default-image

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সময়কালের ডিক্লাসিফায়েড ডকুমেন্টসের (জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া গোপন দলিলপত্র) মধ্যে যেগুলো ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্ঙ্ক বিষয়ক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত, সেসব দলিলের ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি সংকলন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থগুলো হলো এফ. এস. আয়াজউদ্দিন সমঙ্াদিত দ্য হোয়াইট হাউজ অ্যান্ড পাকিস্তান, রোয়েদাদ খান সমঙ্াদিত অ্যামেরিকান পেপার্স এবং এনায়েতুর রহিম সমঙ্াদিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড দ্য নিক্সন হোয়াইট হাউজ ১৯৭১।

এসব সংকলন-গ্রন্থেও অনেক দলিলপত্র সংকলিত হয়নি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র সরকার নানা কারণে সর্ঙ্শকাতর সেসব দলিলের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। যেমন, ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের মধ্যে যে বৈঠক হয়েছিল, তার দলিলপত্র আজও প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়াও ১৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহের কোনো দলিল এখনো পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। এসব দলিল প্রকাশ পেলে একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধকে নতুন তথ্যের আলোয় দেখা যেত তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও অনেক অজানা তথ্যের সংযোজন সম্ভব হতো। তারপরও এসব ডিক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট থেকে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো মুক্তিযুদ্ধ সমের্ক আমাদের অনেক ধারণায় নতুন মাত্রা যুক্ত করছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ স্বার্থে পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখার চেষ্টা করেছে। সেটা আরো সঙ্ষ্টভাবে বোঝা যায় এসব দলিলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও অন্যান্য তত্পরতার বিবরণ দেখে। পাকিস্তান যাতে ভেঙে না যায় সেজন্য তারা মুজিবনগর সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছিল। ভারতকেও চাপের মুখে রেখেছিল। জাতিসংঘে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে এসে তারা পাকিস্তানের ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়ন একাধিকবার ভেটো প্রয়োগ করে সেই চেষ্টা প্রতিরোধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব তত্পরতা সত্ত্বেও তাজউদ্দিন আহমদসহ মুজিবনগর সরকারের কিছু কিছু নেতা তত্কালীন স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে পরিস্থিতিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগাতে সমর্থ হন। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক তত্পরতায় ব্যর্থ হয়ে যে শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তি প্রয়োগের চিন্তাও করেছিল তা বোঝা যায় বঙ্গপোসাগর অভিমুখে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাঠানো দেখে, যা মালাক্কা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে যায়।

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে ড. কিসিঞ্জারের দাপ্তরিক বিবরণ

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

প্রেরক : হেনরি এ. কিসিঞ্জার

বিষয় : পাকিস্তান পরিস্থিতি

পাকিস্তান অচিরেই একটি অভ্যন্তরীণ সংকটের সম্মুখীন হতে পারে এবং সে সম্ভাবনা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের স্বার্থের ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আমি কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি এবং আপনার কাছে পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে চাই।

পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে অনমনীয় আলাপ-আলোচনা থেকে গোলযোগ সৃষ্টির যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা প্রায় শুরু হয়ে গেছে। আপনি তো জানেন, প্রধান ইস্যুটি হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার সমর্ঙ্ক।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান নেতা জুলফিকার ভুট্টো নতুন সংবিধান প্রশ্নে এখন পর্যন্ত একটি অনানুষ্ঠানিক মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার সামরিক সরকারকে বেসামরিক রাজনীতিকদের কাছে হস্তান্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি পাকিস্তানের ভাঙনের পৌরহিত্য করতে চান না।

এখন গণপরিষদের অধিবেশন বসার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ৩ মার্চ। এরপর ১২০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে গণপরিষদকে একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। তবে মুজিবুর রহমান, ভুট্টো ও ইয়াহিয়া-এদের প্রত্যেকের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সংবিধান যে প্রণয়ন করা যাবে যাবে না এমন সম্ভাবনাই বাড়ছে বলে মনে হয়। মুজিবুর রহমান এখন কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য তার দাবিতে অটল থাকার পরিকল্পনা করছেন। যদি তার এ দাবি মেনে নেওয়া না হয়-সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি-তাহলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিকল্পনা করছেন। তার পক্ষ থেকে এটা আলাপ-আলোচনার একটি চাল হতে পারে। কিন্তু জোরালো ও ক্রমবর্ধমান প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদ মুজিবুর রহমানের জন্য নমনীয় হওয়ার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে এবং তার সর্বোচ্চ দাবির পেছনে তার সাংগঠনিক শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করছে। তার উদ্দেশ্যের আরো প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরা তার সামঙ্রতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তার দাবি পূরণ না হলে এবং তিনি একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটি গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে, যা এড়ানোর উদ্দেশ্যে শান্তিস্থাপনকারীর ভূমিকা পালনের জন্য তিনি কূটনীতিকদের কাছে ওই দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের ব্যাপকভাবে অনিশ্চিত অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আমাদেরকে খুবই সরু দড়ির ওপর হাঁটতে বাধ্য করেছে। আমরা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণকারী অনুঘটক নই। কিন্তু প্রধান রাজনৈতিক নেতারা আমাদের প্রভাব ও সমর্থন চান। আমাদের নিশ্চয়ই কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ আছে, এবং প্রধান রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সমর্থন চান। আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ আছে, এবং ভবিষ্যতে এসব স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই সন্ধিক্ষণে আমাদের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো : আমরা পাকিস্তানের ঐক্য সমর্থন করি। এটা বিনা কারণে নয়। কতিপয় পাকিস্তানি রাজনীতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে ষড়যন্ত্র করছে, এবং আমরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সুসঙ্ষ্ট অবস্থান নিয়েছি। এভাবে ঢাকায় আমাদের কনসাল জেনারেল একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত খুঁজে বের করার জন্য মুজিবুর রহমানকে অনুরোধ করেন এবং রহমান যদি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান না রাখার ব্যাপারে মনঃস্থির করেন সেক্ষেত্রে মার্কিন হস্তক্ষেপ করার বিষয়টি প্রকারান্তরে তিনি এড়িয়ে গেছেন। (কাগজের মার্জিনে নিক্সন লিখেছেন : ভালো)

তবে আমরা অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণার সম্মুখীন হতে পারি। যদিও বিচ্ছিন্ন হওয়ার বর্তমান হুমকিতে আলাপ-আলোচনার অনেক উপাদান রয়েছে, তারপরও আমরা ওই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারি। কখনো যদি আমাদের একটি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সমর্ঙ্ক রক্ষা করতে হয় তাহলে সে সময়ের প্রয়োজনের কথা ভেবে মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে আমাদের আরো নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা উচিত কি-না সে প্রশ্নটি উঠবে, যিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। (কাগজের মার্জিনে নিক্সন লিখেছেন : এখনো নয়-সঠিক তবে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া যাবে না, যা বিচ্ছিন্ন হতে উত্সাহিত করবে।) একটি বাস্তববাদী মূল্যায়ন থেকে এ স্বীকৃতিই প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তানের ঐক্য কাঠামোর খুব সামান্য উপাদানই অবশিষ্ট আছে। এটা আমাদের অবস্থান সমন্বয় করার পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরে। তবে এর বিপরীতে এটিও সত্য যে, পাকিস্তানের বিভক্তি মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবে না।

default-image

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে, এটা অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হয়। এ অবস্থায় সবচেয়ে ভালোভাবে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে আমরা একত্রে আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন করব। দক্ষিণ এশিয়া নীতির ব্যাপারে একটি বৃহত্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আমি সে রকম একটি বিশেষ পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছি যাতে প্রয়োজনের সময় আমাদের হাতে কিছু থাকে।

(সূত্র : এফ. এস. আয়াজউদ্দিন সমঙ্াদিত হোয়াইট হাউজ অ্যান্ড পাকিস্তান)

গোপন টেলিগ্রাম

২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

প্রেরক : কনসাল জেনারেল, ঢাকা

প্রাপক : মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ইসলামাবাদ

বিষয় : আওয়ামী লীগের আশঙ্কা

১. ২৪ ফেব্রুয়ারি আলমগীর রহমান নিজ উদ্যোগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। অসংলগ্ন কথাবার্তার মাধ্যমে তিনি বেশ কিছু বিষয় নিয়ে তার আশঙ্কা, বিভ্রান্তি ও ভাবনার কথা তুলে ধরেন, যা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাল্টা-চাপের সম্মুখীন মুজিব ও তার দলের বিশেষ মনোভাব বলেই মনে হয়।

২. আলমগীর বলেন, রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রত্যাশিত আসন্ন বৈঠকের ব্যাপারে মুজিব উচ্চ আশা পোষণ করছেন। আওয়ামী লীগ মনে করে, পাকিস্তানকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে উত্সাহিত করার জন্য যুক্তরাষ্টের বেশ কিছু ভূমিকা ছিল। কাজেই সেখানে পরীক্ষামূলক গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড দেখার জন্য তাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আলমগীর বলেন, মুজিব তাকে বলেছেন যে, ভুট্টো ও তার মধ্যে একটি কার্যকর সাংবিধানিক আপোস-মীমাংসার প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রদূত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে রাজি হতে পারেন, এ ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। জবাবে আমি বলি, আমি মনে করি রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সম্ভাবনা খুবই কম, যা কি-না ইয়াহিয়ার পালন করার কথা।

৩. আলমগীর মত পোষণ করেন, মুজিব ছয় দফার প্রধান অংশের ব্যাপারে আপোস-মীমাংসায় কেবল তখনই রাজি হতে পারেন, যদি তিনি ক্ষতিপূরণমূলক এ ব্যাপারে কিছু ছাড় আদায় করতে পারেন, এমনকি তা একটি কৌশল হলেও, যা তিনি ছয় দফা থেকে বেরিয়ে আসার ন্যায্যতা প্রতিপাদনের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। এ ব্যাপারে আলমগীর ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের সম্ভাবনার বিষয়টি বাজিয়ে দেন এবং পরিষ্কার করে দেন যে এটা তার নিজের ধারণা। আমি তাকে বলি, আমি মনে করি এ ধারণা সফল হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই।

৪. আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মাঝে গতকাল এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান দু মাসের জন্য বিলম্ব করার ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ এখনো আশঙ্কা করছে, ইয়াহিয়া ৩ মার্চের নির্ধারিত তারিখ নিয়ে অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের অনুপস্থিতি এবং সংবিধান প্রশ্নে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অধিবেশন কয়েক মাসের জন্য স্থগিত রাখার উদ্দেশ্যে দ্রুত মত পরিবর্তন করবেন। আলমগীর বলেন, বিচ্ছিন্নতার জন্য আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান চাপ থাকার কারণে এ ধরনের কালক্ষেপণ মুজিবের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে।

৫. আলমগীর বলেন, মুজিব ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তাত্পর্যপূর্ণ সৈন্য বিন্যাস সমির্কত খবরাখবর পরীক্ষা করে দেখতে বলেছিলো। এর জবাবে তিনি মুজিবকে জানান যে, তিনি এ ধরনের কোনো প্রমাণ পাননি। বিমানবন্দরের চারপাশে এবং পার্শ্তবর্তী অন্যান্য জায়গায় বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে প্রাথমিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক-জনগণকে বোঝনো যে, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার আবহ বিরাজ করছে।

৬. আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি মুজিব নতুন সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের সঙ্গে কথাবার্তায় খুবই সতর্ক ছিলেন, ছয় দফা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প, সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করা বাঙালিদের ভীষণভাবে হতাশ করবে-এসব বিষয়ের ওপর তিনি আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেন।

৭. মুজিব আলমগীরকে বলেছেন, তিনি এই গুজবে অনেকটাই বিরক্ত যে সমঙ্রতি তিনি (মুজিব) জেনারেল ওয়েস্টমোরল্যান্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং খুঁজে বের করেছেন এ গুজবের উত্স চীনারা।

বিজ্ঞাপন

৮. মন্তব্য : ৩ মার্চের সংকট নিকটবর্তী হওয়ায় মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উত্সাহ ও আত্মবিশ্বাসে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে মনে হয়। ৩ মার্চের আগে জাতীয় পরিষদের সদস্যদের পদত্যাগের বিষয়টি অনুমোদনের জন্য এলএফও সংশোধন এবং মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেওয়া সংক্রান্ত ইয়াহিয়ার সামঙ্রতিক পদক্ষেপ আওয়ামী লীগ দলীয়দের সঙ্ষ্টতই হতবুদ্ধি ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মুজিব এখন জানতে পেরেছেন যে, ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র অর্জনের সুযোগ খুব সামান্যই আছে। অন্যদিকে, যদি তিনি ছয় দফা পরিত্যাগ করেন, তাহলে দলে তার কর্তৃত্ব মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। যদিও আমাদের এ বিশ্বাস আছে যে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতা, কিন্তু আমরা এ কথা মনে করি না যে, মুজিব এ মুহূর্তে তার নিজ স্বার্থে বিচ্ছিন্নতা চাচ্ছেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে কিছুটা মরিয়া হয়েই তিনি তা চাইতে পারেন। তিনি ও তার দল বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। আলমগীরের কথা বিশ্বাস করলে, এমনকি গান্ধীর মতো অহিংস আন্দোলন শুরু করাও এসব উপায়ের মধ্যে রয়েছে, যদি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

(সূত্র : এনায়েতুর রহিম সমঙ্াদিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড দ্য নিক্সন হোয়াইট হাউজ ১৯৭১)

গোপন টেলিগ্রাম

২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

প্রেরক : কনসাল জেনারেল, ঢাকা

প্রাপক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ওয়াশিংটন ডিসি

বিষয় : মুজিবের আরো একটি প্রতিক্রিয়া

১. টাইম লাইফ পত্রিকার বৈরুত ভিত্তিক সংবাদদাতা ড্যান কগিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আগের দিন বিকেলে তিনি মুজেবের সঙ্গে কয়েক ঘন্টা কথা বলেছেন। কগিন আমাকে বলেন, ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র মেনে নেওয়ার জন্য ইয়াহিয়ার ওপর প্রভাব খাটানো অথবা দুই প্রদেশের জন্য দুটি সংবিধানের ব্যাপারে ইয়াহিয়া ও সামরিক বাহিনীকে রাজি করাতে সাফল্য লাভে ব্যর্থতার বিষয়ে মুজিব তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব জানার চেষ্টা করতে বলেছেন। কগিন বলেন, এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে তার কী কথা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুজিব তাকে তা জানাতে বলেছেন।

২. আলমগীর রহমানের সঙ্গে পূর্ববর্তী রিপোর্ট আমার কথপোকথনের মতো করেই আমি কগিনকে বলি যে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। সংবিধান প্রণয়নে আমাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সম্ভাবনাও আমি বাতিল করে দিয়েছি। আমরা মনে করি ইয়াহিয়া ইতিমধ্যেই সে ভূমিকা পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমি আরো বলি, পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভাব্য স্বাধীনতার আন্দোলন মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারকে পরামর্শদানের মতো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিজেদের জড়ানো আমাদের জন্য ঠিক হবে না।

৩. কগিন বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা ঠেকাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রলম্বিত গেরিলা-সদৃশ সংগ্রাম হলে এর পরিণামে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখলের বিপদ সমের্কও মুজিব তাকে অনেক কথা বলেছেন।

৪. কগিন মুজিবের ২৪ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনের বিবৃতির (ঢাকা ৫০২) যে ব্যাখ্যা দেন, মুজিবের সঙ্গে তার পরবর্তী কথপোকথনেও যার সমর্থন মেলে, তা ছিল ছয় দফা প্রশ্নে মুজিব কোনো আপোসে অনিচ্ছুক।

৫. কগিনের বক্তব্য অনুযায়ী মুজিব দৈনিক ইত্তেফাকের সমঙ্াদক মইনুল হোসেনকেও ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিষয়ে ‘আমেরিকানদের’ মনোভাব জানার চেষ্টা করতে বলেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কিছু জানাননি।

৬. মন্তব্য : মুজিবের কিছুটা অস্বাভাবিক কূটনৈতিক কৌশল (আগে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের প্রত্যাশা সত্ত্বেও কগিনের কাছে নিজ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা) থেকে ধারণা হয়, সংবিধান প্রণয়ন প্রশ্নে অব্যাহত অচলাবস্থার পরিণতির ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা একটু যেন শঙ্কিত।

(সূত্র : এনায়েতুর রহিম সমঙ্াদিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড দ্য নিক্সন হোয়াইট হাউজ ১৯৭১)

গোপন টেলিগ্রাম

২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১

প্রেরক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ওয়াশিংটন

প্রাপক : মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ইসলামাবাদ

বিষয় : পাকিস্তানের ঐক্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

১. ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় আপনি যেমনটা উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের একটি ‘সর্ঙ্শকাতর মুহূর্তে’ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে তা হলো আগামী সপ্তাহে গণপরিষদে আওয়ামী লীগের আচরণ সমের্ক অনিশ্চয়তা, আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মুজিবের আগ্রহের গুরুত্ব, কিছু পশ্চিম পাকিস্তানির মাঝে দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহ যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানের বিভক্তিকে সমর্থন করছে। এক অর্থে আপনি সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকবেন। পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি অব্যাহতভাবে আমাদের সমর্থন দিয়ে যাওয়ার নীতি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করা প্রয়োজন, যত দিন সে বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যদি স্বাধীনতার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন, তাহলে যাতে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যেতে দেখা যায় সেজন্য পর্যাপ্ত নমনীয়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা কনসাল জেনারেলের ঢাকা সমের্ক সর্বশেষ মূল্যায়ন লক্ষ্য করব যা হলো, মুজিব এ মুহূর্তে তার নিজ স্বার্থে বিচ্ছিন্নতার কথা ভাবছেন না, ‘শেষ চেষ্টা হিসেবে কিছুটা মরিয়া হয়েই তিনি তা চাইতে পারেন’ (রেফ. সি), সংবাদ সম্মেলনে মুজিব প্রদত্ত বিবৃতি ঢাকা ৫০২ এ ধারণাকেই সমর্থন করে।

২. এসব বিবেচনায় আপনাকে ঐক্যের নীতি বজায় রাখারই পরামর্শ দিচ্ছি। আমরা আমাদের এ স্বীকৃতির প্রতিও সমান গুরুত্ব দেই যে, সরকার গঠনসহ ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা করার বিষয়টি পাকিস্তানিদের নিজেদের ব্যাপার। আমি বিশ্বাস করি, আপনার ভূমিকা পাকিস্তানের ভবিষ্যতের ব্যাপারে বাঙালিদের মনে উদ্বেগের সঞ্চার করবে না (অনুচ্ছেদ ৩, রেফ. বি)।

৩. ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকের অল্প কিছুদিন পর মুজিবের সঙ্গে আপনার এ বৈঠক হতে যাচ্ছে। আমি এ বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি, মুজিবের মনে যাতে ধারণা না জন্মে যে, আমরা ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে কাজ করছি কিংবা কোনো ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে আগ্রহী, যদিও মুজিব এর বিপরীতটিই আশা করেন। পীরজাদার মিশনের (ইসলামাবাদ ১৫৯৯) অত্যাবশ্যকীয় উল্লেখ ছাড়া যদি এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, আমি মনে করি তখন আপনার উচিত মুজিবকে অনুসরণ করা, তাতে আমরা বুঝব ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে এবং, আমাদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের জন্য পাকিস্তানি যোগাযোগের সূত্রগুলো যথাযথ।

(সূত্র : এনায়েতুর রহিম সমঙ্াদিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড দ্য নিক্সন হোয়াইট হাউজ ১৯৭১)

default-image

মার্চের ঘটনাপ্রবাহ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

হোয়াইট হাউজ ইয়ার্স এটা সঙ্ষ্ট করে দেয় যে, চীনের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ছিল নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মনে পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ সমের্ক প্রতিক্রিয়া সঞ্চার হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এমনিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ এলাকাটির কোনো কৌশলগত গুরুত্ব ছিল না। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে নিক্সন যখন লাহোর সফর করছিলেন, তখন তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে চীনের সঙ্গে একটি মার্কিন আলোচনার প্রস্তাবের ধারণা তুলে ধরেন। পরে তিনি চীনের কাছে বিভিন্ন অনুসন্ধানমূলক বার্তা প্রেরণের জন্য পাকিস্তান ও রুমানিয়াকে একটি গোপন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।...৬ মার্চ চীনের ব্যাপারে হোয়াইট হাউজের সর্ঙ্শকাতরতার কথা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সিনিয়র রিভিউ গ্রুপের (এসআরজি) সদস্যদের কাছে তুলে ধরা হয়। এটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ আগের ঘটনা। কিসিঞ্জার এসআরজি’র বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে যোগ দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সিআইএ’র সিনিয়র প্রতিনিধিরা। তারা দুই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পূর্ব পাকিস্তানি নেতা মুজিবুর রহমানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মুখে যুক্তরাষ্ট্রের কী করা উচিত তার পর্যালোচনা করেন। দক্ষিণ এশিয়া সংক্রান্ত প্রথম এসআরজি বৈঠকে রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যালেক্সিস জনসন এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, এ সংকট বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার কোনো ইস্যু নয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বিরোধের কোনো বিষয় নয়; সোভিয়েত, ভারতীয় ও আমেরিকান-সকলেই মনে করে একটি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান ধরে রাখার মাধ্যমেই তাদের স্বার্থ রক্ষা পাবে।

জনসন তার প্রস্তাবে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে মুজিব ও আওয়ামী লীগের অনুসারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে নিরুত্সাহিত করতে চেষ্টা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ‘বিশেষ সমের্কর’ কথা মনে রাখার ব্যাপারে এসআরজি সদস্যদের কিসিঞ্জার সতর্ক করে দেওয়ার পর জনসন এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করেননি। ইয়াহিয়ার সঙ্গে এ সমের্কর কথা বৈঠকে যোগদানকারীদের বিস্মিত ও হতবুদ্ধি করে দেয়। কিসিঞ্জার বলেন, প্রেসিডেন্ট এ কথা ভাবতে নারাজ যে, পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়া দমনপীড়ন চালাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, যদি ইয়াহিয়ার কাছে এ প্রস্তাব তুলে ধরার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তারপরও পাকিস্তানিরা তার ‘পরোয়া করবে না’। এই সতর্কতামূলক মন্তব্য এবং বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আরো আলোচনার পর এসআরজি সদস্যরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, ‘ব্যাপকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকাই’ হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সর্বোত্তম নীতি।

(সূত্র : আবুল মাল আবদুল মুহিত সমঙ্াদিত ডকুমেন্ট অন ইউএস পলিসি অ্যান্ড ইট্স ক্রিটিক)

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে ড. কিসিঞ্জারের লিখিত দাপ্তরিক বিবরণ

২৬ মার্চ, ১৯৭১

প্রেরক : হেনরি এ. কিসিঞ্জার

বিষয় : পাকিস্তান পরিস্থিতি

পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করার জন্য সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। আমাদের দূতাবাস মনে করে, তাত্ক্ষণিকভাবে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর নিয়ন্ত্রণের শক্তি সম্ভবত সামরিক বাহিনীর আছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার শক্তি তাদের নেই। এর ফলে আমাদের জন্য এ মুহূর্তে দুুটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে : (১) সরকারি ও বেসরকারি মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, এবং (২) শান্তি স্থাপনের উদ্যোগে যদি কোনো মার্কিন ভূমিকা থেকে থাকে। আজ বিকেল ৩ টায় আমি ওয়াশিংটন সেঙ্শাল অ্যাকশন গ্রুপের (ডব্লিউএসএজি) বৈঠক ডেকেছি এবং বৈঠকের পর এ বিষয়ে সুপারিশমালা পাঠাব।

মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা

এ মুহূর্তে ৮৫০ জনের মতো আমেরিকান পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছে, এদের মধ্যে সরকারি মার্কিন কর্মকর্তা ও তাদের পোষ্যর সংখ্যা ২৫০। এসব লোককে তাত্ক্ষণিকভাবে অপসারণের কোনো পরিকল্পনা রাষ্ট্রের নেই, কারণ রাস্তায় বেরুলে তাদের বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। বিমানবন্দরের পরিস্থিতি সমের্ক এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে আমাদের কনস্যুলেট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছেন এবং বর্তমান সংকটের শুরুতে যে অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে তা পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশের জন্যই পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে মার্কিন নাগরিকদের অপসারণের উদ্দেশে সামরিক বিমান আনা হতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন বা অন্য কোনো দেশের নাগরিকের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

শান্তি স্থাপনে মার্কিন ভূমিকা

পূর্ব পাকিস্তান সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ (এসআরজি) তা পর্যালোচনা করেছে। এসব পরিকল্পনায় রক্তপাত বন্ধের আবেদনসহ ব্রিটেন ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইয়াহিয়ার দ্বারস্থ হওয়ার মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা থেকে শুরু করে তত্ত্বগতভাবে সম্ভাব্য বেশ কিছু বিকল্প ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ স্থগিতকরণসহ নিষেধাজ্ঞার হুমকি ব্যবহারও এসব পরিকল্পনায় রয়েছে।

প্রকৃত ইস্যুটি হলো আমরা এর সঙ্গে নিজেদের জড়াবো কি না। ব্রিটিশরা নিজেরা এ দায়িত্ব নিতে পারে এবং তার ফলে আমাদের সুবিধা হবে। তবে এ ছাড়াও :

- এই পর্যায়ে নিজেদের না জড়ানোর সুবিধা হলো এই যে, আমরা আগেভাগেই পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সমের্কর ক্ষতি করছি না। পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে কিছু সময়ের জন্য আমরা দাবি করতে পারব যে, সেখানে পরিস্থিতি খুবই অসঙ্ষ্ট হওয়ায় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি প্রস্তুত করা যাচ্ছে না।

- রক্তপাত বন্ধের জন্য ইয়াহিয়াকে চাপ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি হবে (ক) মানবিক, (খ) রাজনৈতিক, কারণ তা থেকে আবেগের উদ্রেক হতে পারে, বায়াফ্রাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যেমনটা দেখা গেছে, (গ) কূটনৈতিক, সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত নতুন পূর্ব পাকিস্তানি জাতির সঙ্গে সমর্ঙ্ক রক্ষার্থে।

মন্তব্য

ডব্লিউএসএজি বৈঠকের পর আমি আপনাকে সুপারিশমালা পাঠাব।

সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ আমেরিকান নাগরিকদের অপসারণ পরিকল্পনা পর্যালোচনা ছাড়াও দুটি বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে, যা হলো :

১. ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করার সময় তাকে রক্তপাত বন্ধের জন্য অনুরোধ। আজই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সম্ভবত তা কিছুটা আগে হয়ে যাবে। কারণ আমরা এখনো জানি না পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে নাকি সহিংসতার ধরন অব্যাহত থাকবে এবং তা আরো বাড়বে। কাজেই আগামী দু-তিন দিনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

২. পূর্ব পাকিস্তানের একটি চূড়ান্ত ঘোষণা হলে কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। আমাদের কনসাল জেনারেলের প্রতি নির্দেশ রয়েছে, এ ধরনের যেকোনো প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের শরণাপন্ন হওয়ার। যদি সামরিক বাহিনী শহরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিরোধ সংগ্রাম গ্রামাঞ্চলে স্থানান্তরিত হয় তাহলে এ ইস্যুটি কিছু সময়ের জন্য অসঙ্ষ্ট থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, আমাদের প্রতিক্রিয়ার সুরটি হবে পাকিস্তানের উভয় অংশের সঙ্গে সমের্কর পক্ষে।

(সূত্র : এফ. এস. আয়াজউদ্দিন সমঙ্াদিত হোয়াইট হাউজ অ্যান্ড পাকিস্তান)

অনুবাদ : আসিফ রশীদ