default-image

সে সময় ছিল এ অঞ্চলের বাঙালির এক আরম্ভেরই প্রস্তুতি। বাঙালি স্বরূপচেতনা তখন প্রখর থেকে প্রখরতর হয়ে উঠছে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বঞ্চনা ও শোষণ যত তীব্র হয়ে উঠছে, বাঙালি গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ততই অধিক জেগে উঠেছে। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়, ‘বাঙালি ঘরে ফিরছে।’ রাজনৈতিক আন্দোলন এই বাঙালির ঘরে ফেরায় এক পথ নির্মাণ করেছিল, সন্দেহ নেই। ছয় দফা, অব্যাহত ধারার বন্দী মুক্তি আন্দোলন, এগারো দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রখর করেছিল। আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনকে উপলক্ষ করে সামরিক শাসনের মধ্যে প্রথম নাগরিক প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের কিছুদিন পরে গঠিত হলো ছায়ানট।

এই সেই ছায়ানট, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নানা দিক থেকে খরপ্রবাহিনী করে মুক্তিযুদ্ধের পথ নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। আর কে না জানে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকে স্কন্ধে নিয়ে সাংস্কৃতিক যাত্রাপথ নবীন আবেগে ঋদ্ধ এবং নবীন পথ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গি ও প্রথাশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের বাঙালি ষাটের দশকে যে নবজাগরণের সূচনা করেছিল, তা সীমিত অর্থে রেনেসাঁর আলোক-উদ্ভূত। শুধু জাতীয় অর্থে জাগরণ নয়, বাঙালিত্বের সাধনা ও জাতিধর্মে সবার প্রতি সম্মান ও সব নাগরিকের অধিকারের মর্মকে বলীয়ান করেছিল।

বিজ্ঞাপন

আমরা তখন তারুণ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল, নবীন যুবা। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন আমাদের চেতনালোককে করে তুলেছিল শাণিত ও দীপ্ত। আইয়ুবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলনের অন্তর্নিহিত মর্মবাণীর সঙ্গে ছাত্রসমাজের সাংস্কৃতিক আন্দোলনও দীপিত করছিল বাঙালি সমাজকে। এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও অগ্রযাত্রাকে প্রাণবন্ত ও সজীব করে তুলেছিল। এই যাত্রাকে কোনোভাবেই শুধু সংস্কৃতিচর্চার আলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এ আন্দোলন ছিল মৃত্তিকালগ্ন, জনমানুষকে বৃহত্তর সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার অভিপ্রায়ে আরেক সংগ্রাম। এই সংগ্রামের মর্মবাণী ছিল বাঙালি হওয়ারও সাধনা। ষাটের এই সংগ্রামে ছায়ানট, বাফা, ক্রান্তি, খুলনার সন্দীপন গোষ্ঠী এবং সে সময়ের ছাত্র ইউনিয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ নবীন মাত্রা সংযোজন করেছিল। নতুন নতুন গান লেখা হচ্ছে; তখন কবিতায় সুরারোপ চলছে। আর একদা গীত বিস্মৃতপ্রায় সলিল চৌধুরীর গান উজ্জীবন সৃষ্টি করছে জনমানুষের। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পীড়নে নিহত আলতাফ মাহমুদ এই সব গানে দীক্ষিত করেন বহু বিদ্যার্থীকে। এ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম দেশের রাজনৈতিক সংগ্রামে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানিদের নির্বিচার গণহত্যা প্রায় এক কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু করেছিল। ভারতবর্ষের নানা জায়গায় গড়ে উঠেছিল এই মানুষদের জন্য শরণার্থীশিবির। এ সময় কলকাতার সল্টলেক ছিল দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। আজকের মতো তখন সল্টলেক সুরম্য ভবনের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া রানাঘাট, নৈহাটি, বনগাঁ, কল্যাণী ও কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও শরণার্থীশিবিরে স্থান করে নিয়েছিল লাখ লাখ শরণার্থী।

পাকিস্তানিদের নির্বিচার গণহত্যা এবং এই উদ্বাস্তু দেশত্যাগী মানুষদের সহায়তা, ওষুধ, আশ্রয় দেওয়ার জন্য ১৯৭১ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের অগ্রণী ও বিবেকতাড়িত লেখক ও শিল্পীরা গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতি’। তিনজন সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলেন। সভাপতি ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে পরলোকগমন করেন। সভাপতি হন শান্তি আন্দোলনের বামপন্থী নেতা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মনি বিশ্বাস। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি মণীন্দ্র রায়—এই তিনজন সম্পাদক হন। তাঁরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করতেন। সর্বদা তাঁরা ব্যাপৃত থাকতেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সহায়তা করার জন্য। সর্বাধিক পরিশ্রম করতেন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

তিনি বহুদিন আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে এই ভবনেই ১৪৪ লেনিন সরণিতে রাত্রিযাপন করতেন। বিখ্যাত পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও নিরাশ্রিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশের প্রতি কর্তব্যবোধ, অঙ্গীকার ও যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁরা বাংলাদেশের শিল্পীদের একটি গানের দল গড়ে তুললেন। জহির রায়হান, ওয়াহিদুল হক ও সন্‌জীদা খাতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেন এবং এই উদ্যোগে সঙ্গী হলেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশের যেসব শিল্পী সংগ্রাম, প্রতিবাদ ও ভালোবাসায় পরিবর্তনপ্রয়াসী এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, কলকাতা পৌঁছে তাঁরা আর শুধু উদ্বাস্তু হয়ে থাকলেন না। পশ্চিমবঙ্গ বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতির প্রণোদনা ও প্রযত্নে গানের দলে তাঁরা যুক্ত হলেন। তাঁদের শিল্পীসত্তা নতুন আলো পেয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

কলকাতার ১৪৪ লেনিন সরণিতে সহায়ক সমিতির অফিসে বাংলাদেশের আশ্রিত বুদ্ধিজীবী ও সংগীতশিল্পীরা যে মহাকর্ম পরিচালনা করেছিলেন, তা আজ ইতিহাসেরও অন্তর্গত হয়ে গেছে। শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে উদ্দীপিত ও বৃহত্তর যুদ্ধে প্রেরণা সঞ্চারের জন্য এই অফিসে গানের মহলা হতো। বাড়িটি ঐতিহ্যমণ্ডিত। এখানেই একদা ভারতবর্ষের বামপন্থী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা অনেক সভা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সঞ্জীবিত করার জন্য নির্দেশ গেছে এই ভবন থেকে। বহু সৃজনশীল মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়েছে এই ভবন। এই ভবন নিয়ে অনেকে স্মৃতিচারণা করেছেন। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও চিন্মোহন সেহানবীশ এই ভবন নিয়ে হৃদয়গ্রাহী ছবিও এঁকেছেন।

কলকাতার নানা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের শিল্পীরা সমবেত হতেন প্রগতি লেখক সংঘ ও গণনাট্য সংঘখ্যাত এই অফিসে। মুক্তিযুদ্ধকালে এ অফিস হয়ে উঠেছিল আরেক সংযোগেরও কেন্দ্র। আমরা নানা কাজে অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুশল জানার জন্য ছুটে যেতাম এই অফিসে। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদার সহায়তা বাংলাদেশের শিল্পীরা কোনো দিন ভোলেননি। এই পথচলার মধ্য দিয়ে দীপেন্দ্রনাথ অনেকের সুহৃদ হয়ে ওঠেন। বিশেষত ওয়াহিদুল হক ও সন্‌জীদা খাতুনের সঙ্গে তাঁর সখ্য এক উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক সাক্ষাৎকারে পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিল্পীসমাজ বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের জন্য যে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিলেন, সে সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ধর্মতলা স্ট্রিটের আপিসে যেতাম। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আগত লেখক-শিল্পীদের একত্র করে নানা রকম অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও তালিম দেওয়ার কাজ হতো। অনুষ্ঠান করে কেবল অর্থ সংগ্রহ করা নয়, মানুষকে এই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত করাও হতো। যাঁরা কলকাতায় এসেছিলেন, তাঁদের জন্য সাধ্যমতো থাকার ব্যবস্থাও আমরা করেছিলাম। অনেকেরই ছোটখাটো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আমরা করতে পেরেছিলাম। মোটকথা, বিপদের দিনে বিপন্ন মানুষের পাশে যেমন সম্পন্ন মানুষেরা এসে দাঁড়ায়,—আমরাও তেমনি যতটা পেরেছি, করেছি। সীমান্ত পেরিয়ে যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এপারে এসেছিলেন, তাঁদের যথাসাধ্য সাহায্য করাই ছিল আমাদের প্রধান নৈতিক কর্তব্য। বস্তুত লড়াইয়ের ময়দানে অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবিলা করার চেয়ে এই সাংস্কৃতিক জোট বাঁধাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার মূলে আমাদের এই সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল।’

এই বাড়িতে মহলা হতো। উদ্দেশ্য ছিল এই সব গান দিয়ে শরণার্থীশিবির, মুক্তিযোদ্ধা ও পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষকে প্রাণিত করা। বিশেষত মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে প্রত্যয়ে ও দেশচেতনায় উদ্দীপিত করাও অভিপ্রায় ছিল। এই সব মহলায় রবীন্দ্রনাথের গানের প্রাধান্য ছিল; নজরুল ইসলামের গানও। সঙ্গে সলিল চৌধুরীর গানও বাদ যায়নি। বরং মর্যাদার সঙ্গে ভিন্ন আবেগ নিয়ে সঙ্গী হয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। আবুবকর সিদ্দিক ও গুরুসদয় দত্ত রচিত গানও গাওয়া হতো উজ্জীবনী মন্ত্রে; সত্যেন সেন ও শহীদ সাবের লিখিত দুটি গানও লোকপ্রিয় হয়েছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত একটি কবিতার সুরারোপ ষাটের দশকের শেষ দিকে করেছিলেন সংগীতশিল্পী শেখ লুতফর রহমান। এই গান সে সময় যুক্ত হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা মহলা হতো। কলকাতা শহরের নানা অঞ্চল থেকে অনেকেই ছুটে আসতেন এই মহলায়।

গান শেখাতেন সন্‌জীদা খাতুন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর তখন মহাসংকট। তবু তিনি দেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের প্রধান সৈনিক হয়ে ওঠেন। দলে কী গাওয়া হবে, তা নির্বাচন করতেন তিনি এবং অনুজ শিল্পীদের রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন; সম্মিলিত গণসংগীতেও সাধ্যমতো তালিম দিতেন, গলাও মেলাতেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা নির্ভরতা পেয়েছিলেন সন্‌জীদার সাংস্কৃতিক রুচি ও অঙ্গীকারে। সে সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি একটি নিবন্ধে। তিনি বলেন, ‘১৪৪ লেনিন সরণির প্রায় ভেঙে পড়া দোতলা বাড়িতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হলো। রাজশাহীর সারওয়ার জাহান, রফিকুল আলম, মুক্তি মজুমদার; চট্টগ্রামের শীলা দাস, শর্মিলা দাস, কল্যাণী ঘোষ, প্রবাল ঘোষ, উমা ঘোষ; খুলনার দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপদ রায়; ময়মনসিংহের আলোকময় নাহা; সিলেটের রাখী চক্রবর্তী; ঢাকার ডালিয়া নওশিন, নায়লা জামান, সুকুমার বিশ্বাস—এই রকম অনেক মানুষ আমরা সেদিন মিলিত হলাম।

ঢাকার “ছায়ানটে” শেখ লুতফর রহমান যেসব সংগ্রামের গান শিখিয়েছেন,—খুলনার আবুবকর সিদ্দিকের লেখা সাধন সরকারের সুরের গান—এসব ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের, গুরুসদয় দত্তের, সলিল চৌধুরীর গান বাছাই করে নিয়ে মহড়া করার সিদ্ধান্ত হলো। সকাল ১০টা-১১টায় একত্র হয়ে গানের চর্চা হতো ঘণ্টা কয়েক। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সিদ্ধেশ্বর সেন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ সান্যাল, দেবেশ রায়, প্রসূন বসু, শঙ্খ ঘোষ, সন্তোষকুমার ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু জ্ঞানীগুণী ১৪৪ লেনিন সরণিতে আমাদের মহড়ার সময়ে এসেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। কিছুদিন মহড়া চলার পর ঢাকা থেকে মাহমুদুর রহমান বেণু, শাহীন মাহমুদ, ফ্লোরা আহমদসহ আরও কজন এসে যোগ দেন ওই আয়োজনে।’

এই আয়োজন শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ও উদ্বাস্তু শিবিরে গান পরিবেশনে সীমিত থাকেনি। কিছুদিন পর লিবারেশন কাউন্সিলের প্রতিনিধি জহির রায়হান ও ওয়াহিদুল হকের অনুমোদনক্রমে একটি সংঘ তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের শিল্পীরা। নাম রেখেছেন মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা। সন্‌জীদা খাতুন হন সভাপতি, মাহমুদুর রহমান বেণু সাধারণ সম্পাদক।

এই সংস্থা দুই দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল রবীন্দ্রসদনে। অনুষ্ঠানটি আমার জীবনে অম্লান হয়ে আছে। উদ্বাস্তু জীবনে মনোগ্রাহী ও পরিশীলিত সে অনুষ্ঠান হৃদয় ও মনে দাগ কেটেছিল খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনার জন্য নয় বা কিংবদন্তিতুল্য শিল্পীদের চোখে দেখেছিলাম সে অনুষ্ঠানে, সে জন্যও নয়; আমি ভুলতে পারিনি সন্‌জীদা খাতুনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে’ গানটির পরিবেশনা আর সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি। শুধু দেশাত্মচেতনা নয়, মুক্তিযুদ্ধের মহান শক্তিরও অনুপ্রেরণায় দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। সন্‌জীদা খাতুন যে গানটি গেয়েছিলেন, সেটি আজও গাওয়া হয়। কিন্তু সেদিন অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে সন্‌জীদার গানটির পরিবেশনা আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত ও চেতনাকে স্নাত করেছিল। যুদ্ধদিনে আনন্দের আবাহন—এ কেমন নির্বাচন সন্‌জীদার—এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন কলকাতার আমার এক সাংবাদিক বন্ধু। গানটির ব্যাপক অর্থ, প্রাণশক্তি ও বোধ সমগ্র অনুষ্ঠানেই ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে দেখেছি, ধীমান ভাবুক ও কবি বিষ্ণু দে এ খবর পেয়ে কীভাবে স্পন্দিত হয়েছিলেন। কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় এ প্রসঙ্গে লিখেছেন।

পরের দিন তিনি ও দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১১০ প্রিন্স গোলাম মোহাম্মদ রোডে বিষ্ণু দের বাড়ি গিয়েছিলেন সাক্ষাৎ করতে। তিনি বলছেন, তিনি আমাদের জন্য দরজা খুলে দিলেন, কিন্তু আমরা সবাই বসার আগেই নিজেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন সন্‌জীদা,—‘কাল সন্‌জীদা কী গান গেয়ে উদ্বোধন করলেন, আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে।’ বলে হাসিমুখে হাতটা ঘুরিয়ে দিয়ে আবার বললেন, ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে।’ আর আমার অন্তত সেই প্রথম মনে হলো, আগের দিন সন্ধ্যায় সন্‌জীদা খাতুনের গানের নির্বাচন ছিল কী অমোঘ! যখন যুদ্ধ চলছে, তখন ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে।’ বিষ্ণুবাবু অনুষ্ঠানে যাননি। তাঁর বাড়ির সবাই গিয়েছিলেন। তাঁদের কাছেই গানটার কথা শুনেছিলেন। তারপর আর ভুলতে পারেননি। সেদিন আমরা যতক্ষণ ছিলাম, প্রায়ই হাত ঘুরিয়ে বলছিলেন, ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে।’ কোথাও একটা কবিতা তৈরি হয়ে উঠছিল হয়তো। আর সুচিত্রা মিত্র সেদিনের অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে গাইতে তিনি কাঁদছিলেন। পরিবেশনের সময় বিষাদে কণ্ঠ যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে প্রত্যয়েও দীপ্ত। অনেক শ্রোতা সেদিন অশ্রুসংবরণ করতে পারেননি। সেই দৃশ্য আমি চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পাই। শরণার্থীজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকার সেই দুঃসময়ে হৃদয় ও মনে সজীব হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল সুচিত্রা মিত্রের গান। মনে পড়ে, ষাটের দশকের অন্তিমের দিনগুলোতে গানটি জাহেদুর রহীম ও সন্‌জীদা খাতুনের কণ্ঠে আমাদের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদে কীভাবে উদ্দীপনের বিভাব সৃষ্টি করেছিল।

বিজ্ঞাপন

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস—অনেকেই আগ্রহের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন।

দ্বিতীয় দিনে সম্মিলিত গানে বাংলাদেশের অনেক শিল্পীই অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটির নাম হয়েছিল রূপান্তরের গান। অনুষ্ঠানের চেতনা ধরে রেখে মনোগ্রাহী ও উপযোগী ধারাবিবরণী লিখেছিলেন শাহরিয়ার কবির। ধারাবিবরণীটি পাঠ করেছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। যদিও পরে জেনেছিলাম, এই অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট লেখার কথা ছিল জহির রায়হানের। তিনি স্টপ জেনোসাইড নিয়ে ব্যস্ত এবং অবরুদ্ধ দেশে তাঁর অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের অবস্থান নিয়ে চিন্তিত ও কিছুটা অস্থির ছিলেন বলে তাঁর পক্ষে এ স্ক্রিপ্ট লেখা সম্ভব হয়নি। মঞ্চস্থাপত্য ও আলোকসম্পাতে মুস্তাফা মনোয়ার যে এক অসামান্য শিল্পী, সে কথা আমরা সবাই জানি। আমরা অনেকেই তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি যে মঞ্চস্থাপত্যে কত নিরীক্ষাপ্রবণ, নিত্য বদলান মঞ্চস্থাপত্যশৈলী—এ আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি। এই দুই দিনের মঞ্চসজ্জায় তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কলকাতার নাগরিক সমাজ চমৎকৃত ও উদ্বুদ্ধ হয়েছিল তাঁর উদ্ভাবনী ভাবনায়। আলো ও মঞ্চস্থাপত্যে নতুন দেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল।

