default-image

আমাদের ইতিহাসের কথা উঠলেই বঙ্কিমচন্দ্রের একটি কথা আমরা সবাই স্মরণ করি :

‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী, তাহাকেই লিখিতে হইবে।’

কথাটি যে একান্তভাবেই স্মরণ ও অনুসরণের যোগ্য—এ-বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। বঙ্কিমের কালকে আমরা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। ইতিমধ্যে বাংলা ও বাঙালির অনেক ইতিহাস লেখা হয়েছে, এখনো হচ্ছে এবং সে-সব ইতিহাসে আমাদের অনেক বিস্তৃত ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার ঘটেছে ও ঘটছে। আজ আমরা নিশ্চয়ই বঙ্কিমের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই’ বলে হাহাকার করতে পারি না।

তাই বলে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে, বাঙালির সমাজ-জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইতিহাসের আলোর যথাযথ প্রক্ষেপণ ঘটেছে, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেই আমরা ইতিহাস রচনা করছি,—এমন কথাও আত্মপ্রসাদের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারি না। ইতিহাসচর্চার নামে প্রায়শই আমরা আত্মমুখী ভাববাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছি এবং প্রায় কখনোই সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে নির্মোহ দৃষ্টিতে অবলোকন করতে পারছি না। মোহগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টি দিয়ে যে-ইতিহাস আমরা রচনা করি, সে-ইতিহাস তো খণ্ডিত ও বিকৃতই হবে। আমরা এক গোষ্ঠীর মানুষ অন্য গোষ্ঠীকে ইতিহাসের খণ্ডায়নের ও বিকারায়ণের জন্য দোষারোপ করি, কিন্তু নিজের দোষটি কেউই দেখতে চাই না।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের তথ্য নির্বাচন ও আহরণের ব্যাপারেও আমরা খণ্ডিত ও বিকৃত দৃষ্টিরই পরিচয় দিই, নিজের নিজের মতলব ও সুবিধা মতো তথ্য নির্বাচন ও আহরণ করি, কোনো তথ্যের খণ্ডাংশকে প্রকাশ করে অপরাংশকে লুক্কায়িত করে রাখি, এমনকি অনেক সময় তথ্য ‘সৃজন’ও করে নিই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তো এ-রকম তথ্যের খণ্ডায়ন, বিকারায়ণ, লুক্কায়িতকরণ ও ‘নবসৃজন’ অহরহই ঘটানো হচ্ছে। এ-রকম করেই বিতর্কিত করে ফেলা হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকেও। স্বাধীনতার ঘোষক কে ছিলেন—এই নিয়ে এমন এক মতলববাজির খেলা চালানো হচ্ছে, যাতে স্বাধীনতার পুরো ইতিহাসটাই যেন এক কৃত্রিম ধূম্রজালের নিচে চাপা পড়ে গেছে। সেই ধূম্রজাল ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তকেও। একদল দুর্বুদ্ধিজীবী এ-রকম ধূম্রজাল থেকেই নিজেদের জন্য বেশ ফায়দা উঠিয়ে নিচ্ছেন।

আবার ‘স্বাধীনতার ঘোষক’-এর বিপরীতে ‘জাতির পিতা’কে নিয়েও ভ্রান্তিবিলাসের সৃষ্টি কম করা হয়নি। একদল শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ বলছেন, অন্যদল তাঁর সমস্ত কৃতিকে নস্যাত্ করে দিয়ে তাঁকে কুত্সার কলঙ্ককালিমায় আবৃত করে ফেলার ন্যক্কারজনক অপচেষ্টায় মেতেছেন। ‘বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না’—এমন কথা বলছেন একদল, তার বিপরীতে অন্যদলের মতে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি তো ননই, বরং এদেশটিকে তিনি ভারতের ক্রীড়নকে পরিণত করে রেখে গেছেন। বামপন্থিদের কোনো কোনো গোষ্ঠী তো শেখ মুজিবকে এখনও ‘মুত্সুদ্ধি পুঁজিবাদের ধারক বাহক’ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুছে দেওয়ার অবিমৃষ্যকারী অপপ্রয়াস নিন্দনীয় অবশ্যই। কিন্তু তাই বলে শেখ মুজিবের ওপরই সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে রেখে সচেতনভাবে ইতিহাসের অন্য অন্য সকল তথ্য ও উপাদান বিস্মৃত হয়ে থাকাটাও কোনোমতেই প্রশংসনীয় হতে পারে না। অথচ, শেখ মুজিবের অতি উত্সাহী সমর্থকদের অনেকেই এমন কাজটি করছেন। তারা তো, এমনকি, মুজিবের রাজনৈতিক সংগঠনটির অন্য অন্য নেতা-কর্মীদের অবদানেরও যথাযথ স্বীকৃতিদানে অনীহা প্রকাশ করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের সময় সশরীরে উপস্থিত না থেকেও বঙ্গবন্ধুই যে ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা—এ-তথ্যটি যারা অস্বীকার করে তারা হয় মূর্খ, নয় জ্ঞানপাপী। কিন্তু অনুপস্থিত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে রাখার লক্ষ্যে অতন্দ্র নিষ্ঠাবান ছিলেন ও অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের কথা ভুলে থাকা কি শোভন ও সঙ্গত? তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দিলে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা লাঘব হয় বলেই কি বঙ্গবন্ধুর একশ্রেণীর ভক্ত মনে করেন? তা না হলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানে তাজউদ্দিনের অবদান প্রসঙ্গে তাঁরা এত মিতবাক কেন? স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দিনের দূরত্ব সৃষ্টির হেতুটিকে চাপা দিয়ে রাখা কি সুষ্ঠু ইতিহাসচর্চার পরিচায়ক?

শুধু তাজউদ্দিন বা তাঁর সহযোগীদের কথাই নয়। এঁদেরও আগে থেকে তিল তিল করে দেশের স্বাধীনতার চেতনাকে অবয়ব দান করে চলছিলেন যাঁরা, তাঁদের সকলের অবদানকেই যথাযথ মর্যাদা দান না করলেও ইতিহাসের খণ্ডায়নই ঘটানো হয়।

বিজ্ঞাপন

শেখ মুজিব যে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন, তা তো কোনো অলৌকিক শক্তির বিধানে হঠাত্ করে একদিনে হয়ে যাননি। দেশের লোকসাধারণ প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ক্রমে ক্রমে পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্ত হয়ে উঠেছে, অগ্রসর চিন্তার অনেক মানুষ ও তাঁদের দ্বারা সংঘটিত নানা আন্দোলনও লোকসাধারণের মোহমুক্তি ঘটানোয় নানাভাবে সহায়তা দিয়েছে। এ-রকম সহায়তাদানকারীদের মধ্যে যেমন ছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্ব-প্রত্যাখ্যানকারী উদারগণতন্ত্রী অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদীরা, তেমনই ছিলেন সমাজের আমূল পরিবর্তনকামী সাম্যবাদীরাও। সে-সময়ে সাম্যবাদীদের পথ ছিল খুবই বন্ধুর। প্রকাশ্যে কাজকর্ম চালানো তাদের পক্ষে ছিল একেবারেই অসম্ভব। তবু প্রচণ্ড দমন-পীড়নের মধ্যেও প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণচেতনা সৃষ্টি ও গণসংগ্রাম সংঘটনে তাঁরাই ছিলেন অগ্রচারী।

তাঁদের সংগ্রাম থেকেই এদেশের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদীরাও শক্তিসংগ্রহ করে। এ-রকম জাতীয়তাবাদী নেতা রূপেই সামনে এসে যান শেখ মুজিবুর রহমান। উনিশ শো একষট্টির শেষ ও বাষট্টির গোড়ায় জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিব ও তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সাম্যবাদী নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সঙ্গে চারটি বৈঠক করেন, সেই বৈঠকগুলোতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘রক্তবীজ’ রোপিত হয়ে যায়। সেই রক্তবীজই বৃহত্ মহীরুহে পরিণতি পায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। আর শেখ মুজিবও ধাপে ধাপে হয়ে উঠতে থাকেন ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘স্বাধীন বাংলার স্থপতি’ ও ‘জাতির পিতা’।

অথচ এ দেশের সাম্যবাদীদের প্রধান অংশটির সঙ্গে জাতীয়তাবাদীদের সংযোগের বিষয়টি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে কোনোমতেই যথাযথ গুরুত্ব পায় না। বিষয়টিকে ক্রমশই যেন বিস্তৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস’ নামে যে-দলটি তত্কালীন প্রাদেশিক পরিষদে ও গণপরিষদে যে অসাধারণ অবদান রেখেছিল এবং সে-অবদান যে স্বাধীন বাংলার ভিত্তি নির্মাণে অনেক পরিমাণেই সহায়তা করেছিল,—স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেকথাও আমরা প্রায়শই বিস্মৃত হয়ে যাই। এভাবেও কি ইতিহাসের খণ্ডায়ন ও বিকারায়ণ ঘটানো হচ্ছে না?

