default-image

১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক গোপন ও ভয়ানক খেলায় মেতে উঠেছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। ইয়াহিয়া খান ও তাঁর দোসরদের বাঁচাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেও তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। একই সময়ে চীনের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কোন্নয়নের কূটনীতির বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারী একদল মার্কিন জেনারেল মেতে ওঠেন এক ভিন্ন ষড়যন্ত্রে। তাঁদের লক্ষ্য: হোয়াইট হাউস।

বিজ্ঞাপন

১.

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাঁর স্মৃতিকথা মেমোয়ার্স অব রিচার্ড নিক্সন গ্রন্থে ১৯৭১-এ বাংলাদেশ-যুদ্ধ প্রসঙ্গে একজন নৌসেনার কথা উল্লেখ করেছেন। ইয়োম্যান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এই নৌসেনা মার্কিন সরকারের একজন নিতান্তই অধস্তন কর্মচারী। তাঁর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। শুধু অভিযোগ তোলাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তিরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুবকটির অপরাধ: একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার সময় নিক্সন প্রশাসন যে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করছেন এবং কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সে দেশের কাছে সামরিক অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত, এই গোপন তথ্য ফাঁস করা। নিক্সনের নির্দেশে একটি আণবিক অস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছে, এই তথ্যও তাঁর মাধ্যমে ফাঁস হয়েছিল। মার্কিন সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসনের হাত হয়ে সে খবর সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

নিক্সন লিখেছেন:

(সবচেয়ে যা আপত্তিকর, তা হলো) ভারত-প্রশ্নে আমাদের নীতির সঙ্গে (এই নৌসেনা) দ্বিমত পোষণ করে বলে কোনো সংবাদপত্র সাংবাদিকের কাছে তথ্য পাচার করে দেবে, এই কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো মূল্যেই হোক, এই অভ্যাস বন্ধ করতে হবে (১)।

কে এই যুবক? বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিস্তর বইপত্র লেখা হয়েছে, কিন্তু কোথাও তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়েছে বলে মনে হয় না। একাত্তরের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ সেই যুদ্ধে নিক্সন প্রশাসনের বৈরী মনোভাব। কিন্তু ইতিহাসের সেটি কেবল একটি দিক। অন্যদিকে ছিল মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের অসংখ্য কর্মী, মার্কিন তথ্যমাধ্যম ও মার্কিন কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য। এঁরা প্রত্যেকেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ছিলেন। সেই নৌসেনাও তাঁদের একজন।

২.

যুবকটির নাম চার্লস র‍্যাডফোর্ড। ১৯৭০-৭১ সালে তিনি ওয়াশিংটনে প্রথমে মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল রেমব্রান্ডট রবিনসন এবং পরে রিয়ার অ্যাডমিরাল রবার্ট ওয়েল্যান্ডারের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। ভিয়েতনাম ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শীতল যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকালে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন কিসিঞ্জার। তাঁর সভাপতিত্বে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপ (ডব্লিউএসএজি) নামের অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কিন্তু গোপনীয় একটি কমিটি কূটনৈতিক ও সামরিক প্রশ্নে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কর্মকৌশল সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করত। সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও কিসিঞ্জারই ছিলেন সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথমে রবিনসন এবং পরে ওয়েল্যান্ডার এই কমিটির সঙ্গে যৌথ সামরিক বাহিনী দপ্তর, বিশেষত তার চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল টমাস মোরেরের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতেন। নিরাপত্তা পরিষদের কর্মচারী হিসেবে এই কমিটিতে কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর যে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হতো, তার নথিপত্র কপি করার ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল র‍্যাডফোর্ডের। কিসিঞ্জার ও নিক্সন সম্পূর্ণ গোপনীয়তায় এবং অন্য কারও সঙ্গে মতবিনিময় ছাড়া যে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেন, অ্যাডমিরাল মোরের তার প্রবল সমালোচক ছিলেন। রবিনসন ও ওয়েল্যান্ডার উভয়েই কিসিঞ্জারের চেয়ে মোরেরের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিই অধিক আস্থাবান ছিলেন। স্বল্পবাক ও প্রায় নীরব র‍্যাডফোর্ড কোনো বাদ-প্রতিবাদ ছাড়াই এঁদের দুজনের সব নির্দেশ পালন করতেন। সেসব নির্দেশের একটি ছিল এই কমিটির এবং কিসিঞ্জারের বিভিন্ন গোপন নথিপত্রের কপি অ্যাডমিরাল মোরেরের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

১৯৭১-এর গোড়া থেকে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপের আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল বাংলাদেশ প্রশ্ন। এই যুদ্ধে নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন বলে দাবি করলেও তাঁরা আসলে যে পাকিস্তানের পক্ষে ঝুঁকে চলা নীতি অনুসরণ করছেন, এ কথা খুব অজ্ঞাত ছিল না। ঢাকায় ও নয়াদিল্লিতে মার্কিন কূটনীতিকেরা গণহত্যার প্রতিবাদ করে পাকিস্তানের প্রতি কঠোর হতে বারবার অনুরোধ জানিয়েছেন। তার কোনোটাই কাজে লাগেনি। উল্টো ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আরচার ব্লাডকে বদলি করে সদর দপ্তরে নিয়ে আসা হয়। দিল্লিতে রাষ্ট্রদূত কিটিংকে কিসিঞ্জার ডেকে এনে কষে বকে দেন। মার্কিন কংগ্রেসের একাধিক প্রভাবশালী সদস্য, যেমন সিনেটর কেনেডি, বাংলাদেশ প্রশ্নে নিক্সন প্রশাসনের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন কয়েকবার। কংগ্রেসে সে মর্মে প্রস্তাব উঠেছে একাধিক। পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র পাঠানো যাবে না, মার্কিন কংগ্রেসের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিক্সন প্রশাসন যে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠানো অব্যাহত রেখেছে, মার্কিন পত্রপত্রিকায় সে খবরও নিয়মিত বেরিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তার পরও নিক্সন ও কিসিঞ্জার তাঁদের ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে চলা নীতি বদলাননি। কিসিঞ্জার পরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখেছেন, নিক্সন অভিজাত বংশীয় ইন্দিরাকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন। সম্ভবত তাঁর সামনে কিছুটা হীনম্মন্যতায়ও ভুগতেন তিনি। অন্যদিকে সেনা অফিসার ইয়াহিয়ার সামনে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। নীতিগত কারণেও নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে। কিসিঞ্জার দাবি করেছেন, একাত্তরে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় ইয়াহিয়ার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে গোপন দূতালির কাজ চলছিল। সে কারণে ইয়াহিয়াকে চটাতে চাননি তাঁরা। অন্য কারণ, কিসিঞ্জারের দাবি অনুসারে, ইন্দিরা সরকার বাংলাদেশে রাজনৈতিক অসন্তোষকে ব্যবহার করে পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে এবং সম্ভব হলে পশ্চিম পাকিস্তানকেও নিজের দখলে আনতে চেয়েছিল। তা ঠেকানোর জন্যই তাঁরা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন। এসব দাবির প্রতিটিই যে অসার, তা অবশ্য কিসিঞ্জারের একাধিক সহকর্মী সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন।

৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে ইরান ও জর্ডান হয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমান যাতে পাকিস্তানে পাঠানো হয়, নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি এমন একটি গোপন ও বেআইনি পদক্ষেপ নেন। যুদ্ধে ভারতের বিপক্ষে চীনকে লেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চালান তাঁরা। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল দ্রুত পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে দেখে নিক্সন তাঁর তুরুপের তাসটি চাললেন। ১০ ডিসেম্বর তিনি নির্দেশ পাঠালেন মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পাঠাতে। গোপন নির্দেশ, কিন্তু নিক্সনের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে কিসিঞ্জার নিজে পত্রপত্রিকার কাছে ফাঁস করে দিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের রক্ষার উদ্দেশ্যে সে নৌবহর পাঠানো হয়েছে। এ কথা বোঝা খুব কঠিন ছিল না যে মার্কিন নাগরিক উদ্ধার নয়, আসল লক্ষ্য ছিল ভারতকে আণবিক অস্ত্রের ভয় দেখানো ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে সংযত রাখা।

নিক্সন প্রশাসন যে পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে চলা নীতি অনুসরণ করছে, সে কথা কাগজ-কলমে প্রথম ফাঁস করেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কলাম লেখক জ্যাক অ্যান্ডারসন। ১৩ ডিসেম্বর তাঁর নিয়মিত কলাম ‘মেরি গো-রাউন্ড’-এ তিনি প্রথমবারের মতো জানালেন নিক্সন প্রশাসনের দুমুখো নীতির কথা। ১৫ ও ১৬ তারিখে স্পেশাল গ্রুপের গোপন নথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানালেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার যে কথা নিক্সন দাবি করে আসছেন, তা ডাহা মিথ্যা। প্রমাণ হিসেবে কিসিঞ্জারের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের বৈঠকে তাঁর কথা অবিকল উদ্ধৃত করে জানালেন, প্রেসিডেন্ট তাঁকে (কিসিঞ্জার) নির্দেশ দিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে চলতে। ‘প্রেসিডেন্ট আগুন হয়ে আছেন। তিনি চান না আমরা (ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি) সমমনা মনোভাব নিয়ে কাজ করি। প্রতি আধ ঘণ্টা পরপর তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বলছেন যে ভারতের ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট শক্ত হচ্ছি না। তিনি চান আমাদের নীতি পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে চলুক।’

অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা সবচেয়ে মারাত্মক তথ্য ছিল সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরমুখী অভিযান। মার্কিন নাগরিকদের রক্ষা এই নৌবহর পাঠানোর উদ্দেশ্য মোটেই নয়। সপ্তম নৌবহরের পাল্টা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেও পাঠানো হয়েছে আণবিক রণতরী। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য উদ্ধৃত করে অ্যান্ডারসন জানালেন, মস্কো ভারত সরকারকে এই বলে আশ্বাস দিয়েছে ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত আণবিক নৌবহর রয়েছে। তারা কিছুতেই বিনা বাধায় মার্কিন রণতরী বঙ্গোপসাগরে ভারতের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অভিযানে জড়াতে দেবে না। অ্যান্ডারসন এও জানালেন, সোভিয়েতরা আশ্বাস দিয়েছেন, চীন যাতে মার্কিন উসকানিতে এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন না করে, সে জন্য তারা প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা নেবে ও চীন-সোভিয়েত সীমান্ত বরাবর অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে। সরকারি নথিপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে অ্যান্ডারসন স্পষ্ট অভিযোগ তুললেন, পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে নিক্সন প্রশাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আণবিক যুদ্ধে জড়িত হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে তিনি লিখলেন, ‘পৃথিবী আরেক মহাযুদ্ধের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল, কিন্তু নিক্সন প্রশাসন এ দেশের মানুষকে সে কথার বিন্দুবিসর্গও জানায়নি।’

গোড়ার দিকে খুব বেশি লোক জ্যাক অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা তথ্যের প্রতি তেমন নজর দেয়নি। তিনি নিজেও কিছুটা রয়েসয়ে তথ্য ফাঁস করছিলেন। তাঁর চেষ্টা ছিল, প্রকাশিত খবরের সূত্র কী, তা যেন কোনোভাবেই প্রকাশিত না হয়। কিন্তু সে নথি সত্যি, না তাঁর বানানো—এমন প্রশ্ন উঠলে অ্যান্ডারসন একাধিক সাংবাদিককে ডেকে তাঁর কাছে সংরক্ষিত নথিপত্রের কপি মেলে দেখালেন। ডিসেম্বরের শেষ দিন অ্যান্ডারসনের কাছে রাখা গোপন নথি পরখ করার পর নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতাজুড়ে এক দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গোপন বৈঠক, সেখানে কী আলাপ হয়েছে, পরিষদের বাইরে হাতেগোনা লোক ছাড়া তা কারও ঘুণাক্ষরেও জানার কথা নয়। গোড়ার দিকে নিক্সন ও কিসিঞ্জার দুজনই অ্যান্ডারসনের প্রতিবেদন উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিক্সনের সঙ্গে অ্যান্ডারসনের বিরোধ পুরোনো। তাঁর কলামে অ্যান্ডারসন নিয়মিতই প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিক্সনের গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠেছিলেন। এর আগের বছরেই প্রেসিডেন্টের পেনশন ভাতা বৃদ্ধির গোপন চেষ্টা বিষয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদন নিক্সনের রোষের কারণ হয়। এমনকি প্রেসিডেন্টের নির্দেশে অ্যান্ডারসনের পেছনে গোয়েন্দা বসানো হয়, ফোনে আড়ি পাতার ব্যবস্থা হয়। ওয়াশিংটন পোস্টে পাক-ভারত প্রশ্নে তাঁর প্রথম কলাম ছাপা হতে না হতেই নিক্সন কড়া নির্দেশ পাঠালেন, যেভাবেই হোক অ্যান্ডারসনকে মিথ্যুক প্রমাণ করতে হবে। ‘এ নিয়ে একটা কথাও বলার দরকার নেই। কেউ প্রশ্ন করলে সব কথা সরাসরি অস্বীকার করবে’, নিক্সন কিসিঞ্জারকে ডেকে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকার পাতায় সে খবর ছাপা হতে না হতে হোয়াইট হাউসে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। একে তো প্রেসিডেন্ট ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, তার ওপর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গোপন নথি ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এর একটা জুতসই জবাব না দেওয়া গেল প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়বেন। অ্যান্ডারসন কিসিঞ্জারকে সরাসরি উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন ছেপেছেন, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। ৩ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিসিঞ্জার জানালেন, তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাঁর সে কথার জবাব হিসেবে অ্যান্ডারসন টিভি ক্যামেরার সামনে গোপন নথির কপি তুলে দেখালেন। ‘দেখুন “টপ সিক্রেট” লেখা সরকারি সিল পর্যন্ত রয়েছে’—হাসতে হাসতে বললেন অ্যান্ডারসন।

বিজ্ঞাপন

তত দিনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছে বটে কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানকে গিলে খায়নি ভারত, যে ভয়ের কথা বলে কিসিঞ্জার ও নিক্সন উভয়েই বারবার তাঁদের পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়া নীতির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। সে নীতি নিয়ে সাফাই গাইবার আর নতুন কোনো প্রয়োজন নেই, তা উপলব্ধি করে নিক্সন এবার তাঁর কৌশল বদলালেন। আগে বলা হয়েছিল অ্যান্ডারসন তাঁদের কথার বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন। এবার বলা শুরু করলেন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত গোপন নথি হাতিয়ে এবং তা ফাঁস করে অ্যান্ডারসন দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছেন। শুধু অ্যান্ডারসন নয়, যাঁরা এসব নথি ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সবাই এ ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কবুল করলেন গোপন নথি ফাঁস হওয়ার ফলে তাঁর সরকার বিব্রত হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এভাবে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো হঠকারী কাজ করতে পারেন, তাঁরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাঁদের কার্যকলাপ, নিক্সনের কথায়, ‘অসহ্য’। অন্যদিকে কিসিঞ্জার যুক্তি দেখালেন নিক্সন প্রশাসনের অনুসৃত নীতির জন্য নয়, সরকারি নথি ফাঁসের ফলেই ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে।

অ্যান্ডারসনের কাছে অবশ্য সে অভিযোগের জবাব মজুদ ছিল। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখলেন, তাঁর হাতে যেসব গোপন নথি এসেছে তার সবগুলোই ‘গোপনীয়’ কিন্তু এর কোনোটিতেই জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এমন কিছু ছিল না। গোপনীয় এই সিল দিয়ে আসলে সত্য গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছে, আমাদের দেশের নেতারা যে কী রকম ভুল করতে পারেন, তা লুকিয়ে রাখাই এসব সিল-ছাপ্পরের একমাত্র উদ্দেশ্য। ‘জাতীয় নিরাপত্তা নয়, কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চাকরির নিরাপত্তাই, এই নথিপত্র ফাঁস হওয়ায় হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।’

জানুয়ারির মাঝামাঝি নিক্সন প্রশাসন থেকে প্রথমবারের মতো স্বীকার করা হলো, অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা তথ্যে মিথ্যা কিছু ছিল না। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রোনাল্ড জিগলার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, কীভাবে এসব গোপন নথি ফাঁস হলো তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

নিক্সন বা কিসিঞ্জার কেউই তখন পর্যন্ত জানেন না এই তদন্তের ফলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে।

৩.

অ্যান্ডারসন কখনো স্বীকার করেননি সরকারি গোপন নথি তিনি কীভাবে, কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার হিসেবে নিজের তথ্যসূত্র প্রকাশ করা নীতিবিরুদ্ধ। তাঁর স্মৃতিকথা পিস, ওয়্যার অ্যান্ড পলিটিক্স গ্রন্থে তিনি সেই সূত্রকে শুধু ‘সোর্স’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেই ‘সোর্সের’ পক্ষে নিক্সন প্রশাসনের মিথ্যাচার ও দ্বিচারিতা সহ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল। নিজ থেকেই তিনি অ্যান্ডারসনকে ফোন করে তথ্য হাতবদলের প্রস্তাব রাখেন। অ্যান্ডারসন লিখেছেন:

‘সেই সোর্স হোয়াইট হাউসের কাছে এক ওষুধের দোকানে আমাকে আসতে আমন্ত্রণ জানালেন। ঠিক হলো আমরা দুজনেই এমন ভাব দেখাব যেন ক্রিসমাস কার্ড বাছাই করছি। হলিউডি কায়দার ‘স্পাই গেম’ খেলা আমার চরিত্রবিরুদ্ধ। কিন্তু আমার সোর্স যে নিক্সন প্রশাসনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি জানতেন টেলিফোনে কথাবার্তা সব সময় নিরাপদ নয়। কার্ড দেখার ভান করার এক ফাঁকে তিনি বিড়বিড় করে বললেন, নিক্সন প্রশাসন বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তিশালী সামরিক নৌবহর প্রেরণ করেছে। উদ্দেশ্য: পাক-ভারত যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করা। (অথচ) সেই যুদ্ধে নিক্সন প্রশাসন ‘নিরপেক্ষ’ বলে বারবার ঘোষণা দিয়েছে (২)।’

সেই সোর্সের কাছ থেকেই অ্যান্ডারসন জানতে পারলেন ‘টাস্কফোর্স ৭৪’ নামের সেই নৌবহরের মূল লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েতদের লক্ষ্য করে পেশিশক্তি প্রদর্শন। সোভিয়েতদের একটি নৌবহর আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত ছিল, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সূত্রে প্রয়োজনীয় সামরিক সাহায্য দিতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। ভারত মহাসাগরে দুই পরাশক্তি তাদের আণবিক অস্ত্র নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হলে তার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা বুঝতে অ্যান্ডারসনের বিলম্ব হয় না। কংগ্রেসকে না জানিয়ে, মার্কিন জনগণকে বিন্দুমাত্র অবহিত না করে নিক্সন প্রশাসন তৃতীয় মহাযুদ্ধের মতো এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চলেছে। এ কথা জানার পর চুপ করে থাকা অসম্ভব। কিন্তু শুধু মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে এমন একটি অভিযোগ তুললে তিনি বিপদে পড়বেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাও তা ছাপতে অস্বীকার করতে পারে। তাঁর ‘সোর্স’-এর কাছে কী প্রমাণ আছে তা জানতে চাইলেন। খানিকটা গররাজি হয়েই সেই সোর্স তাঁকে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের বিভিন্ন বৈঠকের বিবরণী তুলে দিলেন।

জ্যাক অ্যান্ডারসনের সেই ‘সোর্স’ যে ইয়োম্যান র‍্যাডফোর্ড, সে কথা জানা যায় পরে, তথ্য পাচার নিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের ফল হিসেবে। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্দেশে প্রথমে এফবিআই এবং পরে পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট আলাদা আলাদা তদন্ত শুরু করে। সন্দেহ বর্তায় সেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ওপর, যাঁরা হয় স্পেশাল গ্রুপের সভায় অংশ নিতেন অথবা সে সভার নথিপত্র পড়ার সুযোগ পেতেন। অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় তেমন লোকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। র‍্যাডফোর্ডের নাম যাতে কোনোভাবে ফাঁস না হয়, সে জন্য অ্যান্ডারসন সচেতন ছিলেন। অন্যান্য সাংবাদিককে বা টিভির ক্যামেরায় যখন তিনি গোপন নথি দেখাতেন, সব হাতে লেখা নোট মুছে দিতেন বা ঢেকে রাখতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত র্যাডফোর্ডের নাম ফাঁস হয়ে যায় অ্যান্ডারসনের নিজেরই একটি ভুলে। সে কথায় যাওয়ার আগে র‍্যাডফোর্ডের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগাযোগের একটি পরিচয় আমাদের জানা দরকার। অ্যান্ডারসন নিজেই তাঁর স্মৃতিকথায় সে কথা সবিস্তারে জানিয়েছেন।

র‍্যাডফোর্ড ও অ্যান্ডারসন পরিবার উভয়েই উটাহ অঙ্গরাজ্যের নাগরিক ও মরমোন ধর্মাবলম্বী। সেই সূত্রে তাঁদের পরিচয়। র‍্যাডফোর্ড একসময় ভারতে মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন, তখন ভারতের প্রতি একধরনের নিবিড় ভালোবাসা গড়ে ওঠে। দিল্লিতে তাঁর চাকরির সময় অ্যান্ডারসনের বাবা-মা বেড়াতে এলে র‍্যাডফোর্ডের সঙ্গে পরিচয় হয়। দিল্লির চাকরি শেষে ওয়াশিংটনে পেন্টাগনে দায়িত্ব গ্রহণের পরও অ্যান্ডারসনের বাবা-মা র‍্যাডফোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। যৌথ বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কিসিঞ্জারের দপ্তরের সমন্বয়কারী হিসেবে র‍্যাডফোর্ড দায়িত্বপ্রাপ্ত জানার পর অ্যান্ডারসন তাঁর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বাবা-মার উত্সাহে অ্যান্ডারসন র‍্যাডফোর্ডকে তাঁর ওয়াশিংটনের বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। এরপর তাঁদের সম্পর্ক দ্রুত পারিবারিক বন্ধুত্বে গড়ায়। অ্যান্ডারসনের স্ত্রী লিবি ও র‍্যাডফোর্ডের স্ত্রী টনির মধ্যেও ঘনিষ্ঠতা জন্মে।

অ্যান্ডারসন ঝানু সাংবাদিক ছিলেন, কিন্তু গোয়েন্দাবৃত্তি তাঁর পেশা নয়। সামরিক নথির গোপন সংকেত বোঝাও তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। র্যাডফোর্ডের কাছ থেকে গোপন নথির তথ্য অবিকল তুলে ধরে তিনি শোর বাধিয়ে তোলেন বটে, কিন্তু সে কাজ করতে গিয়েই তিনি ঠকে গেলেন। ওয়াশিংটন স্পেশাল গ্রুপের বৈঠকে যাঁরা অংশ নিতেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন অ্যাডমিরাল রবার্ট ওয়েল্যান্ডার। আগেই উল্লেখ করেছি তিনি যৌথ বাহিনী প্রধানের সঙ্গে কিসিঞ্জারের স্পেশাল গ্রুপের মধ্যে সংযোগকারীর দায়িত্ব পালন করতেন। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ জ্যাক অ্যান্ডারসনের একটি প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে তাঁর নজরে পড়ে ‘টারটার স্যাম’ এই শব্দ দুটি। অ্যান্ডারসন সেই প্রতিবেদনে সপ্তম নৌবহরে কোন কোন জাহাজ অন্তর্ভুক্ত আছে, তার একটি তালিকা দিয়েছিলেন। ‘টারটার স্যাম’ সেই নৌবহরের অন্তর্ভুক্ত একটি নৌযান বলে অ্যান্ডারসন উল্লেখ করেন। তাঁর জানা ছিল না ‘টারটার স্যাম’ আসলে একধরনের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র (সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল)। অ্যাডমিরাল ওয়েল্যান্ডার কিসিঞ্জারের কাছে লেখা এক মেমোতে সপ্তম নৌবহরে কোন কোন জাহাজ অন্তর্ভুক্ত আছে, তার তালিকা দেওয়ার সময় ‘টারটার স্যামসহ’ কথাটি ব্যাখ্যা হিসেবে যোগ করেন। কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নৌবহরের সঙ্গে আছে, সে কথা বোঝানোর জন্যই তিনি সে কথা যুক্ত করেছিলেন। অ্যান্ডারসন সে কথা না বুঝেই টারটার স্যামকে আরেকটি নৌযান হিসেবে ধরে নেন।

সে প্রতিবেদন পড়া মাত্রই অ্যাডমিরাল ওয়েল্যান্ডারের বুঝতে বাকি রইল না তাঁর লেখা সেই মেমো কে ফাঁস করতে পারে। চার্লস র‍্যাডফোর্ড সে সময় তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী, চিঠিটি তিনিই তাঁকে টাইপ করার পর কিসিঞ্জার ও নিরাপত্তা পরিষদের অপর সদস্য আলেকজান্ডার হেইগের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে লেখক-জীবনীকার ওয়ালটার আইজ্যাকসনের সঙ্গে আলাপচারিতায় অ্যাডমিরাল ওয়েল্যান্ডার জানান, কিসিঞ্জার ও হেইগ ছাড়া একমাত্র র‍্যাডফোর্ড সে মেমোর কথা জানত। আর যে হোক, তাঁরা দুজন সে মেমো কোনো সাংবাদিকের কাছে ফাঁস করবেন না। দুয়ে দুয়ে যোগ করে তাঁর সব সন্দেহ বর্তাল র্যাডফোর্ডের ওপর। নিরীহ ও গোবেচারা হলেও র‍্যাডফোর্ড ভারতের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তাঁর ওয়াশিংটনের বাড়িতে সে বছরও এক ভারতীয় ছাত্র আতিথ্য গ্রহণ করেছিল, এ কথাও ওয়েল্যান্ডারের জানা ছিল (৩)।

ফাঁস করা নথি নিয়ে পেন্টাগন তত দিনে অনুসন্ধান শুরু করেছে। ওয়েল্যান্ডারের কাছ থেকে র‍্যাডফোর্ডের নাম জানামাত্রই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে গেল। আইজ্যাকসন জিজ্ঞাসাবাদের বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, একটানা সে জিজ্ঞাসাবাদ ছিল ভয়ংকর। র্যাডফোর্ডকে বিশ্বাসঘাতক বলা হলো, তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার ফলে ভিয়েতনামে মার্কিন সেনার জীবন গেছে, এমন দাবিও করা হলো। দীর্ঘ সময় সে জিজ্ঞাসাবাদ সহ্য করা র্যাডফোর্ডের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন, কিন্তু এ কথা স্বীকার করলেন না তাঁর হাত দিয়েই অ্যান্ডারসনের কাছে তথ্য পাচার হয়েছে। র‍্যাডফোর্ডের কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পলিগ্রাফ পরীক্ষাও নেওয়া হয়।

অ্যান্ডারসনের নাম না জানা গেলেও এই জিজ্ঞাসাবাদের ফলে অন্য যে সত্য বেরিয়ে আসে তা ছিল ভয়াবহ। র্যাডফোর্ড জানান, নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন গোপন নথিপত্র তিনি কপি করেছেন যৌথ বাহিনীর প্রধানের নির্দেশ। সেসব নথিপত্র তিনি তাঁর কাছেই পৌঁছে দিয়েছেন।

নিক্সন নিজে এই ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন:

জিজ্ঞাসাবাদের ভেতর দিয়ে জানা গেল র‍্যাডফোর্ড বেশ কিছু সময় ধরেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গোপন নথিপত্র কপি করছিল। পুড়িয়ে ফেলতে বলা হয়েছে এমন কাগজপত্রের বস্তা থেকে জেরস্ক বা কার্বন কপি সে খুঁজে বের করত। বার কয়েক সে কিসিঞ্জার ও হেইগের ব্রিফকেস থেকে নথিপত্র চুরি করে তা কপি করে রেখেছে। বার কয়েক সে কিসিঞ্জার ও চৌ এন লাইয়ের কথোপকথনের বিবরণও কপি করে রেখেছে। এসব কাগজপত্র সে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিত (৪)।

নিক্সনের এই নিরস বর্ণনা থেকে বোঝার উপায় নেই আসলে কী ঘটছিল। যৌথ বাহিনীর প্রধানের কাছে গোপন নথি পৌঁছে দেওয়ার তাত্পর্যই বা কী। সে ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পর, ২০০২ সালে নিক্সন প্রশাসনের বিভিন্ন গোপন দলিলপত্র উন্মুক্ত করার পর সে কথা স্পষ্ট হয়েছে।

বস্তুত, র‍্যাডফোর্ড তাঁর দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল ওয়েল্যান্ডার ও অ্যাডমিরাল রবিনসনের কাছে এসব কাগজ পৌঁছে দিতেন। তাঁরা সেসব কাগজ তুলে দিতেন যৌথ বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোরেরের কাছে। র‍্যাডফোর্ড ছাড়াও আর যাঁদের নথিপত্র পাচার নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁদের অন্যতম ছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়েল্যান্ডার। র‍্যাডফোর্ড যে নথিপত্র অ্যান্ডারসনকে পাচার করছেন, সে কথা ওয়েল্যান্ডারের কাছ থেকেই জানা যায়, কিন্তু সে কথা প্রকাশের সময় তিনি ভাবেননি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তার ফলে আরও বড় এক গোপন খবর তাঁর কাছ থেকে বেরিয়ে পড়বে। রেকর্ডকৃত এক স্বীকারোক্তিতে ওয়েল্যান্ডার জানান, অ্যাডমিরাল মোরেরের নির্দেশে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, বিশেষত কিসিঞ্জারের কার্যাবলির ওপর নজর রাখার জন্য অনেক দিন থেকেই নথিপত্র সরানো হচ্ছে।

এ কথার অর্থ হলো যৌথ বাহিনীর প্রধান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্ররা হোয়াইট হাউসের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওয়েল্যান্ডার স্বীকার করেন, তাঁর পূর্বসূরি অ্যাডমিরাল রবিনসনের সময় থেকেই এই গুপ্তচরবৃত্তির শুরু। এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেননি, কারণ তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যৌথ বাহিনীর প্রধান স্বয়ং এই নথিপত্র সংগ্রহে আগ্রহী ছিলেন।

কিন্তু কেন?

পরবর্তী সময়ে উন্মুক্ত নথিপত্র ও স্বীকারোক্তি থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে মার্কিন সামরিক প্রশাসন নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জারের বিদেশ নীতির ব্যাপারে মোটেই সন্তুষ্ট ছিল না। তাঁরা সবচেয়ে বিরক্ত ছিলেন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্কোন্নয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক প্রশাসন আদর্শগতভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। অ্যাডমিরাল মোরেরের নির্দেশে ১৯৭০-এর মাঝামাঝি থেকে ১৯৭১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে মোট ১৩ মাস এই গোপন গুপ্তচর চক্র সক্রিয় ছিল। কোনো কোনো লেখক যৌথ বাহিনী প্রধানের হোয়াইট হাউসের ওপর এই গুপ্তচরবৃত্তিকে একধরনের ‘সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। যেমন মনটানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক জোয়ান হফ। তিনি লিখেছেন, অ্যাডমিরাল মোরের এবং তাঁর সহকর্মীরা এই ধারণা পোষণ করতেন যে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নিক্সন প্রশাসন কমিউনিজমের প্রতি তাঁদের নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করছেন। ভিয়েতনাম থেকে সরে আসার কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগেরও তাঁরা বিরোধী ছিলেন।

এই কট্টরবাদীদের অন্যতম ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ অব নেভাল অপারেশন এলমো জুমওয়ালট। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা অন ওয়াচ গ্রন্থে তিনি খোলামেলাভাবেই নিক্সন ও কিসিঞ্জারকে কমিউনিজমের প্রতি নমনীয়, সেই হেতু মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন।

অ্যাডমিরাল জুমওয়ালট লিখেছেন:

নিক্সন প্রশাসনের নীতি-নির্ণয় পদ্ধতি ও তাঁদের অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। তাঁরা মার্কিন জনগণের দেশপ্রেম ও বুদ্ধিমত্তায় অবিশ্বাসী ছিলেন, কংগ্রেস যে শাসনতান্ত্রিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাঁরা সে কথাও অস্বীকার করতেন। নিক্সন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি আচ্ছন্ন ছিল হেনরি কিসিঞ্জারের বিশ্ববীক্ষা দ্বারা। আর সে বিশ্ববীক্ষার মূলকথা ছিল ইতিহাসের চাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে, সেদিন দূরে নয় যখন সোভিয়েত ইউনিয়নই হবে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হবে একটি হেরে-যাওয়া জাতি। এই সম্ভাবনা ঠেকানোর জন্য যে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি দরকার, আমেরিকানদের তা নেই। অতএব, নীতিনির্ধারকেরা একমাত্র যা করতে পারেন তা হলো দেশের মানুষের কাছ থেকে সম্ভাব্য পরিণতি লুকিয়ে রাখা এবং সময় থাকতে থাকতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করা। নিক্সন প্রশাসনের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি এই বিশ্ববীক্ষা থেকেই পরিচালিত হতো। প্রেসিডেন্ট নিক্সন নিজে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকুন বা কিসিঞ্জারের প্রভাবে তা গ্রহণ করে থাকুন, এটাই যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই (৫)।

সামরিক অভ্যুত্থানের কথা জানার পরও নিক্সন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করার বিপক্ষে ছিলেন। ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ প্রথম নিক্সন এই গুপ্তচর চক্রের তথ্য জানতে পারেন। সেদিন হোয়াইট হাউসে এ নিয়ে কথা বলেন তাঁর নিকট সহকর্মী ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা এহরিশম্যান, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ বব হালডেরম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেল জন মিচেল। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মাউন্টেন স্টেট ইউনিভার্সিটির নিক্সন হোয়াইট হাউসে রেকর্ডকৃত সেই কথোপকথনের কিছু টেপ সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করেছে (৬)। তা থেকে বোঝা যায় নিক্সনের সহকর্মীরা কেউ চান না বিষয়টি নিয়ে খুব ঘাঁটাঘাঁটি হোক।

default-image

হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি সর্বোচ্চ মাত্রার গর্হিত অপরাধ। জন মিচেল নিক্সনের এ কথার সঙ্গে একমত হন, কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্টকে মনে করিয়ে দেন, এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি হলে যৌথ বাহিনীর প্রধানকে টেনে আনা হবে। রাজনৈতিকভাবে সেটি খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। তাঁর পুনর্নির্বাচনে সেটি বিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। নিক্সন সে যুক্তির সঙ্গে একমত হলেন। তাঁর আরও ভয় ছিল, হোয়াইট হাউস ও সামরিক নেতৃত্বের ভেতর কোনো রকম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, এ কথা তথ্যমাধ্যম জানতে পারলে মার্কিন সামরিক স্বার্থে বড় রকমের আঘাত আসতে পারে। তা ছাড়া চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য তিনি আশা করছেন, যা তাঁর পুনর্নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন এই গুপ্তচর চক্রের খবর জানাজানি হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ ঘটবে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত উচ্চপদস্থ কোনো সামরিক কর্মকর্তা এ ঘটনার জন্য শাস্তি ভোগ করেননি। নিক্সনের নির্দেশে পুরো ব্যাপারটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। একই কারণে র‍্যাডফোর্ডের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে তাঁকে বদলি করে ওরেগন অঙ্গরাজ্যের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো হয়। নিক্সন তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, র‍্যাডফোর্ড কিসিঞ্জারের সঙ্গে বিদেশে অনেক জায়গায় গেছে, অত্যন্ত গোপনীয় খবর তাঁর নখদর্পণে ছিল। সেসব যদি ফাঁস হয়ে যায় তাহলে চীন ও উত্তর ভিয়েতনামের সঙ্গে যে আলাপ-আলোচনা চলছিল, তা ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারত। এমন একজনের বিচারকার্য শুরু হলে তা হতো এক টাইম বোমা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের কথা র‍্যাডফোর্ড কতটুকু জানতেন, জানি না। তবে এটুকু জানি, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্রের পাঁয়তারায় আণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্র সে সময় যে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত ছিল, যার ফলাফলে আণবিক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারত, তা ফাঁস করে একটি গভীর মানবিক দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা কৃতজ্ঞ সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসনের কাছেও। ১৯৭১-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মহাপরাক্রমশালী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার গোপন চক্রান্ত যে শেষ পর্যন্ত আমরা জানতে পারি, অ্যান্ডারসনের ব্যক্তিগত সাহস ও নীতিবোধ ছাড়া তা অসম্ভব ছিল। একাত্তরের বাংলাদেশকে ঘিরে নিক্সন-কিসিঞ্জার জোটের গোপন চক্রান্ত বিষয়ে তাঁর প্রতিবেদনের জন্য জ্যাক অ্যান্ডারসন ১৯৭২ সালে পুলিত্জার পুরস্কার পান।

হাসান ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক।

তথ্যসূত্র

১. রিচার্ড নিক্সন, মেমোয়ার্স অব রিচার্ড নিক্সন, ১৯৯০, পৃ. ৫৩২

২. জ্যাক অ্যান্ডারসন, পিস, ওয়্যার অ্যান্ড পলিটিক্স, ১৯৭৬, পৃ. ১৮২

৩. ওয়ালটার আইজ্যাকসন, কিসিঞ্জার, এ বায়োগ্রাফি, ২০০৫, পৃ. ৩৮০ ও ৩৮৪

৪. রিচার্ড নিক্সন, পৃ. ৫৩২

৫. এলমো জুমওয়ালট, অন ওয়াচ, ১৯৭৬, পৃ. ভূমিকা ১৯

৬. দেখুন: http://www.nixonera.com