default-image

১৯৭১-এ ২৫ মার্চের রাতে যা ঘটে, তা ঢাকাবাসীর কাছে একেবারে আকস্মিক বা হঠাত্ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না। কারণ ওই সময় মাত্র ২৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়া পাকিস্তান নামক কিম্ভূতাকার ভৌগোলিক আয়তনবিশিষ্ট রাষ্ট্রটির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত রকমের সংকট এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সংকটের শুরু অবশ্য বহু আগে থেকেই। বলা যায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দাবি ওঠে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দাবি ওঠে স্বায়ত্তশাসনের। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রটির অধিকাংশ জনগণ-অধ্যুষিত প্রদেশ পূর্ববাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার বরখাস্ত করে দেয়। আর সেই ঘটনাই নবীন রাষ্ট্রটির ভবিষ্যত্ সমের্ক অনিশ্চয়তা এবং আস্থাহীনতার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রভাষা এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পাকিস্তানের শাসকদের উপেক্ষা এবং বিরোধিতা পূর্ববাংলার জনগণের মনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা সমের্কই প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। এবং তরুণদের মধ্যে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র করার সম্ভাবনা সমের্ক আলোচনা হতে শোনা যায়।

১৯৭০-এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংখ্যাগুরু সদস্যরা যাতে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন না করতে পারে, সে জন্য নানা রকমের টালবাহানা শুরু করে দেয় সামরিক শাসকরা। আর তাতে তাদের প্রকৃত রূপ বাঙালি জনগণের কাছে গোপন থাকে না। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এবং অন্যান্য শহর-জনপদে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল-এসব আন্দোলন প্রতিদিনকার ঘটনা হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

শাসকদের জনগণের অধিকার হরণ এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন আর বিক্ষোভ ক্রমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শাসকরাও ওই সব আন্দোলন ও দাবিকে দমন করার জন্য চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, অর্থাত্ সশস্ত্র বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। তাতে বিক্ষোভ-আন্দোলন দমিত না হয়ে আরো উত্তাল হয়ে ওঠে। এ রকম পরিস্থিতিতে বড় রকমের কোনো ঘটনা যে ঘটবে, সেই আশঙ্কা মানুষের মনে এমনিতেই ছায়ার মতো দুলতে আরম্ভ করে। সবারই মুখে তখন এক প্রশ্ন : কী হবে? কী হতে যাচ্ছে? আপসমূলক কোনো সিদ্ধান্ত কি নিতে পারবে দু পক্ষ? সংঘর্ষ হোক কি রক্তপাত ঘটুক বা মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাক-এসব মানুষ অবশ্যই চায়নি। কিন্তু আবার এও চায়নি যে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের কাছে তাদের বাঙালি নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করুক। আর সে জন্যই মনের ভেতরে আশঙ্কার কালো পর্দা থেকেই গিয়েছিল।

ঢাকা মহানগরীর তরুণরা প্রায় প্রতিদিনই মিছিল আর সমাবেশ করছিল, যা ৭ মার্চের মহাসমাবেশের পরও অব্যাহত ছিল। প্রতিদিনই ছোট-বড় সংঘর্ষ হচ্ছিল। ২৫ মার্চের দুপুরেই মুখে মুখে জানাজানি হয়ে যায় যে মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ভেঙে গেছে; কোনো সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়নি। সেদিনই ইয়াহিয়া-ভুট্টো পাকিস্তানে ফিরে যাবে এবং তার পরই সশস্ত্র বাহিনী অ্যাকশন শুরু করবে। পাটুয়াটুলী আর ইসলামপুরের সোনা আর কাপড় ব্যবসায়ীরা খবরটা জেনে যায় বিকেল শেষ হওয়ার আগেই। সাংবাদিক মহলে জানাজানি হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীরা কীভাবে খবরটা পায়, অনেকের মনেই এ প্রশ্ন জেগে উঠেছিল। পরে জানা যায় যে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর লোকদের কাছ থেকেই খবরটা বেরিয়ে এসেছিল। ভুট্টো সাহেব তার প্রেস কনফারেন্সে আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং তার পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার কথা জানানোর অনেক আগেই খবরটা জানাজানি হয়ে যায়। মোহাম্মদপুর-মিরপুর এলাকার অনেক জায়গায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের ঘাঁটি গাড়তেও দেখে মানুষ। বিকেল ৫টার দিকে টেলিফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি বাহিনীর প্রস্তুতি দেখে প্রতিবাদী তরুণরাও, সংখ্যায় তারা যত নগণ্যই হোক, প্রতিরোধের আয়োজন শুরু করে দেয়।

