default-image

তখন আমি ঘোড়ার গাড়ি চালাতাম। নিজের ঘোড়া ছিল। থাকতাম রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের নামাজ গ্রামে, আমার শ্বশুরবাড়িতে। নিজের বাড়ি ছিল রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামে। বাবা তারুন শেখ আগেই মারা গেছেন। পৈতৃক বাড়িতে আমার বিধবা মা ফাতেমা খাতুন থাকতেন।

১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা পুঠিয়ার বানেশ্বর আক্রমণ করে। ওই দিনই তারা চারঘাটে গণহত্যা চালায়। অনেক মানুষকে হত্যা করে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের নিচে পদ্মা নদীতে অনেক নৌকা যাত্রীসহ ওরা গুলি করে ভাসিয়ে দেয়। অনেক লোক মারা যায়। চারঘাটের ইউসুফপুরের বাড়িতে মা একা ছিলেন। মায়ের জন্য খুব মন খারাপ হলো। সেদিন বিকেলে স্ত্রী হাসিনা বেগমকে বললাম, আমি মাকে দেখে আসি। ঘোড়ার গাড়ি নিয়েই চারঘাটে এলাম, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমি ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা পেলাম না। একটাই রাস্তা খোলা ছিল, পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতে চলে যাওয়া। ইউসুফপুর ইপিআর ক্যাম্পের জওয়ানেরা সব ভারতে পার হয়ে যাচ্ছে। ১৪ এপ্রিল সকাল নয়টার দিকে ইপিআর সুবেদার লস্কর খাঁ ও আরও কয়েকজন ইপিআর জওয়ানের সঙ্গে এক নৌকায় করে পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতে চলে যাই। তিন-চার দিন পর সেখানে ক্যাপ্টেন রশিদ এলেন। তারপর এল সব ইপিআর ও আনসার সদস্যরা। ওখানে প্রশিক্ষণ নিয়েই চলে আসি দেশের ভেতর। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা এবং পাবনার আতাইকুলা পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় অপারেশন হচ্ছে তানোরের বাগধানী ও পাবনার আতাইকুলা অপারেশন।

বিজ্ঞাপন

দেশে ফিরে এসে দেখি, আমার পৈতৃক বাড়িঘর সব পাকিস্তানি সেনারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। পুঠিয়ার নামাজ গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে এলাম। সেখানে এসে দেখি, বউ-শাশুড়ি কেউ নেই। বাড়িঘর খোলা হাট হয়ে পড়ে আছে। লোকমুখে যা শুনলাম, তাতে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে এল। আমি মরে গেছি, এ কথা প্রচার করে গ্রামের শান্তি কমিটির সদস্য তাছু মণ্ডলের ভাতিজা সাদেম আমার স্ত্রীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে করেছে। ফিরে আসার খবর পেয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে সে পালিয়ে গেছে। খবর পেয়ে সঙ্গের তিনজন মুক্তিযোদ্ধা গিয়ে রাজাকারের ভাতিজা সাদেম আর আমার স্ত্রী হাসিনাকে ধরে নিয়ে এল। প্রস্তুতি নিলাম তাদের দুজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে মারব। খবর পেয়ে চারঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার দিলশাদ চৌধুরীসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা এলেন। সবাই মাফ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। ভাবলাম, আমার স্ত্রী তো অসহায়। তাকে বিয়ে বসতে বাধ্য করা হয়েছে। তার তো কোনো দোষ নেই। তার মুখের দিকে তাকিয়েই রাজাকারের ভাতিজাকেও মাফ করে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নামাজ গ্রাম ছেড়ে চলে আসি।

এর আট মাস পর আত্মীয়স্বজনের কথায় আবার বিয়ে করলাম। নিজের ঘরবাড়ি নেই। মানুষের বাড়িতেই থাকতে হয়। পুঠিয়ার খুঁটিপাড়া গ্রামের বেলাল নামের এক ব্যক্তির বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকি। বড় তিন ছেলে মুটেগিরি করে। ডালকলে কাজ করে। ছোট ছেলেটা মানসিক প্রতিবন্ধী। আমার কাছেই থাকে।

১৯৮৮ সালের ২২ ডিসেম্বর একখণ্ড খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য আবেদন করি।

গত বছর ২০ আগস্ট পুঠিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার ফিরোজ শাহ উপজেলার শিবপুর মৌজার ৪৪৮৯ দাগের ১০ শতাংশ জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চিঠি দেন। অবশেষে ঘুরতে ঘুরতে আমার নামে সরকার ১০ শতাংশ জমি নিবন্ধন করে দিয়েছে। সরকারকে ধন্যবাদ। আমি কাগজ-কলমে আমার স্বাধীন বাংলাদেশের ১০ শতাংশ জমির মালিক হয়েছি। কিন্তু জমির দখল আর পাচ্ছি না।

অনুলিখন: আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী

বিজ্ঞাপন