default-image

ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর তার প্রবল নিন্দা জানিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে ভারত থেকে। ভারতীয় আইন পরিষদ ৩১ মার্চ ১৯৭১ এক প্রস্তাবে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলাকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করে তার নিন্দা জানায়। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে, সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই পদগোর্নি ৩ এপ্রিল ইয়াহিয়া খানের কাছে লেখা এক চিঠিতে সামরিক হামলার সমালোচনা করেন এবং সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। অপর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক মুখপাত্রের মাধ্যমে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের কথা বললেও গণহত্যার কোনো নিন্দা করা থেকে বিরত থাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র চীনই তাত্ক্ষণিকভাবে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে। এই নব্য পরাশক্তি সে সময় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতম সামরিক ও কৌশলগত মিত্র। চীন ও ভারতের সাপে-নেউলে সম্পর্ক, সে সমীকরণ মাথায় রেখে পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান এর আগের এক দশক পরিকল্পিতভাবে চীনের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কমিউনিস্ট হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের কেন চীনের সঙ্গে নিকট সম্পর্ক তৈরি করা উচিত, সে ব্যাপারে তাত্ত্বিক যুক্তিটি খাড়া করেন তার নবীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। বাংলাদেশে সামরিক অভিযানে তাঁর বড় রকমের ইন্ধন ছিল।

বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান আশা করেছিল, ১৯৭১ সালে চীনকে পাশে পাবে, আর কিছু না হোক বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণে সে ইতস্তত করবে না। পাকিস্তানের এই আশার অন্য কারণও ছিল। এর আগের বছর নিক্সনের অনুরোধে চীন ও আমেরিকার ভেতর গোপন দূতিয়ালির দায়িত্ব পেয়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। এই আপাত-নৈকট্য সত্ত্বেও ২৬ মার্চের পর চীন কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর বদলে ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের’ সিদ্ধান্ত নেয়। এই নীরবতায় উদ্বিগ্ন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট এপ্রিলের গোড়ার দিকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের কাছে এক চিঠিতে তাঁর দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে জানানোর অনুরোধ জানান। এর জবাবে চৌ যে চিঠিটি লেখেন, সেটি পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩ এপ্রিল।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে বা পরে বাংলাদেশের নেতৃবর্গ চীনা নেতৃবর্গের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম না হলেও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষাবলম্বন সে করবে না, এমন একটি বিশ্বাস তাঁদের অবশ্যই ছিল। হাজার হোক, তৃতীয় বিশ্বের জনগণের স্বঘোষিত নেতা হিসেবে উপমহাদেশে চীন ভিন্ন মর্যাদা ভোগ করত। পূর্ব বাংলার বামপন্থী নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী, যিনি মাও সে তুংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন, চীনা সমর্থনের অনুরোধ জানিয়ে তাঁর কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আদর্শিক বিবেচনার বদলে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীনা নেতৃবর্গ পাকিস্তানি সামরিক সরকারের পাশে এসে দাঁড়ান। ইয়াহিয়া খানকে লেখা চৌ এন লাইয়ের চিঠিটি ছিল সেই সমর্থনের প্রথম বাহ্যিক প্রকাশ।

চীনা প্রধানমন্ত্রীর এই বিলম্বিত চিঠি উদ্ধৃত করে কোনো কোনো লেখক মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে চীন দোটানায় ভুগছিল। পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানালেও বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে সে অনাগ্রহী ছিল। যেমন, ব্রিটিশ লেখক রবার্ট জ্যাকসন মনে করেন, চৌয়ের চিঠিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় সংহতির কথা রয়েছে, কিন্তু অঞ্চলগত সংহতি বা টেরিটরিয়াল ইন্টেগ্রিটি বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। পাকিস্তানি লেখক হাসান জহিরও দাবি করেছেন, চৌয়ের চিঠিতে এমন কিছু নেই, যা থেকে বলা যায়, এই সংকটে পাকিস্তান চীনকে তার পাশে পাবে।

কিন্তু চিঠিটির ভাষা ও তার বক্তব্য থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে চীন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে কোনো সমর্থন জানাবে না। গণহত্যা রোধে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের ওপর কোনো রকম প্রভাব বিস্তারেও তার আগ্রহ ছিল না। এই চিঠি এবং একাত্তরে চীনের সার্বিক ভূমিকা থেকে তিনটি জিনিস স্পষ্ট:

১. চীন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে একটি ভারতীয় ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু মনে করে না।

২. পাকিস্তান (ভারতের হাতে) আক্রান্ত হলে চীন তার পাশে এসে দাঁড়াবে।

৩. বাংলাদেশে যে রক্তগঙ্গা বইছে, তার জন্য চীন পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করবে না।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ভেতরে যে গণহত্যা চলছে, এ কথা চীনাদের অজ্ঞাত থাকার কথা নয়। অথচ বিশ্বের তাবত্ পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে দীর্ঘ সচিত্র বিবরণ ছাপা হলেও কোনো চীনা পত্রিকায় তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ ছিল না। মনে রাখা ভালো, চীনের তথ্যমাধ্যম সে সময় সম্পূর্ণ সরকারনিয়ন্ত্রিত। অতএব, এ কথা বলা অযৌক্তিক নয় যে চীন সরকারের নির্দেশেই সেই তথ্য গোপন রাখা হয়। চীনা নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে গণহত্যা বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ না করলেও মাওপন্থীদের ব্যাপারে খোঁজখবর ঠিকই রাখতেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পিকিং আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ইয়াহিয়ার বাঙালি উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরী সেই সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে লিখেছেন, চৌ ভুট্টোর কাছে নিজে অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তানি সেনা হামলায় ৬৪ জন পিকিংপন্থী রাজনীতিবিদ-কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সফরের সময় চৌ এন লাইয়ের উপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী চি পেং ফি পাকিস্তানি অতিথিদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে পূর্ব পাকিস্তানে যারা সামরিক তত্পরতায় লিপ্ত, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী ছাড়া আর কেউ নয়। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিতর্কে চীন ঠিক এই যুক্তিই অনুসরণ করে।

পাকিস্তান আশা করেছিল, পুর্ব পাকিস্তানের মুক্তি আন্দোলনকে ভারতের আগ্রাসন বলে চালাতে পারলে চীন তাকে সমর্থন দেবে। আর ভারতের সঙ্গে যদি যুদ্ধ বেধে যায়, তাহলে তার কাছ থেকে সামরিক সমর্থন আসবেই। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অধিকাংশই এ সমর্থনের ব্যাপারে সুনিশ্চিত ছিলেন। যেমন, সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ভারতের বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার মুখে চীন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না (৭ এপ্রিল)। এক সপ্তাহ পর, ১৬ এপ্রিলে আইয়ুব লিখেছেন, ‘শোনা যাচ্ছ চীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দুই ডিভিশন সৈন্য তাদের অস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করতে সম্মত হয়েছ।

’ ১ নভেম্বর সিবিএস রেডিওর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে ইয়াহিয়া দাবি করেছিলেন ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে চীন পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করবে। যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে, বিশেষত ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পর, পাকিস্তানি কমান্ডাররা চীনা (ও মার্কিন) সাহায্যের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনা কমান্ডার নিয়াজিকে বলা হয়েছিল, তাদের সাহায্য করতে উত্তর দিক থেকে হলদেরা (অর্থাত্ চীনারা) এবং দক্ষিণ দিক থেকে সাদারা (অর্থাত্ মার্কিনরা) আসছে।

একাত্তরে চীনারা পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সেনা পাঠায়নি, এ কথা ঠিক; কিন্তু তাদের পাকিস্তানি বন্ধুদের জন্য সামরিক সাজসরঞ্জাম প্রেরণে খুব কার্পণ্য করেছে, তাও বলা যাবে না। ভারতীয় সূত্রমতে, ১৯৭১-৭২ সালে চীন পাকিস্তানকে ‘উপহার’ হিসাবে যেসব ভারী অস্ত্রশস্ত্র পাঠায়, তার মধ্যে ছিল ২৫৫টি ট্যাংক, এক স্কোয়াড্রন ইল-২৮ বিমান ও ২০০ সামরিক প্রশিক্ষক। ১৯৭২ সালে বিভক্ত পাকিস্তানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীন বেড়াতে এসে ভুট্টো একাত্তরে তাঁর দেশকে সর্বাত্মক সাহায্য দেওয়ার জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

পাকিস্তানি অনুরোধ ও মার্কিন উসকানি সত্ত্ব্বেও চীন পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সেনা নামায়নি, কিন্তু তার কারণ এই নয় যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার কোনো সমর্থন ছিল অথবা পাকিস্তানকে সংযত করা তার লক্ষ্য ছিল। মূল কারণ ছিল সোভিয়েত প্রতি-আক্রমণের ভীতি। আগস্টের মাঝামাঝি ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর চীন সতর্ক হয়ে পড়ে। ১৯৬৮ সালে উসুরি নদী বরাবর চীনা সীমান্তের ভেতর কিলিজিন দ্বীপে চীন ও সোভিয়েত বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর পরের বছর জেনবাও দ্বীপে (যা সোভিয়েতদের কাছে দামান্স দ্বীপ পরিচিত) এই দুই বাহিনী নতুন সংঘর্ষে জড়িয়ে। এই যুদ্ধের স্মৃতি চীনাদের মনে তখনো তাজা। ফলে, সোভিয়েতদের সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার কোনো ইচ্ছা চীনাদের ছিল না। মনে রাখা ভালো, ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে সোভিয়েতরা চীন সীমান্ত বরাবর অন্ততপক্ষে ৯০ ডিভিশন সেনা মোতায়েন করে।

পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ না নামলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে চীন তীব্র বিরোধী, এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিতর্কের সময়। জাতিসংঘে সদ্য সদস্যপ্রাপ্ত চীন ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিতর্কে অংশগ্রহণকালে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণের পাশাপাশি ‘তথাকথিত’ বাংলাদেশের প্রতি তীব্র ও কর্কশ ভাষায় আক্রমণ হানে। চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ১৯৩১ সালে অধিকৃত চীনের মানচুকো প্রদেশে জাপান স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের যে চেষ্টা চালায়, তার সঙ্গে তুলনা করেন। অন্য কথায়, বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার একটি করদ রাজ্য ছাড়া আর কিছু নয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরেও নতুন এই রাষ্ট্রের প্রতি চীন তার বিরোধিতা বন্ধ করেনি। শুধু চীনের বিরোধিতার কারণেই বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার পর প্রায় সাড়ে তিন বছর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভে ব্যর্থ হয়। বস্তুত, কমিউনিস্ট চীন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পর তার প্রথম ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে স্বাধীন বাংলাদেশের সদস্যপদের আবেদনের বিরুদ্ধে।

 হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক