default-image

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঠিক বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে পাকিস্তানের জঙ্গিবিমানগুলো ভারতের পশ্চিম সীমান্তে একযোগে আক্রমণ চালায়। লক্ষ্য, খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় ভারতীয় বিমানবহরের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেদিন একটি বিমানও অরক্ষিত বা উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল না। ফলে এই হামলায় কোনো ভারতীয় বিমান খোয়া যায়নি। সেদিন বিমানে কলকাতা থেকে দিল্লি ফিরে তড়িঘড়ি করে মন্ত্রিপরিষদের জরুরি সভা ডাকলেন ইন্দিরা। সে সভায় ঠিক হলো ভারত পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। মধ্যরাতের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।

এর অব্যবহিত পরেই এক ভিন্ন রকমের যুদ্ধ শুরু হয় ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্কে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অনিবার্য ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভক্তি ঠেকানো অসম্ভব, এই দুর্ভাবনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মস্ত শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। তাঁরা শলা-পরামর্শে বসলেন কীভাবে নিদেনপক্ষে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে রক্ষা করা যায়। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না, তাতে মস্কোকে যুদ্ধে টেনে আনা হবে। মস্কোর সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। তাঁরা চীনকে সে পথে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতেও সফল হননি। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ভরাডুবি ঠেকানোর একমাত্র পথ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি অর্জন।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের এই রণকৌশলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে সময় জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন রাষ্ট্রদূত ইয়াকফ মালিক। দীর্ঘদিনের ঝানু কূটনীতিক, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে, ১৯৪৮ সালে এই পদে প্রথম যোগ দেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর কাটানোর পর মস্কো ফিরে যান সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে। সেই পদেই আবার ফিরে আসেন ১৯৬৮ সালে। একাত্তরের যুদ্ধের পুরো সময়টা মস্কোর হয়ে কূটনৈতিক ঝড়ঝাপটা তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। এই কাজে তাঁর কাছে মিত্র ছিলেন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি বাঙালি কূটনীতিক সমর সেন।

ভারত যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে, নিউইয়র্কে তখন সদ্য সকাল। টেলিফোনে ইয়াকফ মালিক ও সমর সেনের মধ্যে কথা হলো। তাঁরা জানতেন ওয়াশিংটন অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করবে। সে প্রস্তাব এককথায় নাকচ করা সম্ভব হবে না, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে সব রকম যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সিদ্ধান্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিপরীতে পাল্টা প্রস্তাব তুলবে মস্কো। সেখানে সাদামাটা যুদ্ধবিরতি নয়, ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকব। যে কথাটা অনুক্ত থাকল তা হলো, এই মুহূর্তে, চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, যেভাবেই হোক কোনো যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস করানো যাবে না।

default-image

যুক্তরাষ্ট্র ও আরও আটটি রাষ্ট্রের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন শুরু হলো ৪ ডিসেম্বর, নিউইয়র্ক সময় বিকেল পাঁচটায়। পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৫ সদস্য ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত। ইয়াকফ মালিক ও সমর সেনের মধ্যে দিনের বেলা কয়েক দফা শলা-পরামর্শ হয়েছে, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যুদ্ধবিরতির যেকোনো প্রস্তাব উত্থাপনের আগে তাঁরা পরিষদের আলোচনায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে অংশগ্রহণের প্রশ্নটি তুলবেন। তিনি কয়েক মাস ধরেই নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন, ভারত ও সোভিয়েত কূটনীতিকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

সমর সেন সেদিন দুপুরেই পরিষদের সভাপতি সিয়েরা লিওনের টেইলর-কামারার কাছে পরিষদের কার্যাবলিতে অংশগ্রহণের অনুরোধসংবলিত আবু সাঈদ চৌধুরীর একটি চিঠি পাঠিয়ে তা পরিষদের কার্যাবলিতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানালেন।

বৈঠকের শুরুতে বক্তব্য দেন ইতালির রাষ্ট্রদূত, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিকে বৈঠকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানোর পক্ষে মত রাখেন। এরপর বক্তব্য দিতে ওঠেন ইয়াকফ মালিক। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলেও পরিষদের ভেতর আসল লড়াইটা এই মুহূর্তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে, এ কথা কারও অজানা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের অভিন্ন রণকৌশলও ঠিক করা ছিল। তারই ভিত্তিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলেন মালিক। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির একটি খসড়া প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র বিলি করেছে, সে কথা সবার জানার ছিল। এখন ইয়াকফ মালিক সে প্রস্তাবের ব্যাপারে কী বলেন, সবার কান উৎকর্ণ হয়েছিল সেদিকে। কোনো ভনিতা ছাড়াই মালিক দাবি করলেন, এই আলোচনা কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের অবনতিশীল পরিস্থিতি। এ ব্যাপারে বক্তব্য দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা হোক।

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশে পাকিস্তানে সামরিক হামলার নিন্দা করলেও তখন পর্যন্ত বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিটি স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেনি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, এ কথা মস্কো বলেছে, কিন্তু একটা স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রয়েছে, যে অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে জাতিসংঘের সনদে, সে কথা তখনো বলা হয়নি। এই সভায় তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যেই সে অধিকারের স্বীকৃতি দিলেন ইয়াকফ মালিক। এখানেই ইয়াকফ মালিকের মুখ দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বকে জানায়, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা আসলে একটি জাতির মুক্তি আন্দোলন।

মুক্তিযুদ্ধরত বাঙালিদের জন্য সেটি ছিল একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক বিজয়।

ইয়াকফ মালিক বললেন, ‘আমরা যদি উটপাখির মতো বালুতে মাথা গুঁজে থাকতে চাই, তাহলে এ নিয়ে ভাবার কিছু নেই। কিন্তু বাস্তব সত্য যদি আমরা জানতে চাই, কেন এই দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে, তাহলে এই সংকটের মূল কারণ জানতে হবে। এই ঘটনা ও তার কারণ নিরূপণ করতে হবে। এই যে বিদ্রোহ, জাতিসংঘের নিজস্ব পরিভাষায় তা অন্যভাবেও বর্ণনা করা যায়, আর তা হলো জাতীয় মুক্তিবাহিনী (ন্যাশনাল লিবারেশন ফোর্সেস) ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন (ন্যাশনাল লিবারেশন মুভমেন্ট), এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে দেখা।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে এই স্বীকৃতির গভীর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। জাতিসংঘের অভ্যন্তরে অধিকাংশ দেশ সেই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে বিরাজমান যুদ্ধাবস্থাকে পাকিস্তানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে ধরে নিয়েছিল। চীন সে যুদ্ধকে ভারতের সম্প্রসারণবাদ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে একটি অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ভিন্ন অন্য কিছু মানতে চায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ভারত, যে গোড়া থেকেই এই যুদ্ধকে একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করে। ইয়াকফ মালিক এবার তাকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, জাতিসংঘের বি-উপনিবেশীকরণ কার্যক্রমের কেন্দ্রে প্রোথিত ছিল যে আন্দোলনের প্রতি স্বীকৃতি। ১৯৬০-এর দশকে এই স্বীকৃতির ভিত্তিতে আফ্রিকার বিপুলসংখ্যক উপনিবেশ বা কলোনি স্বাধীনতা অর্জন করে।

default-image

নিরাপত্তা পরিষদের সেদিনের বিতর্কে অবশ্য সবচেয়ে তির্যক মন্তব্যটি করলেন ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে বিতর্কে অংশগ্রহণের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে এই প্রশ্নে আলোচনা হবে প্রিন্স অব ডেনমার্ককে বাদ দিয়ে হ্যামলেট নাটকের অভিনয়।’

বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধির বিতর্কে অংশগ্রহণের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে চীন ও পাকিস্তান। পরিষদের সভাপতি টেইলর-কামারাও তাঁর সিদ্ধান্তে বললেন, বৈঠকে অংশগ্রহণের অনুরোধসংবলিত বাংলাদেশের চিঠিটি তিনি বৈঠকের ঠিক আগে পেয়েছেন, তা যথারীতি বিলির জন্যও দেওয়া হয়েছে। সে চিঠি সবার হাতে পৌঁছানো না পর্যন্ত এই প্রশ্নে আলোচনা স্থগিত থাকুক। এই ছিল তাঁর ‘রুলিং’ বা সিদ্ধান্ত।

সেই রুলিংয়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানালেন ইয়াকফ মালিক। তিনি বললেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব বর্তায় পরিষদের সব সদস্যের ওপর, একা সভাপতি সে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিব্রত সভাপতি টেইলর-কামারা তখন তাঁর রুলিংয়ের ওপর অনতিবিলম্বে সিদ্ধান্তের জন্য সব প্রতিনিধির বক্তব্য আহ্বান করলেন। কেউ নতুন কোনো বক্তব্য প্রদান না করায় অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাঁর গৃহীত প্রস্তাবই বলবৎ রইল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে তার স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো জোড়াতালি দেওয়া সমাধান গ্রহণ করবে, এই বৈঠকে ইয়াকফ মালিকের বক্তব্যের ভেতর দিয়ে সে কথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। এর আগে মস্কো থেকেও সমর্থনসূচক ইঙ্গিত আসছিল। ২৮-২৯ সেপ্টেম্বর মস্কোতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সফরকালে মুখোমুখি আলোচনায় সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন, বাংলাদেশের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উপাদান রয়েছে।’ ব্রেজনেভ অবশ্য বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তিনি তখন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান নামেই তাকে অভিহিত করছেন। ইয়াকফ মালিকই প্রথম সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, যিনি বিশ্বসভায় বাংলাদেশ নামটি উচ্চারণ করলেন।

এই সময় থেকে বাংলাদেশ প্রশ্নে যুদ্ধ দুই ফ্রন্টে সমানভাবে চলতে থাকে। একটি সামরিক, অন্যটি কূটনৈতিক। যেকোনো মূল্যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ঠেকাতে হবে, মস্কোর কাছ থেকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ পেয়ে তাঁর তূণে রাখা একের পর এক কূটনৈতিক তির ছুড়তে থাকেন ইয়াকফ মালিক। বাংলাদেশের প্রতিনিধির বক্তব্য প্রদানের প্রথম দাবিটি অগ্রাহ্য হওয়ায় এবার মনোযোগ দাঁড়াল ওয়াশিংটন ও বিভিন্ন আরব দেশের সমর্থনে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বাতিলের চেষ্টা। সোভিয়েত ভেটোর কারণে মার্কিন প্রস্তাবটি নাকচ হলে ইয়াকফ মালিক একটি পাল্টা প্রস্তাব রাখলেন, তাতে সংকট উত্তরণের জন্য ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ দাবি অন্তর্ভুক্ত হলো। এই দাবির অর্থই ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা সে দেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তর। পাকিস্তান সে প্রস্তাবে গররাজি, তাদের সমর্থনে এগিয়ে এল চীন ও পরিষদের আরও ১০ জন সদস্য। ফলে সোভিয়েত প্রস্তাবটি বাতিল হলো। ছোট ছোট কয়েকটি দেশের ও চীনের উত্থাপিত একাধিক প্রস্তাবও পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাবে বাতিল হয়ে গেল। দুই দিন পর, ৬ ডিসেম্বর ইয়াকফ মালিক ‘যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ব্যবস্থা একই সময় নেওয়ার’ আরও একটি প্রস্তাব করলেন, কিন্তু চীনের ভেটোর কারণে সেটিও বাতিল হলো।

নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রশ্নের সমাধান অম্ভব, সে কথা বুঝতে পেরে বিষয়টি আলোচনার জন্য পাঠানো হলো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। সেখানে বিপুল ভোটাধিক্যে যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব গৃহীত হলো বটে, কিন্তু এর ফলে যুদ্ধাবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। কারণ, সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের নৈতিক গুরুত্ব থাকলেও তা অনুসরণের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই কালক্ষেপণের রণেকৗশল নিয়েছিল, এ কথা আগেই বলা হয়েছে। তারা চাইছিল যুদ্ধটা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াক যখন কোনো বিরতি প্রস্তাবই তাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবে না। সে কথা মাথায় রেখে ভারত সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবের ব্যাপারে তার অবস্থান জানাতে পাঁচ দিন সময় নিল। ১২ ডিসেম্বর সে জানাল, এই প্রস্তাবে সমস্যার মূল কারণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সেদিনই ফের বসল নিরাপত্তা পরিষদের সভা। ওয়াশিংটন প্রস্তুত ছিল যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব নিয়ে। মস্কোর সঙ্গে শলা-পরার্মশের জন্য সময় প্রয়োজন, এই যুক্তিতে মালিক বিতর্ক এক দিন পেছাতে অনুরোধ করল। ফলে মিলল আরও একটি দিন। ১৩ ডিসেম্বর পরিষদ পুনরায় মিলিত হলে লড়াইটা কেন্দ্রীভূত হলো চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া ও সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ইয়াকফ মালিকের মধ্যে। নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কের রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বাইরে সব বাদানুবাদ কোনো কাগজপত্র ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়। সে কাজে তাঁর দক্ষতা ঈর্ষাজনক। ইয়াকফ শুধু তাঁর নিজের দেশের নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে ময়দানে লড়তে নামলেন। যুক্তি-তর্ক তো ছিলই, শ্লেষে ও বিদ্রূপে তিনি ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন হুয়াং হুয়াকে।

হুয়ার জন্য এটি ছিল বিশ্বসভায় বিতর্কে অংশগ্রহণের প্রথম অভিজ্ঞতা। কিছুটা আনাড়িপনা, কিছুটা অতি উৎসাহে তিনি অপ্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও সোভিয়েত-চীনের আদর্শগত পার্থক্য নিয়ে লম্বা ভাষণ দিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী অভিহিত করে হুয়া চেকোস্লাভাকিয়ায় ও একাধিক আফ্রিকান দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্থক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করলেন।

হুল ফুটিয়ে সে কথার জবাব দিলেন মালিক। বললেন, এক জটিল আন্তর্জাতিক প্রশ্নের সমাধান খোঁজার বদলে চীনের প্রতিনিধি আদর্শগত লড়াইয়ে নেমেছেন, যার একমাত্র লক্ষ্য বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। এর ফলে শুধু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহই খুশি হবে, আর কেউ নয়।

বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ অথবা ভারত-বাংলাদেশ প্রশ্নে এই যুদ্ধ চলাকালীন নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ও তার এক দিন পর ভারত একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। ২১ ডিসেম্বর, ঢাকায় যুদ্ধসমাপ্তির পাঁচ দিন পর, নিরাপত্তা পরিষদ অবশেষে একটি অর্থহীন প্রস্তাব গ্রহণ করে। তত দিনে সারা বাংলাদেশে উড়ছে সদ্য স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা।

সেদিন, অর্থাৎ ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রশ্নে তাঁর শেষ ভাষণ দিতে উঠলেন ইয়াকফ মালিক। এ যুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশের বিজয় ছিল তাঁর নিজেরও এক বিজয়, এ কথা সে দিন তিনি তাঁর মার্কিন ও চীনা ‘বন্ধুদের’ মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বললেন, এই যুদ্ধ সমাপ্তির ভেতর দিয়ে এই দেশের মানুষ জাতীয় উন্নয়ন ও প্রগতির পথে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয় সুযোগ পাবে।

ইয়াকফ মালিক সেদিন শুধু একজন বিদেশি কূটনীতিক ছিলেন না। তিনি শুধু সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অকৃত্রিম বন্ধু।

হাসান ফেরদৌস: সাংবাদিক ও লেখক