default-image

নাম তার উক্যচিং মারমা, পরিচিতজনরা আদর করে ডাকে ইউকে চিং। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী একমাত্র আদিবাসী বীরবিক্রম। রংপুরের হাতিবান্ধায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) নায়েক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন রংপুর, লালমনিরহাট, পাখিউড়া, বাঘবান্ধা, চৌধুরীহাট, ভূরুঙ্গামারীতে। বান্দরবানে ’৩৭ সালে বাইসাউ-হ্নাংসাউ মারমার দরিদ্র পরিবারে ইউকে চিংয়ের জন্ম। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর ’৫২ সালে ভগ্নিপতি মংচিনু তাকে ঢাকায় নিয়ে ইপিআরে ভর্তি করে দেন। ’৮২ সালে হাবিলদার মেজর হিসেবে অবসর নেন ইউকে চিং। বর্তমানে বান্দরবানের লাঙ্গিপাড়ায় সেনাবাহিনীর বানিয়ে দেওয়া একটি ঘরে দুই ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনী নিয়ে হতদরিদ্র অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

হাতিবান্ধা বিওপির অধিনায়ক ছিলেন হাবিলদার মাযহারুল, আমি উপ-অধিনায়ক। ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতাম না আমরা। ২৬ মার্চ বিকেলে আমাকে হাতিবান্ধা বাজারে পেট্রলিংয়ে পাঠালেন হাবিলদার মাযহারুল।

বিজ্ঞাপন

বাজারে রেডিওর খবর ও বিভিন্ন লোকজনের কথাবার্তা শুনে প্রথম দেশের পরিস্থিতির কথা আঁচ করতে পারলাম। সেখানেই কোম্পানি সদর দপ্তরের এক সিগন্যালম্যানের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘ওস্তাদ, খবরাখবর কিছু রাখেন? বিওপিতে তো থমথমে অবস্থা। যেকোনো সময় বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে পাঞ্জাবি ও বিহারিদের যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এখনো সময় আছে, পাঞ্জাবি ও বিহারিদের কাছ থেকে হাতিয়ার নিয়ে নিন।’

ফেরার পথে দেখি একটি গরুর গাড়ি। ছাইনির নিচে কালো কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে একজন পাঞ্জাবি নায়েক সুবেদার, পাশে রাইফেল হাতে একজন বাঙালি সিপাই। জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কারা? যাবেনই বা কোথায়? পাঞ্জাবি বললেন, আমরা স্পেশাল বিওপি ভিজিটে যাচ্ছি। তাদের বিওপিতে নিয়ে গেলাম। তাদের হঠাত্ আগমনে আমাদের সন্দেহ হলো। তাই তাদের হাতিয়ারও (একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল) জমা নেওয়া হলো। পরদিন তাদের রংপুর ফিরে যেতে বললেন হাবিলদার মাযহারুল। কিন্তু ততক্ষণে বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। লোকজনের মধ্যেও এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। পাঞ্জাবি নায়েক সুবেদারকে বাজারে দেখতে পেয়ে ছাত্র-জনতা আটক করে আবার আমাদের কাছে হস্তান্তর করে।

এদিকে আসলে কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আর ওয়্যারলেস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাইরের থেকে আমরা একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। একদিন কমান্ডার মাযহারুল বললেন, ‘ইউকে এক কাজ করো, তুমি বিওপির দায়িত্বে থাকো। আমি এই পাঞ্জাবি নায়েক সুবেদারকে রংপুরে রেখে আসি। এই ফাকে পরিবারের সঙ্গেও দেখা করে আসব আর দেশের পরিস্থিতিটা একটু বুঝে আসি।

হাবিলদার মাযহারুল চলে যাওয়ার পর বিওপির সব অস্ত্র-গোলাবারুদ ম্যাগাজিন হাউসে রেখে দুইজন বাঙালি জওয়ানকে সার্বক্ষণিক প্রহরায় রাখলাম। হাতিবান্ধা বিওপিতে তখন ১৪ জন সৈনিক—একজন পাঞ্জাবি ও দুজন বিহারি, বাকি সবাই বাঙালি। বিহারি-পাঞ্জাবি সিপাইদের ওপর কড়া নজর রাখার জন্য নির্দেশ দিলাম।

দুই দিন পর রংপুর থেকে ফিরলেন মাযহারুল। বললেন, পশ্চিমারা ঢাকায় অপারেশন করে বাঙালি ও বাঙালি সৈনিকদের নির্বিচারে হত্যা করছে। কী করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমরা। কোম্পানি থেকেও কোনো আদেশ আসছে না। যোগাযোগও বন্ধ। দুপুরে সীমান্ত পার হয়ে কিছু বাঙালি ছাত্র বিওপিতে আসে। বিওপির সৈন্য সংখ্যা, অস্ত্র, বাঙালি, পাঞ্জাবির সংখ্যা জানতে চায় তারা। আমরা তাদের এসব তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করলাম। তারপরও তারা কোনো জোরজবরদস্তি করলো না, বরং বিপদ হলে সীমান্ত পার হয়ে ওপারে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিল। অবশেষে সন্ধ্যায় এলো কাঙ্ক্ষিত সংবাদ। কোম্পানি কমান্ডার আরব আলীর নির্দেশ, সীমান্ত পার হয়ে সোনাহাট বিওপিতে চলে আসুন। আমরা এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দুই বিহারি ও এক পাঞ্জাবি জওয়ানকে স্থানীয়দের হাতে তুলে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হাজার হলেও তারা আমাদের সহকর্মী। তাই তাদের নিজের হাতে না মেরে ভলান্টিয়ারদের মাধ্যমে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছিলাম।

বিজ্ঞাপন

মোগলহাট হয়ে গরুর গাড়িতে সীমান্ত অতিক্রম করে দুই দিন পর আমরা সোনাহাট পৌঁছলাম। সন্ধ্যায় কোম্পানি কমান্ডার আরব আলী আমাদের সবাইকে নিয়ে মিটিং করলেন। তিনি গণহত্যা, স্বাধীনতা যুদ্ধসহ দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করলেন। যুদ্ধের জন্য কার কোন স্থানে অবস্থান নিতে হবে, কীভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে তাও তুলে ধরলেন। আমার ১৪ জন সৈনিককে নিয়ে পরদিন সকালে আমাকে কুলাঘাটে অবস্থান নিতে বলা হল। এরমধ্যে একদিন গোপনে হাতিবান্ধা থেকে আমার ছোট ভাই উবাপ্রুকে নিয়ে আসি। উবাপ্রুকে ইপিআরে ভর্তি করার জন্য আমিই রংপুরে নিয়ে আসি, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাকে আর ভর্তি করা যায়নি। যুদ্ধের পুরো সময়টাই সুবেদার আরব আলীর সঙ্গে ছিলেন উবাপ্রু।

কুলাঘাটে প্রায় ১৫ দিন ছিলাম। একদিন গ্রামের লোকজন এসে জানাল, শাড়ি পরে নারীবেশে দুইজন পাঞ্জাবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা কিছু বলে না, খালি বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাবার খুঁজে খায়। তাদের ধরে আনার নির্দেশ দিলাম। গ্রামের লোকজন একজনকে ধরতে পারলেও আরেকজন পালিয়ে যায়। দুই দিন পর রাতে হঠাত্ গুলির আওয়াজ। কিন্তু ঘাটি থেকে দূরে হওয়ায় এবং কোনো প্রকার সংবাদ না পাওয়ায় পর্যবেক্ষণ ছাড়া আর কোনো কিছু করার উপায় ছিল না। রাত ১০-১১টার দিকে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না চেক করতে গিয়ে নদীর ওপারে শিশুর কান্নাকাটি শুনতে পাই।

দুইজন সৈনিককে নিয়ে নৌকায় ওপারে গিয়ে দেখি অনেক নারী ও শিশু কান্নাকাটি করছে। জিজ্ঞেস করার পর পাকহানাদার বাহিনীর নারকীর ঘটনা ও তাদের পালিয়ে আসার বিবরণ দিলেন। হানাদাররা অতর্কিতে গ্রামে ঢুকে লোকজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ‘ব্রাশফায়ার’ করে হত্যা করে। হত্যার পর কেরোসিন ঢেলে লাশগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। যাহোক নারী ও শিশুদের নৌকায় করে পাশের গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সেখানে মাতবর ও শিক্ষকদের পালিয়ে আসা নারী ও শিশুদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলাম। পরদিন তাদের ভারতের শরণার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দিলাম।

মের প্রথম দিকে পাখিউড়ায় বাঙ্কার বানিয়ে তাতে অবস্থান নিলাম আমরা। নদীর ওপারেই লালমনিরহাট। রাজাকার কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে আমাদের বিষয়টি পাকবাহিনী জেনে যায়। রাত ৮টার পর থেকে আমাদের লক্ষ্য করে শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলি ও বোমা। মাথা উঁচু করার সুযোগ নেই। টানা ১১টা পর্যন্ত চলে গুলি ও বোমাবর্ষণ। রাত ১২টার দিকে সৈনিকদের অবস্থা চেক করতে গিয়ে দেখি একজন সৈনিকও নেই। আমার সঙ্গে শুধু দুইজন সৈনিক। তারা বলল, ওস্তাদ, আপনি যেখানে মরবেন আমরাও সেখানে মরব। আমরা সবাই চিন্তিত, ১১ জওয়ান গেল কই। তাদের কি পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গেল নাকি প্লাটুন হেডকোয়ার্টারে চলে গেল? টিপটিপ বৃষ্টি। একজন সামনে আরেকজন পেছনে সতর্ক দৃষ্টি রেখে রাত কাটালাম। ভোর ৪টার দিকে সৈনিকদের বললাম, এখানে থাকা ঠিক হবে না। সৈনিকদের খুঁজে দেখতে হবে। ডিফেন্স বাঙ্কার থেকে এলএমজি দিয়ে ফায়ার করলাম। কিন্তু সবই চুপচাপ এবং কোথাও কোনো সাড়া নেই।

আমরা তিনজন প্লাটুন হেডকোয়ার্টারে চলে এলাম। গিয়ে দেখি, সৈনিকরা সবাই চা-নাশতা করে আরাম করছে। সঙ্গের দুই সিপাইকে বললাম, তোমরা এখনই চা-নাশতা করো না। আগে জিজ্ঞেস করে আসি তারা কেন আসছে? তার তাদের জিজ্ঞাস করলাম, তোমাদের প্লাটুন কমান্ডার কে? প্লাটুন কমান্ডার সিলেটি। ওয়্যারলেসের রিসিভার ধরে বসে আছেন। আমি তার থেকে রিসিভার তুলে নিলাম। প্লাটুন কমান্ডার তখন বললেন, ইউকে, কী করছ তুমি? বললাম, চুপ, আপনি প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সৈনিকরা ডিফেন্স ছেড়ে কেন চলে এল ডিজ্ঞেস করেছেন? চা-নাশতা খাইয়ে রেখেছেন। তারা কি যুদ্ধ করতে এসেছে, নাকি চা-নাশতা করার জন্য এসেছে? ওয়্যারলেসে কথা বললাম ভারতে। ভারতীয় এক বাঙালি মেজর টেলিফোন ধরলেন। তাকে বিস্তারিত বলার পর তিনি বললেন, আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। আপনি অস্ত্র রেখে চলে আসুন। আমি বললাম, স্যার, অস্ত্র ফেলে আসব কেন? তিনি বললেন, অস্ত্রের অভাব নেই, আপনি চলে আসুন।

ভারতে চার রাত থাকার পর কোম্পানি কমান্ডার আরব আলীর নেতৃত্বে আমরা সরাসরি চলে এলাম বাঘবান্ধা। বাঘবান্ধার ছোট্ট একটি ছড়ার পশ্চিম তীরে অবস্থান নিয়ে দ্রুত শেল্টার, বাঙ্কার, হাইডার বাঙ্কার তৈরি করলাম। এখানেও আমাদের অবস্থান জেনে যায় পাকহানাদার বাহিনী। আকাশে সকাল থেকে ভারী মেঘ। কিছুক্ষণ পর একসঙ্গে শুরু হলো হানাদারদের বম্বিং আর বৃষ্টি। প্রকৃতিও যেন আমাদের ওপর বৈরী। দ্রিম দ্রিম মর্টারের গোলা। আমরা অবশ্য একটি গুলিও করিনি। কারণ আমরা জানি, ভূরুঙ্গামারী থেকে বম্বিং করছে হানাদাররা। আর বাঘবান্ধা থেকে ভূরুঙ্গামারীর দূরত্ব অনেক। তাই তাদের বম্বিংয়ে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। আমি আর মাযহারুল ওস্তাদ ছোট বাঁশের সেতু দিয়ে ছড়া অতিক্রম করছিলাম। এমন সময় বিকট আওয়াজে ছড়ার ওপর এসে পড়ল মর্টারের গোলা। মাথায় স্প্লিন্টারের ছোট এক টুকরো বিদ্ধ হলে আমি হালকা আহত হলাম। তারপরও আমরা সামনে অগ্রসর হলাম। ছড়া পার হয়ে আমরা পরিত্যক্ত বিওপিতে এসে অবস্থান নিলাম। ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিলাম ভূরুঙ্গামারী যাওয়ার সড়ক। শত্রুর আক্রমণের সম্ভাব্য দিকগুলোতে গ্রেনেড, এলএমজি ফিট করলাম।

