সময়টা ১৯৭১, লস অ্যাঞ্জেলেসে রাগা অ্যালবামের কাজ করছি। রবিশংকরের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। একটা কনসার্ট করতে চান তিনি। সাধারণত যেমনটা করেন, তার চেয়ে বড়, যাতে বাংলাদেশের অভুক্ত মানুষের জন্য অন্তত ২৫ হাজার ডলার তোলা যায়। আমি কোনোভাবে সাহাঘ্য করতে পারি কি না, জানতে চাইলেন। এই যেমন কনসার্ট শুরু করে দিয়ে গেলাম অথবা পিটার সেলার্সকে নিয়ে এলাম...যেকোনো ধরনের সাহাঘ্য।

তারপর তিনি পত্রিকা ও সাময়িকীর যুদ্ধ আর দারিদ্র্যসংক্রান্ত কাটিংস দেওয়া শুরু করলেন। বিষয়টা কী, আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলাম। আমার মনে হলো, কাজটার ব্যাপারে আমার বোধহয় তাঁকে সাহাঘ্য করা উচিত।

আর বিটল্সের দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে—যদি কিছু করো, তাহলে বড় করেই করো, আর মিলিয়ন ডলারই বা নয় কেন?

বিজ্ঞাপন
default-image

এভাবেই জড়িয়ে গেলাম। পরে যা ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবে, তিন মাস ধরে টেলিফোনে সেটাকে দাঁড় করালাম। কাজটা সম্ভব করার জন্য লোকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম। এরিকের (ক্ল্যাপটন) সঙ্গে কথা বললাম, আরও যাঁরা শেষ পর্যন্ত এতে কাজ করেছিলেন, সবার সঙ্গে কথা বললাম।

সামান্য মহড়াই আমরা করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, সবার উপস্থিতিতে একটা মহড়া আমরা করতে পারিনি। নানা অসুবিধার মধ্যে অগোছালোভাবে কাজটা করলাম আমরা।

অনুষ্ঠানের জন্য আমরা এমন একটা সময়সীমা ঠিক করে নিলাম, যার মধ্যে কাজটা আমাদের করতে হবে। একজন ভারতীয় জ্যোতিষী জানালেন, আগস্টের শুরুটা আমাদের জন্য শুভ। আগস্টের মোক্ষম দিনটাও পেয়ে গেলাম। তখন ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনও ছিল ফাঁকা, আমরা সেটা ভাড়া করলাম। তারপর কনসার্টটা আমরা করলাম। দুটো অনুষ্ঠান করেছিলাম। প্রথম অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় কনসার্ট করেছিলাম। কপালই বলতে হবে, সবকিছুই ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হয়েছিল। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে শোনাও গিয়েছিল চমৎকার।

সাউন্ড মিক্সের জন্য ব্যান্ডের প্রোডাকশনের ব্যক্তিদেরই পেয়েছিলাম আমরা। লাইটিংয়ের জন্য ছিল চিপ মংক। আর ঘটনাটাকে চলচ্চিত্রায়িত করেছিল অ্যালেন ক্লাইনের লোকজন। ছবিটা ভালোভাবে করা যায়নি। বড় বড় সাদা লাইটের নিচে প্রথম কনসার্টের পর গরমে আমাদের প্রায় সেদ্ধ হওয়ার দশা। মঞ্চে কোনো স্টেজ লাইট ছিল না। ব্যাপার কী জানতে চাইলাম চিপের কাছে। সে জানাল, ফিল্মের লোকজন তাকে শুধু সাদা আলো জ্বালিয়ে রাখতে বলেছে। তাদেরই একজন বলেছে, ‘না না, চলচ্চিত্রায়ণের জন্য আমাদের স্টেজ লাইটের দরকার নেই।’ মনে মনে সে ভেবেছিল, ‘আমাদের জিনিস তো পেয়েই গেছি, দ্বিতীয় শোতে তারা রঙিন আলো ব্যবহার করুক।’ আমার বিবেচনায় দ্বিতীয় শো-টাই সেরা।

বিজ্ঞাপন

লাইটিং ছিল খুবই ভালো, কিন্তু চলচ্চিত্রায়ণ ঠিকমতো হলো না। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ঠিক পেছনের একটি ক্যামেরার ফিল্মের পুরোটাই কালো, মাঝখানে শুধু আলোর একটা বিন্দু, তাতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দালানের ডান দিকে মাঝ বরাবর রাখা আরেকটি ক্যামেরা পুরো সময়েই ছিল আউট অব ফোকাস, ক্যামেরাটিতে ত্রুটি ছিল। দালানের বাঁ দিকে মাঝপথে আরেকটি ক্যামেরা ছিল, এটার সামনে আবার পুরো সময়টায় ঝুলছিল বড় বড় তার। ফলে মঞ্চের ঠিক সামনে রাখা ক্যামেরা আর শব্দ ধারণে অক্ষম হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরাই ছিল আমাদের ভরসা। আপনারা যে ছবিটা দেখেন, সেটা অনেক কসরতের ফল। যেমন ধরুন, ছবিতে আমার প্রথম গান ‘ওয়াহ ওয়াহ’তে ১২টা কাট আছে, ১২টা জোড়া। তার মধ্যে ১২টা আসল, নয়টা নকল। নানা জায়গার আলাদা আলাদা শট জুড়তে বাধ্য হয়েছিলাম আমরা। কিছু অংশ আবার ব্লো-আপ (বর্ধিত) করতে হয়েছে। ফলে সেই জায়গাগুলোর ছবি খুব দানাদার। আরও অনেক ব্যাপার আছে, নেতিবাচক ব্যাপার।

কিন্তু শিল্পীরা সবাই ছিল খুব সদয়। আমি তাদের এই নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে কারও যদি রেকর্ড বা ফিল্ম পছন্দ না হয়, তাহলে তারা এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে। আমি চাইনি, এসব কিছুর জন্য আমাদের বন্ধুত্বের অবসান হোক। এটা একটা বিরাট দায়িত্ব, কিন্তু সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছিল।

কিন্তু ক্লাইনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। সে কাজটা ঠিকমতো গুছিয়ে করেনি। কনসার্টের আগে না গিয়ে সে ইউনিসেফের কাছে গিয়েছিল পরে। তারপর মার্কিন কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করে আমাদের আইনজীবীরা। ওরা এখনো বলে, ‘আমরা ভেবেছিলাম, তোমরা হয়তো নিজেদের লাভের জন্য এটা করেছ।’ বছরের পর বছর টাকাটা আটকে রাখা হয়।

যা হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ঘটনাবলির ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা যখন কনসার্টের প্রস্ত্ততি নিচ্ছি, মার্কিনরা তখন পাকিস্তানকে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সংবাদপত্রে শুধু কয়েক লাইন, ‘ও হ্যাঁ, এখনো এটা চলছে।’ আমরা ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম। এখনো বাঙালি রেস্তোরাঁয় এমন সব ওয়েটারের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যারা বলে, ‘ওহ মিস্টার হ্যারিসন, আমরা যখন জঙ্গলে লড়াই করছিলাম, তখন বাইরে কেউ আমাদের কথা ভাবছে, এটা জানাটাও আমাদের জন্য ছিল অনেক কিছু।’

সত্যি, এর একটা ভালো প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বাঙালির জন্য এটা একটা নৈতিক উদ্দীপনা জুগিয়েছিল আর কিছু পাকিস্তানি হিটলারকে শনাক্ত করতে তাদের ওপর আলোকপাত করেছিল।

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

জর্জ হ্যারিসনের I. Me. Mine গ্রন্থ থেকে

পৃষ্ঠা ৫৯-৬১।