনের মরণপণ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা হেলিকপ্টারও ব্যবহার করেছিল। তখন মুক্তিবাহিনী পশ্চাদপসারণ করত প্রচুর গাছপালায় পূর্ণ ঘন জঙ্গলে। আবার ভোরে শুরু হতো লড়াই। যুদ্ধের মুহূর্তে আমরা নদীর দিকের রাস্তাটা খালি রেখেছিলাম। যাতে পাকিস্তানিরা এ পথ ধরেই যায়। হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় মরিয়া হয়ে ওরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাচ্ছিল।

default-image

এ যুদ্ধে চারজন মারা যায়। তার মধ্যে যোদ্ধা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সাধারণ মানুষও। বহু পাকিস্তানিও মারা গিয়েছিল। দিশেহারা হয়ে অনেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ওরা সাঁতার জানত না। সাঁতার না জানার কারণেও অনেকে মারা গিয়েছিল। আমরা দুজন সৈন্যকে বন্দি করেছিলাম। ওরা বলেছিল, ওদের বাড়ি বেলুচিস্তানে।

গোলাঘাটের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে গুরুতর আহত হন কিশোর যোদ্ধা হাবিব। জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল কর্নেল কেভিন সিংয়ের সাবধানবাণী, ‘যুদ্ধ ক্ষেত্রে তোমার নজর থাকবে সামনের দিকে। অস্ত্রের মতো শত্রুকেও বিশ্বাস করবে না, জানবে সে তোমার অধীন নয়, তোমার দেশের নয়।’

হাবিবের ভাষায়—আহত হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগেই লক্ষ করেছিলেন, এক পাকিস্তানি সৈন্য বলছে, ওর বউ-বাচ্চা আছে। ওকে না মারতে। এবং পরমুহূর্তেই সে হঠাত্ গুলি করতে শুরু করে। গুলিতে হাবিব আহত হন। পরে অবশ্য অন্য যোদ্ধাদের গুলিতে পাকসেনাটি মারা পড়ে। একটি গুলি কাঁধের ডান দিকে লেগে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়, আরেকটি গুলি বাঁ হাতের তালুতে বিদ্ধ হয়। দিনটি ছিল ৭ ডিসেম্বর।

গোলাঘাটের যুদ্ধে হাবিব আহত হয়েছিলেন ভোরবেলায়। আর যে হাবিলদার হাবিবের লুঙ্গি ছিঁড়ে প্রথম রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তিনিও পরে আহত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি হাবিব বয়ে বেড়িয়েছেন দুই হাতে। স্বাভাবিক মানুষের হাতের মতো কর্মক্ষম, সচল ছিল না হাত দুটো। তাই তার স্নায়ুর শিহরণে, ভাবনায় জলের মতো ঘুরে ঘুরে আসে যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলো। ‘আমরা সাইকোলজিক্যালি স্ট্রং ছিলাম। কারণ, দেশটা তো আমাদের। আমার এলাকা, রাস্তাঘাট চিনি, এখানে কাটিয়েছি বছরের পর বছর। আমাদের টেকনিকও ছিল ভিন্ন। হানাদারদের মতো আধুনিক, ভারী আর্মস, প্রচুর গোলাবারুদ আমাদের ছিল না। তাই আমরা গুলি করেছি হিসেব করে। আমরা একটি গুলি করেছি, জবাবে ওরা ১০টা গুলি করেছে। বাম দিকে এক গুলি করব, ওরা দশ গুলি করে জবাব দেবে। এভাবে ডান দিকে একটা গুলি করলে ওরা জবাব দিচ্ছে দশ গুলিতে। আমাদের প্লান হলো—ওদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে আমরা এগুবো ক্যাপচার করতে। ওরা আমাদের দেশ দখল করতে এসেছে, কাজেই ওদের জীবন নিয়ে ফিরতে দেব না।’

জ্ঞান ফিরে হাবিব নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন হাসপাতালের বেডে, ময়মনসিংহ মেডিকেলে। পরে উন্নত চিকিত্সার জন্য আরো আটজন গুরুতর আহত যোদ্ধাসহ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আগরতলা হাসপাতালে।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন হাবিব। বাবা-মা জানতেনই না হাবিবের খবর। যুদ্ধের পর তার বাবা বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান করেছেন। পরে সামসুল হক সাহেবের মাধ্যমে জানতে পারেন ছেলের কথা। স্বাধীনতার পর তিনি প্রথম হাবিবকে দেখেন হাসপাতালে। তার মায়ের সঙ্গে দেখা হয় আরো পরে। পিজি হাসপাতালে একটু সুস্থ হলে যখন হাঁটতে পারেন তখন দেখা করতে যান তার মা। হাবিব বেঁচে আছে—মা-বাবা, ভাইবোনদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য ছিল। হাবিব মুক্তিযুদ্ধে গেছে এ খবর তারা পেয়েছিলেন বেশ দেরিতে, এক আত্মীয়র মাধ্যমে।

হাবিবের জখম শুকিয়ে গেলে পাঠানো হয় ঢাকার পিজি হাসপাতালে। দুই হাত তখন প্যারালাইজড। চিকিত্সাধীন অন্য চারজন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবকে স্নেহ করতেন ছোট ভাইয়ের মতো। ব্যবহারটা ছিল বন্ধুর মতো, অমায়িক। তারা প্রতিদিনের কাজ—খাওয়া, বাথরুমে যাওয়া ইত্যাদিতে সাহায্য করতেন। এদের মধ্যে দুজনকে পরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মেরে ফেলা হয়। দুজন রক্ষীবাহিনীর অফিসার ছিলেন।

’৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের পর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে পিজিতে আসেন। গুরুতর আহত পঙ্গু যোদ্ধাদের উন্নততর চিকিত্সার জন্য বিদেশ পাঠানোর আশ্বাস দেন। সেই প্রথম হাবিব বঙ্গবন্ধুকে দেখেন। সে সময় পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ফ্রান্স ও সুইস রেডক্রসের উদ্যোগে আটজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠানো হয় প্যারিসে। এই গ্রুপে হাবিব ছিলেন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল নাসিম, বিখ্যাত হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দীন, মুহম্মদ আলী শেখ, মুহম্মদ ইউসুফ আলী খান, নায়েক আবদুল খালেক হাওলাদার এবং শাফায়েত উল্লাহ। বলা বাহুল্য হাবিব ছিলেন এদের মধ্যেও সর্বকনিষ্ঠ।

বিজ্ঞাপন

’৭২ সালের ৩ জুলাই হাবিব প্যারিসে আসেন। প্রায় এক বছর চিকিত্সাধীন অবস্থায় দুটি অপারেশন করা হয়েছিল তার হাতে। চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরে যান। প্রথম পর্যায়ে চিকিত্সা পূর্ণ হলেও হাসপাতাল থেকে তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল, যাতে শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিত্সকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

প্যারিসে বিখ্যাত হাসপাতাল অঁরি মন্দরে থাকার স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা বলেন হাবিব—ডাক্তার, নার্স সবাই ছিল খুব সহানুভূতিশীল। ছোট ছিলাম তো। সবার মনোযোগটা পেতাম। যে ডাক্তার আমার অপারেশন করেছিলেন তিনি এখন অবসর নিয়েছেন। কিন্তু তার সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। তিনি মেডিকেল একাডেমিতে আছেন। হাসপাতালে আমাদের দেখতে আসতেন ফ্রান্স-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মারি ফ্রঁস স্মিলদা (তিনিই প্রথম বাংলাদেশে গণহত্যার খবর শুনে ফ্রান্সে জনমত গড়ে তোলেন, পরে তাতে সমর্থন দেন অঁদ্রে মাঁলরোর মতো মনীষীও), মানুয়েল জোয়ান বারতেস প্রমুখ। মানুয়েল ছাত্র ছিলেন। প্রত্যেক সপ্তাহে এসে প্যারিস দেখাতে নিয়ে যেতেন, বাইরে খাওয়াতেন। আসলে যুদ্ধাহত বলে শুধু আমার প্রতি নয়, ফরাসিদের সিমপ্যাথিটা ছিল বাংলাদেশের জন্যও। সে সময় ফ্রান্সের সংবাদপত্র, টেলিভিশনে ১৭ বছরের হাবিবের সম্পর্কে লেখা হয়েছে; সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে।

’৭৩ সালের ৬ জুন প্যারিসের টাউন হল ‘ওতেল দ্য ভিল’-এ বাংলাদেশের এই আটজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তি সংগ্রামে তাদের গৌরবময় ভূমিকার জন্য পদক দিয়ে সম্মানিত করেন প্রেসিদঁ দু কনসাই দ্য পারির মাদাম নিকোল দ্য ওতে ক্লক।

হাবিব চিকিত্সার জন্য দ্বিতীয়বার প্যারিস আসেন ’৭৪ সালে। আবার যথাসময়ে দেশে ফিরে যান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ দেখা হয় ’৭৫ সালের জুন বা জুলাইয়ে। গণভবনে গিয়েছিলেন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্ট, দুর্ভোগের কথা জানাতে। অভিযোগ শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মুক্তিবাহিনীর সোনার ছেলেদের তিনি ভোলেননি।

প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছে তার ছিল না। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি প্যারিস ফিরে আসেন ক্ষোভ আর গ্লানি নিয়ে। বদলে যায় হাবিবের জীবনের ঠিকানা। প্যারিসে সোশিওলজিতে গ্রাজুয়েশন করার পর আলাপ হয় এক কানাডিয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনি হাবিবকে কাজের সুযোগ করে দেন কানাডা দূতাবাসে অ্যানেক্স ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বিভাগে। তখন রাষ্ট্রদূত ছিলেন থমাস বার্ন। কানাডায় ফিরে যাওয়ার আগে তিনি হাবিবকে ইউনেস্কোতে স্থানীয় কর্মচারী হিসেবে কাজের ব্যবস্থা করে দেন প্রেস বিভাগে। বিভিন্ন দেশের নিউজ গেজেটস ও রিপোর্টের কপি পাঠানো ছিল তার কাজ। এই কাজ করতে গিয়ে হাবিবের মতে, ‘অনেক শিখেছি, বুঝেছি, পড়েছিও।’ ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘে কাজ করেছেন। কাজের সূত্রে তিন মাসের জন্য জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্ক যান। সেবার সাতজনের যে দলটি নিউইয়র্ক যান তার মধ্যে হাবিবই ছিলেন একমাত্র এশিয়ার। তাদের কাজ ছিল জাতিসংঘের শিশু দপ্তরে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিষয়গুলো ছিল হাবিবদের কাজের আওতায়। নিউইয়র্ক থেকে ফিরে বৈবাহিক সূত্রে আর ব্যবসার কাজে কিছু দিন ইরানেও ছিলেন হাবিব।

ইরানে এক ফরাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল হাবিবের। তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক জার্মান ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বর্তমানে তাদের সঙ্গেই কম্পিউটার ব্যবসায় জড়িত হাবিব। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা পেশা হলেও হাবিবের শখ থিয়েটার, সিনেমায় অভিনয় করা। বর্তমানে ফ্রান্স টিভি চলচ্চিত্রে একজন মোটামুটি ব্যস্ত শিল্পী। মুক্তিযোদ্ধা থেকে অভিনেতা হাবিব নিজেই শোনালেন আলোকিত জগতে আসার পূর্বকথা।

প্যারিসের এক বিজ্ঞাপন এজেন্সি একজন ভারতীয় তরুণ খুঁজছিল। বেনেতোঁর র্যাম্প শোর জন্য। হাবিবকে দেখে তারা পছন্দ করেন। ওই ফ্যাশন শোতে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্স টিভি, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্রের সাংবাদিক এবং অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে কয়েকজন হাবিব সিনেমায় কাজ করতে আগ্রহী কি না জানতে চান। ওরাই পরে তাকে থিয়েটার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। উদ্যোগীদের একজন ছিলেন চলচ্চিত্রের। পরে তিনি হাবিবকে রুপালি পর্দায় কাজের সুযোগ দেন। হাবিব বলেন—এ পর্যন্ত ৩৬টি ফরাসি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। বিখ্যাত ফরাসি অভিনেতা অ্যালান দ্যলোর সঙ্গে অভিনয় করেছিলাম। ২২ বছর আগে। সেটা ছিল শুধু ফিগারেশন। এখন ছোটখাটো ভূমিকায় করছি। কাজ করেছি সম্প্রতি জোজে গার্সিয়া, ইসাবেল কারে, ফঁসোরা বোজের সঙ্গে। কিছু দিন আগে করলাম ফাবিউস লুচ্চিনি ও জনি হলিডের সঙ্গে। মনিকা বেলুচ্চির সঙ্গে করলাম এই ডিসেম্বরেই শেষ। চলচ্চিত্রের নাম কনসিল দ্য পিয়ের। সিনেমায় আমার সিল্যয়েট ছিল। সামনের বছর দুটো চুক্তি আছে ফরাসি টিভি চ্যানেল ছয়তে। সাত বছর আগে স্বপ্না নামে একটি বলিউড স্টাইলের ছবিতেও কাজ করেছিলাম। পরিচালক ছিলেন ব্রিটিশ। ওই ছবির পরই চার-পাঁচটি এজেন্সির সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। বিদেশে ভালো কাজ করেই আমরা বাংলাদেশের সুনাম রাখতে পারি।

প্যারিসে চিকিত্সার সময় হাবিব বইপত্র নিয়ে এসেছিলেন। বাঁ হাতে লেখার অভ্যেস করে তিনি ’৭৪ সালে এসএসসি পাস করেন পাঁচটি লেটার নিয়ে। তখন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখিছেলেন তাকে। অঁদ্রে মালরোর শুভেচ্ছাবাণীও আছে হাবিবের কাছে। এসবই বিশেষ দিনের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে তার কাছে।

মঞ্জুর (২৪) ও সোহেল (২২) দুই সন্তানের জনক তিনি। আজকাল দেশে যাওয়ার কথা খুব ভাবেন। দীর্ঘদিন পর কথা বলেছেন ছোট বোন সালমার সঙ্গে টেলিফোনে। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোর একটা বিশেষ সংখ্যায় মারি ফ্রঁস স্পিলদার ওপর একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে প্যারিসে আসা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি ছিল। সংবাদপত্রে সে ছবি দেখে হাবিবের বোন সালমা প্রথম আলোর উপ-সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের কাছে গিয়েছিলেন হাবিবের ঠিকানার সন্ধানে।

স্মৃতিটান হাবিবকে ছুঁয়ে থাকে। তিনি বলেন, আমি সময়ের অপেক্ষায় আছি। দেশের জন্য আমাদের অনেক করার আছে। স্বাধীনতার জন্য যারা মারা গেছেন, পঙ্গু হয়েছেন তাদের কাছে আমাদের অনেক দেনা। তারা যা দিয়ে গেছেন বাংলাদেশ তা কখনো দিতে পারবে না। আমরা অন্তত তাদের সম্মান জানাতে পারি। তাদের স্মৃতি রক্ষা করে। আর বঙ্গবন্ধু, তিনি জাতির স্থপতি, জনক। ইতিহাস তো মোছা যায় না। আমাদের বিজয়ের স্বপ্ন-প্রেরণা তাকে কেন্দ্র করেই ছিল। যারা বেঁচে আছেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রইল আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আর শুভেচ্ছা।