default-image

তিনি যখন চোখ খুললেন, প্রায় কিছুই দেখতে পেলেন না, কেবল চারদিকে দুধের মতো সাদা রঙ ছাড়া। আয়তাকার ছোট ঘরটার সব দেয়ালে সাদা রঙ কুয়াশার জেদী ভাব নিয়ে জাঁকিয়ে বসে আছে। ঘরের দরজার সামনে ঝোলানো লম্বা যে পর্দা তার রঙ সাদা। পাশে একটা ছোট দরজা, মনে হয় বাথরুমের, সেখানে ঝুলছে সাদা পর্দা। ঘরের একমাত্র জানালার অর্ধেক জুড়ে যে পর্দা বাতাসে দোল খাচ্ছে, তার রঙও সাদা। একটি মেয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে দেখছে। মেয়েটির শাড়ি, মাথার ওপরের আবরণ সেসবও সাদা। সাদা তার কাছে শূন্যতা, যেমন হয় সাদা ক্যানভাসের দিকে তাকালে।

সাদার ভেতর থেকে যতক্ষণ না ফর্ম আর রঙ বেরিয়ে আসে, তিনি অস্থির বোধ করেন। সাদা তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে, কেননা এর ভেতর তিনি দেখতে পান মৃত্যুর মুখোশ, ধ্বংসের সব চিহ্ন। সাদা রঙ তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, ডাক দেয় দ্বৈরথে। যেন বলে, এসো তো দেখি কে জেতে, আমি না তুমি? তারপর নিজেই রায় দিয়ে অট্টহাসি হাসে। না হে, পারবে না। যতই রঙ ব্যবহার করো না কেন, আমাকে হারাতে পারবে না। আমি তোমার সব রঙ শুষে নেব। অথবা নতুন নতুন জাগায় আমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করব। আমাকে অদৃশ্য করে দেওয়ার মতো এত রঙ তুমি কোথায় পাবে?

বিজ্ঞাপন

তিনি জানেন, সাদা রিক্ততার প্রতীক, বৈধব্যের হাহাকার, শূন্যতার আস্ফাালন। সাদা রঙ তার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে দেয়, তার সীমাবদ্ধতা, অক্ষমতা এবং মরণশীলতাকে বিদ্রূপের সঙ্গে জানিয়ে দেয়। তিনি সারা জীবন, সেই শৈশব থেকে, সাদার সঙ্গে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। সাদা কাগজে আঁকিবুঁকি আঁকা থেকে শুরু করে লেখালেখি এবং যৌবনে এসে রঙ দিয়ে সাদাকে পরাজিত করার জন্য অক্লান্ত লড়াই করে যাচ্ছেন। সাদা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে বেসামাল হয়ে যান। বেশ বুঝতে পারেন যে, প্রতিপক্ষ তার অস্থিরতা এবং অসহায়বোধ দেখে তৃপ্তির সঙ্গে তাকিয়ে আছে। মৃদু মৃদু হাসছে। সেই হাসিতে অবজ্ঞা এবং করুণা দুই-ই মেশানো।

তারপর তিনি যখন তুলি হাতে নেন, প্যালেট থেকে রঙ নিয়ে সাদার বুকে চেপে ধরেন, আঘাত করেন তীরন্দাজের মতো কিছুটা দূর থেকে অথবা রোমান গ্ল্যাডিয়েটরের সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যান, সাদা প্রবলভাবে বাধা দেয়, তাকে পরাস্ত করতে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। তিনি অক্লান্তভাবে তূণ থেকে তীর তুলে ছোড়ার মতো প্যালেট থেকে রঙের পর রঙ ছুড়তে থাকেন সাদা ক্যানভাসের শূন্যতায়। ধীরে ধীরে ফর্ম জেগে ওঠে। রঙের প্রলেপে টেক্সচার তৈরি হয়, সাদা পিছু হটতে থাকে। কিন্তু তখনো সাদার আক্রোশ থাকে। তাকে সহজে জয়ী হতে দেয় না। রঙের বিন্যাসে পেলব রূপ ফুটে উঠতে সময় নেয়। তিনি ভুল করেন, সাদা তখন হেসে ওঠে হা-হা করে। তারপর যখন ক্যানভাস জুড়ে থাকে কেবল রঙ, অথবা সাদাকে বন্দি করে বিজয়ী হয় রঙের প্রলেপে আঁকা নানা ফর্ম, টেক্সচার, কমেঙ্াজিশন, তার অস্থিরতা কাটতে শুরু করে।

আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়। তিনি ক্যানভাসে রঙের রেখায় জেগে ওঠা ফর্ম এবং তাদের বর্ণনা শুনতে পান। কিন্তু একটা ক্যানভাসে রঙ উজ্জ্বল হয়ে ছবি সৃষ্টি করলেই তো সাদা পরাজিত হয় না। সাদা বিদ্রূপ করে জড়ো করে রাখা অন্যসব ক্যানভাস থেকে। সাদার বিরুদ্ধে তার লড়াই রূপকথার সেই সব সৈন্যের কথা মনে করিয়ে দেয় যারা মরে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠে এবং লড়াই করতে এগিয়ে আসে। সাদা মরেও মরে না, মরতে চায় না। তূণ থেকে তীর ছোড়ার মতো তাকে প্যালেট থেকে একের পর এক রঙ তুলে নিয়ে ক্যানভাসের শূন্যতা ভরিয়ে তুলতে হয়। তিনি সাদার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে চান না। তিনি জানেন সাদা কেবল কোনো কিছুর অনুপস্থিতি নয়। নির্দোষ শূন্যতা নয়। সাদা মৃত্যুর এবং ধ্বংসের প্রতীক। অমর নন তিনি-এ কথা জানেন, তবু মৃতুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে পিছপা হন না, বার্গম্যানের ছবির চরিত্রের মতো মৃত্যুর সঙ্গে তিনি দাবা খেলে যান।

তিনি প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন, মানুষের ফিগার দেখে ক্যানভাসে শিল্প তৈরি করেছেন। রঙের ব্যবহারে তার কার্পণ্য নেই। রঙের জাদুকর, এই খ্যাতি আর পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। শিল্পরসিক, শিল্পসমালোচক রঙের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণকেই বড় করে দেখেছে এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেছে। কিন্তু কেন যে তিনি রঙের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন, তাদের প্রায় নিত্যসঙ্গী করেছেন, সেই রহস্য জানতে পারেনি কেউ। তিনি অনেক ইন্টারভিউ দিয়েছেন, কিন্তু কখনই সাদার প্রতি তার ভীতি বা তীব্র অপছন্দের কথা বলেননি। তিনি যে ক্যানভাসের সামান্য অংশও রঙের বাইরে রাখেন না, শূন্য থাকতে দেন না, এর নানা ব্যাখ্যা পড়ে এবং শুনে মনে মনে হেসেছেন। যারা তার ছবি দেখে, ছবি নিয়ে লেখে, তাদের কেউ তার মনের ভেতরকার কথা জানে না। তিনি নিজেই ব্যাখ্যা দিতে পারতেন, কিন্তু তাহলে সব রহস্যই উদঘাটিত হয়ে যেত এবং জেডি সেলিঞ্জারের কিশোর চরিত্র হোন্ডেন কলফিল্ডের মতো নিজেকে একাকী নিঃসঙ্গ মনে হতো। নিজের সম্বন্ধে সব কথা বোলো না-কলফিল্ড চরিত্রের এই উক্তি তার কাছে বেশ তাত্পর্যময় মনে হয়েছে। বেশ পুরনো বই, কিন্তু এখনো পড়েন শুধু সেই শেষ বাক্যটির জন্য-নিজের সব কথা অন্যদের বোলো না। তাহলে একাকী নি:সঙ্গ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

সাদা শাড়ি পরে, মাথায় সাদা ক্যাপ জাতীয় আবরণ নিয়ে যে মেয়েটি তাকে দেখছিল নিবিষ্ট দৃষ্টিতে, সে ধীরপায়ে তার কাছে এল। তিনি শিউরে উঠলেন, মনে হলো একদলা সাদা পাথরের টুকরো গুড়িয়ে দিতে। তিনি বিছানার অন্য পাশে ঘুরে শুলেন। বিছানার সাদা চাদর, সাদা বালিশের ওয়ার এবং পাশের সাদা দেয়াল হেসে উঠল। তিনি চোখ বুজলেন। মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন তিনি। আপনার কেমন লাগছে এখন? বুকের ব্যথা কমেছে? একটু ভালো লাগছে? তিনি হূিপণ্ডের শব্দ শুনতে পেলেন খুব সঙ্ষ্ট করে। একটানা শব্দ করে যাচ্ছে, একই লয়ে, আজন্ম। ব্যথা? না বুকে ব্যথা অনুভব করছেন না তিনি। তবে চারদিকে সাদার ভেতর থেকে তিনি অস্থির হয়ে উঠেছেন চোখ খোলার পর থেকে।

তিনি যেন হেরে যাচ্ছেন-এই অনুভব আছন্ন করছে তাকে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কী নাম দেওয়া যায় এই অনুভবের? এর কি কোনো নাম আছে? তিনি চোখ বন্ধ করেই, পাশ না ফিরেই মেয়েটিকে বললেন, আমি এখানে কেন? তার স্বরে উত্তেজনা ছিল। কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিটাও সঙ্ষ্ট। মেয়েটি আস্তে চাপা স্বরে বলল, আস্তে কথা বলুন। এত জোরে কথা বলবেন না। তিনি আগের মতোই চোখ বন্ধ করে প্রশ্ন করলেন, কেন? আস্তে কথা বলব কেন? কার আদেশ এটা? মেয়েটি একটু থতমত খেল, যেন প্রস্তুত ছিল না এমন প্রশ্নের জন্য। তারপর সামলে নিয়ে বলল, আদেশ না, উপদেশ। ডাক্তারের উপদেশ। আমি তাকে ডেকে নিয়ে আসি। তিনিই সব বলবেন। এবার তিনি পাশ ফিরে নিলেন এবং চোখ খুলে জমাট সাদা রঙের শরীর নিয়ে যে মেয়েটি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানে সব সাদা রঙ কেন? দেয়াল সাদা, পর্দা সাদা, বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার সব সাদা। আপনিও সাদা। ব্যাপার কী? আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বুঝি? আমি সব বুঝতে পারি। কিছু হবে না। পারবে না তোমরা।

তার কথা শুনে প্রলাপের মতো মনে হয় নার্সটির কাছে। সে ভয়ার্ত চোখে তাকে দেখে। রোগের নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে মনে করে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সে কাকুতির স্বরে বলে, আপনি ডাক্তার সাহেবকে সব বলুন। একটু শান্ত হয়ে থাকুন। আমি এক্ষুনি তাকে ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি সব বলবেন। আপনি একটুও উত্তেজিত হবেন না। প্লিজ। তার স্বরে মিনতি ঝরে পড়ে। শুনে তিনি ভ্রূ কুঁচকান। ভালো করে দেখেন মেয়েটির দিকে। সাদা রঙের আড়ালে তার শ্যামল রঙ মুখ উঁকি দেয়। দেখা যায় শীর্ণ নগ্ন দুটি বাহু আর চোখের নার্ভাস দৃষ্টি। মেয়েটির রঙ সাদার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করেছে, কিন্তু নিচের স্তরে থেকে প্রায় পরাজয় স্বীকার করে। সাদাই তার ওপর প্রভুত্ব করছে, যেমন করছে ঘরের দেয়ালে, পর্দায়, বিছানার চাদরে। মেয়েটি হয়তো নির্দোষ, তার রয়েছে সংকল্পের অভাব, শক্তিহীন, তাই সমর্পণ করেছে সাদার কাছে। তার ওপর রাগ করে লাভ নেই। ডাক্তার আসুক। তার কাছ থেকেই শোনা যাবে। তাকেই সব কথা জিজ্ঞাসা করবেন তিনি।

ডাক্তারকে নিয়ে একটু পরে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ডাক্তারটির পোশাকের ওপর সাদা অ্যাপ্রন কিন্তু তার মাথায় সাদা কাপড়ের টুপি নেই। কিন্তু সব চুল সাদা। তিনি যে শার্ট পরেছেন সেটাও সাদা। শুধু প্যান্টটার রঙ খাকি। খাকি রঙ সাদাকে ছাপিয়ে উঠতে পারেনি। সুতরাং ডাক্তারও সাদার কাছে পরাজিত। তিনি ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন। যেন বুঝতে পারলেন, তাকে নিয়ে একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে এখানে। কিন্তু তিনি এখানে কেন? তার সব রঙিন ক্যানভাস কোথায় গেল? সেই সব ক্যানভাস ছিল সাদার বিরুদ্ধে তার নিরন্তর যুদ্ধের এবং যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ট্রফি। সেই সব উল্লাসের চিহ্নগুলো সরিয়ে এরা তাকে এখানে বিষণ্ন আর রিক্ত সাদার শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে কেন? কী এদের উদ্দেশ্য?

ডাক্তার এসে তার হাতের নাড়ি টিপে দেখলেন। চোখের দিকে তাকালেন। স্টেথেস্কোপ দিয়ে বুকে রক্তের শব্দ শুনলেন। একটা ছোট রড দিয়ে হাঁটুর ওপর আঘাত করে দেখলেন তার প্রতিক্রিয়া। তারপর হাসিমুখে বললেন, ভালো বোধ করছেন? ব্যথা বা বুকে ভারী ভাব নেই তো? শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কেন, বুকে কি ব্যথা ছিল আমার, কিংবা ভার ভার ভাব? ডাক্তার হেসে বললেন, ছিল। সেই জন্যই তো এখানে এসেছেন আপনি। কী আশ্চর্য, মনে নেই সে কথা! আপনিই তো আপনার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের বলেছিলেন বুকের ব্যথার কথা। তারা নিয়ে এসেছেন আপনাকে এখানে। শুনে তিনি বললেন, আমি এখন কোথায়? ডাক্তার হকচকিয়ে গেলেন প্রশ্ন শুনে। নার্সের দিকে তাকালেন একটু সময় নিয়ে। তারপর বললেন, কেন, আপনি হাসপাতালে! কেবিনে। অবশ্য এখন বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই বাড়ি যেতে পারবেন।

তিনি প্রায় চেচিয়ে বললেন, আমি এখানে থাকব না। বাড়ি যেতে চাই। আমার স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের খবর দিন।

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, তা হয় না। আপনাকে এখন রিলিজ করা যাবে না। আরো কদিন থাকতে হবে। কেন রিলিজ করা যাবে না, কেন আরো কদিন থাকতে হবে? আপনি এসব বলার কে? বলতে বলতে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।

ডাক্তার এবার আরো গম্ভীর স্বরে বলেন, আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাননি। যে পর্যন্ত তেমন মনে না করা যায়, আপনাকে আমরা রিলিজ করতে পারি না। এটা আমাদের কর্তব্য। শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনারা রিলিজ না করুন, আমি নিজে চলে যাব। ধরে রাখতে পারবেন?

বিজ্ঞাপন

হ্যাঁ। আমাদের সার্টিফিকেট ছাড়া আপনি হাসপাতালের বাইরে যেতে পারবেন না। আপনার ওপর এখন আমাদের সমঙ্ূর্ণ কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ।

ষড়যন্ত্রটা তার কাছে এবার সঙ্ষ্ট হয়। সাদা তাকে পরাস্ত করার নতুন পথ বের করেছে। হাসপাতাল, কেবিন, ডাক্তার, নার্স-এই সবই সাদার ষড়যন্ত্রের নকশা।

ডাক্তার এবার খুব সহানুভূতি আর বন্ধুত্বের স্বরে বলেন, আপনার কি এখানে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে? হলে স্বচ্ছন্দে বলুন। আমরা চেষ্টা করব আপনাকে যতটা কমফোর্টে রাখা যায়, তার জন্য।

শুনে তিনি চারদিকের সাদা দেয়াল দেখেন, বাতাসে মৃদু উড়তে থাকা জানালার পর্দার দিকে তার চোখ যায়। তারপর বলেন, এখানে সব সাদা কেন? সব রঙ কোথায় গেল? উজ্জ্বল সব রঙ। খুব ডিপ্রেসিং এই সাদা। আমার মাথা ঘুরছে, বমি বমি ভাব হচ্ছে। আপনারা সাদাকে এত পাত্তা দেন কেন? জানেন সাদা মানে কি? ডাক্তার নার্সের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকান। তারপর তার দিকে ফিরে বলেন, সাদা হলো শুভ্রতা, পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতার প্রতীক। সাদা রঙ দেখলে রোগীদের মন প্রসন্ন হয়। তারা স্বস্তি পায়। প্রসন্ন ভাব ভেসে ওঠে মনে।

রাবিশ! আপনি যা বলছেন সব মিথ্যে। সাদা মনকে প্রফুল্ল করতে পারে না। ওটা কোনো রঙই নয়। রঙ ছাড়া জীবন অসমঙ্ূর্ণ, প্রায় ব্যর্থ এবং পরাজিত। আশ্চর্য, আপনারা লেখাপড়া জানা লোক বলেই মনে হচ্ছে! কিন্তু সাদা আপনাদের ধোঁকা দিয়েছে। বিওয়েয়ার অব হোয়াইট! ইট ইজ দ্য মাস্ক অব ডেথ। বিওয়েয়ার!

ডাক্তার এবার একটু হকচকিয়ে যান। তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখায়। তিনি নিচু স্বরে নার্সের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। তারপর হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার এখন ঘুমানো দরকার। একটা ইনজেকশন দেব আমরা। ঘুমুলেই দেখবেন এসব চিন্তা দূর হয়ে যাবে।

না না, আমার ঘুমানোর দরকার নেই। আমার চারপাশে রঙ চাই। সাদা অসহ্য লাগছে। ডাক্তার বললেন, বেশ তো, অনেক ফুল এনে রাখা হবে এই ঘরে। রঙের ছোঁয়া থাকবে। আপনার যেমন পছন্দ সেভাবেই হবে। কিন্তু সাদা দেয়াল তো রঙিন করা যাবে না। ঘরের পর্দাও। হসপিটাল রেগুলেশন। একজনের জন্য পরিবর্তন করা যায় না। দেখবেন ক্রমে ক্রমে সাদা রঙ সহ্য হয়ে যাবে। এই তো মাত্র কিছুক্ষণ চোখ খুলে দেখছেন। আরো দেখার পর খুব পরিচিত, এমনকি প্রিয়ও হয়ে যাবে সাদা রঙ অন্য রোগীদের মতো।

কক্ষনো না, সাদা কখনই সহ্য হবে না আমার। তার দিকে পেছন ফিরে হেঁটে যেতে থাকা ডাক্তার আর নার্সের উদ্দেশে প্রায় চিত্কার করে বললেন তিনি।

চোখ খুলতেই তিনি দেখলেন টেবিলের এক কোণে টুলের ওপর ফুলদানিতে ফুল তার দিকে তাকিয়ে আছে। একগুচ্ছ সাদা রজনীগন্ধা। শিউরে উঠলেন তিনি। তারপর দেয়ালের দিকে তাকাতেই অবাক হলেন এবং ধীরে ধীরে প্রসন্নতায় মন শান্ত হয়ে এল। জানালার ওপাশে যে গাছটা ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার কিছু শাখা-প্রশাখার ছায়া এসে পড়েছে দেয়ালে। পাতাও দেখা যাচ্ছে। খুব গাঢ় নয়। হালকা কালো রঙে দেয়ালের সাদার ওপর ফুটে উঠেছে গাছের ডালপালা আর কয়েকটি পাতা। পাতাগুলো মাঝে মাঝে নড়ছে। যেন আলেকজান্ডার ক্যালডারের মোবিল স্কাল্পচার। হোক না একটা দেয়ালের সামান্য অংশ, সাদা সেখানে পরাজিত গাছের ছায়ার কাছে। একটা পাখি বসল ডালে, তার ছায়াও প্রতিফলিত হলো দেয়ালের ওপর। পাখিটা লেজ নাড়ছে। যেন খুব ফূর্তিতে আছে এবং সে কথা তাকে জানিয়ে দিচ্ছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাছের ডালপালা আর পাতার ছবি আঁকা হয়ে থাকল দেয়ালে। তিনি সেখান থেকে চোখ ফেরাতে পারেন না। খুব নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকেন। দেয়াল বলে মনে হয় না। যেন সত্যি সত্যি গাছের ডালপালা আর পাতা এসে জন্মেছে সেখানে, পুরনো বাড়ির কার্নিশে বা ছাদে যেমন বেড়ে ওঠে বটের চারা। এও যেন তেমন এক বেপরোয়া, দুর্বিনীত ভঙ্গি। তিনি খুব প্রসন্ন মনে দেখেন আর তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে ওঠে।

দুপুরের পর যখন গাছের ডালপালার ছায়া সরে যায় এবং এক সময় অদৃশ্য হয়, তার মন খুব খারাপ হয়ে আসে। তার নিঃসঙ্গতা বাড়ে। সাদার কাছে তাকে আবারও পরাজিত মনে হয়। দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। তখন আবার গাছের ডালপালার ছায়া এসে পড়বে সাদা দেয়ালে। পাতারা নড়বে বাতাসে। হয়তো সেই সুখী পাখিটাও এসে বসবে। কিন্তু বড় দীর্ঘ সেই প্রতীক্ষা! এতক্ষণ সাদার অত্যাচার সহ্য করবেন কী করে? ভাবতে ভাবতে বেশ অস্থির হয়ে পড়েন তিনি।

বিকেলে পা টিপে টিপে ঘরের বাইরে যান তিনি। বিশাল করিডরে তখন মাত্র দুজন পিওন টুলে বসে ঝিমুচ্ছে। তিনি সন্তর্পণে হেঁটে তাদের পেরিয়ে সামনে গিয়ে সিঁড়ি দেখতে পান। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দেখেন একটা লোক মইয়ের ওপর উঠে কী যেন করছে। তিনি কৌতূহলী হয়ে তার কাছে গিয়ে উপস্থিত হন। লোকটা লাল-নীল-সবুজ রঙ দিয়ে দেয়াল ভরে দিচ্ছে। দেখে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন তিনি। উল্লাস বেরিয়ে আসতে চায় বুকের ভেতর থেকে। স্নায়ুর ভেতর শোনেন মন্দিরার শব্দ। মেঘলা আকাশে রঙধনু দেখার মতো খুশিতে পেয়ে বসে তাকে। তিনি হা করে তাকিয়ে থেকে বলেন, কী করো ভাই? লোকটি না তাকিয়ে বলে, রঙ করতাছি। তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু এখানে কোথাও রঙ নেই। সব সাদা। তুমি রঙ করছো কেন? কে অনুমতি দিল? বকবে না তোমাকে? লোকটা এবার অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর বলল, অর্ডার পাইছি রঙ করনের, তাই করতাছি। বকবো ক্যানে! শুনে অবাক হলেন তিনি। হাসপাতালের রেগুলেশন? তার কী হলো? তাহলে মিথ্যে বলেছে ডাক্তার? রেগুলেশন-টেগুলেশন বলে কিছু নেই? তিনি মুখ উঁচিয়ে বলেন, সব ঘরে রঙ করা হয় না কেন? সেই অর্ডার পাওয়া যায় না? লোকটা তার দিকে না তাকিয়ে বলে, আপনে ক্যাডা? নতুন আইছেন মনে হয় এহানে? হাসপাতালে সব সাদা। এইডা ছাত্রছাত্রীদের কমনরুম। এইহানে রঙের অর্ডার আছে। বুঝলেন ব্যাপারডা?

তিনি মাটিতে রাখা এনামেল পেইন্টের টিনগুলো দেখেন। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ রঙ জমাট বেঁধে আছে ভেতরে। ব্রাশ দিয়ে ছড়িয়ে দিলেই খলখলিয়ে উঠবে দেয়ালে। তিনি বললেন, কোথায় পাওয়া যায় এসব রঙ? লোকটা বলল, হাসপাতালের সামনে। ওষুধের দোকান ছাড়াইয়া গেলেই বার্জার পেইন্টের খুচরা বিক্রেতা। কিনবেন নাহি? কিনলে অ্যাহনই কিইন্যা ফ্যালান। মাগাদাস্কার না কই জানি বেড়াইতে যাইবার টিকিট পাইবেন। না হইলে একশো-দুইশো ট্যাকার পুরস্কার। কিনলে তাড়াতাড়ি যান। এই মাসেই শেষ হইবো। লটারির মতন আর কি। তারপর সে প্রশ্ন করে, আপনে কী করেন? তিনি যেতে যেতে বলেন, কিছু না, আমি এখন কিছু করি না।

পরদিন সকালে তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে কেবিনে আসে তার জন্য নাশতা নিয়ে। ভেতরে ঢুকে দমকে ওঠে তারা। ঘরের দেয়ালে একটা মই। তার ওপরে দেয়ালের অনেকটা জুড়ে সবুজ পাতা, ধূসর ডালপালা আর লাল-হলুদ রঙের এক পাখি আঁকা। জ্বলজ্বল করছে কাঁচা রঙগুলো। নিচে মেঝেতে চারটা রঙের টিন। বার্জার পেইন্টস লেখা। এনামেল পেইন্ট। তিনি শুয়ে আছেন হাত-পা ছড়িয়ে মেঝেতে। দুই চোখ বোজা আর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি। তাকে খুব প্রসন্ন দেখাচ্ছে।

দুই.

ও হেনরির ‘লাস্ট লিফ’ গল্পে এক মৃত্যুপথযাত্রিনী জানালার বাইরে দেয়ালে ছায়া হয়ে একটি গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে তার সঙ্গিনীকে বলে যে, শেষ পাতাটি যখন ঝরে যাবে সেই সময় মৃত্যু হবে তার। সঙ্গিনী প্রতিবেশী এক চিত্রশিল্পীকে বিষয়টি বলার পর দেখা গেল শিল্পী দেয়ালে শেষ পাতাটি এমনভাবে এঁকেছেন যে রোগিনী তা সত্য বলে মনে করে এবং আরোগ্য লাভ করে। শীতের রাতে দেয়ালে ছবি আঁকার জন্য নিউমোনিয়ায় শিল্পীর মৃত্যু হয়।

তিন.

সেই রাতে তিনি নিদ্রাহীন কাটিয়েছেন এবং তার স্টুডিও ঘরের মেঝেতে কখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, কখনো অস্থিরভাবে পায়চারি করে। সব সময়ই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থেকেছে বিশাল ক্যানভাসের ওপর। তার ভেতর উত্তেজনা ফেটে পড়ছে, যেন ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে নতুন করে। তিনি মাঝে মাঝে প্যালেটের বুকে ব্রাশ ডুবিয়ে রঙ ভরে নিয়ে ক্যানভাসের কাছে গেছেন। বেশ একরোখা ভঙ্গিতে ওপরে-নিচে, ডানে-বাঁয়ে ব্রাশ টেনে রঙের প্রলেপ দিয়েছেন তিনি। সাদার ওপর ভরে উঠেছে নানা রঙের নকশা। কোথাও উঁচু হয়ে টেক্সচার জেগে উঠেছে, কোথাও ছড়ানো বালুকণার সঙ্গে মিশে অমসৃণতা সৃষ্টি করেছে। কিছুক্ষণ আঁকার পর তিনি পেছনে সরে এসে তাকিয়ে থেকেছেন সামনে। তার ভেতরের অতৃপ্তি দূর হয়নি। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে অস্থিরতা। আবার নতুন উদ্যমে প্যালেট থেকে রঙ নিয়ে ক্যানভাসের দিকে এগিয়ে গেছেন তিনি। প্রায় উন্মত্তের মতো ক্যানভাসের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছেন রঙ, কখনো ব্রাশ দিয়ে, কখনো সেঙ্র করে আবার কখনো খালি হাত দিয়ে ঘষে ঘষে।

সেই রাতে তার ঘরে কারো ঢোকার অনুমতি ছিল না। না স্ত্রী, না সন্তান-সন্ততি অথবা কাজের লোকের। মাঝে মাঝেই তিনি এমন নির্দেশ দিয়ে থাকেন। কেউ তাকে কাজের সময় বিরক্ত করুক এটা তিনি চান না। তার এই অভ্যাস বেশ পুরোনো এবং বাড়ির সবার জানা। সেই জন্য সারা রাত যখন তিনি স্টুডিওতেই দরজা বন্ধ করে থাকলেন, বাড়ির কেউ অবাক হয়নি। কিন্তু সকালে স্টুডিওর ভেতর ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে তার স্ত্রী যখন দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলেন তার দেহের অর্ধেকটা মেঝেতে এবং অর্ধেকটা দেয়ালে ‘দ’-এর আকারে পড়ে আছে এবং তার মুখ থেকে ঝরছে লালা, সেই সময় একটা আর্তচিত্কার বেরিয়ে এল। পরপরই টেলিফোনে উত্তেজিত এবং ভয়ার্ত স্বরে ডাকাডাকি, ঘরের ভেতর ত্রস্তে ঢুকে তাকে তুলে বিছানায় শোয়ানো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আঘাত প্রাপ্ত পশুর মতো সাইরেন বাজাতে বাজাতে অ্যাম্বুলেন্স এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ানো-এই সব একটার পর একটা ঘটে। সেই সকালে তার বাড়ির সামনে কিছু কৌতূহলী লোক ছাড়া আর সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। ফেরিওয়ালা হেঁকে হেঁকে গেছে। ভিখিরি হাত পেতে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের মেয়েরা ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাওয়ার জন্য রিকশায় চড়েছে। অফিসে যাওয়ার জন্য হেঁটে গেছে লোকজন। সূর্য সাঁতারুর মতো আকাশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।