অবশেষে উদ্বেগ, আশঙ্কা, উত্কণ্ঠা প্রাণঘাতী বিস্ফোরণে ফেটে পড়তে শুরু করে। সারা রাত ধরে চলে গোলাগুলি। ফার্মগেটের দিকে, ইউনিভার্সিটি এলাকায়, মোহাম্মদপুর, গুলিস্তান, কোনদিকে নয়-সব দিক থেকে গুলির আওয়াজ আসতে থাকে। কত মানুষ যে মারা হয়, তার হিসাব কেউ দিতে পারেনি। তবে অনেকে দূর থেকে দেখেছে সারি সারি ট্রাকে ভর্তি করে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তখনকার দ্বিতীয় রাজধানী এলাকার অনেক মানুষই ওই লাশের ট্রাকবহর যেতে দেখেছে। ওই এলাকাতেই মিরপুর রোডের পাশে এক বাড়ির সামনে আর্মির জিপ থেকে গুলি করা হচ্ছে-এ দৃশ্য যেমন দেখেছে মানুষ, তেমনি এও দেখেছে যে পলায়নপর পথচারীদের রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে কীভাবে গুলি করে মারা হয়েছে। ড. জি সি দেবের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য বা অন্য অধ্যাপকদের হত্যার দৃশ্য বেশি লোক দেখেনি। কিন্তু তাদের মৃতদেহ অনেকেই দেখেছে, দেখেছে জগন্নাথ হলের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য। ওই সব দৃশ্য, ওইসব হত্যা, মৃত্যু গণনা করে হিসাব করা যায়নি।

হত্যাকাণ্ড সর্বত্র চলেছে এবং আশ্চর্যের কথা এই যে, কণ্ঠ যত ক্ষীণ হোক কি সংখ্যা যত নগণ্যই হোক, তবু প্রতিবাদ হয়েছে এবং কোনো কোনো এলাকায় হয়েছে প্রতিরোধও। ২৬ মার্চের সারাটা দিন কারফ্যু থাকে এবং নির্বিচারে চলে হত্যাকাণ্ড। তবু এরই মধ্যে কোনো কোনো এলাকার লোকজন শহর ছাড়তে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

২৭ মার্চ সকালে কিছুক্ষণের জন্য কারফ্যু শিথিল করা হলে শহরবাসী লোকদের মধ্যে যাদের গ্রামে আশ্রয় লাভের সুযোগ ছিল, তারা বেরিয়ে পড়ে। ওদের দেখাদেখি এমন সুযোগ যাদের ছিল না তারাও প্রাণে বাঁচতে জন্য শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যেতে থাকে। পথে নেমেই তারা দেখেছে অসংখ্য লোক পথে-বুড়োবুড়ি, মেয়ে-পুরুষ বাচ্চাকাচ্চা-পোঁটলা-ব্যাগ-বাক্স হাতে ঝুলিয়ে অথবা ঘাড়ে নিয়ে চলেছে নদী পার হওয়ার জন্য। পথ চলতে চলতে এবং নদী পার হতে হতে কিছু খবর জানাজানি হয়ে যায়। কারুর মুখে শোনা যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেছে এবং তারা যুদ্ধ আরম্ভ করে দিয়েছে। দেশের মানুষকে, দেশকে স্বাধীন করার জন্য ডাক দিয়েছে। নদী পার হয়ে যেতে যেতে বেলা ১১টা/১২টার দিকে এক গাছতলায় কয়েকজন মানুষকে ট্রানজিস্টারে খবর শুনতে দেখা যায়। ওদের কাছেই খবর পাওয়া যায়, একজন মেজর নাকি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। ওখানে আরো খবর পাওয়া যায় যে গতকাল রাত ১২টায় বিদেশী রেডিওর খবরে বলা হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেছে; তারা যুদ্ধ আরম্ভ করে দিয়েছে।

বুড়িগঙ্গা পার হয়ে ধলেশ্বরীপাড়ে পৌঁছার আগেই ওই সব খবর শোনার জন্যই কি না বলা যায় না, হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত মানুষগুলোর চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। প্রতিটি পদক্ষেপে দেখা যায় দৃঢ়তা। পরসেরর সঙ্গে আলাপও করছে। কেউ জিজ্ঞেস করছে, কবে ফিরবেন? তখন প্রশ্নকারীকেই পাল্টা প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে। বলছে, আপনি কবে ফিরে যাচ্ছেন?

দুজনের কেউই ফেরার সঠিক তারিখটা বলতে পারে না। তবে চোখমুখের ভাব দেখে বোঝা যায় যে তারা অল্প কিছুদিন পরই ফেরার আশা রাখে।

তিন-চার মাইল যাওয়ার আগেই দেখা যায় এক স্কুলের মধ্যে রিলিফ ক্যামঙ্ খোলার আয়োজন চলছে। কিছুদূর পর আবার চোখে পড়ে, সেখানেও ক্যামঙ্ খোলার কাজে ব্যস্ত কিছু লোক। আরো দেখা যায় তরুণ ভলান্টিয়াররা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে নেতার আদেশ আর নিয়ম পালনের কথা শুনছে।

ওদিকে বিকেল গড়িয়ে আসে। চৈত্রের প্রখর রোদে দুপুরে পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিল। বেলা পড়ে আসায় গায়ে এখন বাতাস লাগছে, কেউ কেউ গন্তব্য কাছে বলে বিশ্রামের জন্য থামে না। কিন্তু যাদের যাওয়ার নির্দিষ্ট জায়গা নেই, তারা ক্যামেঙ্ আশ্রয় নিচ্ছে। ২৭ মার্চ এভাবেই কাটে ঢাকা শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া মানুষদের।

তাদের যে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে আসতে হয়েছিল, এ বিষয়ে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই। কেউ যদি ‘পালিয়ে যাওয়া’ শব্দ দুটো ব্যবহার না করতে চান, তাহলে বলার কিছু নেই। কারণ শব্দ দুটো অপমানকর বলে অনেকের মনে হতে পারে। আসলে ওই সময়ের অমন পরিস্থিতিতে পালিয়ে যাওয়া বা ভয় পাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তবু ভাবা দরকার। সেদিনে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাই কি প্রধান ছিল? পালিয়ে গিয়ে অথবা পালিয়ে যেতে যেতে তারা কোথায় পৌঁছে ছিল, সেটাও তো ভেবে দেখা দরকার। দেখা যাবে, তারা শহর থেকে পালিয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে অথবা আত্মীয়-বন্ধুর আশ্রয়ে ছিল, এক মাস কি দু মাস। তারপর তারা শহরে ফিরে আসে অথবা কেউ কেউ ভারতে যাওয়ার জন্য সীমান্তের দিকে যাত্রা করে। তবু তাদের পালিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে থাকাটাই কি শেষ কথা? নাকি সেটাই শেষ ঘটনা?

নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি যে, যারা শহরের বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে গিয়েছিলাম, তারা কি গ্রামের আশ্রয়ে অবস্থানকালে পাকিস্তান সরকারের শাসন এবং গণহত্যাকে মেনে নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছিলাম? নাকি দেখছিলাম গ্রামের সাধারণ মানুষ কী করে? তরুণরা যে খোঁজখবর নিয়ে একে একে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছিল, তা কি আমরা দেখিনি বা বুঝিনি? যেসব তরুণের সঙ্গে রোজ দেখা-সাক্ষাত্ হতো, তাদের কি উপদেশ দিতাম পাকিস্তানকে শক্তিশালী করাটাই আমাদের প্রধান কাজ? নাকি বলতাম যে, পাকিস্তানের শাসন থেকে আমাদের মুক্তি চাই-না হলে আমাদের অস্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না। তাদের আমরা এ কথা কি বলতাম যে পাকিস্তানকে শক্তিশালী করার জন্য এগিয়ে যাও? নাকি বলতাম বাংলাদেশ আর বাঙালিকে স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে, বাঙালি তরুণদের সেই যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে স্বাধীন করা উচিত।

যখন খবর পেয়েছি যে ঘনিষ্ঠ আপনজনদের মধ্যে কেউ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে, তখন কি লজ্জা বা সঙ্কোচবোধ করেছি? নাকি গর্ববোধ করেছি? ঘোষণা করে সবাইকে হয়তো বলে বেড়াইনি, কেননা তাতে পরিবারটির জন্য বিপদের আশঙ্কা ছিল। এখানে বলার কথা এই যে, বাঙালির জাগরণ প্রক্রিয়া তখন সর্বত্র এবং সর্বক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছিল এবং তা হয়েছিল সরাসরি এই প্রশ্ন থেকে যে, আমি বাঙালি, না পাকিস্তানি? আমি বাঙালি হতে চাই? নাকি পাকিস্তানিই থেকে যেতে চাই?

বিজ্ঞাপন

’৭১-এর নয় মাসের যুদ্ধ আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের জাতীয়তার উপলব্ধি সর্বশ্রেণীর মানুষকে, যারা এ দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং যাদের মাতৃভাষা বাংলা, তাদের সবাইকে এককাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নিজেদের জাতীয়তার পরিচয়ে এখন আর অসঙ্ষ্টতা নেই। তবে এই জাতীয়তার উপলব্ধি ও পরিচয় আগ্রাসী ভূমিকা যাতে গ্রহণ না করে সেই সচেতনতা জাগরূক থাকা প্রয়োজন-বলা যায় ওই সচেতনতাটি জাতীয়তা উপলব্ধিরই একটা অঙ্গ।

জাতীয়তার উপলব্ধি আমাদের সাফল্যের পথ দেখিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আবার এও স্মরণ না করে পারি না যে সেই উপলব্ধি থেকে অমার্জনীয় স্খলনও ঘটে চলেছে। ’৭১-এর স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে দেখে আসছি স্খলনের পর স্খলন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ভূমিকা রাখতে পারেনি। সমঙ্দ লুণ্ঠনের স্থায়ী প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষে, অনাহারে মৃত মানুষের সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় বিপুল। দারিদ্র্য কমে না। দুর্নীতি, ঘুষ, সন্ত্রাস, খুন বেড়েই চলে। খাদ্যশস্য পাচারকারী কারা, সেই তদন্তের কথা ওঠে না। বৈদেশিক সাহায্যের টাকা, কি উন্নয়ন তহবিল কীভাবে লুটপাট হয় তারও কোনো তদন্ত বা বিচার হয় না। সন্ত্রাস, খুন, দুর্নীতি, লুটপাট, সমিত্ত দখল এসব এখন বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এও দেখার মতো বিষয় যে শাসক ও শোষকশ্রেণীর কখনোই কোনো অসুবিধা হয় না। তারা অনবরত ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং ক্ষমতা আর দাপট দেখায়।

তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার যেমন করতে চায় না, তেমনি যুদ্ধ-পরবর্তীকালের হত্যা এবং অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের ব্যাপারেও উদাসীন থাকে। এই উপেক্ষা ও নিষ্ক্রিয়তার জন্য তাদের কোনো রকম অসুবিধাও হয় না।

একবার ক্ষমতায় গিয়ে যারা লুটপাট চালায়, ঘুষ খায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস করে তারা ক্ষমতায় থাকতে না পারলে তাদের প্রতিপক্ষ যারা, তারা ক্ষমতাসীন অবস্থায় সেই একই ধরনের অপকর্ম চালায়। কোনো পক্ষেরই শেষ পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয় না-কারণ তারা মূলত একই পক্ষের লোক।

যারা জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার আসনে বসে, তারা পরিচালিত হয় দেশী-বিদেশী শোষকদের দ্বারা। সরকার পরিচালনার নামে তারা যা করে, তাতে জনগণের কষ্ট লাঘব না হয়ে তা আরো বাড়ে। কৃষি উন্নয়নের নামে যে নতুন প্রযুক্তি বহু অর্থব্যয়ে কাজে লাগানো হয়, তাতে শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, উত্পাদন সামান্য বাড়লেও ক্ষতি হয় বহুগুণ বেশি। খাদ্যশস্য উত্পাদন বাড়ানোর জন্য যে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তাতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি তো হয়ই, সেই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়। আরো লক্ষ করার বিষয় এই যে, ক্ষতি যে হয়, তা দেখার ব্যবস্থা না থাকায় বিপর্যয়ের খবর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় বহু পরে-যখন করার মতো কিছু থাকে না। শিল্পক্ষেত্রে যা হচ্ছে তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা কেউ কি দিয়েছেন? একসময় যে ভূখণ্ডে বিপুল আয়োজনে শিল্প স্থাপন আরম্ভ হয়েছিল, দেশজ কাঁচামাল দিয়ে উত্পাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে যেত, এখন সেসব শিল্প-কারখানা একে একে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে লোকসান। কিন্তু সেই লোকসান কেন হচ্ছে? আর তা রোধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? সে ব্যাপারে শাসকদের কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। একটা কারণ তারা দেখান, আর তা হলো, শ্রমিকদের ফাঁকি কিংবা শ্রমিক অসন্তোষ।

কিন্তু যখন প্রশ্ন তোলা হয়, শ্রমিকদের নেতৃত্ব কে দেয়? কিংবা ম্যানেজমেন্টের লোকরা কি কাজ করে ঠিকমতো? তখন সে প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।

শিক্ষাক্ষেত্রে যা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কেউই দিতে পারে না। বাংলাদেশে কোথাও যুদ্ধ হয় না, যুদ্ধ হয় শুধু কলেজে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর হরতাল, মিছিল; ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই, সেশনজটের পর সেশনজট। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ হতে কত বছর যে লাগে তা কেউ বলতে পারে না। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠায়; যাদের নেই তাদের ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করে থাকে। আর ক্লাসরুমে কি লেখাপড়া শেখে ছাত্রছাত্রীরা? নাকি তাদের কোচিংয়ে যেতে হয়? তার পরও নকল, পরীক্ষার হলে খাতাবদল-এসব তো রয়েছেই।

প্রশাসনে, আদালতে, ট্যাক্স আর কর বিভাগে সর্বত্রই তো একই অবস্থা। এই বাংলাদেশের জন্য কি লাখ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে? যে-চেতনা দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছে, অনুভব করেছে, আবেগে আপ্লুত হয়েছে, সেই চেতনার খোঁজ কেন পাওয়া যায় না?

যেই চেতনা ছিল জাতীয়তার চেতনা, নিজেকে বাঙালি বলে সগর্বে ঘোষণা করার চেতনা, সেই চেতনা কি জাগ্রত আছে? তা জাগ্রত, উদ্দীপ্ত এবং সৃজনশীল না করলে বাঙালির জীবনের বিপর্যয় রোধ করা যাবে না।

২৭ মার্চে ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল, ঘাতকের তাড়া ছিল, তখন আমরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়েছিলাম, কিন্তু পৌঁছেছিলাম কোথায়? পৌঁছে গিয়েছিলাম প্রতিরোধের চেতনায়, আর তারই ফলে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়। সেই চেতনার উজ্জীবন নিশ্চয়ই আবার ঘটবে। কেননা চেতনার অবস্থান তো জীবনেই। আমরা কি জীবন্ত নই?