default-image

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমরা মেজর কে কে মিট্টালচালিত হেলিকপ্টারে সৈয়দপুর রওনা হলাম। পূর্ব আশঙ্কামতো বিজয়ের আনন্দে ভারতীয় সৈনিকরা সব ধরনের গুলি আকাশে ছুড়ছিল। মিট্টাল হেলিকপ্টারকে বিপদমুক্ত উচ্চতায় নিয়ে গেল, কারণ একজন বিজয়োল্লোসিত সৈনিক দুচোখ খোলা রেখে গুলি করেও লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানতে পারে। সফি [ব্রিগেডিয়ার, কমান্ডার, ২৩ ইনফেন্ট্রি ব্রিগেড-লেখক] তাঁর দল নিয়ে জামজামা বিমানবন্দরে বেদনাদায়ক অনুষ্ঠানের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। পাকিস্তানের বিখ্যাত রেজিমেন্টগুলোর গর্বিত অধিনায়কেরা কড়া মাড় দেয়া খাকি পোশাকে দাঁড়িয়ে।

আমি সফিকে অভিবাদন জানালে তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন, আমি বললাম, ‘আপনার সঙ্গে আরও মনোরম পরিবেশে দেখা হলে ভালো লাগত।’ তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং অনুচ্চ স্বরে বললেন, ‘এগুলো যুদ্ধের দুর্ভাগ্য। আমি মাত্র পাঁচ দিন আগে (নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার) দায়িত্ব নিয়েছি।’

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি সৈনিকেরা সারিবদ্ধ হচ্ছে। তিনি বিষাদের সঙ্গে তাঁর অধীনস্থদের দিকে একঝলক তাকালেন এবং তাঁর কাঁধের অ্যাপোলেট ও পিস্তলে হাত রাখলেন এবং হতাশার সুরে বললেন, ‘খুব শিগগিরই এ বোঝা দুটি থেকে আমি হাল্কা হয়ে যাব।’ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে তিনি তাঁর ডান কাঁধ থেকে পদবির একটি অ্যাপোলেট খুলে ফেলেন এবং তাঁর পিস্তলটি গুলিশূন্য করেন ও তাঁর ভারতীয় প্রতিপক্ষকে হস্তান্তর করেন।

সব পাকিস্তানি সিনিয়র অফিসার একত্রে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে অছেন—যেন একে অপরের সঙ্গ দ্বারা আসন্ন অগ্নিপরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে নিজেদের ভেতরে সাহসের সঞ্চার করতে পারেন। সৈনিকেরা হয়তো মৃত্যুভয়ে বা ভয়ংকর পরাজয়ে ভীত, কিন্তু তাদের কাঁপুনি ছিল লজ্জাকর। বেশির ভাগ অফিসার স্থির ও শান্ত ছিল, যদিও তাদের কেউ কেউ একা একা বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে নিমগ্ন ছিল। ২৯ ক্যাভালরির একজন তরুণ অফিসার কাঁদছিল আর জুতার আগা দিয়ে মাটি খোঁচাচ্ছিল এই ভেবে যে, তার চোখের পানি ওই মাটি শুষে নেবে।

সাতটি স্যাফি ট্যাঙ্ক, ১২টি ১০৫ মিমি. ইতালিয়ান কামান এবং চারটি ১২০ মিমি. মর্টার, সঙ্গে ৯৮ জন অফিসার এবং ১১৪ জন জেসিওসহ প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিক সৈয়দপুরে আত্মসমর্পণ করে। দিল্লির আদেশে কোনো ছবি তোলার অনুমতি ছিল না। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের ইতিহাসবোধের বড় অভাব।

১৬০০ ঘটিকায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। গর্বিত এবং সুশৃঙ্খল পাকিস্তানি সৈনিকদের কর্ণবিদারী আদেশ, ‘হাতিয়ার পার জামিন’ (ভূমি অস্ত্র), কুণ্ঠিতভাবে পালন করতে দেখাটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। অনুষ্ঠান শেষে লে. কর্নেল হাকিম আরশাদ কোরেশী, অধিনায়ক ২৬ এফএফের চোখ লাল দেখাচ্ছিল।

কোরেশী দীর্ঘসময় ধরে কাঁদছিল আর তার চোখ শুকিয়ে গিয়েছিল। অঝোর অশ্রুধারা তার গোঁফ ভিজিয়ে দিয়েছিল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এ রকম পরিপক্ব, পদকপ্রাপ্ত যুদ্ধবাজদের শিশুর মতো কাঁদতে দেখা বেশ কষ্টকর ছিল। অনুষ্ঠান শেষে পাকিস্তানি সৈনিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে মাটি ভেজা দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছে যেন সদ্য পানি ছিটানো হয়েছে। ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর পিছন ফিরে জোরে জোরে বললো, ‘হানজুয়ান উইচ সার্ষো নাহি ঔগদি’ (জমিতে নোনাপানি দিলেই সরিষা চাষ হয় না)।

লে. কর্নেল দালজিত্ সিং-এর বর্ণনার অংশবিশেষ

বিজ্ঞাপন