default-image

সেই আশ্চর্য দিনগুলি মনের পর্দায় ভেসে যায় একটার পর একটা। তখন আমাদের সমগ্র চেতনা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল শুধু একটি বিষয়ে: কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ, কোন ইতিহাস আমরা রচনা করতে চলেছি নিজের হাতে?

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছিল এ দেশের এক চরম উত্তেজনাময় দিন। ৩ মার্চে নির্ধারিত হয়েছিল পাকিস্তানের সদ্যনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন। বাঙালি উন্মুখ হয়ে ছিল সেই দিনটির জন্যে। তারা আশা করেছিল, দেশটির নতুন সংবিধান রচিত হবে তাদের বাঁচার দাবিনামা ছয় দফার দাবিতে। যেমন আশা ছিল তেমনি ছিল সংশয়ও। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং স্বয়ং দেশের প্রেসিডেন্ট যেমন ওজর-আপত্তি করতে থাকলেন একের পর এক, তাতে মনে হলো, আবার না বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং নির্বাচনে দেওয়া সুস্পষ্ট রায় নিষ্ফল হয়ে যায়!

বিজ্ঞাপন

পয়লা তারিখে প্রেসিডেন্ট যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন, তখন এই আশঙ্কা প্রায় সম্পূর্ণই সত্য হয়ে ওঠে। মুহূর্তমধ্যে গগনবিদারী ধ্বনি ওঠে: বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো; ছয় দফা না এক দফা, এক দফা এক দফা। তাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে বাঙালি দাবি করে প্রেসিডেন্টের ঘোষণার সমুচিত জবাব। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ২ মার্চে ঢাকায় এবং ৩ মার্চে সারা দেশে সম্পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হবে আর ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্সের জনসভায় দেওয়া হবে চূড়ান্ত কর্মসূচি। তিনি আরো বলেন, গত ২৩ বছর ধরে সাত কোটি বাঙালি যে উপনিবেশিক শোষণের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে, তার থেকে তাদের মুক্ত করতে তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্ত্তত।

পরদিন ২ মার্চ হাজার হাজার ছাত্র ও সাধারণজনের উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে উত্তোলিত হয় এক নতুন পতাকা। সবুজ জমিনের ওপর রক্তলাল একটি বৃত্ত, সেই সূর্যের বুকে আঁকা পূর্ব বাংলার সোনালি মানচিত্রের অবয়ব। এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সে-পতাকা সেই প্রথমবার উত্তোলন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব। সেদিন তাঁর সঙ্গে আর যাঁরা বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী এবং সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা ওড়াবার পরে ছাত্রেরা মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সেখানে এই নতুন পতাকা উত্তোলন করে।

default-image

পতাকাটিতে যে-ভাব প্রকাশ পেয়েছিল, তা তাৎপর্যপূর্ণ। সবুজ বাংলাদেশের প্রকৃতির দ্যোতক; লাল বৃত্ত সংগ্রামের ও উদিত সূর্যের; মানচিত্র সোনার বাংলার। বাঙালি কোন ভূখণ্ডের মুক্তি চাইছে, এতে তা সুস্পষ্টরূপে নির্দেশ করা হয়। পরদিন থেকে সে-পতাকা ছড়িয়ে যায় সবখানে। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। ছাত্রেরা সেদিন দিবসটি পালন করে প্রতিবাদ দিবস হিসেবে। গভর্নমেন্ট হাউজ আর সেনানিবাস ছাড়া সেদিন সর্বত্র উড়েছিল অনাগত বাংলাদেশের এই পতাকা। গাড়িতে এই পতাকা উড়িয়েই বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সংকট-নিরসনের আলোচনায়—তাঁর এই পদক্ষেপকে পরে ইয়াহিয়া ঘোষণা করেছিলেন রাষ্ট্রদ্রোহ বলে। ঢাকায় যেসব বিদেশি দূতাবাস পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছিল, ছাত্র ও জনতার পীড়াপীড়িতে তারাও পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করেছিল এই পতাকা।

তখন থেকে পরবর্তী ন মাসই এই পতাকা ছিল আমাদের বুকের পাঁজর হয়ে। কলকাতায় ৮ থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের দপ্তর স্থানান্তরিত হলে বিএসএফের জওয়ানদের বিউগল-ধ্বনির সঙ্গে প্রতিদিন প্রত্যুষে এই পতাকা উড্ডীন হতো এবং গোধূলিতে তা নেমে যেত। সেই বিশেষ পতাকাটি এখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রক্ষিত। বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে ৬ সার্কাস অ্যাভিনিউতে—সেখানে এককালে ছিল পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনের দপ্তর, পরে আমাদের বাংলাদেশ মিশনের।

বিজ্ঞাপন

আরো কত জায়গায় যে উড়েছে এই পতাকা! যেখানেই মুক্তিকামী বাঙালি, যেখানেই সোনালি-লাল-সবুজের এই সমারোহ আর ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। পৃথিবী জানলো, আমরা লড়ছি একটা পতাকার জন্যে, একটা ভূখণ্ডের জন্যে, সাত কোটি মানুষের জন্যে।

অনেক অশ্রু, স্বেদ আর রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। নতুন করে—কিংবা বলা যায়, রাষ্ট্রের দিক থেকে প্রথমবার—স্থির হলো: ‘প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা হইতেছে সবুজ ক্ষেতের উপর স্থাপিত রক্তবর্ণের একটি ভরাট বৃত্ত’। মানচিত্র আর রইল না, পতাকায় মানচিত্র আঁকা একটি জটিল প্রক্রিয়া বটে, তাছাড়া তার আর দরকার নেই—এখন তো আমাদের মাটি আর মানচিত্র এক।

জয় হোক এই মাটির, জয় হোক এই মানুষের, সগর্বে উড্ডীন থাক বাংলাদেশের পতাকা।

আনিসুজ্জামান: প্রফেসর অব এমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য।

সুত্র: সূত্র: ২৬ মার্চ ২০১২ প্রথম আলোর "স্বাধীনতা দিবস" বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত