default-image

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা এলে প্রথম যে বাক্যটি বলতে হয়, তা হলো, এ এক অনন্য ইতিহাস। বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীতে এমন ইতিহাস সম্ভবত একমাত্র এটিই। এই গৌরব সারা পৃথিবীতে কেবলই আমাদের।

নয় মাসের যে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের খেলোয়াড়েরাও তাতে অবদান রেখেছেন। ভারতে খেলতে গিয়ে আমরা দুই দেশের পতাকা উড়িয়েছি। সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত বেজেছে। সে এক অসাধারণ পথচলা। মরহুম আলী ইমামের কথা মনে পড়ছে, যিনি ছিলেন এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সে সময় প্রতাপশঙ্কর হাজরা, আশরাফ, প্যাটেলরা কলকাতা যান। তারপর গেলাম আমি। আকাশবাণীতে ঘোষণা শুনে উন্মুক্ত ট্রায়াল দিতে ৪০ জন ফুটবলার এল। সেখান থেকে টিকল ৩০ জন। ব্যস, জন্ম হয়ে গেল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের। তারপর তো ভারতে ঘুরে ঘুরে শুধুই ম্যাচ খেলা।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে আমরা ম্যাচ খেলেছিলাম ১৬টি। নয়টিতে আমাদের জয় আর চারটিতে পরাজয় হয়, তিনটি খেলায় হয় ড্র। কিন্তু এসব তো নিছক বোবা পরিসংখ্যান। এর পেছনে আছে কত স্মৃতি, কত ত্যাগ! খেয়ে না-খেয়ে, হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা একদল খেলোয়াড় দেশের জন্য লড়াই করছি। নদীয়ার কৃষ্ণনগরে প্রথম ম্যাচের দিন মাঠের দর্শকেরা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘জয় বাংলা এগিয়ে চলো, দেশ স্বাধীন করো।’ এই ধ্বনি আমাদের রক্তে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছে।

একটা স্মৃতি তো আজও জ্বলজ্বলে। মহারাষ্ট্রের অধিনায়ক হয়ে বিখ্যাত ক্রিকেটার পতৌদির নবাব মনসুর আলী খান মুম্বাইয়ে আমাদের বিপক্ষে খেলেছিলেন। একটা গোলও করেছিলেন। আমাদের দলের খেলোয়াড় কায়কোবাদ ম্যাচে তাঁকে চার্জ করল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভাই, তুমি আমাকে এভাবে মারছ কেন? আমি তো ক্রিকেট খেলোয়াড়।’ ওই ম্যাচের দিন আমাদের অনেক খেলোয়াড়ই রোজা রেখেছিল।

কী অপূর্ব অভিজ্ঞতা! ভারত সরকারের কল্যাণে বাস ও ট্রেনে আমরা টিকিট ছাড়াই চলাফেরা করতে পারতাম। ট্রেনে তো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্য আলাদা একটা কামরাই থাকত। আমরা সবাই মিলে যেন ছিলাম এক অভিযাত্রী।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনমত তৈরি করার পাশাপাশি আমরা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে পাঁচ লাখ টাকাও তুলে দিয়েছিলাম। এত কিছুর পেছনে একজন মানুষই প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলেন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশের জন্য যুদ্ধ করতে। আমরা সেটি করেছি ফুটবল দিয়ে।

৪২ বছরের পেছনে তাকিয়ে গৌরবে বুকটা ভরে উঠছে। একাত্তরে সেই সোনাঝরা ১৬ ডিসেম্বর আমরা দেশের মাটিতে পালন করতে পারিনি। আমাদের মূল ঠিকানা তখন কলকাতা। খেলোয়াড়েরা সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় বিজয়ের আনন্দ একসঙ্গে উদ্যাপন করা হয়নি। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ আমাদের কাছে সমান আনন্দ বয়ে নিয়ে এসেছিল।

আজ তো আমরা জীবন-সায়াহ্নে। একাত্তর আমাদের যৌবনের গল্প। আমাদের তো শুধু নয়, পুরো জাতির যৌবনের গল্প। বিশ্বের বুকে নিজেদের পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার অঙ্গীকার করে ফুটবল নিয়ে সেদিন আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই অবদানের কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

বিজ্ঞাপন