default-image

১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সপ্তাহকাল পরে, অচেনা এক ব্যক্তি এলেন কলকাতায় গোলপার্কের কাছে আমার অস্থায়ী আবাসে। মধ্যবয়েসী, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, পরিষ্কার বাংলা উচ্চারণে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন আগেই কোনো খবর না দিয়ে চলে আসার জন্য। সংক্ষেপে বললেন, তাঁর নাম নাথ। কাজ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেট ডিভিশনের অধীনে। বললেন, ‘দিল্লি থেকে পি এন হাকসার জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটা ঐক্যবদ্ধ মোর্চা করার বিষয়ে যেসব কথাবার্তা তাঁর সঙ্গে আপনার হয়েছিল, তার কতখানি অগ্রগতি ঘটেছে?’ আমি কথা বলতে ইতস্তত করছি দেখে তিনি বললেন, যত শিগগির সম্ভব বিষয়টি তিনি তাঁকে জানানোর অনুরোধ করেছেন। তারপর এক টুকরো সাদা কাগজে একটা টেলিফোন নম্বর লিখে তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো সাহায্যের দরকার হলে আমাকে এই নাম্বারে যোগাযোগ করলে আমি সে ব্যবস্থা করে দিতে পারব।’ কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন। বড় জোর পাঁচ-ছয় মিনিট তিনি আমার সঙ্গে ছিলেন।

চুপ করে কেবল ওর কথা শোনার কিছু কারণ আমার ছিল। অচেনা মানুষেরা এসে কথা বলেছেন, এমন অভিজ্ঞতা আমার আত্মনির্বাসনের এই তিন মাসে হামেশাই ঘটেছে। কিন্তু এই মানুষটি এমন নিগূঢ় এক তথ্যের সন্ধান চাইলেন, যা প্রকাশমাত্র তখনকার আবহাওয়ায় সেই ঐক্যপ্রচেষ্টার বিষয়টি সবিশেষ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারত।

বিজ্ঞাপন

তখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের দিক থেকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও আমি ছাড়া সম্ভবত আর কেউ জানতেন না যে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে একটি জাতীয় মোর্চা গঠনের প্রাথমিক প্রয়াস শুরু হয়েছে। ভারতীয়দের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি এন হাকসার ও উপদেষ্টা পি এন ধর বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন। ওঁদের মধ্যে আর কে কে জানতেন, তা আমার জানা ছিল না। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কলকাতায় তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার আলোচনার সময় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনের প্রসঙ্গটি প্রথম আলোচিত হয়। তাঁরই আগ্রহের কারণে মে মাসের শেষ দিকে ভারতের উপরিউক্ত দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে বিষয়টি আমি উত্থাপন করি। এদের মধ্যে পি এন হাকসার ছিলেন ভারত সরকারের বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়কারী।

এরপর জুলাই মাসে আমাকে দ্বিতীয়বার দিল্লি যেতে হয়েছিল, এবারও তাজউদ্দীনের অনুরোধে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী এবং হেনরি কিসিঞ্জার—যাঁর হাতে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাধারা নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা—দিল্লি এসেছিলেন অজ্ঞাত অ্যাজেন্ডা নিয়ে। এর প্রভাব বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রামকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, বিশেষ করে দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলে এর কী প্রভাব পড়তে চলেছে, তা অনুধাবন করার জন্যই আমার দিল্লি যাওয়া। সেখানে আমার অবস্থানকালে শেষ সন্ধ্যায় পি এন হাকসার এসে অত্যন্ত সংক্ষেপে আশা করার মতো কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী কিছুদিন আমি দিল্লির রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আগের তুলনায়—এবং আমাদের উদ্বেগ সঞ্চার করার মতো—বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করি।

সেখানে আমলাতন্ত্রের ভেতরে এবং ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহলে এই ধারণা প্রায় বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে বাংলাদেশের শরণার্থীদের বিরামহীন প্রবেশের ফলে ভারতের অর্থনীতি ও সমাজজীবন বিপন্নপ্রায়। শরণার্থীর এই স্রোত থামানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া ভারতের আর কোনো পথ খোলা নেই। ওরাই যা পারে মিটমাট করে দেবে, সেটা ভারতের জন্য অন্তত মন্দের ভালো।

দিল্লি ও কলকাতায়—যে দুই শহরে আমার যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিল—১৯৭১ সালের গ্রীষ্মকালে এমন একটি প্রশ্ন দ্রুত প্রসার লাভ করছিল যে বাংলাদেশের এক অকার্যকর বিদ্রোহী সরকারকে মদদ দিতে গিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট শাসকদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা ছাড়া আর কী হবে? সেই বৈরী আবহাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকে সচল করা এবং কিছুটা এর অনুকূলে সোভিয়েত সমর্থন লাভের জন্য, বাংলাদেশের মধ্যপন্থী আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলোর মোর্চা গঠনের কথা প্রকাশ হওয়ামাত্রই তা ভারতের দক্ষিণপন্থী জনমতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারত। সেই আশঙ্কা থেকে রাজনৈতিক ঐক্য সাধনের বিষয়ে নীরবতা রক্ষা করা হতো।

পরদিন ঘটনাটি জানিয়ে বার্তাবাহক ব্যক্তিটির নাম বলতেই তাজউদ্দীন তাঁকে চিনলেন। নাথ হলেন আর এন ব্যানার্জি, পুরো নাম রবীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি—ওদের রাজনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’-এর (RAW) পূর্বাঞ্চলের প্রধান, অ্যাডিশনাল ডিজি। আমি কোনো সরকারি পদে নিযুক্ত ছিলাম না। কাজেই ব্যাপারটা বুঝে ওঠার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, এমন একটা বার্তা পাঠানোর জন্য অত বড় পদের কাউকে পাঠানো হলো কেন? মনে হলো, তাজউদ্দীনও সঠিক জানেন না। বললেন, বার্তার গুরুত্ব ও গোপনীয়তার মান নির্দেশ করার জন্য ওটাই হয়তো প্রটোকল।

এর পরদিন আবার গেলাম ৮ থিয়েটার রোডে, হাকসারের প্রশ্নের জবাব তৈরি করে। আমার অভিমত ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত: প্রথমত, সর্বদলীয় মোর্চা গঠনের প্রশ্নে দুয়েকজন বাদে মন্ত্রিসভা ও দলের নেতৃস্থানীয়দের পর্যায়ে অধিকাংশের আপত্তি আগের মতোই প্রবল, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পরও তাদের মনোভাবে পরিবর্তন নেই। দ্বিতীয়ত, যখন তাঁরা দেখতে পাবেন মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন ভারত সরকার মোর্চা গঠনের জন্য যথোপযুক্ত চাপ প্রয়োগ করলে তা ফলপ্রসূ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তাজউদ্দীন মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। এ নিয়ে আগে একাধিকবার আমাদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে। প্রথম অভিমত সম্পর্কে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু দ্বিতীয়টি সম্পর্কে তিনি ক্রমেই বেশ সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন। ওটা আমার একারই ধারণা। কাজেই তাঁর নিজস্ব যে ব্যবস্থা আছে তার মাধ্যমে অপরিবর্তিত অবস্থায় হাকসারের প্রশ্নের জবাব চলে গেল।

ভারত সরকারের চাপ কতদূর কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ পোষণ করা কতটা যৌক্তিক ছিল, তা আমি জানতাম না। তবে এটা মানতাম যে তিনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরের বাস্তব অবস্থা এবং বিভিন্ন উপদলীয় তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নেতার দৃষ্টিভঙ্গি, মনমানসিকতা, কর্মক্ষমতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার খবর আমার চেয়ে ঢের বেশি জানতেন। কিন্তু সেগুলো তিনি সহসা প্রকাশ করতেন না। কারও চরিত্র বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে, এমন অনুমাননির্ভর কথাও তাঁকে আমি বলতে শুনিনি। ফলে দলীয় সংগঠনের বেশ কয়েকটি স্তরের ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট অনেক মানবিক উপাদান আমার অগোচরে রয়ে যেত। আমার নিজের এই অসুবিধা সম্পর্কে সজাগ থেকেও পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতির বৃহত্তর চিত্র অনুধাবন করা ও প্রকাশ করার চেষ্টায় সচরাচর আমার সাহসের অভাব ঘটত না। বলা যায়, তার অনেকটাই ছিল আমার বয়সোচিত অনভিজ্ঞতার সাহস।

