default-image

‘আপনি ঠিক বলছেন? তিনি মারা গেছেন?’

‘না, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে বয়সের হিসাবে তার এখন বেঁচে থাকার কথা নয়।’

পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং প্রথম আলোর কলামিস্ট এম বি নাকভি মাস কয়েক আগে প্রথম আলো অফিসে এলে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর লে. জেনারেল আজম খানের কোনো খবর জানেন কি-না অর্থাত্ তিনি বেঁচে আছেন কি-না। নাকভি প্রথমে সরাসরি বলেছিলেন, ‘আজম খান বেঁচে নেই।’ তখন তাকে দ্বিতীয় প্রশ্নটি করি।

জেনারেল আজম খানকে দেখেছিলাম এক দশকেরও বেশি আগে। তখনই তাকে অনেক বয়স্ক দেখেছি। তবু বেঁচে না থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে নাকভির কথা শুনে অবাক হওয়ার কারণ আজম খানের মৃত্যুর কোনো খবর কোথাও দেখিনি। পাকিস্তানের সব খবর এখানে না আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে ব্যক্তিটি এক সময় এ দেশের কেবল হর্তকর্তাই ছিলেন না, ছিলেন ভীষণভাবে জনপ্রিয় শাসক, তার মৃত্যু সত্যি হয়ে থাকলে সেটা এখানকার কোনো পত্রিকায় ‘খবর’ হবে না কেন?

পাকিস্তানে পরিচিত এমন কেউ নেই যার কাছ থেকে আজম খান সমের্ক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে ইন্টারনেট সার্চ করে আজকাল অনেক তথ্য খুব সহজেই পাওয়া যায়। সেই চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। জেনারেল আজম খান সমের্ক কোথাও কোনো তথ্য নেই। এর পর করাচির ডন পত্রিকার প্রখ্যাত কলামিস্ট আরদেশির কাওয়াসজির কাছে ই-মেইল করলাম। আশ্চর্য, দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেই জবাব এল। কাওয়াসজি লিখেছেন, ‘আজম খান বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন এবং অনেক ভালো কাজ করেছিলেন।’ ক্ষণিকের জন্য মনটা বিষাদে ভরে গেল।

১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সমর্ঙ্ক বিভাগ থেকে ছাত্র-শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ভারত ও পাকিস্তান সফর করেছিলাম। পাকিস্তানে অবস্থানকালে পাঞ্জাব প্রদেশের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী গোলাম হায়দার ওয়াইনি (পরে আততায়ীর গুলিতে নিহত) এক সন্ধ্যায় তার লাহোরের বাসভবনে আমাদের সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেন। সেখানেই আমার শিক্ষক ড. আকমল হোসেন এবং ড. সি আর আবরার জানালেন, পরদিন বিকেলে জেনারেল আজম খান তার বাসায় আমাদের যেতে বলেছেন। তারা আরো বললেন, আজম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন এবং খুব ভালো মানুষ ছিলেন, বাঙালিদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন।

পাকিস্তানি শাসকদের সমের্ক বরাবরই একটা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে এসেছি। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলের অথবা একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো শাসকের ক্ষেত্রে। এর একটি কারণ আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে সরাসরি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাছাড়া স্বাধীনতা পূর্বের কোনো পাকিস্তানি শাসক ভালো হতে পারে বা বাঙালিদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে, এটা ছিল আমাদের অনেকেরই ধারণার বাইরে। আমরা, ছাত্র-ছাত্রীরা, যারা ওই সফরে ছিলাম তাদের প্রায় কারোরই আজম খান সমের্ক কিছু জানা ছিল না। আমার শুধু এটুকু মনে পড়ছিল খুলনায় এ নামের একটি কমার্স কলেজ দেখেছি।

বিজ্ঞাপন

এই অজ্ঞানতা নিয়েই পরদিন জেনারেল আজম খানের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গেলাম। একতলা অনাড়ম্বর বাড়ি। আজম খান নিজেই বাড়ির গেটে আমাদের অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির কমঙ্াউন্ডে ঢোকার মুখে তিনি আমাদের দলের সব পুরুষ সদস্যকে একে একে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এটা তোমাদের বাড়ি, তোমরা এখানে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পার।’ ড্রয়িংরুমে পা দিয়ে চমকে উঠলাম। দেয়ালে টাঙানো ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কয়েকটি পেইন্টিং-যার রেখার টান, তুলির আঁঁচড় আমাদের অতি পরিচিত। সুদূর লাহোরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম দেখতে পাব, এ ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। শুধু জয়নুলের পেইন্টিং নয়, ড্রয়িংরুমে সাজানো শো-পিসগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশের হস্তশিল্প সামগ্রী। বিস্ময়ের পর বিস্ময়!

অনেকক্ষণ গল্প চলল। আজম খান তার গভর্নরশিপকালীন পূর্ব বাংলার স্মৃতিচারণ করলেন। জানালেন কীভাবে আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতার ব্যাপারেও দুঃখ প্রকাশ করলেন। বাংলাদেশ ও বাঙালিদের জন্য তার অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া।

সেদিন জেনারেল আজম খান আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছিলেন তার মধ্যে আন্তরিকতার আধিক্য ছিল নিঃসন্দেহে কিন্তু তাতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল বলে মনে হয়নি। তার সমের্ক আগে থেকে কিছু জানা না থাকলেও তিনি যে একজন ব্যতিক্রমী পাকিস্তানি শাসক ছিলেন, সেদিনের অভিজ্ঞতায় তা বুঝতে কষ্ট হয়নি।

কৌতূহলের জন্ম সেখান থেকেই। দেশে ফিরে শুরু করলাম আজম খান সমের্ক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা। কিন্তু ইতিহাসের নানা বই ঘেঁটেও আজম খান এবং তার গভর্নরশিপ সমের্ক বেশি কিছু জানা সম্ভব হলো না। এ দেশের ইতিহাস কতটা অসমঙ্ূর্ণ তখনই সেটা সঙ্ষ্ট হয়ে ধরা পড়েছিল। তারপরও বিভিন্নজনের কাছ থেকে এ সমের্ক তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ যেটুকু তথ্য পেয়েছি এবং ১৯৫৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গভবনে গভর্নরদের এডিসি মেজর এস জি জিলানির একটি গ্রন্থে যা কিছু বর্ণনা আছে তা থেকে আজম খানের একটি পরিচয় সঙ্ষ্ট হয়েছে-তিনি পূর্ব বাংলায় দু বছর গভর্নর থাকাকালে এ দেশ এবং এ দেশের মানুষকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলেন। কেউ হয়তো বলতে পারেন, তখন এর পেছনে তার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। কিন্তু এর পুরোটাই যদি রাজনৈতিক স্টান্টবাজি হতো তাহলে এত বছর পর বাংলাদেশ থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের একটি দলকে কাছে পাওয়ার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠতেন না। আর তিনি যে এ দেশকে সত্যিই ভালোবাসতেন তার প্রমাণও তো তার ড্রয়িংরুমেই পেয়েছি। তাই আজম খান সমের্ক জানা তথ্যটুকু তুলে ধরতে চাই আমাদের বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে।

১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার পর সারা পূর্ব বাংলা ফুঁসে উঠতে থাকে। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সামরিক শাসক আইয়ুব খান তখন একজন কঠোর সেনা কর্মকর্তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছিলেন। আজম খান জাতিতে পাঠান হলেও তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন কঠোর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যার প্রমাণ দিয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে লাহোরে সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে। এই আজম খানই প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সামনে পিস্তল উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘মির্জা, তোমাকে এই কাগজে (পদত্যাগপত্র) সই করতে হবে।’ তিনি আইয়ুব খানকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করেছিলেন।

সেই লে. জেনারেল আজম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হয়ে ১৯৬০ সালের ১৫ এপ্রিল প্রথমবারের মতো এ দেশে এলেন। কথিত আছে, নিয়োগ দেওয়ার সময় তাকে আইয়ুব খান বলেছিলেন, ‘আজম, তুমি যদি সেখানে না যাও তাহলে আমাকেই যেতে হবে।’

আজম খানের নিযুক্তিতে পূর্ব বাংলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। রাজনৈতিক মহল মনে করল আইয়ুব খান তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এ নিয়োগ দিয়েছেন। আর সাধারণ মানুষ এই ভেবে শঙ্কিত হলো যে, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন আরো শক্ত করার জন্যই তাকে গভর্নর করে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর আজম খান কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, জেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশতে থাকলেন। মানুষের সঙ্গে মেশার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিনি পূর্ব বাংলার প্রায় সব জেলা সফর করলেন এবং তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বের জাদুসের্শ মানুষের হূদয় জয় করে নিলেন। সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধার দিকেও তিনি যথেষ্ট দৃষ্টি দিলেন। চালু করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান সপ্তাহ’ পালনের রেওয়াজ। খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছাড়াও কৃষি ও শিল্প প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন। আজম খান এ দেশে বন্যা মোকাবিলায় স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।

১৯৬০ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দু দফা প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর আজম খান উপকূলীয় অঞ্চল পরিদর্শনে যান এবং অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রায় দেড় মাস ধরে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও পুনর্গঠন কাজ তদারকির জন্য অনবরত ওইসব এলাকা সফর করেন। বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেন। দুর্যোগের সময় গভর্নরের একনিষ্ঠ তত্পরতা দেখে জনগণ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে এবং সে বছর ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে তাকে এক বিরাট গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৯৬২ সালে ঢাকায় ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের সফর উপলক্ষে রাস্তা নির্মাণের সময় আজম খান শ্রমিকদের সঙ্গে বসে মাটির সানকিতে খিচুড়ি খেয়েছিলেন। পরদিন সংবাদপত্রে সে ছবি ছাপা হয়। এ ঘটনাটিও মানুষের মনে দীর্ঘ ছাপ ফেলেছিল।

যাহোক, অচিরেই কেন্দ্রে আইয়ুব খানের সঙ্গে আজম খানের মতবিরোধ দেখা দিল। শাসনতন্ত্র কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য আইয়ুব খান ১৯৬১ সালের ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর গভর্নরদের সম্মেলন ডাকলেন। কমিশনের প্রধান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনজুর কাদির আইয়ুব খানের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য পূর্ণ গণতন্ত্রের পরিবর্তে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সুপারিশ করলেন। রিপোর্ট পর্যালোচনা করে আজম খান বললেন, জনগণের ওপর আস্থা রাখা উচিত এবং জনগণের রায়কেই চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা উচিত। এতে আইয়ুব খান তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন।

এরপর থেকে আইয়ুব খান আর আজম খানের মধ্যে সন্দেহ ও মতবিরোধ বাড়তে থাকে। কেন্দ্রে কেউ কেউ অভিযোগ তোলেন, আজম খান পূর্ব পাকিস্তানে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের চেষ্টায় মত্ত। তখন থেকে পূর্ব বাংলার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তার কোনো প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হতো না। কখনো কখনো পূর্ব পাকিস্তান সমির্কত কোনো বিষয়ে তার মতামতই চাওয়া হতো না। পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি সৈয়দ হাশিম রেজাকে আজম খানের অগোচরেই বদলি করা হয়। তাকে না জানিয়েই ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে কেন্দ্র থেকে তার দায়দায়িত্ব আবার আজম খানের ওপরই চাপানো হয়।

মার্চের ৯ তারিখে আজম খান লাহোরে যান এবং দুদিন পর ফিরে আসেন। লাহোর থেকে আইয়ুব খানকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন : বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে কেন্দ্র ও আমার মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্যের সৃষ্টি হচ্ছে এবং কেন্দ্রের মতামত ও সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে আমি আমার পদের প্রতি সুবিচার করতে অক্ষম। কাজেই আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করুন।

৩১ মার্চ আইয়ুব খান ঢাকায় আসেন। তিনি নির্বাচন পর্যন্ত গভর্নরের দায়িত্ব পালনের জন্য আজম খানকে অনুরোধ করেন। কিন্তু আজম খান এ প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ৮ এপ্রিল পাকিস্তান অবজারভারে আজম খানের পদত্যাগের খবর ছাপা হয়। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলা জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৪ এপ্রিল আইয়ুব খানের পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর হিসেবে গোলাম ফারুককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আজম খান শেষ দিন পর্যন্ত আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন। তার উদ্দেশে বিভিন্ন জায়গায় বিদায় সংবর্ধনা সভা হতে থাকে। এসব সভায় সব শ্রেণীর মানুষ তাকে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানায়। চট্টগ্রামে এরকম এক সভায় মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ে। ঢাকা স্টেডিয়ামে বিশেষ বিদায় সংবর্ধনা সভায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়।

বিজ্ঞাপন

দু বছর গর্ভনর পদের দায়িত্ব শেষে ১৯৬২ সালের ১০ মে আজম খান যখন পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দেন তখন বিমানবন্দর পর্যন্ত পথের দু ধারে জনতা ভিড় করে তাকে বিদায় জানায়। সম্ভবত আর কোনো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক বাঙালির কাছ থেকে এমন ভালোবাসা পাননি।

আজম খান আবার ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৬৫ সালের নির্বাচনের সময়। নির্বাচনে তিনি আইয়ুব খানের প্রতিপক্ষ ফাতেমা জিন্নাহ্র পক্ষে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জায়গায় সভা করেন।

জেনারেল আজম খান এবং তার গভর্নরশিপের দিনগুলো আমাদের ইতিহাসেরই অংশ। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কজন জানে এসব কথা? এ সমের্ক আমাদের ইতিহাস গ্রন্থের পৃষ্ঠাগুলো শূন্য কেন? চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণের যে ইতিহাস তার মাঝে আমরা একজন অন্যরকম, একজন ভালো গভর্নর পেয়েছিলাম, সে সমের্ক আমরা জানব না কেন? পাকিস্তানে তিনি উপেক্ষিত হতে পারেন কিন্তু আমাদের ইতিহাসে কেন তার জায়গা থাকবে না? তার মৃত্যুর খবরটিও আমাদের কাছে এসে পৌঁছেনি! আমরা তার কোনো খবর রাখিনি। এ কি আমাদেরই দৈন্যতা নয়? ইতিহাস-বিস্মৃত জাতি হিসেবে আমাদের যে বদনাম আছে এও কি তারই একটি নজির?