অখণ্ড ও অবিকৃত ইতিহাস রচনা করতে গেলে শুধু ইতিহাসের নায়কশক্তির দিকে দৃষ্টি দিলেই চলে না, প্রতিনায়কদের ব্যাপারেও মনোযোগী হতে হয়। যারা প্রকাশ্যে শত্রুতা করে তাদের তো সহজেই চেনা যায়, সহজেই তাদের মোকাবিলাও করা যায়। কিন্তু মিত্রবেশধারী খলনায়কদের চিনে নেওয়া খুবই কঠিন। আর তাদের মোকাবিলা করা শুধু কঠিনই নয়, অনেক সময় প্রায় অসম্ভবও হয়ে ওঠে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এমন কপট মিত্রদের কাউকে কাউকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি তারা নিজেরাই ধরা দিয়েছে বলে। যারা ধরা দেয়নি তাদের অনেককেই এখনো আমরা ধরতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের শিবিরে অবস্থানকারী খোন্দকার মোশতাক আর তাদের সাঙাত্রা এক সময়ে নিজেরাই নিজেদের চরিত্র অনাবৃত করে দিয়েছে। তাই তাদের নিয়ে কোনো বিভ্রম আর এখন নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত থেকেও যারা একে নানাভাবে কলুষিত ও দিকভ্রষ্ট করেছে, অথচ নিজেদের আসল চরিত্রকে অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে আড়াল করে রাখতে পেরেছে, সেই অতি চতুর কপট মিত্রদের আমরা চিনতে পারিনি। কিংবা চিনলেও এদের অতি চাতুর্যের দরুনই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপনসহ প্রকাশ্যে চিহ্নিত করতে পারিনি। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস খণ্ডিত হয়ে থাকার এও একটি কারণ।

তা ছাড়া বাংলাদেশকে যারা স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তাদের একটি প্রবল ও প্রতাপান্বিত অংশ ছিল মতলববাজ। তারা এবং তাদের অব্যবহিত পূর্বসূরিদের অনেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। নিজেদের জন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন মৃগয়াক্ষেত্র রূপেই তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ-রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলটি মোটেই স্বাধীন হয়নি, এটি হয়ে গেছে পশ্চিমাঞ্চলের উপনিবেশের মতো। তখন পাকিস্তানের কোটিপতি বাইশ পরিবারের একটিও ছিল না পূর্ব পাকিস্তানে, সবাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি। এ-অঞ্চলে যাদের কোটিপতি হওয়ার সাধ ছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত থেকে যে সে-সাধকে সাধ্যে পরিণত করা কোনোমতেই সম্ভব হবে না—এ-কথা তারা বুঝে ফেলেছিল। বুঝে ফেলেই এ অঞ্চলের প্রবঞ্চিত ও শোষিত গণমানুষদের কণ্ঠে তারা কণ্ঠ মেলায়, তারাও বাংলাদেশের প্রবক্তা হয়ে ওঠে।

কিন্তু অগণিত অকুতোভয় স্বাধীনতা-সংগ্রামীদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ওদের মতলবের ছিল আসমান-জমিন ফারাক। গণমানুষ স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে গণ-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েমের আকাঙ্ক্ষাকে বুকের গভীরে লালন করে তারা আত্মদান করেছে। আর এর বিপরীতে ওই মতলববাজরা চেয়েছে এমন এক বাংলাদেশ, যে-দেশটিতে তাদের জন্য থাকবে শোষণের অবাধ স্বাধীনতা।

স্বাধীন বাংলাদেশে সেই স্বাধীনতারই তারা নিশ্চয়তা বিধান করেছে। স্বাধীনতার সকল ফসল তারাই লোপাট করে নিয়েছে। শোষণের স্বাধীনতাকে নিরঙ্কুশ করে তোলার জন্য তারা শুধু স্বাধীন বাংলার স্থপতিকেই নিহত করেনি, অগণিত শহীদের রক্তে লেখা রাষ্ট্রীয় সংবিধানকেও যদৃচ্ছা কাটা ছেঁড়া করেছে, স্বাধীনতার অন্তঃসারকেই লুপ্ত করে দিয়েছে। যে-সমস্ত মহান প্রত্যয়কে বলা হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ’, সে-সবকে ওরা কোনোদিনই মনেপ্রাণে মেনে নেয়নি।

বিজ্ঞাপন

আপন স্বার্থেই ওরা পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চেয়েছে বটে, কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রাদর্শকে পরিত্যাগ করার সামান্যতম বাসনাও ওদের ছিল না, থাকতে পারে না। বরং নামে বাংলাদেশ হয়েও অন্তর্বস্তুর দিক দিয়ে যদি এটি হয়ে ওঠে একটি ‘মিনি পাকিস্তান,’ তাহলেই এ রাষ্ট্রটি হতে পারে ওদের স্বার্থের সাধক ও ধারক। বাংলাদেশকে আজ ওরা তেমনটিই করে তুলতে পেরেছে। এবং সে-কাজে ওরা সহযোগী করে নিয়েছে স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী পাকিস্তানপন্থিদের। শুধু সহযোগী নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারও করে নিয়েছে ওদের। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই যে পরিণতি ঘটলো, এটিও নিতান্ত আকস্মিক বা কার্যকারণবিহীন নয়। যে-শক্তি ইতিহাসের এ-রকম পরিণতি ঘটিয়েছে সে-শক্তির ঠিকুজি সন্ধানের কোনো প্রয়োজন আমরা অনুভব করিনি। একারণেই দেশের অখণ্ড ও অবিকৃত ইতিহাস আজও অলিখিতই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশকে উল্টোরথে চড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে যারা, তারা আজ এমনই ধনশালী হয়ে উঠেছে যে, তাদের ধনের পরিমাণ বোধ হয় সেকালের পাকিস্তানের বাইশ পরিবারকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে। ধনিকরা শ্রমিকদের তৈরি উদ্বৃত্ত মূল্য অপহরণ করেই ধনের অধিকারী হয়—এমন কথা মহামতি কার্লমার্কসের কল্যাণে আজ আমরা সবাই জানি। সেই সঙ্গে আমরা এ-ও জানি যে উদ্বৃত্ত মূল্য অপহরণ করার জন্য ধনিকদের উত্পাদন শক্তির বিকাশ ঘটাতে হয়, এবং তেমনটি করেই ধনিকরা সমাজপ্রগতিতে বিশেষ অবদানও রাখে। কিন্তু আমাদের ধনিকদের এমন কোনো অবদান নেই, তাদের ধনের উত্স নিছক লুটপাট। ব্রিটিশ রাজত্বের শুরু থেকেই এমনটি শুরু হয়েছে। সে-সময়ে ব্রিটিশদের সহায়তায় নবগঠিত কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যারা ‘হঠাত্ নবাব’ আখ্যা পেয়েছিল, তাদেরই উত্তরাধিকার বহন করে আমাদের দেশে গজিয়ে উঠেছে একটি ‘লুটেরা ধনিক গোষ্ঠী’। আমাদের রাষ্ট্রটি আজ এদেরই দখলে। আইন-প্রণেতা থেকে আইন-প্রয়োগকারী পর্যন্ত সব আসনেই এরা সমাসীন।

এদের ব্রিটিশ জামানার পূর্বসূরিদের নিয়ে উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে অনেক প্রহসন ও নকশা লেখা হয়েছিল। যদিও সে-সবের অনেকগুলোই একান্ত স্থূল অমার্জিত ও সাহিত্যগুণবর্জিত, তবু সেই সব প্রহসন ও নকশা জাতীয় রচনা থেকে আমরা আমাদের ইতিহাসের একেবারে ভেতরকার উপাদানগুলো সংগ্রহ করে নিতে পারি। সে-রকম উপাদান বঙ্কিমচন্দ্রও রেখে গেছেন তাঁর একটি অত্যন্ত শিল্পসম্মত স্যাটায়ারধর্মী রচনায়। সে-রচনাটির নাম ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’। রচনাটি শুরু হয়েছে এভাবে—

‘মুচিরাম গুড় মহাশয় এই জগত্ পবিত্র করিবার জন্য, কোণ্ শকে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, ইতিহাস তাহা লেখে না। ইতিহাস এরূপ অনেক প্রকার বদমাইশি করিয়া থাকে। এদেশে ইতিহাসের সাক্ষাত্ পাওয়া যায় না, নচেত্ উচিত ব্যবস্থা করা যাইত।’

যে-বঙ্কিম সকল বাঙালিকে বাংলার ইতিহাস লেখার তাগিদ দিয়েছিলেন, সেই বঙ্কিমই ইতিহাসের ‘বদমাইশি’র ব্যাপারটিও সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। উপলব্ধি করে ইতিহাসের সেই বদমাইশি অপনোদনের উদ্যোগ নিজেই গ্রহণ করেন, এবং সে-লক্ষ্যেই বদমাইশ মুচিরাম গুড়ের জীবন ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত হন।

মুচিরাম গুড় চরিত্রটি অবশ্যই কল্পনাসৃষ্ট। তবে সে-কল্পনা উনিশ শতকের বাংলার ঔপনিবেশিক শাসন কর্তৃপক্ষের একেবারে ভেতর মহলের আকাড়া সত্য থেকেই উত্সারিত। উপনিবেশোত্তর কালেও মুচিরামদের বিলুপ্তি তো ঘটেইনি, বরং তাদের প্রতাপ এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক গভীরে শিকড় গেড়েছে। যে ভুঁইফোড় মূর্খ মুচিরাম ব্রিটিশের আদালতে দশ টাকা মাইনের মুহুরিগিরি করে প্রচুর ঘুষ খাওয়ার সুযোগে বড়লোক হয়ে গিয়েছিল, পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিল এবং রায় বাহাদুর খেতাবও অর্জন করেছিল, ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সেই মুচিরামের ‘আদর্শের অনুসারীরা’ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাটিকেই নিজেদের কব্জায় নিয়ে গেছে। ইতিহাসের খলনায়করাই এখন মূল নায়কদের ইতিহাসের বাইরে নির্বাসিত করেছে।

শুধু তাই নয়, এরা আসল ইতিহাসেরই উত্সাদনে লেগে গেছে। এরা বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়কেই বাংলাদেশের ইতিহাসের যাত্রাবিন্দু বলে প্রচার করছে। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের মূল মর্ম যে অসাম্প্রদায়িক লৌকিক চেতনা, সেই চেতনাকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দিয়ে এরা দেশটির ‘মুসলিম বাংলা’ পরিচয়কেই বড় করে তুলছে, ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে সব অধার্মিক আচরণকে আড়াল করে রাখতে চাইছে।

তবু এদের আসল চরিত্র ও সকল অপকর্ম জনগণের সামনে অনাবৃত হয়ে পড়ছেই। অনেক সময় এদের মুখপাত্রদেরও কেউ কেউ সরল স্বীকারোক্তি করে বসছেন। গত ২৩ নভেম্বর (২০০৫) একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির তো বলেই ফেললেন, ‘ব্যাংকের টাকা লুট করে অনেকেই শিল্পপতি হয়েছে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে গেছে। একটা অংশ দরিদ্র হয়েছে, অন্য অংশ লুটপাট চালিয়ে মন্ত্রী-এমপি হয়েছে।’ (প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর, ২০০৫)

এ-রকম অকপট সত্যকথনের জন্য প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে অনেক অনেক ধন্যবাদ। যাঁরা বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস লিখতে চাইবেন, এই প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে তাঁদের অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। কারণ তিনিই তো তাঁর সহকর্মীদের স্বরূপ সম্পর্কে সঠিক সাক্ষ্যদান করলেন!

বিগত শতকের আশির দশকে বাংলাদেশের লুটেরাদের সম্পর্কে একটি পুস্তিকায় বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছিলেন মতিউর রহমান। এরপর এদের লুটপাটের পরিধি আরো অনেক বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিনিয়ত সে-সব তথ্য উদ্ঘাটন করে যাচ্ছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডক্টর আবুল বারাকাত। লুটেরাদের সম্পর্কীয় ওই সব তথ্য অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব উপাদানকে বাদ দিয়ে বা উপেক্ষা করে লিখিত হবে যেসব ইতিহাস, সেগুলো হবে অনেক ‘বদমাইশি’র ধারক। ইতিহাসকে ‘বদমাইশি’মুক্ত করতে হলে ‘বদমাইশ’দের ইতিহাস লিখতেই হবে। ইতিহাসের খলনায়ক বা বদমাইশদের কথা স্পষ্ট করে তুলে না ধরলে ইতিহাসের মূল নায়কদের অবদানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

তাই বঙ্কিমচন্দ্র কাঙ্ক্ষিত ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ আমরা লিখবো বটে, কিন্তু ‘ইতিহাস অনেক প্রকার বদমাইশি করিয়া থাকে’—বঙ্কিমচন্দ্রের ওই বক্তব্যটিকেও ভুলে থাকবো না। বদমাইশদের ভূমিকা যথাযথভাবে চিত্রিত করেই ইতিহাসের বমদাইশি আমরা প্রতিহত করতে পারবো।