আমি পরিস্থিতির যুক্তি অন্বেষণ করতাম বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিসরে, চলমান আন্তর্জাতিক ঠান্ডা লড়াইয়ের বাস্তব উপাদানের মধ্যে। তার অনেকটাই তখন প্রাক-স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ছক ও যুক্তিকে অকার্যকর করে ফেলেছে। সে সময়ে শুনতাম, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিশেষ করে মন্ত্রিসভার মধ্যে এই মর্মে একটা চাপা আলোচনা চলছে যে যুক্তরাষ্ট্রেরই শরণাপন্ন হওয়া উচিত, যাতে তারা ইয়াহিয়া ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা আপস মীমাংসা করে দেয়। শর্ত হবে, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার দাবি ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানের অধীনে ‘ছয় দফার’ কাছাকাছি স্বায়ত্তশাসনের একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, অন্যদিকে ইয়াহিয়াও শেখ মুজিবকে তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দেবে। আওয়ামী লীগের মধ্যপর্যায়ে একটা কথা তখন বেশ চালু হয়েছিল, ‘হয় স্বাধীনতা, না হয় মুজিবের জীবন রক্ষা; কিন্তু দুটোই একসঙ্গে সম্ভব নয়।’

তাজউদ্দীন যে হাকসারকে পাঠানো আমার সমীক্ষার দ্বিতীয়াংশের ব্যাপারে অর্থাৎ ভারতীয় চাপের মুখে মন্ত্রিসভা মোর্চা গঠনে সম্মত হতে পারে, সে প্রসঙ্গে মতের ভিন্নতায় তাঁর সহকর্মীদের মনমানসিকতার প্রতিফলন আমি দেখতে পাই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রায় একই সময়ে, অর্থাৎ জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লিতে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একই রকম বিরোধী প্রচারণা দেখতে পেয়েছিলাম। বলা হতো, বাংলাদেশ নিয়ে যথেষ্ট করা হয়েছে; চলো, এবার বরং আমেরিকার কাছে যাই, তারা যেভাবে পারে, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মিটমাট করে দেবে। কলকাতায় জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ মহলে কথাটা একটু অন্য রকম করে বলা হতো। বলা হতো, শরণার্থী দেখিয়ে বিপুল বৈদেশিক সাহায্য সংগ্রহ করার পরেও মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার ব্যাপারে ভারত চার-পাঁচ মাসেও বিশেষ কিছু করল না; তার চেয়ে দেশের মাটিতে গিয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে একটা মিটমাট করা যায় কি না সেটা দেখাই ভালো; যদি আমেরিকার মধ্যস্থতায় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত করা যায়। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও এই প্রচার অব্যাহত থাকে। প্রবাসী সরকারের উঁচু পর্যায়েও কীভাবে তা প্রকাশ পেয়ে চলে, তার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছিল।

ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পরের কয়েক দিন তাজউদ্দীনের অনুরোধক্রমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে আমি কতকগুলো প্রস্তাব নিয়ে দেখা করি, যাতে বিদেশমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিজের ভূমিকার ও ভবিষ্যৎ কাজের পরিসর বাড়ে এবং আমাদের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পরবর্তী পদক্ষেপে তিনি অন্তরায় না হন। খোন্দকার মোশতাকের উৎসাহে চার দিন ধরে বেশ ভলোভাবেই আলোচনা চলে। সম্ভবত তিন দিনের মাথায় জানতে পারলাম, তার পররাষ্ট্রসচিব মাহবুব আলম চাষী মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে দীর্ঘ বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, শুধু আক্রান্ত হলেই এই মৈত্রী চুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং এটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার ক্ষমতা হ্রাস করবে।

তাঁর এই অভিমত খণ্ডন করার মতো কোনো বক্তব্য সেখানে ওঠেনি। না ওঠারই কথা, প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী আরও জোরালো ভাষায় একই কথা বলতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রসচিবের মধ্যে মতের এই বিভিন্নতায় আমার উৎসাহ দ্রুত নিঃশেষিত হয়।

এরপর ১৫ আগস্ট নাগাদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লিতে আমন্ত্রিত হন। মৈত্রী চুক্তি সম্পর্কে ভারত সরকারের সবিশেষ আস্থার কথা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে তুলে ধরেন। তাঁরা ফিরে আসার পরপরই হাকসারের প্রশ্ন নিয়ে নাথ আসেন। আমি সে প্রশ্নের জবাব পাঠাই ১৯ আগস্ট।

বিজ্ঞাপন

এর মাত্র তিন বা চার দিন পর, ২২ কিংবা ২৩ আগস্ট, সকাল ১০টার দিকে তেমনই আগে না জানিয়ে নাথ আবার এলেন। এবারও আগের মতো সংক্ষিপ্ত বার্তা। ২৯ আগস্ট মস্কো থেকে ভারতের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ডি পি ধর দিল্লি থেকে কলকাতা আসবেন। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টায় হোটেল হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনালে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমার সম্মতির কথা জেনে নিয়ে তিনি বিদায় নিতে উদ্যত হলেন।

আগেরবার একটু অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছি মনে করে আমি সামান্য বাক্যালাপের চেষ্টা করতেই বুঝলাম, তিনি পেশাগত কারণেই স্বল্পভাষী। কেবল নির্দিষ্ট বার্তা পরিবেশন ও উত্তর সংগ্রহ করেই তিনি নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন বলে মনে করেন। সংবাদটা তাজউদ্দীনকে দিলাম। তিনি বললেন, তাঁকে ও সৈয়দ নজরুলকে মিসেস গান্ধী গত সপ্তাহে ডি পি ধরের নিয়োগের সংবাদ দিয়েছেন। তিনি নিযুক্ত হতে যাচ্ছেন কেবল বাংলাদেশ সমস্যার সার্বক্ষণিক সমাধানের দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর কর্মদক্ষতার ওপর ইন্দিরার প্রগাঢ় আস্থা। সামনের মাসের শুরুতে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার আগে ডি পি ধর সরজমিনে অবস্থা দেখতে আসছেন। অনেক দায়িত্বশীল লোকের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

কোন বিষয়গুলো তুলে ধরা যায়, সে বিষয়ে আমার মত জানতে চাইলেন। বললাম, ‘তার অগ্রাধিকার তালিকা তো চিন্তাভাবনা করে দিতে হবে। তবে দেখে মনে হয়, শুরুতে আমরা যে স্ট্র্যাটেজিক ধারণাটা তাদের কাছে আমরা তুলে ধরেছিলাম, সেই জায়গার মধ্যেই তাদের চিন্তা মোটামুটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা একটা নিরাপত্তা চুক্তি সই করেছে। সন্দেহ নেই যে সেটা চীনকে নিরুৎসাহিত করবে। যে লোকটি এই চুক্তি সম্পাদনে দক্ষতা দেখিয়েছেন, তাকেই আবার এখানে আনা হচ্ছে।

এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা গঠনের তাগিদ আসছে। আরও অনেকখানি বুঝে ওঠা দরকার। আমাদের প্রয়োজন তো বেশি নয়, কিন্তু সব কটি অত্যন্ত জরুরি: কত তাড়াতাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়ানো যায়, তাদের পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া যায়, দেশের ভেতরে তৎপরতা চালানো যায়। অত্যন্ত দ্রুত সব দরকার। না হলে তো রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।’ আমি থামলাম।

‘আপনি জানেন তাহলে?’

‘সব নয়, কিছু। আমেরিকার সঙ্গে আপস করে দেশে ফেরার নতুন রব বাড়ছে। তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৎপরতাও তো বাড়ছেই।’

‘তাহলে আপনাকে আরেকটা সংবাদও দিই। দিল্লিতে এবার আমি নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার অভিযোগ হাকসার আর কাওয়ের কাছে তুলে ধরেছি। তাঁরা আমার কথার কোনো জবাব দেননি।’

২৯ আগস্ট ছিল রোববার। সেদিন ১০টার আগে থেকে এমন প্রবল বৃষ্টি নামল যে ট্যাক্সি পাওয়া গেল না। হোটেল হিন্দুস্থানে গিয়ে পৌঁছালাম পৌনে বারোটায়। নির্ধারিত সময়ের সোয়া এক ঘণ্টা পরে। ভেবেছিলাম, সেক্রেটারির মতো কাউকে পেলে বৃষ্টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করব। সম্ভব হলে সাক্ষাতের আরেকটা সময় নিয়ে আসব। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই ডি পি ধরের সচিব জানালেন, ‘ধর সাহেব বলেছেন যেভাবে হোক আপনাকে ধরে রাখতে। যদি মেহেরবানি করেন। এখন একসঙ্গে দুজন দর্শনার্থী রয়েছেন, বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। সাড়ে ১২টায় তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন।’

ওরা চলে যাওয়ার একটু পরেই ডি পি ধর বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘকায় সুপুরুষ। আন্তরিকতার সঙ্গে বসার ঘরে নিয়ে এসে একের পর এক প্রসঙ্গ তুললেন। ২৯ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর—ওই চার দিন তাঁর সঙ্গে আমার পাঁচ দফা বৈঠক হয়। এর আগে আগস্টজুড়ে তাজউদ্দীন আহমদ একের পর এক প্রতিকূল স্রোতে ক্রমশ তাঁর কর্মক্ষমতা হারাচ্ছিলেন।

তাজউদ্দীনের দূত

পূর্ববঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, লোদি এস্টেটের বাড়ি পূর্ববঙ্গীয় অতিথিবৃন্দে বোঝাই।...সবচেয়ে বেশি দিন ছিল মঈদুল হাসান। এক সংবাদপত্রের স্বত্বাধিকারীর জামাতা হওয়ার সুবাদে সে সম্ভবত পত্রিকাটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিল, পরে অবশ্য তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে, কথাবার্তায় আলাপ-আপ্যায়নে তুখোড়, দেশ-বিদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাজউদ্দীনের খুব কাছের মানুষ। তত দিনে বনগাঁ সীমান্তে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সংগঠিত হয়ে গেছে, রাষ্ট্রপতি পূর্ব পাকিস্তানে বন্দী শেখ মুজিব, উপরাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সমসাময়িক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। প্রায় প্রতি সপ্তাহে, দুর্গাপ্রসাদ (ডি পি) ধর ও হাকসারের সঙ্গে পরামর্শের উদ্দেশ্যে তাজউদ্দীনের দূত হিসেবে মঈদুলের দিল্লি আগমন; থাকত আমাদের সঙ্গে, আনিস-রেহমানের (আনিসুর রহমান ও রেহমান সোবহান) মতোই আমাদের ঘরের লোক হয়ে গিয়েছিল।

অশোক মিত্রের স্মৃতিকথা আপিলা-চাপিলা থেকে

কার্যকর দূতিয়ালি

আগস্টের ২৯ তারিখে ডি পি ধর কলকাতায় আসেন নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের মিশনে (fact-finding mission)।...

রাজনৈতিক পর্যায়ে নানা সমস্যা ও সমাধানের প্রক্রিয়া জানতেই তাঁর এই আগমন। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তায় বোঝা গেছে, ভারত সরকারের নিকট বাস্তবসস্মত একটি নীতি ও কর্মপন্থা (policy-package) সুপারিশ করার আগে বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, প্রধান সেনাপতি ওসমানী ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মত-বিনিময়, আলাপ-আলোচনা করে সর্বসম্মত কিছু পথ বের করার চেষ্টা করছিলেন, যাতে মুক্তিযুদ্ধ জোরদার এবং আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে বন্ধুবর মঈদুল হাসান ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিরূপে শ্রী ধরের সঙ্গে বেশ কয়েকবার অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেন। তাঁর এই দূতিয়ালি যথেষ্ট কার্যকর ছিল এই জন্য যে কোনো পক্ষেই আনুষ্ঠানিকতার বালাই ছিল না এবং কেউই অপরের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না। মঈদুল হাসানের মারফত ডি পি ধর আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থা, সরকারের ওপর নানাবিধ চাপ, সর্বোপরি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। এতে আমাদের সরকার অপর পক্ষের অর্থাৎ ভারতের সীমাবদ্ধতা, তৎকালীন সমস্যা ও দ্রুত সমাধানের উপায় হিসেবে কী করণীয় তার উপায় উদ্ভাবনে সচেষ্ট হতে পেরেছিলেন।

এইচ টি ইমামের বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ থেকে

মঈদুল হাসান: মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ সহযোগী