বিজ্ঞাপন

ভূরুঙ্গামারী যুদ্ধ

বাঘবান্ধায় আমাদের ডিফেন্স লক্ষ্য করে ভূরুঙ্গামারী থেকে পাকবাহিনী সারা রাত থেমে থেমে বম্বিং করল। আমরা কিন্তু চুপচাপ। সকালে তারা বম্বিং বন্ধ করে। সম্ভবত তাদের ধারণা হয়েছিল, আমরা বোমা হামলায় টিকতে না পেরে পশ্চাত্পসরণ করেছি। সকাল ৮টার দিকে ভারতীয় সৈন্যের একটি কোম্পানি এসে পৌঁছল। ভারতীয় বাহিনীর একজন মেজর, একজন ক্যাপ্টেন, একজন সিগন্যালম্যানসহ আমরা চারজন রেকি করতে গেলাম ভূরুঙ্গামারী। দূর থেকে আমরা বাইনোকুলার দিয়ে পাকবাহিনীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলাম। পাকহানাদাররা কেউ বাঙ্কারে, কেউ বাইরে বসে চা-নাশতা করছে, তাদের সঙ্গে অনেক মেয়ে। তাদের অবস্থান ম্যাপিং করে ফিরে এলাম।

সন্ধ্যায় ভূরুঙ্গামারী আক্রমণের জন্য ভারতীয় বাহিনীসহ অগ্রসর হলাম। রাত ৮টার দিকে শুরু হলো আক্রমণ। বৃষ্টির মতো গুলি আর বোমা। সারা রাত যুদ্ধ হলো, পাকবাহিনীও প্রচণ্ড প্রতিরোধ করেছে। কিন্তু তারা আমাদের বোমা আক্রমণে টিকতে না পেরে শেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ভোর ৬টার দিকে ভূরুঙ্গামারী দখল করে নিলাম আমরা। তল্লাশি চালিয়ে সাধারণ কিছু লোকজনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। একটি বাঙ্কারে একজন পাক-ক্যাপ্টেন ও মহিলার লাশ ছাড়া আর কোনো পাক সৈন্য পাওয়া যায়নি। লোকজন জানালেন, পাকসেনারা আক্রমণের সময় বাঙ্কার ছেড়ে বাজারের পেছনে একটি খাদে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখান থেকেও তারা পালিয়ে গেছে।

সকাল ৯টার দিকে বাঘবান্ধায় এলেন জেনারেল অরোরা। আমাদের ডিফেন্স ঘুরে দেখলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপ কাহাহে।’ বললাম, স্যার, আমার নাম ইউকে চিং, পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা সমপ্রদায়ের লোক। বৌদ্ধ ধর্মাম্বলম্বী। তাকে এলএমজি ও গ্রেনেডের ফাঁদ দেখালাম। এটা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের শিকার ধরার ফাঁদের অনুকরণে করেছি বলায় তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, আমার নাম-ঠিকানা নিলেন। ভূরুঙ্গামারী পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য আমাদের ব্যারিকেড তুলে দিতে বললেন তিনি। কিন্তু বাঘবান্ধার আমাদের ঘাঁটি থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর ওত পেতে থাকা একদল রাজাকার তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করলে অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। আবার বাঘবান্ধায় ফিরে আসেন অরোরা। এবার শুরু হলো রাজাকার অবস্থানের ওপর বম্বিং। টানা ৫০-৬০টা বোমাবর্ষণ করা হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে রাজাকারদের ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যায়।

লালমনিরহাট অপারেশন

ক্যাপটেন আজিজের নেতৃত্বে অপারেশন হলো লালমনিরহাটে। এই অপারেশনের সবাই মুক্তিফৌজ, ভারতীয় বাহিনীর কেউ নেই। পাঁচটি গ্রুপে তিন দিকে দুই কলামে ইউ শেপ আক্রমণের পরিকল্পনা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হলো আক্রমণ—মর্টার শেলিং। পাকবাহিনীও মুহুর্মুহু বোমা ও গুলিবর্ষণ করল। আমার সেকশন লালমনিরহাট বাজারের পেছনে অবস্থান নিল। সারা রাত চলে যুদ্ধ। সকালে পাকবাহিনী পালিয়ে যায়। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর দেখি আমার সৈনিকদের বেশির ভাগই নেই। তারা গেল কোথায়? সৈনিকদের নিখোঁজসংবাদ ক্যাপটেন আজিজকে জানালাম। সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন তিনি।

খোঁজাখুঁজি করে তাদের পাওয়া যায় এক জায়গায়। পালিয়ে যাওয়া এই আট-নয়জন সৈনিককে কোনো কিছু না বলে নদীর ওপর লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন ক্যাপটেন আজিজ। তারা দাঁড়ানোর পর আমাকে নির্দেশ দিলেন, ইউকে, আপনার এলএমজি নিয়ে আসুন। তিনি কড়া ভাষায় বললেন, এ রকম সৈনিক আমাদের দরকার নেই। এদের ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলুন। এই নির্দেশে তো আমি হতবাক। বললাম, স্যার, ওরা ভুল করেছে। এ রকম প্রশিক্ষিত সৈনিক আমরা আর পাব না। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। পরে হাতে-পায়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করে তাকে শান্ত করা হলো। লালমনিরহাট যুদ্ধে আমাদের অনেক সৈনিক হতাহত হয়। পাকবাহিনীরও অনেকে মারা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে রাজাকার।

গোপন সূত্রে খবর পেলাম, চৌধুরীহাটে পাঞ্জাবি বাহিনী ও রাজাকার আছে। লেফটেন্যান্ট সামাদের নেতৃত্বে ভূরুঙ্গামারী থেকে চৌধুরীহাটের দিকে অগ্রসর হলাম। আমাদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করলেন লেফটেন্যান্ট সামাদ। সামাদ নিজে পাকা সড়কে গেলেন, ডান দিকে আমার সেকশন বামে হাবিলদার মাযহারুল। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। আমরা নিরাপদ দূরত্বে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শুধু বেলচা দিয়ে মাটি খনন করছিলাম। এমন সময় কাদের যেন ছুটে যাওয়ার আওয়াজ। আওয়াজ পাওয়ার আধ ঘণ্টা পর শুরু হলো পাকবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণ। মাথার ওপর দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি আর একটার পর একটা মর্টার শেলিং। কোনোমতে মাথা তুলতে পারছিলাম না। তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পশ্চাত্পসরণ করতে হলো। ডিফেন্সে ফিরে জানতে পারলাম, লেফটেন্যান্ট সামাদ মারা গেছেন। তার লাশও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সারা দিন ঘাঁটিতেই কাটালাম। রাতে লেফটেন্যান্ট সামাদের লাশ উদ্ধার করতে আমরা কয়েকজন নামলাম। চৌধুরীহাটের ব্রিজের পাশে খুঁজে পাওয়া গেল তার লাশ। ব্রিজের ওপারে রাজাকারদের এলএমজি বাঙ্কারে সতর্ক প্রহরা ছিল।

ওই রাজাকারদের গুলিতে নিহত হয়েছেন সামাদ। আমাদের সৈনিক সুলতান কম্বল দিয়ে সামাদের লাশ পিঠে বেঁধে গড়িয়ে গড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে এলেন। পরদিন যথাযথ সামরিক মর্যাদায় ভূরুঙ্গামারী বাজারের সিকি মাইল দূরে তার লাশ দাফন করা হয়। পরদিন সংবাদ পেলাম পাকবাহিনী ও রাজাকাররা চৌধুরীহাট ছেড়ে চলে গেছে। আমরা চৌধুরীহাট এলাম। এরপর সামনে আগ্রসর হলাম। প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই দখল করে নিলাম তিস্তা ব্রিজ। ঢুকে পড়লাম রংপুর। দিনটা ১৬ ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন হয়েছে।

কোম্পানি কমান্ডার আরব আলী ১৯৭৩ সালের একদিন ডেকে বললেন, বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তোমাকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিন পর সুবেদার মেজর বোরহান আমাকে ডাকলেন। অত্যন্ত সাদামাটাভাবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তিনি আমাকে বললেন, ইউকে, আপনি বাংলাদেশ নোটিফিকেশন নম্বর ০৮/২৫/ডি-১/৭২-১৩৭৮ তাং-১৫/১২/১৯৭৩ মোতাবেক বীরবিক্রম উপাধিপ্রাপ্ত হয়েছেন। এখন থেকে আপনি নিজের নামের শেষে সবসময় বীরবিক্রম লিখবেন। তিনি আমাকে ২ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ’৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকাসহ বীরবিক্রম পদক গ্রহণ করি। কিন্তু ’৯৫ সালে বান্দরবান জেলা শহরের উজানীপাড়া বাসা থেকে ওই পদক হারিয়ে যায়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমাকে বীরত্বভূষণ সনদপত্র প্রদান করেন।