বিজ্ঞাপন
default-image

মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাড, যিনি বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত, ২৫ মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আসলে এটি ছিল পরিপূর্ণ গণহত্যা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত নয় মাস ধরেই তারা এই গণহত্যা চালিয়েছে।

পৃথিবীর বহু দেশে গণহত্যার নজির আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নাজিরা ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। আর্মেনিয়ায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়ায় গণহত্যা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক কিংবা জাতিগত উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো গণহত্যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়নি। একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যার সূচনাই করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী হত্যার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানিরা প্রথমেই আক্রমণের নিশানা করে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আবার ডিসেম্বরে যখন তারা দেখতে পেল পরাজয় অবধারিত, তখনো আরেক দফা মরণ কামড় হানে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের কথা বলে ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ সদলবলে ঢাকায় আসেন। একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতিও চলতে থাকে। ১৮ মার্চ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

১৬ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে।

১৭ মার্চ টিক্কা খান ঢাকার কমান্ডার খাদিম হুসেন রাজা ও বেসামরিকবিষয়ক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীকে ডেকে নিয়ে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে বলেন। ১৮ মার্চ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় অপারেশন সার্চলাইট।

সেদিন পাকিস্তানি সেনারা ট্যাংক বহর নিয়ে অটোমেটিক মেশিনগান, মর্টার ছুড়তে ছুড়তে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। প্রতিটি হলের প্রতিটি কক্ষে হানা দিয়ে তারা নির্বিচারে শিক্ষক, ছাত্রদের হত্যা করেছে। ২৫ মার্চ রাতে নিহত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ফাজিলুর রহমান, সৈয়দ আলী নকী, আবদুল মুক্তাদির, কে এম মুনিম, এ আর খান খাদিম, শারাফত আলী, মুনিরুজ্জামান প্রমুখ। অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও রাশিদুল হাসানের মতো যেসব শিক্ষক ওই দিন পাকিস্তানি বাহিনীর জিঘাংসা থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, ডিসেম্বরে আলবদর তাঁদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে।

পাকিস্তানিরা নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্য অপারেশন চালানোর আগে সব বিদেশি সাংবাদিককে দেশ থেকে বের করে দেয়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে গাড়িযোগে বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে করাচিগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু দুজন সাংবাদিক বাঙালি কর্মচারীদের সহযোগিতায় হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থাকেন, লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফ–এর সাইমন ড্রিং ও এপির ফটোসাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট। তাঁদের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী প্রথম ঢাকার গণহত্যার কথা জানতে পারেন।

default-image

২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খান যখন কলম্বোর আকাশে পিআইএর বিমানে হুইস্কিপানে মত্ত, তখন তাঁর সেনারা তাঁরই নির্দেশে ঢাকার ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালায়।

সাইমন ড্রিং লিখেছেন, পাকিস্তানি নেতারা জাতির অখণ্ডতা রক্ষার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকায় ট্যাংক বহর নামিয়ে। একমাত্র ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) ২০০ ছাত্রকে হত্যা করেছে তারা।....তাঁদের ভবন ও কক্ষগুলো মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় পুলিশ ও বাঙালি সেনাদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করার প্রেক্ষাপটে তাঁরা পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এই অভিযানের পর রাজনৈতিক প্রতিবাদকারীরা নিজেদের প্রতিরোধযুদ্ধে শামিল করেন, যার লক্ষ্য বাংলাদেশ নামে নতুন এক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়।

মার্কিন ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি উলপার্টের ভাষ্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ছাত্র হলগুলোতে পাঞ্জাবি-বেলুচ বাহিনীর অভিযানে মার্কিন এম-২৪ ট্যাংক ব্যবহার করা হয়েছিল। ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে ঘুমিয়ে থাকা ছাত্রদের ওপর ট্যাংক থেকে অন্তত পাঁচ মিনিট বিরতিহীনভাবে মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হয়। সেনারা শেল নিক্ষেপ করে ছাত্রাবাস দুটির দরজা-জানালা উড়িয়ে দেয় এবং গোলা ছোড়ার পরও যে ছাত্র, শিক্ষক ও কেয়ারটেকার বেঁচে ছিলেন, তাঁদের সবাইকে সেনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলে। এই হত্যাকাণ্ডের আগাগোড়া জুড়ে ছিল টিক্কা খানের বাহিনী।

জগন্নাথ হলে চলা হত্যাকাণ্ড শেষে মৃতদেহগুলো হলের মাঠেই মাটিচাপা দেয় নরপশুরা। ২৬ মার্চ সকালে সৈন্যরা ৫ জনকে ধরে নিয়ে আসে হলের ভেতরে। তাঁদের দিয়ে বিভিন্ন কক্ষ, হলের ছাদ, বারান্দা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকা লাশগুলো নিয়ে ট্রাকে তোলে। হলের মাঠের মাঝখানে আগে থেকেই একটি বিরাট গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছিল। লাশগুলো সেখানে নিয়ে যায় মাটিচাপা দেওয়ার জন্য। মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দেওয়া সম্পন্ন হলে সেই ৫ জনকেও ঠিক গর্তের পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি করে সৈন্যরা। সেই ৫ জনের মধ্যে একজন ছিলেন কালীরঞ্জন শীল, যিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। সৈন্যরা চলে গেলে মৃতের স্তূপ থেকে তিনি দৌড়ে পালাতে সক্ষম হন। এই হামলার প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে, যেদিন থেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়, সেদিন থেকেই। এমনকি ৭ মার্চ যেদিন মুজিব রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন, সেদিন একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পাকিস্তানিরা এটিকে আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করত। মুজিব তাদের সেই সুযোগ দেননি। এ কারণেই ২৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা সব সময়ই সত্য চেপে রাখতে তৎপর ছিলেন। তারপরও সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার গণকবরগুলো দেখছিলাম। ৫ থেকে ১৫ মিটার ব্যাসার্ধের তিনটি গর্ত দেখতে পেলাম। সেগুলো সদ্য তোলা মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে।...ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের চারপাশ দিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। দূর থেকে মনে হয়েছিল হামলার সময় দুটো ভবনই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।’

এ ছাড়া এই পাষণ্ড বাহিনী হামলা করেছে রোকেয়া হলেও। তাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মেয়েরা যখন পালাচ্ছিলেন, তখনো তাঁদের আটক করা হয়। এসবের কিছু বর্ণনা শহীদ আনোয়ার পাশার রাইফেল রুটি আওরাত বইয়ে আছে।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনা অভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন নিহত হয়েছেন, তার সঠিক হিসাব জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিলপত্র ঘেঁটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হিসাব বের করা গেছে। কিন্তু আন্দোলনের সেই তুঙ্গ মুহূর্তে বাইরের যাঁরা এসে ছাত্রাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের হিসাব কখনো পাওয়া যাবে না। হিসাব পাওয়া যাবে না বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে নিহত বস্তির বাসিন্দাদেরও।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি।