ডিসেম্বর ৪, শনিবার

default-image

কাল রাত পৌনে তিনটায় প্রথম বিমান আক্রমণ শুরু হলো। বাহিনীরই হোক কিংবা ভারতীয়ই হোক, ঢাকার বুকে বিমান আক্রমণ এত দিনে পৌঁছে গেল। লোকজনের মৃত্যু বা তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা শোনা গেল না। কিন্তু আতঙ্ক-উত্কণ্ঠায় লোকজন অস্থির। কত সর্বনাশের পর এ উত্কণ্ঠা আবার কত দিন ধরে চলবে, কে জানে। দিনের পর দিন জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে। মন-জীবন-দিন-ক্ষণ বিরস, বিবর্ণ, বিস্বাদ।

বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বর ৬, সোমবার

আজ ১১টায় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বাধীন গণতন্ত্রী বাংলাদেশ বলে স্বীকৃতি দান করলেন। বাংলার এক একমুঠো মাটি রক্তসিক্ত, শহীদের খণ্ড হূিপণ্ড। জানি না আজকের শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর এই স্বীকৃতির মর্যাদা বাংলার মানুষ সঠিকভাবে নিয়ে সত্যই গণতন্ত্রী এক মহান বাংলাদেশকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে রাখার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করবে কি না। সন্দেহ, শঙ্কা সবই আছে। আমার জাদুধনদের বুকের রক্তে রাঙা এই মাটি। বড় পবিত্র। আল্লাহ এর মর্যাদা রক্ষা করুন। বিমান আক্রমণ চলছে। পাকিস্তানি একটি বিমানও উড়তে দেখা গেল না।

ডিসেম্বর ১২, রোববার

রাত ১০টা

গতকাল বেলা তিনটা থেকে ঢাকায় কারফিউ দেওয়া হয়েছে, আজ পর্যন্ত চলছে। আজ তিন দিন তিন রাত শামীম বাড়িতে আর আসতে পারেনি। আজ রয়াল এয়ারফোর্স এসে ঢাকার বিদেশি দূতাবাসের কর্মচারী পরিবার ঢাকা থেকে নিয়ে গেল। প্লেন থেকে গোলাবর্ষণ, তথাকথিত ভারতীয় গোলাবর্ষণ হচ্ছে মাঝেমধ্যে। ঢাকার বাড়িঘর অধিকাংশ শূন্য। ভায়াবহ নীরবতা, আতঙ্ক, আশঙ্কায় মানুষ শ্বাসরোধকারী আবহাওয়ার মধ্যে দিন-রাত কাটাচ্ছে। আমার ভয় নেই, শঙ্কা নেই। আল্লাহ আছেন। চাটগাঁ বিচ্ছিন্ন, কোথাও থেকে কারোর কোনো খবর পাচ্ছি না। ফোনও মৃত।

বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বর ১৪, মঙ্গলবার

মুক্তিবাহিনী ঢাকার কাছে এসেছে। আজ তিন দিন থেকে ঢাকায় কারফিউ, হাটবাজার বন্ধ। আজ পানিও নেই। নিষ্প্রদীপ তো আছেই। আশা করছি, রাত যত গভীর হচ্ছে, ভোরের আলো ততই এগিয়ে আসছে। জয় হোক সর্বহারাদের। যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়েছে। শ্রীমতী গান্ধীর বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পর শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ। মায়ের দুধ খেয়েছিল। ও সুকন্যা। আজ আশায় গৌরবে বুক ভরে উঠছে। সব হারিয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনেক বড়। আল্লাহ যেন এ আশায় বাদ না সাধেন। ওগো অকরুণদাতা, অনেক দিয়েছ, অনেক নিয়েছ। বাংলাদেশের আজাদি দাও এবার।

ডিসেম্বর ১৫, বুধবার

আজ ছয় মাস হলো, আমার পাখিরা আমার কোলছাড়া। আল্লাহ নেগাহবানি করছেন। সর্ব দুঃখের দাহন নিয়ে আজও আল্লাহর কাছেই আবার মাথা নোয়াই। ফিরে আসুক বাংলার বুকে শান্তি। আসুক ফিরে মুজিব। আসুক যার যার বুকের ধনেরা আজও বেঁচে আছে, তারা মায়ের কোলে। আমার বাছারাও যেন ফিরে আসে। জোর দিতে ভারত যুদ্ধবিরতির আদেশ দিচ্ছে। বিকেল পাঁটটা থেকে আগামীকাল সকাল নয়টা পর্যন্ত সময় নির্ধারিত হয়েছে। সোভিয়েত থেকে জোর হুমকি চলছে, আল্লাহ যেন এবার রহমত করেন।

ডিসেম্বর ১৬, বৃহস্পতিবার

আজ ১২টায় বাংলাদেশ যুদ্ধবিরতির পর মুক্তিফৌজ ঢাকার পথে পথে এসে আবার সোচ্চার হলো ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণে। আল্লাহর কাছে শোকর। বুক ভেঙে যাচ্ছে। সুখ-দুঃখের অনুভূতি কমে গেছে যেন, তবুও এ কী শিহরণ! আল্লাহ, তোমার দানের অন্ত নেই! ইন্দিরা গান্ধী শতায়ু হোন। শতবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েও তাঁর ঋণ শোধ হবে না। জয়যুক্ত হোক সোভিয়েত রিপাবলিক। আমার বাবা আমার কাহহার আজ বেঁচে নেই। আজ ২৯ দিন হলো, সে শুয়ে আছে মাটির কোলে। আর আজ কী শোকাবহ ঘটনা! জয় মিছিল দেখতে গিয়ে হাতেম আলীর শালির মেয়ে জলির বড় বোন ডলি ১৮ নম্বর রাস্তায় গিয়ে মিলিটারির উন্মতার দরুন গুলিতে মারা গেল। আহা! মা বেঁচে আছে যে। এ যে কী করুণ দৃশ্য!

বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বর ১৭, শুক্রবার

আজ আমার বাবার মৃত্যুর এক মাস পূর্ণ হলো। বাবারে, বাবা! আর তুই ফিরে আসবি না। ফিরে এল আজ মুক্তিবাহিনীতে যারা বেঁচে আছে, বাবুল, শাহাদত, নাসিম, খোকন, আরও অনেকে। আল্লাহ বাঁচালেন সবাইকে—এও শোকর। আজ আবার তিনটায় বোরহান এসে নিয়ে গেল শহীদ মিনারে। নাগরিক সমিতিতে ভাষণ দিতে গেলাম। কী বললাম মনে নেই। দেখলাম, মেয়েরা, বোনেরা, মায়েরা, ভাইয়েরা অনেকে এসেছেন, অনেকে আজ আসেননি, অনেকে আর কোনো দিনই আসবেন না। তবু বাংলাদেশ স্বাধীন। বদর বাহিনীর চোরা মার, পশ্চিমা সেনাদের চোরা মার খেতে খেতে যে এখনো রক্তে বাংলাদেশ সিক্ত হচ্ছে, এর শেষ কবে হবে।

সূত্র: একাত্তরের ডায়েরী, ১৯৮৯