default-image

১. নিক্সনের কাছে ইন্দিরার খোলাচিঠি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে একটি খোলাচিঠি লেখেন। তত দিনে বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পূর্ব ফ্রন্টে দিশেহারা পাকিস্তান বাহিনী। এক দিন-দু দিনের মধ্যেই তারা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।

অন্যদিকে পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি একের পর এক দখল করে চলেছে। সেখানেও নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তখনো আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যেভাবেই হোক পাকিস্তানের বিভক্তি ঠেকাতে। এর জন্য বড় ধরনের যুদ্ধ বাধিয়ে ফেলতেও তাদের আপত্তি নেই। তাদের গোপন নির্দেশে মার্কিন কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জর্দান থেকে অস্ত্রের চালান এসে পৌঁছাচ্ছে পাকিস্তানে। ভারতকে চাপে ফেলার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে আণবিক অস্ত্রবাহী রণতরী ‘এন্টারপ্রাইজ’। প্রায় একই সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনাপূর্ণ বক্তব্য রেখে চলেছেন। ঠিক সে অবস্থায় ইন্দিরার চিঠিটি লেখা।

বিজ্ঞাপন

তার চিঠিতে ইন্দিরা লিখলেন :

মাননীয় প্রেসিডেন্ট,

আমি এমন এক উদ্বেগজনক সময়ে এই চিঠি লিখছি যখন আমাদের দু দেশের মধ্যে সমের্কর অবনতি ঘটেছে।

আমি সকল আত্মশ্লাঘা, সন্দেহ এবং ভাবাবেগ একপাশে সরিয়ে রেখে যতটা শান্তভাবে সম্ভব আরো একবার বর্তমান ট্র্যাজেডির উদ্ভব কীভাবে হলো তার বিশ্লেষণের চেষ্টা করছি।...সকল নিরপেক্ষ ব্যক্তি, যারা বস্তুনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর পর যে নির্মম ঘটনা ঘটেছে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন, তারা সে দেশের ৭৫ মিলিয়ন মানুষের বিদ্রোহের স্বীকৃতি দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাদের জীবন রক্ষার জন্য এ ছাড়া অন্য কোনো পথই খোলা ছিল না। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের প্রশ্ন তো উঠছেই না। বিশ্বের তথ্যমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠভাবে সে ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে। যেসব মার্কিন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল, তারাও এ ব্যাপারে একমত।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান কর্তৃক ভারত আক্রমণের আগে বিশ্বের নেতৃবর্গ যদি সে বিদ্রোহের কারণ খোঁজার চেষ্টা করতেন, পরিস্থিতির বাস্তবতা অনুধাবন করতেন এবং সমঝোতার বাস্তবসম্মত পথ অনুসন্ধান করতেন তাহলে এ হূদয়বিদারক যুদ্ধ, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, তা এড়ানো যেত। তাদের সে অনুরোধ জানিয়ে আমি দীর্ঘ চিঠি লিখেছি, দেশের জটিল পরিস্থিতির মুখে দেশের বাইরে সফরে গিয়ে বিশ্বের নেতাদের পরিস্থিতি বোঝাতেও চেষ্টা করেছি। যদিও (বাংলাদেশী) উদ্বাস্তুদের জন্য সহানুভূতির কমতি ছিল না কিন্তু সমস্যার আসল কারণ কী তা বোঝার কোনো চেষ্টা কারোরই ছিল না। আমার জন্য ব্যাপারটি ছিল গভীর বেদনার।

বিশ্বের শক্তিধর দেশসমূহ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির ব্যাপারে তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করত, তাহলেও যুদ্ধ ঠেকানো যেত। কিন্তু আমাদের উল্টো বোঝানো হলো, সেখানে (বাংলাদেশে) একটি বেসামরিক সরকার গঠিত হচ্ছে।...মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার কাছে সকল আন্তরিকতা নিয়ে একটি প্রশ্ন করতে চাই : যুদ্ধ শুরুর বদলে একজন মানুষের (অর্থাত্ শেখ মুজিবের) মুক্তি দাবি করা বা তার সঙ্গে গোপন আলোচনা চালনা কি বেশি বিপর্যয়কারী ছিল?

মি. প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা জনজীবনের মৌলিক শর্তসমূহ লঙ্ঘিত হওয়ার পরও যুদ্ধ ঠেকানো যেত। গত নয় মাস তাদের ক্রমাগত উসকানি আমরা উপেক্ষা করে গেছি। কিন্তু তারা ৩ ডিসেম্বর, দিন-দুপুরে অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অবন্তিপুর, উত্তরলাই, যোধপুর, আম্বালা এবং আগ্রার বিমান ক্ষেত্রসমূহে ব্যাপক বোমা হামলা চালায়। সে সময় আমি কলকাতায়, আমার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাটনা থেকে বাঙ্গালোরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং অর্থমন্ত্রী বোম্বেতে। আমাদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এ হামলা করা থেকে (পাকিস্তানের) দুষ্ট উদ্দেশ্য সঙ্ষ্ট হয়। এ আক্রমণ সত্ত্বেও আমরা কি হাত-পা গুটিয়ে এই বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকতে পারতাম যে, পাকিস্তানি শাসকদের অথবা তাদের পরামর্শদাতাদের শান্তিপূর্ণ, গঠনমূলক এবং যুক্তিযুক্ত লক্ষ্য রয়েছে।

এই জাতীয় অভিযোগ করা হয়, আমরাই নাকি এ সংকটের কারণ, সম্ভাব্য সমাধানের নাকি আমরাই বিরোধিতা করেছি। এ ধরনের কথাবার্তা আমাদের আহত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং বেলজিয়াম সফরের সময় প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমি আশু রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি। নয় মাস তার জন্য আমরা অপেক্ষা করেছি। ১৯৭১-এর জুলাই মাসে ড. কিসিঞ্জার যখন দিল্লি আসেন, আমি তখন আশু রাজনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা সমাধানের লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত কোনো রূপরেখা দেখিনি যার ভিত্তিতে রয়েছে পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা অথবা যেমন খুশি কল্পনা করে সে রূপরেখা নির্মিত নয়।

সে যাই হোক, আমি আন্তরিকভাবে এই আশা পোষণ করি, আপনার প্রতিনিধি আমাদের ব্যাপারে কর্কশ ভাষায় কোনো বক্তব্য প্রদানের আগে মানবিক সমর্ঙ্ক বিষয়ে আপনার জ্ঞান ও গভীর উপলব্ধির ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবং আমেরিকার মহান জনগণের আশা ও আদর্শের প্রতিফলন দেখিয়ে আপনি নিদেনপক্ষে এই কথাটুকু জানাবেন যে, আমরা কোথায়, কী ভুল করেছি।

(দেখুন : ইন্দিরা গান্ধী : সিেচস অ্যান্ড রাইটিংস, হার্পার অ্যান্ড রো, নিউইয়র্ক, ১৯৭৫, পৃষ্ঠা-১৭১)।

