বিজ্ঞাপন
default-image

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর। ইতিহাসের এক যুগান্তকারী দিন। অধীর আগ্রহের বাঞ্ছিত অবসান। বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছে নয়াদিল্লি। প্রায় আট মাস আগে সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে যার প্রথম আবির্ভাব, আজ তার পূর্ণ অভিষেক সমাপ্ত। নবজাতকের মাথায় কল্যাণ বারি বর্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের ৫৫ কোটি নর-নারীর অন্তরের শুভেচ্ছা মিশন রয়েছে তার সঙ্গে। লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা করছিলেন ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত, তখন আনন্দমুখর হয়ে উঠেছিল পরিষদকক্ষ, দলমত নির্বিশেষে সবার কণ্ঠ গিয়েছিল মিশে। স্বাগত জানাচ্ছিলেন তাঁরা বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রটিকে। উচ্ছল হৃদয়ের এই সাদর অভিবাদন গোটা ভারতের তৃপ্ত বাসনার প্রতিধ্বনি। হয়তো চমক লেগেছে ইসলামাবাদের জঙ্গীশাহীর। সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ধ্বংস করার জন্য তাঁরা ছুড়েছিলেন কামানের গোলা। তাঁদের সেই নিক্ষিপ্ত গোলা থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন রাষ্ট্র। ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির সম্ভাবনায় সে প্রাণবন্ত। তাকে দাবিয়ে রাখতে পারে না দুনিয়ার কোনো স্বৈরাচারী শক্তি।

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা আপসে পায়নি, লড়াই করে ছিনিয়ে নিয়েছে। দিতে হয়েছে তাকে রক্ত মূল্য। যা সে পেয়েছে, তা রাখার জন্য দরকার আরও রক্তের। পুবের বাঙালি তার জন্য তৈরি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত। গত আট মাস ধরে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছে সে। সীমান্তের ওপার থেকে প্রতিদিন ভেসে আসত আর্তমানুষের বুকফাটা কান্না, ধর্ষিতা নারীর রক্ষার মিনতি এবং মায়ের কোল জড়িয়ে ধরা অসহায় শিশুর ভয়ার্ত চিৎকার। আবার পরক্ষণেই পাকিস্তানি পশুদের উন্মত্ত উল্লাসের মধ্যে মিলিয়ে যেত সব। সীমান্তের বাঁধ ভেঙে ঘাতকের খাঁড়া কেড়ে নিতে পারেনি ভারত। মানবতার চরম অপমান সে দেখেছে এবং ভেতরে ভেতরে জ্বলেছে। এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। তাঁদের চোখের জল মোছাতে ত্রুটি করেননি এ দেশের ৫০ কোটি নর-নারী। সাময়িক সান্ত্বনায় ভরেছে ওদের মন, কিন্তু প্রাণে আসেনি শান্তি। স্বদেশ যাদের শত্রুকবলিত, তারা কী করে পাথর চাপা দিতে পারেন জীবনের সব অনুভূতি? আহত সিংহের মতো গর্জে উঠেছিল বাঙালি। করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।

ইচ্ছা করে নয়াদিল্লি নেয়নি এই রক্ত পিছল বন্ধুর পথ। ইসলামাবাদের উন্মাদের দল তাদের ঠেলে দিয়েছে এ পথে। আজ ভারত ও স্বাধীন বাংলাদেশ সহযাত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের খুন মিশে যাচ্ছে ভারতীয় জওয়ানদের রক্তের সঙ্গে। ওদের সম্মিলিত আঘাত পড়ছে নরপশুদের ওপর। কিসের বন্ধনে বাধা পড়েছে অসম সাহসী ভারতীয় জওয়ান এবং দুর্বার মুক্তিসেনা। কোথায় পেয়েছে তারা উল্কার গতি? কেন একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে তাদের প্রাণের স্পন্দন? ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতন্ত্রী ভারত আদর্শের মূল্য দিতে জানে। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক বদ্ধ জলার মধ্যে বাংলাদেশ ফুটন্ত পদ্ম। তার সারা অঙ্গে রয়েছে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ছাপ। আদর্শের এই ঐক্য চেতনা ভারত এবং বাংলাদেশকে টেনে এনেছে কাছাকাছি। তাই নবীনের মাথায় প্রবীণ ঢেলেছে প্রথম অভিষেকের কল্যাণ বারি। তার হাতে পরিয়ে দিয়েছে সৌভ্রাতৃত্বের রাখি। আন্তর্জাতিক সমাজের পাদপ্রদীপের সামনে আসার আগেই নবজাতককে গলা টিপে মারতে চেয়েছিল কায়েমি স্বার্থবাদীর দল। দুই হাতে তাকে আড়াল করে রেখেছে ভারত।

ইয়াহিয়ার অস্ত্র পড়েছে তার পিঠে। ভ্রুক্ষেপ করেনি সে। জমির লোভ তার নেই। আদর্শের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে সে প্রস্ত্তত। বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে পশ্চিম পাকিস্তান। এটা অপ্রত্যাশিত নয়। একসঙ্গে থাকতে পারে না কল্যাণব্রতী এবং মানবদ্রোহী দুটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশে যারা গণহত্যার নায়ক, যারা লাখ লাখ নর-নারীকে ভিটেছাড়া করার নিপীড়ক যন্ত্র এবং যারা নারীর ইজ্জত অপহারক, তারা নিঃসন্দেহে সভ্য সমাজের অপাঙ্ক্তেয়। পূর্বের নবীন সূর্যকে অভিনন্দন জানাতে ভারত যখন ব্যস্ত, তখন অন্ধকারের জীবগুলো খঁুজে বেড়াচ্ছে বিবরাশ্রয়। রেহাই পাবে না ওরা। ভারতের সার্বভৌম মর্যাদার ওপর আঘাত হেনেছে বর্বরের দল। চরম শাস্তি তাদের পাওনা। কোথায় আজ পাকিস্তানি দোস্তদের শয়তানি চক্র? একসঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তারা করেছে উন্মত্ত নর্তন। ঠেকাতে পেরেছে কি স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতি? থামাতে পেরেছে কি তার জওয়ানদের প্রচণ্ড প্রত্যাঘাত? নির্বোধ ইয়াহিয়া ও নির্বোধ তাঁর পরিষদ দল। ওদের ধ্বংস অনিবার্য। বাংলাদেশ খঁুড়েছে অত্যাচারী স্বৈরতন্ত্রীর কবর। তাতে ইসলামাবাদের শব নামাবে ভারত। আর এই কবরে মাটি দেবে ভারত এবং বাংলাদেশের সাড়ে ৬২ কোটি নর-নারী। এ দুটি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের বুনিয়াদ পরস্পরের বুকের পাঁজরে গড়া এবং শহীদের তাজা রক্তে সিঞ্চিত। এ বন্ধন অক্ষয় এবং ভবিষ্যতের অপরূপ আলোকে ভাস্বর। স্বাগত সার্বভৌম বাংলাদেশ, স্বাগত তার রাহুমুক্ত জনতা এবং স্বাগত তার সরকার। জয় বাংলা।

৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১। কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় ভারতের বাংলাদেশকে দেওয়া স্বীকৃতির ওপর প্রকাশিত সম্পাদকীয়।

সূত্র: ২৬ মার্চ ২০১১ প্রথম আলোর "স্বাধীনতা দিবস" বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত