default-image

তুমুল যুদ্ধ চলছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে গণহত্যা। সারা দেশে নির্বিচারে মানুষ মারছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর থেকেই তাই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে যেখানে পারছে মানুষ পালাচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে তার বিরাট এক অংশ পিলপিল করে ঢুকছে ভারতে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ এ সংখ্যা ৯৯ লাখ ছুঁইছুঁই করবে। তবে এখন চলছে সেপ্টেম্বর মাস।

বাংলাদেশের বেনাপোল প্রান্ত দিয়ে যে রাস্তাটা ভারতে ঢুকে গেছে, তার নাম যশোর রোড। কলকাতার দিকে ছুটে যাওয়া দীর্ঘ এই রাস্তাটিতে মানুষের মাথা মানুষে খাচ্ছে। রাস্তার দুপাশ ঘরবাড়িতে তখনো ততটা ঘিঞ্জি নয়। মাঝে মাঝে যেসব খেতি জমি আর ফাঁকা মাঠ, সব সয়লাব হয়ে আছে মানুষে। মাইলের পর মাইল তাঁবু খাটিয়ে থাকা মানুষ, খোলা মাঠে নিরাশ্রয় মানুষ, মুমূর্ষু স্বজনকে পিঠের ওপর বয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটতে থাকা মানুষ। আর পুরো দৃশ্যপট ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বন্যা। বন্যার হাত ধরে এসেছে তার চিরন্তন আততায়ী সঙ্গী কলেরাও।

বিজ্ঞাপন

এই মৃত্যুময় দৃশ্যপটের মধ্যে বন্যার পানি ভেঙে ঢুকে পড়েছেন এক সাহেব। সাহেব আসলে তিনি নন। একই সঙ্গে ক্রুদ্ধ ও মমতাময় এক মার্কিন কবি। তিনি এসেছেন বনগাঁ-বয়ড়া সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে। তাঁবুতে তাঁবুতে ঘুরছেন। কথা বলছেন শরণার্থীদের সঙ্গে। দেখছেন, খাদ্যের অভাবে কীভাবে ধুঁকছে লাখ লাখ মানুষ, মরণাপন্ন বাবা-মায়ের জন্য ওষুধ না পেয়ে কীভাবে মাথা কুটছে সন্তান, বমি করতে করতে কীভাবে মরছে শিশুরা। নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়ে নভেম্বরের ১৪ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত এ অভিজ্ঞতা একটি কবিতায় রূপ দেবেন এই কবি। ভিলেজ ভয়েসনিউ ইয়র্ক টাইম্‌স্‌-এ ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামে বেরোবে সেই কবিতা। হুলুস্থুল পড়ে যাবে সর্বত্র।

অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ (১৯২৬-১৯৯৭) নামের সেই কবিটি তত দিনে পৃথিবীজুড়ে দারুণ নন্দিত ও নিন্দিত। তাঁর জীবনযাপন প্রথাবিরোধী ও অকপট। সেই অকপট জীবনের নানা অভিজ্ঞতা উপচে পড়েছে তাঁর খোলামেলা কবিতার মধ্যেও। স্রেফ কবিতা লেখার কারণে জেলও খেটে এসেছেন। বিট সাহিত্য আন্দোলন, যুদ্ধবাজ মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা, কিউবার পক্ষ সমর্থন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা তাঁকে তুমুল তর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সেই বিতর্কের ঘূর্ণিবাত্যার মধ্যেই তিনি এসেছেন কলকাতায়। অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ এস্টেটের ওয়েবসাইট বলছে, ‘অনামা এক লোকের অনুদানের টিকিটে অ্যালেন ভারত, পশ্চিমবঙ্গ এবং পরে বন্যা ও দুর্ভিক্ষে প্রায় ৭০ লাখ লোকের উন্মূল দশা দেখতে যশোর রোডের শরণার্থী শিবিরে ঘুরতে যান।’