এই অনুষ্ঠানের আগে বা পরে গঠিত হলো মুক্তির গানের দলটি। যুক্ত হয়েছিলেন অনেক গায়ক ও শিল্পী। ট্রাকে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে। এক শরণার্থীশিবির থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শরণার্থীশিবিরে। মার্কিন আলোকচিত্রশিল্পী লেয়ার লেভিন মুক্তির গানের কয়েক হাজার ফুট ছবি তুলেছিলেন। সেই বিরল ফুটেজ থেকে নির্বাচিত অংশ নিয়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ যে বিরল চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আরেক দলিল হয়ে আছে। এ গানের দলে যুক্ত হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। দেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরা এক শরণার্থীশিবির থেকে আরেক শরণার্থীশিবিরে, মুক্তিযোদ্ধাদের এক ক্যাম্প থেকে প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে ও জনপদে সেই সব উজ্জীবনী গান পরিবেশন করে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনাকে তুলে ধরেছেন; রাত্রিযাপনের অনেক সময় কোনো ব্যবস্থা থাকত না, তবু দেশচেতনার প্রেরণায় নতুন দেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে দুঃসময়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন।

default-image

লোকগানও উপেক্ষিত হয়নি সে সময়ে। রাজশাহীর মোশাদ আলী উচ্চকণ্ঠে লোকগান গেয়ে দেশচেতনায় সঞ্চার করেছিলেন আরেক মাত্রা। মুক্তির গানের এই দলে বিপুল ভট্টাচার্য, নায়লা জামান, লতা চৌধুরী, লুবনা মরিয়ম, তপন বৈদ্য, স্বপন চৌধুরী, মিলিয়া গনি, তারেক আলী যে অবদান রেখেছিলেন, তা শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও মনে পড়ে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রিত বুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিল্পীদের জন্য স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্রবাসটি হয়ে ওঠেছিল বড় এক আশ্রয়স্থল। এই ছাত্রাবাসের সুপারেন্টেড ছিলেন কবি তরুণ সান্যাল। তাঁরই অনুরোধ ও উদ্যোগে কলেজ কর্তৃপক্ষ এই ছাত্রাবাসটি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল।

এ ছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আরেক বুদ্ধিজীবী সৈয়দ সাদাত আবুল মাসুদ যে উদার সহযোগিতা করেছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের, সে কথা ভুলবার নয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনেও বিশ্বের নানান দেশের প্রতিনিধিদের সামনে বাংলাদেশের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।

১৯৭১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে বাংলাদেশের ১৭ জন চিত্রকরের ৬৬টি ছবির প্রদর্শনী শহরের চিত্রানুরাগীদের মধ্যে খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জনসমাগম হতো বিপুল। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও খ্যাতনামা ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী। শীর্ষ কয়েকজন শিল্পী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য দপ্তরে নিয়োজিত থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণায় ব্যাপৃত ছিলেন। কয়েকজন চিত্রীর অঙ্কিত পোস্টার স্মরণীয়তার মূল্য পেয়েছে। অনেকেই চাকরি পাননি, তবে উদ্বাস্তু জীবনে রংতুলি ছাড়েননি। কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুন্ডু, প্রাণেশ মণ্ডল, নাসির বিশ্বাস, কাজী গিয়াসউদ্দিন, বীরেন সোম, রণজিৎ নিয়োগী, গোলাম মোহাম্মদ, স্বপন চৌধুরী, চন্দ্রশেখর দেসহ ১৭ জনের তেলরং, জলরং, কালি ও কলম এবং মিশ্রমাধ্যমের কাজ ছিল। এ প্রদর্শনীতে পাকিস্তানিদের বর্বরতা ও গণহত্যা উপজীব্য বিষয় হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্রম ও অসম সাহসও ফুটে উঠেছিল তাঁদের তুলিতে।

সেই দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে দেশের সংগীতশিল্পী ও চিত্রকরেরা অঙ্গীকার ও দেশচেতনার যে স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

আবুল হাসনাত কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক