দেশ ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যথেষ্ট আলোচিত হচ্ছে। সমসাময়িক সময়ে ১৯৭১ সালে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের পরিমাপ ও ধরন এতই ভয়াবহ যে প্রায় চার যুগ পরে তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হতেই সবার দৃষ্টি পড়েছে ট্রাইব্যুনালের দিকে। ট্রাইব্যুনাল প্রমাণ করল, বিচার ও বিচারের দাবি কখনো তামাদি হয় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩, পূর্ণাঙ্গ একটি আইন হওয়ার পরও প্রশ্ন থাকছে, অজস্র অপরাধের মধ্যে কোন ঘটনা ট্রাইব্যুনাল কোন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে। ভিকটিমদের এ ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকার আছে জানার এবং সে জন্যই বিচার-প্রক্রিয়াটাকে স্বচ্ছ করেছে আইন। তার পরও কিছু বিশেষ ঘটনার উত্তর জানতে অনেকে উদ্গ্রীব। একটি প্রশ্ন এখানে উল্লেখযোগ্য, ১৯৭১ সালে নয় মাস ধরে বেছে বেছে তালিকা করে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড, যার লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্টভাবে বাঙালি লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ইত্যাদির নিধন, সেসব কি জেনোসাইড বলে বিবেচিত হবে, নাকি অন্য কোনো অপরাধের মধ্যে পড়বে?

default-image
বিজ্ঞাপন

১৯৭৩ সালের আইন (ধারা ৩) এবং ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (ধারা ২) মতে, জেনোসাইডের লক্ষ্য হতে হবে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি (জেনোসাইড সনদে উল্লেখ্য আটটি) গ্রুপের সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক নিধন। এই গ্রুপগুলো হচ্ছে জাতীয় ( National), জাতিগত ( Ethnic), বর্ণ ( Racial), ধর্মীয় ( Religious) ও রাজনৈতিক ( Political)। ট্রাইব্যুনাল এই গ্রুপ ভিত্তিতেই বিচার করবে। অন্য কোনো পেশার সদস্যদের হত্যা জেনোসাইড হিসেবে বিবেচিত হবে না। তবে, পেশা না হলেও জাতীয় ও জাতিগত ভিত্তিতে, অর্থাৎ বাঙালি হওয়ার কারণে নিধন, জেনোসাইড বলে বিবেচিত হবে। ১৯৭১ সালে হিন্দুদের নিধন নিশ্চিতভাবেই জেনোসাইড। কারণ, কেবল ধর্মীয় কারণেই তাদের হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে এসব হত্যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলেও বিবেচনা করা যায়। ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীদের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হবে ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য, ভিকটিমদের গ্রুপভিত্তিক পরিচয়, সাক্ষী, আলামত, কাগজাদি, অন্যান্য তথ্য ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ করা, যার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ করা যাবে যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল এবং সেই অপরাধে তদন্তাধীন সন্দেহভাজনদের ভূমিকা কী ছিল। অপরাধের সহযোগীরাও এই আইনের আওতায় আসবে। জেনোসাইড ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট উপাত্ত রয়েছে।

বিচারের মান:

ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে চিন্তার আর শেষ নেই। বিচার নাকি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। কেন, তার পরিষ্কার উত্তর নেই। বাংলাদেশে রাত-দিন বিচার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানের কথা তো শোনা যায় না এসব বিচারের ক্ষেত্রে। এর অর্থ কী, আন্তর্জাতিক অপরাধের অপরাধীরা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী এবং তাদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে হবে? আন্তর্জাতিক আইনে কোথাও আন্তর্জাতিক অপরাধের সন্দেহভাজনদের বিশেষ কোনো আইনি অধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। দেশীয় আইনে যে বিচার হচ্ছে, দেশের মধ্যে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের, সে জন্য দেশীয় আইনই যথেষ্ট, মান দেশীয় হলেই চলবে, কেবল বিচারটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত হলেই হলো। সংশোধনীসহ ১৯৭৩ সালের আইন সেটাই নিশ্চিত করেছে।

বাস্তবে ট্রাইব্যুনালের অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশীয় বিচারের চেয়ে অনেক উঁচু মান ভোগ করছে। বাংলাদেশে, কোনো অপরাধের বিচারের জন্য দুজন হাইকোর্টের এবং অন্য একজন জ্যেষ্ঠ জেলা বিচারকের সম-আদালতে হয় না, যা এই ট্রাইব্যুনালে হচ্ছে। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে সরাসরি সর্বোচ্চ আদালতে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। ফলে বাংলাদেশের আইনে বর্তমান ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান দেশীয় মানের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।

বিজ্ঞাপন

করণীয়:

দেশের ভেতর এবং বিশেষ করে বিদেশে, অন্য অপরাধসহ বাংলাদেশের জেনোসাইডকে খাটো বা অস্বীকার করার জোটবদ্ধ প্রচেষ্টা চলছে, যা ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের পর থেকে বেশি জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন রকম ভ্রান্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এসবের জন্য ১৯৭১ সালের অপরাধের দেশীয় স্বীকৃতির অভাব একটা বড় কারণ। পৃথিবীর বিভিন্ন পার্লামেন্টে বাংলাদেশ জেনোসাইডের স্বীকৃতির বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের সংসদই যখন জেনোসাইডসহ অন্য সব অপরাধের স্বীকৃতি দেয়নি, তখন অস্বীকার করা সহজ হয়। সে জন্যই বাংলাদেশ সংসদের উচিত হবে, দ্রুত জেনোসাইডসহ ১৯৭১-এ সব অপরাধের স্বীকৃতি দিয়ে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া, অথবা সংবিধানে এসব অপরাধ সংঘটনের উল্লেখ করে স্বীকৃতি দেওয়া।

১৯ মার্চ ২০১১, বেলজিয়াম