default-image

প্রেসিডেন্ট নিক্সন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম পি রজার্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অন্য সদস্যদের প্রতি মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের আহ্বান

পাকিস্তানে চলমান গৃহযুদ্ধ ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সম্ভাবনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। গত মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেছে। এই জনগণ কিছুদিন আগে নিরঙ্কুশভাবে একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন জানিয়েছিল, যারা পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। নব্বই লাখ বাঙালি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। শরণার্থীদের এই প্রবাহ চলছেই, দিনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই খাতায় নাম লেখাচ্ছে। এতে ভারত সরকারের ওপর এক অসম্ভব চাপ পড়েছে, এই মানুষগুলোকে খাওয়ানো, পরানো ও নতুন নতুন শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ভারত সরকার ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার পরও ভারত সরকার ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে। পশ্চিম পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সেখানে এখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, এতে শুধু ভারত বা পাকিস্তানই নয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সামরিক মিত্র, আমরা সেখানে সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করার নীতি গ্রহণ করেছি। আমরা পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সাহায্যও পাঠাচ্ছি। ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, আমরা সেখানে সামরিক সাহায্য পাঠিয়ে চলেছি। এই নীতির সমর্থনে আবার যুক্তি হচ্ছে যে এভাবে আমরা পাকিস্তানকে প্রভাবিত করে সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারি। কিন্তু বাস্তবে এতে ভারত সরকার ও বাংলাদেশের জনগণকে দূরে ঠেলা হচ্ছে, আবার পাকিস্তানকেও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম থেকে টেনে এনে রাজনৈতিক সমঝোতার টেবিলে বসানো যাচ্ছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি রাষ্ট্রকে সমর্থন দিচ্ছে, যারা একটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলকে ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার অর্থাত্ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেখানকার নিরস্ত্র জনগণের ওপর চলছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। মার্কিন নীতিকে কঠোরতম জাতীয় স্বার্থের যূপকাষ্ঠেও ন্যায়সংগত করে তোলা যাবে না। নিজ দেশের অধিকাংশ মানুষের বিরুদ্ধে যে সামরিক কর্তৃত্ববাদী সরকার পাশবিক ও তিক্ত সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, তাকে সমর্থন দেওয়া একটি মৌলিক ভুল, যে যুদ্ধে তারা আবার জয়ী হতে পারবে না। ন্যায়পরায়ণতা, জাতীয় স্বার্থ ও মানবিক বিবেচনার প্রয়োগে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে, নীতির মৌলিক বাঁক পরিবর্তনে আরও সহিষ্ণু হতে হবে।

মার্কিন সরকারের কাছে আমরা আবেদন করছি:

পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করবে না। যেসব সাহায্য চলছে, তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে পাকিস্তানের ঋণ পরিশোধের কিস্তি মওকুফ করা হবে না।

পাকিস্তানে যেসব সাহায্য পাঠানোর কথা ছিল, সেগুলো ভারতে অবস্থানরত পূর্ব বাংলার শরণার্থীদের জন্য পাঠানো হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের নিজ ঘরে ফিরতে পারে। আর শরণার্থীদের ভরণপোষণের জন্য ভারতে উল্লেখযোগ্য হারে সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হোক।

মার্কিন সরকারের তরফ থেকে পূর্ব বাংলার জনগণকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া হোক।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হোক, ১৯৬৫ সালের মতো সে ক্ষেত্রে ভারতকে সহযোগিতা বন্ধ করা হবে না।

মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান ও তুরস্ক যদি পূর্ব বাংলার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকারকে তাগাদা দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সে উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক স্বার্থ ও নৈতিক অবস্থানের বিচারে থেকে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের প্রতি আমাদের সহযোগিতার মনোভাব ত্যাগ করা উচিত। বাঙালিদের দাবির প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন ও ভারত সরকারকে এই শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের আরও সহযোগিতা করা দরকার। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া আমরা শুরু করেছি। পরিস্থিতির দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে আমাদের দক্ষিণ এশীয় নীতি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে, যেখানে এখন এক শান্তিসংহারি মূর্তিমান আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমাদের তাই ভেবে দেখতে হবে।

১২ নভেম্বর ১৯৭১

বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, ত্রয়োদশ খণ্ড