না, একেবারেই অনামা নন। অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গকে কলকাতা যাওয়ার টাকা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ব্যান্ড দল রোলিং স্টোনসের কিথ রিচার্ডস। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও প্রশাসন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যে বাঙালিদের প্রতি সমর্থনের জোয়ার জেগেছিল। সেটি সম্ভবপর করে তুলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কবি-শিল্পী-অধিকারকর্মীরা। কিথ রিচার্ডসের প্রত্যাশা ছিল, কলকাতায় গিয়ে অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ ‘গৃহযুদ্ধের ছোবল থেকে পালানো বাংলাদেশের কোটি মানুষের মর্মান্তিক দুর্দশার ছবি তুলে ধরবেন।’

সেই যাত্রায় গিন্‌স্‌বার্গের সফরসঙ্গী ছিলেন তিনজন। একজনের নাম কবিতাটির মধ্যেই আছে—‘সুনীল পোয়েট’, মানে পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাকি দুজন কারা? সুনীল লিখেছেন, ‘একজন বিদেশি পর্যটক ও কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের একটি সুদর্শন বুদ্ধিমান যুবক—এঁদের দুজনেরই নাম মনে করতে পারছি না।’ (‘একটি অসাধারণ কবিতা’, কবিতা কার জন্য?) গিন্‌স্‌বার্গের কবিতাসমগ্রে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার পাদটীকা থেকে জানা যাচ্ছে, সেই বিদেশি পর্যটক একজন মার্কিন বৌদ্ধ ছাত্র, কবি জন গিয়োর্নো। শরণার্থী শিবিরে গিয়োর্নো গিন্‌স্‌বার্গের ছবিও তুলেছিলেন। তেমন একটি ছবি গিন্‌স্‌বার্গের ওয়েবসাইটে যত্ন করে রাখা আছে। বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাটির কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন
default-image

শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই মধুর ছিল না। সুনীল লিখেছেন, ‘আমরা যখন যাই তখনো সীমান্তে বিদেশিদের গমনাগমন নিষিদ্ধ হয়নি বটে, কিন্তু তখন ওখানে বন্যার দাপট চলছে। বনগাঁ শহরের মধ্যেই বড় রাস্তায় একহাঁটু জল, বয়ড়ার রাস্তায় নৌকা চলছে—শরণার্থী শিবিরের মধ্যেও জলস্রোত। তাতে অবশ্য ওই বেপরোয়া কবি নিরস্ত হননি। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আমরা জলের মধ্যেই হাঁটতে শুরু করি—প্রথমে পাৎলুন গুটিয়ে, তারপর মায়া ত্যাগ করে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেছিলাম, কখনো কখনো নৌকায় কিছু পথ ঘুরেছি—ডাব ও সিগারেট ছাড়া আর কোনো খাদ্যপানীয় ছিল না।’ বাংলাদেশি শরণার্থীদের যে দুর্ভোগ গিন্‌স্‌বার্গ দেখতে পান, তার বিশদ বিবরণ কবিতাটিতে উঠে আসে।

ওই সময়টাতে গিন্‌স্‌বার্গ কবিতাও লিখছেন এক অদ্ভুত উপায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি সম্পর্কে সোচ্চার প্রথাবিরোধী এই কবি তখন চষে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। আর যা কিছু দেখছেন, টেপরেকর্ডারে ধরে রাখছেন সব। বিট সাহিত্য গবেষক টনি ট্রিজিলিও জানিয়েছেন, ‘কবির তাৎক্ষণিক ভাবনা বলা হয়ে যাচ্ছিল টেপরেকর্ডারে। একই সঙ্গে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল চারপাশের আওয়াজ আর গাড়ির রেডিওতে চলতে থাকা খবর।’ (এনসাইক্লোপিডিয়া অব বিট লিটারেচার, সম্পাদনা: কুর্ট হেমার) সুনীলও লিখেছেন একই কথা, ‘অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গের সঙ্গে একটা টেপরেকর্ডার ছিল, সর্বক্ষণ খোলা, যেকোনো ব্যাপারে তাঁর প্রতিক্রিয়া টেপরেকর্ডারকে শোনাচ্ছিলেন, কখনো আমরা সবাই মিলে যা আলোচনা করেছি, তাও টেপ-নিবদ্ধ হয়।’

কবিতাটির বক্তব্য ছিল সরাসরি। টনি লিখেছেন, ‘গিন্‌স্‌বার্গ শরণার্থীদের খাদ্যাভাবের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও তুলেছেন, ভিয়েতনামে বিরামহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন তহবিলের টাকা ওই লাখ লাখ নিরাশ্রয় শিশুকে সাহায্যের জন্য কেন ব্যয় করা হবে না।’ কবিতাটিতে জায়গা করে নিয়েছিল শরণার্থীদের আরও নানা দুর্দশার ছবি, অজানার পথে লক্ষ নিরাশ্রয় লোকের দেশত্যাগের মর্মন্তুদ বর্ণনা, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচনা। ‘আ রিভাইভ্যাল অব পোয়েটরি অ্যাজ সং: অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ, রক অ্যান্ড রোল, অ্যান্ড দ্য রিটার্ন টু দ্য বার্ডিক ট্র্যাডিশন’ শিরোনামের এক লেখায় গিন্‌স্‌বার্গের আরেক গবেষক কেটি এম স্টিফেনসন বলছেন, ‘কলকাতায় যে মানুষদের গিন্‌স্‌বার্গ দেখতে পেয়েছিলেন, “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতায় তিনি তাদের কণ্ঠস্বর দিতে চাইলেন। কবিতাটির মধ্য দিয়ে পৌঁছুতে চাইলেন বৃহত্তর পরিসরে ছড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপ্ত জনতার কাছে। তাদের কাছে নগ্ন করে দিতে চাইলেন এই রাষ্ট্রের কপটতা: ন্যূনতম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রেখে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষকে যে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, অথচ ভিয়েতনামে খরচ করছে যুদ্ধের পেছনে।’

কলকাতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে কী করলেন অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ? কেটি স্টিফেনসন দিচ্ছেন এক মজার তথ্য: ‘১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে ফিরে এসে গিন্‌স্‌বার্গ যাঁর সঙ্গে দেখা করতে উন্মুখ হয়ে উঠলেন, তিনি এজরা পাউন্ড নন, জন লেনন। তিনি তড়িঘড়ি করে সাইরাক্যুসে ছুটলেন। ওখানে ছিল জন লেনন আর ইয়োকো ওনোর অ্যাপার্টমেন্ট। জন লেননকে “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” পড়ে শোনালেন। “সংগীতশিল্পীটির দুচোখ বেয়ে যখন অশ্রু গড়াতে শুরু করল”, তিনি অনুভব করলেন কবিতাটি ঘটনা ঘটিয়েছে।’

কবিতা লিখেই অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ বসে রইলেন না। মার্কিন চেতনার গভীরে বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা কী করে পৌঁছানো যায়, এ দুর্দশা দূর করতে কীভাবে মার্কিন জনতাকে সক্রিয় করে তোলা যায়, সে ভাবনায় তিনি অস্থির হয়ে রইলেন। একটি কবিতা পাঠের আয়োজন করলেন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন প্রতিপক্ষ ও প্রবলভাবে বিবদমান। নিউ ইয়র্কের সেই কবিতার আসরে যুক্তরাষ্টের কবি গিন্‌স্‌বার্গ আর রুশ কবি আন্দ্রেই ভজনেসেন্‌স্কি হয়ে উঠলেন মধ্যমণি। ইয়েভগেনি ইয়েতুশেঙ্কো আর আন্দ্রেই ভজনেসেন্‌স্কি তত দিনে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক জোড়া কিংবদন্তিতুল্য নাম হয়ে উঠেছেন। কবিতার নতুন ভাষায়, যৌবনের দাপটে, ব্যঙ্গ আর পরিহাসে তরুণসমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁরা। একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিন্‌স্‌বার্গ আর ভজনেসেন্‌স্কি বিশ্বকে বার্তা দিলেন, রাষ্ট্র যা-ই ভাবুক বা করুক, কবিরা আছেন বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। সব সীমান্তের বাধা পেরিয়ে কবিরা আছেন পৃথিবীর সব নিপীড়িত মানুষের হাত ধরে।

কবিতার সেই আসরে আরও যোগ দিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গের বিটদলের কবি-বন্ধুরা—গ্রেগরি করসো, অ্যান ওয়াল্ডম্যান, পিটার অর্লভিস্ক, কেনেথ কচ, এড স্যান্ডার্স, মাইকেল ব্রাউনস্টাইন, ডিক গ্যালাপ আর রন প্যাজেট। ২০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় সেন্ট জর্জেস চার্চে বসল এ আসর। ‘অ্যামেরিকানস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন এর আয়োজন করল। তারা জানাল, এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে সবাইকে জানানো এবং বাংলাদেশের জন্য একটি ত্রাণ তহবিল গড়ে তোলা’।

বিজ্ঞাপন

একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। প্রকাশের পরপরই ব্যাপক সাড়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবিদের মধ্যেও সে ঢেউ এসে লাগল। কবি বেলাল চৌধুরী এই তথ্য দিয়েছেন যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি ব্যবহার করে একটি পোস্টার বের করা হয়। পোস্টারটির দামের জায়গায় ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশের শরণার্থীদের পুনর্বাসনে অংশ নিতে স্বেচ্ছায় যতটা সম্ভব সহযোগিতা করুন।’ এর বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা শরণার্থীদের তহবিলে জমা পড়ে। (‘গীনসবার্গের সঙ্গে’, নির্মলেন্দু গুণ)

গিন্‌স্‌সবার্গ নিজেও কবিতাটির প্রেমে পড়েছিলেন। এই কবিতার প্রতি তাঁর দুর্বলতা কখনোই শেষ হয়ে যায়নি। নানা কবিতার আসরে এটি তিনি পড়ে শুনিয়েছেন। এ কবিতায় পরে সুর দেওয়া হয়। কবিতাপাঠের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে প্রায়ই এটি তিনি পরিবেশন করেছেন। এমনকি কোনো কোনো আসরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গেয়ে শোনানোর পর্বে গিন্‌স্‌বার্গের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এ বছর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী গায়ক বব ডিলান।

এই কবিতায় চিরকালের জন্য স্থির হয়ে আছে একাত্তরের হাহাকারভরা ছবি: ‘হাঁটছে পাঁকে লক্ষ পিতার কন্যারা/ অবোধ শিশু ভাসিয়ে নিল বন্যারা/ লক্ষ মেয়ে করছে বমন আর্তনাদ/ লক্ষ পরিবারের আশা চূর্ণসাধ।’ (অনুবাদ: খান মোহাম্মদ ফারাবী)

যশোর রোডে সেপ্টেম্বর

লক্ষ শিশু দেখছে আকাশ অন্ধকার

উদর স্ফীত, বিস্ফারিত চোখের ধার

যশোর রোডে-বিষণ্ন সব বাঁশের ঘর

ধুঁকছে শুধু, কঠিন মাটি নিরুত্তর।

লক্ষ পিতা ভিজছে হিমেল বৃষ্টিতে

লক্ষ মাতা দুঃখ দেখে দৃষ্টিতে

লক্ষ ভাইয়ের হৃদয় শুধু যন্ত্রণা

লক্ষ বোনের নেইকো ঘরের সান্ত্বনা।

লক্ষ মাসি ভাতের জন্য যায় মরে

লক্ষ মাতুল মাতাল হয়ে শোক করে

লক্ষ পিতামহের গৃহ চূর্ণপ্রায়

পিতামহী হচ্ছে পাগল নিঃসহায়।

হাঁটছে পাকে লক্ষ পিতার কন্যারা

অবোধ শিশু ভাসিয়ে নিল বন্যারা

লক্ষ মেয়ে করছে বমন আর্তনাদ

লক্ষ পরিবারের আশা চূর্ণ সাধ।

লক্ষ প্রাণের উনিশ শত একাত্তর

উদ্বাস্তু যশোর রোডে সব ধূসর

সূর্য জ্বলে ধূসর রঙে মৃতপ্রায়।

হাঁটছে মানুষ বাংলা ছেড়ে কলকাতায়।

default-image

সিক্ত মিছিল হাঁটছে মানুষ নিঃসহায়

ত্রস্ত ভীত ক্ষুব্ধ বালক থমকে চায়

স্তব্ধ আঁখি শীর্ণদেহ অস্থিসার

মানববেশ এ ক্ষুধার্ত সব ফেরেশতার।

কাঁদছে মাতা উঁচিয়ে আঙুল ওই দেখায়

দাঁড়িয়ে আছে সন্ন্যাসিনীর মতোই প্রায়

সন্তানেরা শীর্ণপদে প্রার্থনায়

পাঁচটি মাসের অন্নবিহীন যন্ত্রণায়।

দুইটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষছায়

নীরব চোখে আমায় শুধু দেখেই যায়

অন্নজোটে সপ্তাহেতে একটি বার

দুধের গুঁড়ো ক্লান্ত শিশু চায় না আর।

সবজিবিহীন অন্ন খেয়েই কাটছে দিন

সপ্তাহেতে তিনটি দিনই অন্নহীন

দুধের ছেলে করছে উপোস মৃতপ্রায়

যা কিছু খায় করছে বমি যন্ত্রণায়।

সামনে আমার কাঁদছিল মা অন্ন চাই,

বাংলা ভাষায় ডাক দিল কে ‘শুনুন ভাই’

পরিচয়ের পত্র ছেঁড়া মাটির গায়

ক্যাম্প অফিসের দ্বারে স্বামী দাঁড়িয়ে ঠায়।

খেলছে শিশু বানের পানি চারটি ধার

শেষ হয়েছে দেবে না আজ খাদ্য আর

আমার ব্যাগে পয়সা—এ কি আমার পাপ

শিশুর চোখে দেখছি মোদের মৃত্যুশাপ।

হাজার বালক লাইন দিয়েছে একটি ধার

খাদ্য দেবে প্রতীক্ষাতেই দাঁড়িয়ে তার

হল্লা কিছু করছে ছেলে নিরন্তর

উঁচিয়ে লাঠি ছুটছে পুলিশ ক্রুদ্ধস্বর।

এমনি করে দাঁড়িয়ে এ কোন শিশুর দল

হল্লা করে দিচ্ছে কিউ ঝড় বাদল

মাথায় নিয়ে কান্না হাসির মাঝখানে

খাদ্য কেন হচ্ছে দেওয়া এইখানে

অফিস থেকে বেরিয়ে এল একটি লোক

হাজার বালক দেখল চেয়ে কী উৎসুক।

প্রার্থনা এ? ‘আজ আর কোনো খাদ্য নাই’

হল্লা করে হাজার ছেলে লক্ষ ভাই।

ছুটল সবাই তাঁবুর ঘরে প্রতীক্ষায়

বসেই আছেন মাতাপিতা একটি ঠায়

কঠিন খবর ছুড়ল ছেলে—খাদ্য শেষ

রুগ্ণ শিশু চমকে উঠে জীর্ণ বেশ।

মাতার কোলে নবজাতক শিশুর শব

অদ্ভুত সব রোগে এখন ভুগছে সব

দুঃখ-শোকের মদ গিলে আজ সব মাতাল

শরণার্থী শিবিরটাই তো হাসপাতাল।

সীমান্তে আজ বানের পানি তা থৈ থৈ

সব ডুবেছে, খাদ্য দেবে পথটা কৈ?

মার্কিন সব দেবতারা কোথায় আজ?

বিমান থেকে শিশুর গায়ে ছুড়ছে বাজ?

রাষ্ট্রপতি কোথায় তোমার সৈন্যদল?

বিমানবহর নৌবাহিনী অর্থবল?

তারা কি আজ খাদ্য ওষুধ আনতে চায়?

ফেলছে বোমা ভিয়েতনামের নিঃসহায়?

অ্যালেন গিন্‌সবার্গের লেখা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা থেকে, অনুবাদ: খান মোহাম্মদ ফারাবী

সাজ্জাদ শরিফ: কবি ও সাংবাদিক