বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। কলকাতায় সন্ধ্যা নামছে। সেখানে এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি জানেন না, তাঁর দেশের পশ্চিম সীমান্তজুড়ে নয়টি ভারতীয় বিমানঘাঁটির ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করেছে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী। ভাষণ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংবাদ তাঁকে জানানো হলো: তিনি তৎক্ষণাৎ ছুটলেন বিমানবন্দরে। একটি তুপোলেভ টুইন জেটবিমানে করে দুঘণ্টা পর তিনি নামলেন দিল্লি বিমানবন্দরে। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষমাণ তাঁর দুই তরুণ পুত্র ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সেখানে কালক্ষেপণ না করে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি তাঁকে নিয়ে চলল সোজা পার্লামেন্ট ভবনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে বসলেন। বৈঠক শেষে মধ্যরাতের কিছু পরে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে তিনি বললেন, ‘পাকিস্তান এত দিন বাংলাদেশে যে নৃশংসতা চালিয়ে আসছিল, এখন তারা সেটিকে পরিণত করেছে ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে।’

এভাবে শুরু হলো বাংলাদেশে আট মাস ধরে নরমেধযজ্ঞ পরিচালনাকারী সামরিক জান্তার অখণ্ড পাকিস্তানের স্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়ার আয়োজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের রক্তাক্ত ইতিহাসে এক মোড়-ঘোরানো তারিখ ৩ ডিসেম্বর। সেদিন পাকিস্তান ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোতে বোমাবর্ষণ ও পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ শুরু করলে পূর্ব রণাঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার চূড়ান্ত অধ্যায় শুরু হয়ে যায়। ৪ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটি বিবৃতি পেশ করেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। একই তারিখে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কূটনৈতিক স্বীকৃতি চেয়ে পত্র লেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করে।

৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনী একযোগে চারটি অঞ্চলে অগ্রাভিযান শুরু করে। এক. পুবে ত্রিপুরা থেকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-নোয়াখালীর দিকে; দুই. উত্তরাঞ্চলে রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া অভিমুখে; তিন. পশ্চিম দিক থেকে যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অভিমুখে এবং চার. মেঘালয়ের তুরা থেকে জামালপুর-ময়মনসিংহ অভিমুখে। ৩ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই চার ফ্রন্টে অনেক এলাকা মুক্ত করে মিলিত বাহিনীর বিজয়াভিযান চলতে থাকে ঢাকা অভিমুখে। এরই সমান্তরালে চলতে থাকে কূটনৈতিক যুদ্ধ। ৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে বসে হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (ডব্লিউএসএজি) বৈঠক। কিসিঞ্জার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের দাবিসংবলিত মার্কিন প্রস্তাব পেশের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রতিনিধি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারত ও পাকিস্তানের সেনা নিজ নিজ সীমান্তের ভেতরে ফিরিয়ে নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু এই প্রস্তাবকে একতরফা অভিহিত করে ভেটো প্রয়োগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক নিষ্পত্তি ও পাকিস্তানের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করলে চীন তাতে ভেটো দেয়, অন্যরা ভোটদানে বিরত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির ও সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাবের মতোই একটি প্রস্তাব আসে আটটি দেশের পক্ষ থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে দ্বিতীয়বারের মতো ভেটো দেয়। এর মধ্যে ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ সামরিক হস্তক্ষেপের উপায় খঁুজতে থাকে। মার্কিন সপ্তম নৌবহর, উত্তর দিক থেকে চীনাদের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং এসবের বিপরীতে ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত সাবমেরিন ও রণসজ্জার মধ্যেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সম্মিলিত যুদ্ধাভিযান পাকিস্তানি বাহিনীকে চূড়ান্ত পরাজয়ের কিনারে নিয়ে যায়।

ইয়াহিয়া চক্র যে কূটনৈতিক দুরভিসন্ধি থেকে ৩ ডিসেম্বর ভারতকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে জড়িয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা ভণ্ডুল হয়ে যায় একদিকে বাংলাদেশের নিপীড়িত সংগ্রামী জনসাধারণের প্রতি ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের কারণে, অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত সফল যুদ্ধাভিযানের ফলে। ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৩ দিনের বিজয়গাথা রচিত হবে—এটি যেন-বা নির্ধারিত হয়েছিল ৩ ডিসেম্বরেই।

১৮ মার্চ ২০১১, ঢাকা

সূত্র: ২৬ মার্চ ২০১১ প্রথম আলোর "স্বাধীনতা দিবস" বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত