default-image

স্বাধীনতা দিবস—পঞ্জিকার একটা তারিখ। যথানিয়মে চলে আসে ঠিকই। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় বলে, সব স্বাধীনতা দিবস সমান আনন্দের দিন হয়ে আসেনি। স্বাধীনতা দিবসে যে-প্রশ্নটি অনিবার্যভাবেই মনে আসে তা হলো, আজকের এই স্বাধীনতা কি একাত্তরের স্বপ্নের স্বাধীনতা, না অন্য কিছু? আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে কত দিন, কতবার, কে বলবে? এই তো, বর্তমান জরুরি অবস্থার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাগ্রহণের আগের দিনও, স্বাধীনতা শব্দটি ছিল অনেক প্রশ্নবিদ্ধ। একটা জাতীয় নির্বাচনের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সে-নির্বাচন যে এক বিরাট প্রহসন হতে চলেছিল, খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেটা।

নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এই ব্যবস্থাটাও একটা নিয়মরক্ষার ব্যবস্থায় পরিণত হতে চলেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত সেটা হতে পারেনি। জরুরি অবস্থা যে চলছে এবং এটা যে দেশের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল, এ-থেকেই বুঝতে পারি আমরা দেশ পরিচালনার সঠিক ও আইনসম্মত পথ থেকে কত দূরে চলে গিয়েছিলাম।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশ পরিচালনার উপরিকাঠামো সঠিক অবস্থানেই ছিল, তবে সেটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পিকার, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা, কোথাও শূন্যতা ছিল না একটুও, অথচ দেশটি কক্ষচ্যুত হয়েছিল। দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। বস্তুনিষ্ঠ জরিপে ধরা পড়ছিল সেটা। অথচ সরকার সেটা অস্বীকার করে চলেছিল। সরকার যদি কোনো অপ্রিয় বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তখন তার প্রতিবিধান কী, কোথায়? তখন অপেক্ষা করতে হয় জনগণের রায়ের জন্য। সে রায় দেওয়ার সুযোগ পায় জনগণ একটি জাতীয় নির্বাচনে। যদি এমন হয় যে নির্বাচনকেও নষ্ট নির্বাচনে পরিণত করার ব্যবস্থা হয়েছে, তখন কোথায় যাবে জনগণ? অনিবার্যভাবেই তখন জনগণ ধরবে আন্দোলনের পথ। অর্থাত্ সংঘাত-সংঘর্ষের পথ। কখনো অবাধ, মসৃণ হয় না সে-পথ-চলা। পুলিশ তখন ব্যবহূত হয় সরকারের লাঠিয়াল হিসেবে। নিন্দা, ধিক্কার, যাই দিই পুলিশকে, পুলিশ তো সরকারের আজ্ঞাবহ। পুলিশের কাজ যখন যে-সরকার থাকবে, তখন তাকে সেবা দেবে। পুলিশের নিরপেক্ষতা তো সোনার পাথরবাটি।

নিছক আইনের দৃষ্টিতে যে বর্তমান জরুরি অবস্থাকে দেখা হচ্ছে না, তার কারণ একটাই। দেশকে এক সমূহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে এই জরুরি অবস্থা। এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে জরুরি অবস্থায়, এবং সন্দেহ নেই যে এর ফলে স্বাধীনতা দিবসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে না। কারণ এই জরুরি অবস্থা দেশের বিপন্ন স্বাধীনতাকে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই কাজ করছে।

দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার জন্য সচরাচর রাজনৈতিক দলগুলিকেই দায়ী করা হয়। এক সময়ে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ক্ষমতার হাতবদল সীমাবদ্ধ থাকবে। তৃতীয়, চতুর্থ দলের উপস্থিতি এই দ্বিদলীয় বাস্তবতাকে খুব বেশি ব্যাহত করবে না। পরিস্থিতিটা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের জন্য সহায়ক হবে, ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দুটি প্রধান দল একে অপরকে মেনে নিতে পারেনি। এবং অপরের ক্ষমতায় আসাকে দেশের জন্য সমূহ সর্বনাশ ভেবেছে। পরস্পরের প্রতি এই অবিশ্বাস থেকে এসেছে সংসদে অসহযোগ। সংসদ অকার্যকর হয়েছে। সংসদ অকার্যকর হলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না সংসদীয় গণতন্ত্রের।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি সমস্যা। সংসদীয় দায়িত্ব পালন, অন্য কথায়, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা কী, প্রার্থী মনোনয়নের সময় এই মৌলিক প্রশ্নটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়নি। নির্বাচন পরিণত হয়েছে লাগামহীন ব্যয়ের মহোত্সবে। এই ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন কোটি কোটি টাকা। যাদের টাকা আছে, সাদা হোক কালো হোক সে টাকা, সেই টাকার জোরেই পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন দেশের কোটিপতিরা। কোটিপতি হলেই বিদ্যা-বুদ্ধি-বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে যে-যোগ্যতা, সেটা আসে না। ফলে আমরা সংসদ বলতে কোটিপতির ক্লাব পেয়েছি, প্রকৃত অর্থে সংসদ পাইনি।

বিজ্ঞাপন

পুরো পরিস্থিতিটা সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের অনুকূল তো নয়ই, বরং পরিপন্থী। এ জন্যই জরুরি হয়ে পড়েছে আমাদের রাজনীতির ধারায় ব্যাপক পরিবর্তনের; প্রয়োজন হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মপর্যালোচনার। মনে হয়, জরুরি অবস্থা দলগুলিকে সে পথেই নিয়ে যাবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অস্বীকার করার ভ্রান্তনীতি পরিহার করবে প্রধান দুটি দল। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য দরজা উন্মুক্ত হবে। রাজনীতিকে নোংরামি ও কদর্যতা থেকে মুক্ত করে এক সমাজ পরিবর্তনের রাজপথে পরিণত করা হবে। আমরা সেই শুভ দিনের প্রত্যাশা নিয়ে উদযাপন করব এবারের স্বাধীনতা দিবস।