১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্র ধরে নিক্সনের কাছে ইন্দিরার লেখা সেটি প্রথম চিঠি নয়। এর আগে ২৯ মে, ১ জুলাই এবং ১৪ আগস্ট তারিখে ইন্দিরা নিক্সনকে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন চিঠি লিখেছিলেন। বাংলাদেশ প্রশ্নে একটি রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে মার্কিন হস্তক্ষেপের অনুরোধ তাতে করা হয়েছিল। ভারতে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই বলে তিনি সে চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এই তৃতীয় চিঠিটির সুর ভিন্ন। এতে ছিল একটি প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ উচ্চারণ। বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন নীতি যে বাস্তবসম্মত নয়, তার ভিত্তিতে রয়েছে ‘কাল্পনিক চিন্তাভাবনা’, সে কথা কোনো রাখঢাক ছাড়াই তিনি লিখলেন। বাংলাদেশে একটি গণহত্যা ঘটেছে, সে দেশের মানুষ তার প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার বিরোধিতা করে এবং সেই গণহত্যার হোতা ইয়াহিয়া খানের প্রতি সমর্থনের ছাতা তুলে রেখে নিক্সন যে তার নিজের দেশের মানুষের আশা ও আদর্শের প্রতিফলন দেখাচ্ছেন না, সে কথা বলতেও ভুললেন না তিনি। কূটনীতিক শিষ্ঠাচার পুরোপুরি মেনেই সে চিঠি লেখা কিন্তু তার প্রতিটি কথায় ছিল শ্লেষ ও বিদ্রূপ।

নিক্সন এবং তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রশ্নে ইন্দিরা প্রশাসনের মতভেদ সুপরিচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর গোড়া থেকেই নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান, বিশেষ করে তার সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের প্রতি তাদের সমর্থন গোপন করেননি। চীনের সঙ্গে গোপন দূতালির জন্য তারা ইয়াহিয়াকেই বেছে নিয়েছিলেন। এই ইয়াহিয়াকে রক্ষা করা তাদের কাছে যেন একটি ব্যক্তিগত ক্যামেঙ্ইনে দাঁড়িয়ে যায়। আমেরিকার ভেতরে ও বাইরে অনেকেই যখন বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের প্রবল সমালোচনায় সোচ্চার, এই দুই নেতা তখন ইয়াহিয়া ও তার সরকারকে কীভাবে রক্ষা করা যায় তার পাঁয়তারা করেছেন। সেজন্য তারা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের ধোঁয়া তুলেছেন, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের যুক্তি তুলে ধরেছেন, এমনকি একটি বড় ধরনের মহাযুদ্ধ বাধিয়ে ফেলতেও প্রস্তুত ছিলেন।

নিক্সন তার আত্মজৈবনিক দি মেমোয়ার্স অব রিচার্ড নিক্সন (গ্রোসেট অ্যান্ড ডানলোপ, নিউইয়র্ক, ১৯৭৮) ও কিসিঞ্জার তার স্মৃতিচারণমূলক হোয়াইট হাউস ইয়ার্স (লিটল ব্রাউন অ্যান্ড কোমঙ্ানি, বোস্টন, ১৯৭৯) গ্রন্থে দাবি করেছেন, বাংলাদেশ যুদ্ধের সূত্র ধরে ইন্দিরা গান্ধী শুধু পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে চাইছিলেন তা-ই নয়, তার আসল উদ্দেশ্য ছিল পুরো পাকিস্তানকেই গিলে খাওয়া। কারণ, ইন্দিরা ও তার বাবা নেহেরু কখনোই পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেননি। ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি নিক্সনের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব শুধু নীতিগত নয়, তা ছিল প্রবল রকম ব্যক্তিগত। তিনি ইন্দিরার ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সামনে ক্ষুদ্র বোধ করতেন। ইন্দিরার সঙ্ষ্ট উচ্চম্মন্যতাও তার জন্য অস্বস্তির কারণ ছিল। ইন্দিরার প্রতি এই মনোভাব সবচেয়ে সঙ্ষ্টভাবে প্রকাশিত ৪ ও ৫ নভেম্বর ১৯৭১-এ হোয়াইট হাউসে ইন্দিরা-নিক্সনের দুটি বৈঠকে। নিক্সন নিজে সে বৈঠককে তার অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেছেন। ইন্দিরা নিজেও সে সাক্ষাত্ প্রসঙ্গে নিক্সনের প্রতি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু সে কথায় যাওয়ার আগে চোখ ফেরানো যাক আরো আগে, ইন্দিরা ও ভারত প্রশ্নে নিক্সনের বৈরী মনোভাবের পেছনের ইতিহাসে। বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন প্রশাসনের মনোভাব বুঝতে তা আমাদের সাহায্য করবে।

বিজ্ঞাপন

২. নিক্সন, ইন্দিরা, ইয়াহিয়া

‘দ্যাট বিচ’ কদর্থে বেশ্যা মাগী, নিক্সন তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ নামেই ইন্দিরাকে ডাকতেন। কখনো কখনো তার সে সম্ভাষণ আরো নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ ছিল। হোয়াইট হাউসে তার কথোপকথনের রেকর্ডিং এবং তত্কালীন কর্মকর্তাদের স্মৃতিচারণ থেকে আমরা এখন নিশ্চিতভাবে ইন্দিরার প্রতি নিক্সনের এ বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের কথা জানি। তার স্মৃতিকথায় নিক্সন সে জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেননি বটে, কিন্তু কোথাও ইন্দিরা বিষয়ে তেমন সদয় কোনো বাক্যও উচ্চারণ করেননি।

নিক্সনের সঙ্গে ইন্দিরার প্রথম সরাসরি সাক্ষাত্ ১৯৫৩ সালে, তার প্রথম বিশ্বভ্রমণের সময়। সে যাত্রায় সাক্ষাত্ করেছেন এমন সব নেতার মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে তিনি ‘সবচেয়ে কম বন্ধুত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন। তার পিতার ‘অফিসিয়াল হোস্টেস’ হিসেবে ইন্দিরার সঙ্গেও সে যাত্রায় তার পরিচয় ঘটে। নিক্সন তাকে সর্বার্থে ‘বাপকা বেটি’ বলে বর্ণনা করলেও তার বুদ্ধিমত্তা ও নিষ্ঠাচারে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে লিখেছেন। ১৯৬৭ সাল তার সঙ্গে আয়ুবের আবার দেখা হয়, আবারও দুজনে মিলে বিস্তর খানা-পিনা চলে। সে কথা স্মরণ করে নিক্সন তার আত্মজীবনীতে আয়ুবকে ‘আমার বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন।

১৯৬৭ সালের সেই একই সফরে নিক্সন ভারতেও এসেছিলেন, সেটি ছিল তার ব্যক্তিগত সফর। তখন ইন্দিরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সে যাত্রায় নিক্সন ভারতীয় নেতাদের কাছ থেকে শুধু যে তেমন কোনো বিশেষ আতিথেয়তা পাননি তা-ই নয়, ইন্দিরা তার সঙ্গে সঙ্ষ্ট দূরত্বও বজায় রাখেন। সে সফরে তার একমাত্র স্মরণযোগ্য ঘটনা ছিল এক সরকারি ভোজের সময় জনৈক নিরামিষাশী ভারতীয় নেতার সঙ্গে তার কথোপকথন। সে ভদ্রলোকের নামটি পর্যন্ত নিক্সন মনে রাখার প্রয়োজন দেখেননি। বলাই বাহুল্য, ভারতীয়দের হাতে সে অবজ্ঞার অপমান নিক্সন ভোলেননি। আরো দু বছর পর, ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিক্সন ফের ভারতে বেড়াতে এলে তার প্রতি প্রটোকল-মাফিক সম্মান দেখানো হয় বটে, কিন্তু সেবারও উষ্ণতার কোনো ছাপ ছিল না। তার একটা কারণ, নিক্সনের পাকিস্তান প্রীতির কথা তত দিনে ভারতীয় নেতারা জেনে গেছেন। সে সফরের কথা স্মরণ করে কিসিঞ্জার হোয়াইট হাউস ইয়ার্স-এ লিখেছেন : ‘নিক্সনকে প্রদত্ত সরকারি ভোজ ছিল সাদামাটা, লোকসমাগম নামমাত্র এবং আলোচনা শেষে প্রদত্ত যৌথ ইশতেহার, কূটনৈতিক ভাষায়, তা ছিল গঠনমূলক ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।’

একই সময় পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিক্সন যে সংবর্ধনা পেলেন তা ছিল রীতিমতো রাজকীয়। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সেবারই প্রথমবারের মতো নিক্সনের পরিচয় হয়। প্রথম সাক্ষাতেই পাকিস্তানের সামরিক শাসকের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত হূদ্যতা গড়ে ওঠে। সে সময় চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সমর্ঙ্ক নির্মাণের ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য নিক্সন প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সামরিক শাসককে অনুরোধ করেন। ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ও তার তথ্যমন্ত্রী বাঙালি বুদ্ধিজীবী জি ডব্লিউ চৌধুরী সে কথা স্মরণ করে লিখেছেন, চীনের সঙ্গে দূতালির যে প্রস্তাব নিক্সন তোলেন, পাকিস্তানের জন্য তা ছিল যেন ঈশ্বরের কাছ থেকে পাঠানো কোনো উপহার। সামরিক শাসক হিসেবে ইয়াহিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল নামমাত্র। দেশের ভেতরেও তার কোনো জনপ্রিয়তা ছিল না। অধ্যাপক চৌধুরী লিখেছেন, ‘কিন্তু তবু নিক্সন কেন ইয়াহিয়াকে এ কাজে বেছে নেন, তা আমার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়। তিনি নিক্সনের কাছে ছিলেন সমঙ্ূর্ণ অপরিচিত, কূটনীতিতেও নবিশ।’ ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান যখন আমেরিকা বেড়াতে আসেন, হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে সে সময় তাকে নিক্সন অযাচিতভাবে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতি তার চেয়ে অধিক সদয় এমন আর কেউ কখনোই এ ভবনে অর্থাত্ হোয়াইট হাউসে ঢোকেনি।’ (অধ্যাপক চৌধুরীর বিশ্লেষণের জন্য দেখুন : রিফ্লেকশনস অন সাইনো-পাকিস্তান রিলেশনস, প্যাসিফিক কমিউনিটি, জানুয়ারি ১৯৭৬, পৃষ্ঠা-২৫৬-২৬৬)।

১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানের পক্ষে তার সুপরিচিত ‘টিলট’ বা ঝুঁকে পড়া নীতির পেছনে ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কূটনীতিতে নীতির চেয়ে ব্যক্তিগত সখ্য বরাবরই অনেক বেশি প্রভাবশালী। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ছিলেন ক্রিস্টোফার ভ্যান হলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি লিখেছেন, নিক্সনের ‘টিলট’ নীতির একটা বড় কারণ অবশ্যই চীনের সঙ্গে দূতালি। কিন্তু পাশাপাশি ভারত ও ভারতীয়দের প্রতি তার উষ্ণ মনোভাব তাতে প্রভাব ফেলেছিল, সে কথায়ও কোনো সন্দেহ নেই। সে সময় নিক্সনের কাছাকাছি এসেছে এমন যে কেউই সে মনোভাবের সঙ্গে পরিচিত ছিল। ‘ভারতীয় নেতাদের বদলে পাকিস্তানি নেতাদের প্রতি নিক্সনের কোনো পক্ষপাতমূলক মনোভাবের সঙ্গে আমি পরিচিত নই’ বলে ডিসেম্বর ১৯৭১-এ হেনরি কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের কাছে যে কথা বলেছিলেন, তা সত্যভাষণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন ভ্যান হলেন। (দেখুন : দি টিলট পলিসি ইন সাউথ এশিয়া, সাউথ এশিয়ান রিভিউ, এপ্রিল ১৯৮৯, পৃষ্ঠা-৩৪১)। ভ্যান হলেন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, হেনরি কিসিঞ্জার নিজে তার স্মৃতিকথা হোয়াইট হাউস ইয়ারস-এ লিখেছেন, ভারতের ‘জটিল ও আপাততভাবে উদ্ভূত ব্রাহ্মণ নেতাদের’ তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্ষ্ট ও খোলাখুলি সামরিক নেতৃত্বের প্রতি নিক্সন অনেক বেশি সহজবোধ করতেন।’

নিক্সন নিজেও তার স্মৃতিকতায় ইন্দিরার প্রতি তার এ মনোভাব গোপন রাখেননি। ইন্দিরাকে তিনি দু-মুখো প্রতারণাপূর্ণ ও চালবাজ বলে বর্ণনা করেছেন। নিক্সনের দাবি, ৪ ও ৫ নভেম্বর হোয়াইট হাউসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ইন্দিরা পাকিস্তান আক্রমণে আগ্রহী নন বলে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তত দিনে পাকিস্তান আক্রমণের ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। সে কথা উল্লেখ করে নিক্সন লিখেছেন : ‘যারা কোনো বাহানা ছাড়া শক্তি ব্যবহারে লিপ্ত হয়, তারা এমনিতেই খারাপ। কিন্তু যারা একদিকে শক্তি ব্যবহার করে, অন্যদিকে অপরের শক্তি ব্যবহার নিয়ে গালভরা বুলি ঝাড়ে, তারা কোনো সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য নয়।’ (পৃষ্ঠা-৫৩১)।

ইন্দিরার প্রতি নিক্সনের বিদ্বেষের একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন খোদ হেনরি কিসিঞ্জার। দি হোয়াইট হাউস ইয়ারস-এ তিনি লিখেছেন এরা দুজন যে পরসেরর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে সদাচারী হবেন না, তা অনেকটা নিয়তি-নিয়ন্ত্রিত। ইন্দিরার ছিল জন্মসূত্রে পাওয়া নৈতিক উচ্চম্মন্যতা। তার এ নাক উঁচু ব্যক্তিত্বের সামনে মুখোমুখি হলে নিক্সনের অন্তর্গত তাবত্ দুর্বলতা, তার নিরাপত্তাহীনতা ফাঁস হয়ে যেত। ইন্দিরার সঙ্গে সাক্ষাতের পর নিক্সন যেসব মন্তব্য করতেন, হেনরি কিসিঞ্জারের কথায় সেসব মুদ্রণযোগ্য নয়। নিক্সন ও কিসিঞ্জার উভয়েই দাবি করেছেন, ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তান আক্রমণ করে তা দখল করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গোপন সূত্রে তারা সে খবর তো পেয়েছিলেন, ইন্দিরার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের পর তাদের সে ধারণা আরো পোক্ত হয়।

৩. হোয়াইট হাউসে ইন্দিরা : ‘শি ইজ গোয়িং টু পে’

হোয়াইট হাউসে ইন্দিরা গান্ধী ও রিচার্ড নিক্সনের মুখোমুখি দুটি বৈঠক হয় নভেম্বরের ৪ ও ৫ তারিখে। সে সময় বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশ প্রশ্নে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ইন্দিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করছিলেন। বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের মনোভাব গঠনে এ বৈঠক দুটির কথা নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার উভয়েই বলেছেন। নিক্সন তার স্মৃতিচারণে ১৯৭১ সালের পর্ব শুরুই করেছেন সে বৈঠকের কথা দিয়ে। আর হেনরি কিসিঞ্জার তার হোয়াইট হাউস ইয়ারস গ্রন্থে ‘ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউস এলেন’ শিরোনামে সে বৈঠক বর্ণনায় বরাদ্দ করেছেন ১০ পাতা।

কিসিঞ্জারও নয়, নিক্সনও নয়, তাদের সে বৈঠকের সবচেয়ে ভালো বর্ণনা দিয়েছেন বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক সেইমোর হার্শ। তিনি লিখেছেন, নিক্সনের সঙ্গে বৈঠকে ইন্দিরার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মার্কিন নেতৃত্বকে একথা বলে যে ইয়াহিয়া খানকে যদি তার গণহত্যার পথ থেকে বিরত না করা যায়, তাহলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য। প্রথম বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ প্রশ্ন উত্থাপনের বদলে নিক্সন ভারতের সামঙ্রতিক বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতি নিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে লিখিত বিবৃতি দিলেন। জবাবে ইন্দিরা হিন্দিতে আগে থেকে লেখা বিবৃতি পাঠের বদলে ইংরেজিতে ভাষণ দেন। তাতে ১ কোটি বাঙালি উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় তার দেশ কি বিশাল সমস্যার সম্মুখীন সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, আমি এখানে এসেছি, আমাদের সমস্যা সমাধানে আপনাদের কাছ থেকে আরো গভীর উপলব্ধির আশায়, কিছু প্রাজ্ঞ বোধের সন্ধানে।

তার সে ভাষণ থেকে কারো বুঝতে বাকি থাকেনি যে ইন্দিরা নিক্সনকে কষে বকে দিয়েছেন। নিক্সন নিজেও সে কথা বুঝতে পেরেছিলেন। সে অপমানের শোধ তিনি নিলেন পর দিন, নির্ধারিত দ্বিতীয় বৈঠকের আগে। বৈঠকের সময় নির্ধারিত থাকলেও ইন্দিরাকে তিনি ৪৫ মিনিট অতিথি কক্ষে বসিয়ে রাখলেন। এমনকি কিসিঞ্জার পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছালেন না। অনেক পর একজন পদস্থ কর্মকর্তা এসে ইন্দিরাকে নিয়ে ওপরের তলায় রুজভেল্ট কক্ষে নিয়ে বসালেন। খুব যে ফলপ্রসূ আলোচনা হলো, তাও নয়। ইন্দিরা নিজে পরে এক সাক্ষাত্কারে সে বৈঠকের কথা স্মরণ করে বলেছেন, অধিকাংশ কথা কিসিঞ্জারই বলছিলেন। নিক্সন হয়তো মিনিট কয়েক কিছু একটা বললেন, তারপর কিসিঞ্জারের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী, তুমি তো কথাই বলবে হেনরি, ঠিক কিনা?’ (বিস্তারিত দেখুন : সেইমোর হার্শ, কিসিঞ্জার ইন নিক্সন হোয়াইট হাউস, সামিট বুকস, নিউইয়র্ক, ১৯৩০, পৃষ্ঠা-৪৫৫-৪৫৬)।

বিজ্ঞাপন

ইন্দিরার সঙ্গে তার সে বৈঠকের ঠিক এক মাস পর, ‘সোভিয়েত অস্ত্র বলে বলীয়ান হয়ে ভারতে পাকিস্তান আক্রমণ করে বসে’ এ কথা উল্লেখ করে নিক্সন লিখেছেন, সে বৈঠকে মিসেস গান্ধী তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধোঁকা দিয়েছেন। ভারতীয় ‘এগ্রেসন’ ও সোভিয়েত ‘এডভেঞ্চারিজম’ ঠেকানোর ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে কিসিঞ্জার এত দিন যে যুক্তি দেখিয়ে আসছিলেন, তাতে সমর্থন জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন নিক্সন। তাদের গৃহীত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ছিল সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত একটি শীর্ষ বৈঠক বাতিলের হুমকি এবং ভারত মহাসাগরে আণবিক অস্ত্রবাহী নৌ-বহর এন্টারপ্রাইজ প্রেরণ।

আমরা জানি নিক্সন হোয়াইট হাউসে তার কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করছিলেন। ইন্দিরার সঙ্গে তার বৈঠক প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের সঙ্গে তার রেকর্ডকৃত যে কথাবার্তা, তা থেকে সঙ্ষ্ট যে, সে বৈঠকে তিনি ইন্দিরার ওপর কেবল বিরক্তই হননি, তার ওপর একহাত দেখে নেবেন বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৬ ডিসেম্বর, ইন্দিরার সঙ্গে তার বৈঠকের এক মাস পর, নিক্সন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইন্দিরার আক্রমণ-বাসনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত যে পাকিস্তান আক্রমণ করবে সে কথা তিনি অনেক আগে থেকেই জানতেন। ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের পর সে ধারণা আরো পোক্ত হয়। ‘আমি এখন ভাবছি, এখানে (অর্থাত্ হোয়াইট হাউসে তার বৈঠকের সময়) ওই হতচ্ছাড়া মেয়েলোকটাকে খুব সহজে ছেড়ে দিয়েছি কি না।...ও আমাদের একেবারে বোকা বানিয়ে গেছে। কিন্তু শুনে রাখ, এর জন্য তাকে মূল্য দিতে হবে, হ্যাঁ মূল্য দিতে হবে।’ (নিক্সন টেপের ৬৩০-২০ নম্বর আলাপচারিতার, মিলার সেন্টার রিপোর্ট, হেমন্ত ২০০২ সংখ্যায় উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা-৩৫০)।

৬ ডিসেম্বর নিক্সন হোয়াইট হাউসে এনবিসিটিভির জন্য একটি সাক্ষাত্কার রেকর্ড করছিলেন। কিসিঞ্জার সে রেকর্ডিংয়ে বাধা দিয়ে তার সঙ্গে পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য নিয়ে কথা বলেন। কীভাবে কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান পাঠানো যায়, সে সমের্ক কিসিঞ্জার প্রস্তাব করলেন : ‘একমাত্র পথ হলো, তবে কাজটা আইনসম্মত হবে না (ইরানের) শাহকে (অস্ত্র পাঠাতে) বলা, পেছনের দরজা দিয়ে অস্ত্র পাঠাতে সম্মত হওয়া। তিনি (শাহ) আপনাকে এ ব্যাপারে একটি চিঠি দিয়েছেন, তাতে বলেছেন তিনি কাজটা করতে পারেন যদি এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকা কিছু না জানে এবং আমরা আমাদের মুখ বন্ধ রাখি। এ ব্যাপারে (অর্থাত্ পাকিস্তানকে সাহায্য করতে) আমাদের মতোই তিনিও আগ্রহী। এখন পথ একটাই, আর তা হলো এই কাজটা শেষ করা। আমরা বলব এ ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না, কিন্তু যত শিগগির সম্ভব ব্যাপারটা আমরা পুষিয়ে দেব।’

সে কথা শুনে নিক্সনের প্রশ্ন : কিন্তু আমরা পুষিয়ে দেব কীভাবে? কিসিঞ্জারও : ‘পরের বছর তাকে কিছু বাড়তি সাহায্য পাঠিয়ে।’ সে কথা শুনে নিক্সন বললেন : ‘ঠিক আছে, তাহলে তাই করো।’

৭ ডিসেম্বর অর্থাত্ ‘ইন্দিরাকে দেখে ছাড়বেন’ বলার এক দিন পর, নিক্সন ভারতে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধের নির্দেশ দেন। কংগ্রেসের ভেতরে তার সে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ উঠলে নিক্সন বললেন, যে যাই বলুক, আমি সে সিদ্ধান্ত বদলাব না।

সে কথার জবাবে কিসিঞ্জার তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কোনো অবস্থায় না?’

নিক্সনের জবাব : ‘না, মহাশয়, আমি (কোনো অবস্থায়) তা করব না। এসব হারামি যেমন কাজ করেছে, এখন তার সমুচিত জবাব পাবে।’

শুধু যে অস্ত্র পাঠিয়ে নিক্সন, কিসিঞ্জার ক্ষান্ত হলেন, তা নয়। তারা আরো এক উপায়ে পাকিস্তানকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১০ ডিসেম্বর, নিক্সন কিসিঞ্জারকে বললেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানকে (সরাসরি) অস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে কংগ্রেসকে রাজি করানো যাবে না। সে ক্ষেত্রে আমরা কী করব জানো? ওদের (অর্থাত্ পাকিস্তানকে) বিস্তর অর্থনৈতিক সাহায্য দেব, কী বলো? আর সে সাহায্য তারা চায় তো অস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহার করুক, সেটা তাদের ব্যাপার। আমরা তো ভারতীয়দের জিজ্ঞেস করিনি যখন তারা রুশিদের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র-শস্ত্র কিনছিল?’

৪. মঞ্চের পেছনে কিসিঞ্জার

একাত্তরের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন নীতির একটি আগ্রহোদ্দীপক দিক হলো, সে সময় মার্কিন প্রশাসনের ভেতর প্রেসিডেন্ট ও তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা ছাড়া অন্য বড় কোনো কর্তাব্যক্তিই পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনে আগ্রহী ছিলেন না। উল্টো, পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রায় সবাই-ঢাকায় কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ও তার সহকর্মীরা, দিল্লিতে রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং, খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য-খোলামেলাভাবে নিক্সনের পাকিস্তান-তোষণ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। ঢাকা থেকে ব্লাড ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠানো এক তারবার্তায় লেখেন, ‘আমাদের সরকার গণতন্ত্র পদদলিত হওয়া সত্ত্বেও তার প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে।’ এই তারবার্তায় বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা বর্ণনা করতে গিয়ে ‘জেনোসাইড’ শব্দটি প্রথমবারের মতো ব্যবহূত হয়। দিলি থেকে রাষ্ট্রদূত কিটিং পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সের কাছে যে জরুরি তারবার্তাটি পাঠান তাও কম কঠোর ছিল না। গণহত্যার সঙ্গে কোনোরকম সমর্ঙ্ক না রাখার বিরুদ্ধে যুক্তি দেখিয়ে কিটিং লেখেন, ‘এখন ন্যায়-নীতির পক্ষে থাকাই হবে আমেরিকার জন্যে সেরা পথ’। কংগ্রেসের উভয় কক্ষই সে সময় উদারনৈতিক ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণে। তাদের অধিকাংশ সদস্যই নিক্সন-কিসিঞ্জারের পাকিস্তান-তোষণ নীতি ভালো চোখে দেখেননি। উদ্বাস্তুবিষয়ক উপকমিটির প্রধান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এ সময় সবচেয়ে কঠোর ভাষায় নিক্সন প্রশাসনের সমালোচনা করেন। নিউইয়র্ক টাইমসসহ অধিকাংশ মার্কিন পত্রপত্রিকার ভূমিকাও ছিল অভিন্ন।

কিন্তু তা সত্ত্বেও নিক্সন-কিসিঞ্জার গণহত্যার নিন্দার বদলে একদিকে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন, অন্যদিকে ভারতের সমালোচনার পথ ধরলেন। তাদের দুজনের চোখই তখন চীনের দিকে। নিক্সন জানতেন, চীনের সঙ্গে মৈত্রী হবে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সোনার চাবিকাঠি। অন্যদিকে কিসিঞ্জার হিসেব করে রেখেছেন, তার হাত দিয়ে চীনের বন্ধ দরজা খোলা সম্ভব হলে ইতিহাসে তার স্থান হবে সুনিশ্চিত। কিন্তু তারা দুজনই মুখে বললেন অন্য কথা। যুুক্তি দেখালেন, ভারতের প্রভাবে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে-পাকিস্তানের বিভক্তি ঘটার অর্থ দাঁড়াবে এরপর যেকোনো বড় দেশ কোনো ছোট দেশকে তার ইচ্ছেমতো কাটাছেঁড়া করবে, তা বাধা দেওয়ার পথ থাকবে না। দিল্লি ও মস্কো তাদের সে চেষ্টায় সফল হলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বলয়ও বিস্তৃত হবে। আমেরিকার নিজের স্বার্থেই তার বিরোধিতা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ প্রশ্ন নিয়ে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হাত মিলিয়েছে। তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমেরিকাকে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সমর্ঙ্ক দৃঢ় করতে হবে।

আমেরিকা যে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করবে-পরিস্থিতি অন্য যে নীতি বা ব্যবস্থাই দাবি করুক না কেন-সে কথা ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদস্যদের জানিয়ে দেওয়া যায়। কিসিঞ্জার পাকিস্তানের পক্ষে আমেরিকার ‘টিলট’ বিষয়ে প্রথম নীতি-নির্দেশনা দেন ১৯৭১-এর ৬ মার্চ, তার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম নীতিনির্ধারক কমিটি সিনিয়র পলিসি গ্রুপের বৈঠকে। সে বৈঠকে কিসিঞ্জার ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কিসিঞ্জারের ‘সেঙ্শাল রিলেশনশিপ’-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সংযত আচরণের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের ওপর কোনোরকম চাপ প্রয়োগে প্রেসিডেন্ট নিক্সন আগ্রহী হবেন না। অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত যদি এ ব্যাপারে নাক গলায় (অর্থাত্ পাকিস্তানকে সাবধান করে দেয়), তাহলে ইয়াহিয়া তার ‘থোড়াই কেয়ার’ করবে বলে কিসিঞ্জার মন্তব্য করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধিকাংশ কর্মকর্তাই একটি সামরিক সরকারের প্রতি এ ধরনের প্রকাশ্য সমর্থন প্রকাশে অনাগ্রহী ছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানে একটি সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করেছে। তাকে আমেরিকার কোনো অবস্থায় সমর্থন করা উচিত নয়। অন্যদিকে ভারত একটি প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রকে সমর্থন জানানো, তাকে উত্সাহ যোগান, আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কারণেই দরকার। তারা নিদেনপক্ষে চলতি রাজনৈতিক জটিলতার মুখে কোনো পক্ষাবলম্বন না করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং পাকিস্তানে কোনোরকম সামরিক সরঞ্জাম প্রেরণে তীব্র বিরোধিতা করেন। চীনের সঙ্গে গোপন দূতালির খবর জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত কার্যত কেউই জানতেন না, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সও নন। ফলে নিক্সন-কিসিঞ্জার কোন ‘সেঙ্শাল রেলেশনশিপ’-এর কথা বলছেন, তা তাদের পক্ষে ঠাহর করা অসম্ভব ছিল। বাংলাদেশ প্রশ্নে রজার্স ও কিসিঞ্জারের মধ্যে বিরোধ যখন তুঙ্গে, সে সময় ২ মে ১৯৭১ নিক্সন নিজ হাতে লিখে একটি নির্দেশনামা প্রেরণ করেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের উদ্দেশে পাঠানো সে নির্দেশনামায় নিক্সন লিখলেন : To all hands. Don’t squeeze Yahya at this time. RN অন্যত্র নিক্সন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদস্যদের এই বলে নির্দেশ দিয়েছেন যে, ‘এই সময় আমরা এমন কিছুই করব না যা ইয়াহিয়ার জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তোলে অথবা তাকে বিব্রত করে।’ তার স্মৃতিকথায় অবশ্য নিক্সন বাংলাদেশ সমস্যাটিকে দুই পরাশক্তির ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করে আমেরিকার নীতির সমর্থনে সাফাই গেয়েছেন এইভাবে :

‘(১৯৭১-এর) ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ কী হবে না হবে, তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত ছিল। বড় কোনো দেশ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে তাদের প্রতিবেশী ক্ষুদ্র দেশের ওপর চড়াও হয়ে তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে তা সহ্য করা হবে কি না, সেটাই ছিল আসল প্রশ্ন। একবার যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় তাহলে পৃথিবী অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’ (পৃ. ৫৩০)

অন্যদিকে কিসিঞ্জার লিখছেন :

“পূর্ব পাকিস্তানকে ‘রক্ষা’ করার কোনো প্রশ্ন এখানে উঠছে না। নিক্সন ও আমি উভয়েই মেনে নিয়েছিলাম যে (বাংলাদেশের) স্বাধীনতা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করা, কারণ আমাদের বিবেচনায় ভারতের আসল উদ্দেশ্য পাকিস্তানের বিলুপ্তি। সোভিয়েত অস্ত্রের ঝনঝনানি ও কূটনৈতিক সমর্থনের জোরে কোনো দেশের বিভক্তি সম্ভব, এ ধারণা রোধও আমাদের লক্ষ্য ছিল। ৪ ডিসেম্বর আমি নিক্সনকে ঠিক এ কথাই বলেছিলাম যে, ভিয়েতনাম থেকে আমাদের প্রত্যাহারের সময় কোনোভাবেই এ ধারণা দেওয়া যাবে না যে, নগ্ন শক্তির ব্যবহারে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। যুদ্ধ ঠেকানো এখন আর সম্ভব না হলেও আমাদের চেষ্টার তীব্রতার ভেতর দিয়ে সোভিয়েতরা যাতে আরো নতুন কোনো অভিযানে নেমে না পড়ে সে ব্যাপারে তাদের হুঁশিয়ার করা যাবে।” (পৃ. ৮৮৬-৮৮৭)

পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করতে যেয়ে কিসিঞ্জার ইয়াহিয়াকে সত্য-মিথ্যা নানা আশ্বাস দিয়েছিলেন, যা ১৯৭১-এর সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের বদলে তার রক্তাক্ত পরিণতি অনিবার্য করে তোলে। জুলাই ১৯৭১-এ চীন যাওয়ার পথে পাকিস্তান এলে ইয়াহিয়া খানকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, ভারত কর্তৃক পাকিস্তান আক্রান্ত হলে, যুক্তরাষ্ট্র বসে থাকবে না। জি ডব্লিউ চৌধুরী সে কথা স্মরণ করে লিখেছেন, আমেরিকার কাছ থেকে সে ধরনের সমর্থন ও উত্সাহ না পেলে ইয়াহিয়া হয়তো আরো অনেক সমঝে, বুঝে-শুনে পা ফেলতেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চীনের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময়েও কিসিঞ্জার ‘ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে’ পাকিস্তানকে সাহায্য করার ব্যাপারে চীনা নেতৃত্বকে উত্সাহিত করেছিলেন। চীন তোমাদের সঙ্গে আছে, এই মর্মে একটি বার্তাও ইয়াহিয়ার জন্য তিনি বয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তার সে কথায় সত্যের চেয়ে কল্পনাই ছিল বেশি। পাকিস্তানি কূটনীতিক সুলতান খান তার স্মৃতিকথা, মেমরিস অ্যান্ড রিফ্লেকশনস অব এ পাকিস্তানি ডিপোম্যাট গ্রন্থে (দি লন্ডন সেন্টার ফর পাকিস্তান স্টাডিস, লন্ডন, ১৯৯৭) লিখেছেন, চীন থেকে তার গোপন সফর শেষে ইসলামাবাদে ফিরে কিসিঞ্জার ইয়াহিয়াকে বলেছিলেন, ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে তাহলে চীন সৈন্য ও অস্ত্র নিয়ে পাল্টা আঘাত হানবে। কিন্তু খান সে কথা চীনা প্রতিশ্রুতির বিকৃত ব্যাখ্যা বলে লিখেছেন। চৌ এন লাই যা বলেছিলেন তার মর্মকথা হলো, পাকিস্তান আক্রান্ত হলে চীন ‘মুখ বুজে দর্শক হয়ে থাকবে না, সে পাকিস্তানকে সমর্থন করবে।’ খান নিজে চৌর সঙ্গে সে বছর এপ্রিলে দেখা করেছিলেন, তখন চৌ তাকে একবারের জন্যও সামরিকভাবে সমর্থনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি (দেখুন, সুলতান খান, পৃ. ৩০৮)।

ভারত পশ্চিম পাকিস্তান দখলে উদ্যত, এমন একটি তথ্য নিক্সন-কিসিঞ্জার কোথা থেকে পেলেন তা সুনিশ্চিত নয়। সমঙ্রতি উন্মুক্ত ব্রিটিশ নথিপত্র থেকে দেখা যায়, ১৯৭১-এর মাঝামাঝি লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় ইন্দিরা পাকিস্তান আক্রমণের ব্যাপারে তার ক্যাবিনেটের ভেতর থেকে চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তেমন আক্রমণে উদ্যত, এমন কথা কোথাও বলেননি। ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে সিআইএ একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, ভারত পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সে প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাকিস্তান আক্রমণের ব্যাপারে তাদের তথ্যের সূত্র হিসেবে কিসিঞ্জার ও নিক্সন উভয়েই ভারত সরকারের ভেতর তাদের নিজস্ব উেসর কথা বলেছেন। কিসিঞ্জার লিখেছেন, ‘এমন এক সূত্র মারফত আমরা যুদ্ধপ্রস্তুতির খবর পেয়েছিলাম, যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আমার এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহ নেই।’

সেইমোর হার্শ তার কিসিঞ্জার ইন দি নিক্সন হোয়ইট হাউস গ্রন্থে এই সূত্রটি যে প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইর, সে ব্যাপারে তিনি সুনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন। ইন্দিরার সঙ্গে দেশাইয়ের দ্বন্দ্ব সুপরিচিত। ইন্দিরার মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে তিনি একটি পাল্টা মোর্চার প্রধান হিসেবে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। হার্শ জানিয়েছেন, জনসন প্রশাসনের সময় থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশাই সিআইএ-র হয়ে ‘পেইড ইনফরমার’ হিসেবে কাজ করেছেন এবং এজন্য বছরে ২০ হাজার ডলার উেকাচ পেতেন। মোরারজি দেশাই মারফত যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারে গোপন কোনো খবর যদি এসেও থাকে, তার সত্যতা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার বদলে নিক্সন ও কিসিঞ্জার দুজনই তাকে একমাত্র সত্য বলে ধরে নিলেন। পরে ভ্যান হলেন লিখেছেন, সে সময় হোয়াইট হাউসের ভেতর একমাত্র নিক্সন ও কিসিঞ্জারই গোপন সূত্র থেকে পাওয়া সে খবরের সত্যতা নিয়ে নিঃসন্দেহ ছিলেন। আর কেউই তা বিশ্বাস করেনি।

একাত্তর প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের আরেকটি মিথ্যাচার, ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রশ্নের সমাধান সম্ভব ছিল বলে তার দাবি। সে উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইসলামাবাদের ওপর চাপ দিচ্ছিল, অন্যদিকে কলকাতায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টায় ছিল বলে কিসিঞ্জার দাবি করেছেন। এই গোপন চেষ্টার সফলতা বিষয়ে কিসিঞ্জার এতটাই সুনিশ্চিত যে, তিনি দাবি করেছেন আমেরিকার অনুসৃত নীতির সফলতায় ভীত হয়েই ভারত তড়িঘড়ি করে পাকিস্তান আক্রমণ করে বসে। তার বিবেচনায়, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সে যুদ্ধ শুরু হয় ২২ নভেম্বর। সেই তারিখে ভারত মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বলে মার্কিন সূত্র থেকে জানানো হয়। কিন্তু পাক-ভারত যুদ্ধ হয়, আরো পরে ৩ ডিসেম্বর এবং সে যুদ্ধের সূত্রপাত করে ভারত নয়, পাকিস্তান। সে কথায় পরে আসছি।

কিসিঞ্জার তার গ্রন্থে নাম উলেখ না করলেও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মার্কিন যোগাযোগ-চেষ্টা যে খন্দকার মুশতাকের সঙ্গে, তা আমরা এখন জানি। আমরা এও জানি যে, কলকাতায় মার্কিন কনসুলেটের মাধ্যমে সে ব্যাপারে যোগাযোগ স্থাপিত হলেও আলোচনা মোটেই তেমন অগ্রসর হয়নি।

অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার সে যোগাযোগ কখনো সমর্থন করেনি এবং মুশতাক তার সহকর্মীদের কাছে এজন্য সমালোচিত হন। ভারত সরকারও সে যোগাযোগের কথা জানতে পেরে আপত্তি করে। তা ছাড়া পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান বাঙালি নেতৃত্বের ভেতর কখনোই গৃহীত হতো না, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই। (বিস্তারিত দেখুন : মূলধারা, মইদুল ইসলাম, ঢাকা, ১৯৮৬, পৃ. ৮৮-৯০)। ফলে সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ ঠেকানো যেত বলে কিসিঞ্জার যত সাফাই গান না কেন, তা খুব বাস্তবসম্মত নয়। তার একটা প্রধান কারণ, ইয়াহিয়া ও পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব শেখ মুজিব ও আওয়ামী লিগ নেতৃত্বের সঙ্গে কোনোরকম সমঝোতার সমঙ্ূর্ণ বিরোধী ছিলেন।

দেশাই ভারতের পাকিস্তান আক্রমণবিষয়ক যে খবরই দেন না কেন, বাস্তবে ঘটনা ঘটেছিল সমঙ্ূর্ণ ভিন্ন। ডিসেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তানই আকস্মিকভাবে ভারত আক্রমণ করে বসে। আবার বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের এক দিন পর ভারত এককভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর তার সামরিক চাপ সে সময়ে অনায়াসেই বাড়াতে পারত, কিন্তু সে যে তা করেনি তার একটি সম্ভাব্য কারণ, পশ্চিম পাকিস্তান ভেঙে চার বা পাঁচ টুকরা হলে ভারতের ওপরও তার প্রভাব পড়ত। দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের রাজ্যসমূহে সে সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করেছিল। পাকিস্তানের বিভক্তি সে প্রবণতাকে কেবল বাড়তি শক্তি যোগাত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভ্যান হলেনও তেমন একটি সম্ভাবনার কথা তার বিশেষণে উলেখ করেছেন। ভারতীয় সাংবাদিক-লেখক প্রাণ চোপড়াকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, পাক-ভারত যুদ্ধের বিস্তৃতির বিরুদ্ধে সে সময় সঙ্ষ্ট জনমত ছিল। জাতিসংঘের ভেতর এক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া ভারতের পক্ষাবলম্বন করেছিল এমন দেশের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ‘এ অবস্থায়, বিরুদ্ধ-আন্তর্জাতিক মনোভাবের কথা বিবেচনা করে, ভারত নিজ থেকেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে’ (দেখুন : প্রাণ চোপড়া, ইন্ডিয়াস সেকেন্ড লিবারেশন, ১৯৭৪, পৃ. ২১২-২১৩)।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কিসিঞ্জার ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ‘ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিং’-এ নিজেই স্বীকার করে নেন, সমঝোতার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা মোটেই তেমন অগ্রসর হয়নি। তিনি প্রথম দাবি করেন, শেখ মুজিবের সম্মতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে আলাপ-আলোচনায় তারা উত্সাহ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের সম্মতি তারা পাননি, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি এ কথাও বললেন যে, তার আইনজীবীর মধ্যে শেখ মুজিবের সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি তারা ইসলামাবাদ থেকে পেয়েছেন। ইসলামাবাদ কি মুজিব কর্তৃৃৃৃৃৃৃৃক অনুমোদিত প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে সম্মত হয়েছে? একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলেন। জবাবে কিসিঞ্জার বললেন :

‘না, আমরা সে পথেই আগাচ্ছিলাম। তারা বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছিল। তারা বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতেও সম্মত হয়েছিল।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কীভাবে এত নিশ্চিত হলেন যে, এই আলোচনা-যার ব্যাপারে আপনার কাছে কোনো নিশ্চয়তাই ছিল না- তার ফলাফলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ‘অটোনমি’ অর্জন সম্ভব হবে?

কিসিঞ্জার : না, আমি বলিনি ব্যাপারটা তাই ঘটেছিল। আমি বলেছি যে (এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে) আমরা তার সমর্থন করব, আমরা পাকিস্তানের ওপর আমাদের প্রভাব খাটাব যাতে তেমন ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (টাইম-টেবিল) ব্যাপারেও কথা বলতে আগ্রহী ছিলাম।

প্রশ্ন : কিন্তু আমি তো শুনলাম আপনি বলেছেন (তেমন ফলাফল) একদম নিশ্চিত?

কিসিঞ্জার : আমি বলেছি যে, আমাদের বিবেচনায় (এই আলাপ-আলোচনার) নিশ্চিত ফলাফল হতো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বাধিকার। এ ব্যাপারে আমরা পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তারা বৈদেশিক নীতি, প্রতিরক্ষা ও অর্থ ছাড়া অন্য সব প্রশ্নে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ (‘অটোনমি’) ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিল।

প্রশ্ন : তার মানে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আলাপ-আলোচনায় আমরা বেশ গভীরভাবে জড়িত ছিলাম?

কিসিঞ্জার : না, মূল বিষয়ে নয়।

প্রশ্ন : মানে, অটোনমি ইত্যাদি প্রশ্নে (আলোচনায় আমরা তাহলে জড়িত) ছিলাম না?

কিসিঞ্জার : সত্যি বলতে কি, (এ সব প্রশ্নে) কোনো আলাপ-আলোচনা শুরুই হয়নি।

(দেখুন : http://www.gwu.edu/@nsarchiv/NSAEBB/NSAEBB79)

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বিখ্যাত সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসন তার সিন্ডিকেটেড কলামে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করার ব্যাপারে কিসিঞ্জার একের পর এক যে নির্দেশ ও সাফাই দিয়ে যান, তার প্রকাশ করা শুরু করেন। তার কলাম থেকেই জানা যায়, ৩ ডিসেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নীতিনির্ধারণী কমিটির এক বৈঠকে কিসিঞ্জার দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন চান যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করুক। সে বৈঠকে কিসিঞ্জার বললেন :

‘প্রেসিডেন্ট প্রতি আধঘণ্টা অন্তর আমার ওপর তার ক্রোধ প্রকাশ করছেন, তিনি বলছেন আমরা ভারতের ওপর যথেষ্ট কঠোর হচ্ছি না। তিনি এই মাত্র আমাকে আবার ডেকেছিলেন। আমরা তার নির্দেশ পালন করছি বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি চান আমরা যেন পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করি। কিন্তু আমরা এখন যা করছি তা সবই তার সে নীতির বিপরীত বলে তার ধারণা।’

পত্রিকার পাতায় তার নিজের বলা কথা অক্ষরে অক্ষরে ফাঁস হয়ে গেলে কিসিঞ্জার প্রচণ্ড বিপাকে পড়ে যান। তার এই বিষোদগারের মাত্র কয়েক দিন আগে তথ্যমাধ্যমের কাছে এক সাক্ষাত্কারে তিনি দাবি করেছিলেন, পাক-ভারত প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমঙ্ূর্ণ পক্ষপাতহীন। অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা নথিপত্র থেকেই প্রথম জানা যায়, জর্দান ও ইরানের মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র প্রেরণে উত্সাহ জুগিয়েছেন কিসিঞ্জার। অ্যান্ডারসানের ফাঁস করা নথিপত্রে হোয়াইট হাউসের ভেতর স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তাও সবিস্তারে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এ সবকিছুই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিক্সনের সততা ও যোগ্যতা নিয়ে সংশয়ের জন্ম দেয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ফলে অবশ্য সে প্রশ্ন অল্প কিছু দিনের মধ্যে আরো ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

৫. উপসংহার

তারা ১৯৭১ কেন, বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান না নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করলেন, তার ব্যাখ্যা হিসেবে নিক্সন ও কিসিঞ্জার দুজনই মোটামুটি একই কথা বলেছেন। কিসিঞ্জার তার গ্রন্থের প্রায় ৭৬ পাতা ব্যয় করেছেন তার অনুসৃত নীতির সাফাই গাইতে। সে নীতির পক্ষে তার যুক্তি ছিল দ্বিবিধ :

এক. চীনের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের ব্যাপারে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট তাদের একমাত্র যোগসূত্র, যেকোনো মূল্যে সে সূত্র অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

দুই. মুখে যা-ই বলুক, ভারত (পশ্চিম) পাকিস্তানকে গ্রাস করতে বদ্ধপরিকর এবং ভারতের পেছনে ছাতা ধরে আছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত তার সে চেষ্টায় সফল হলে দক্ষিণ এশিয়ার এক বিরাট এলাকায় সোভিয়েত-ভারত প্রভাব সুনিশ্চিত হবে এবং আমেরিকার স্বার্থ বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হবে।

রুশ-ভারতকে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যত্র তাদের মিত্রদের চোখেও খেলো হয়ে যাবে।

কিসিঞ্জার ও নিক্সনের ব্যাখ্যায় চীনের সঙ্গে যোগাযোগ সে সময় আমেরিকার জন্য সবচেয়ে প্রধান জাতীয় স্বার্থ ছিল। চীনের সঙ্গে যোগসূত্র হিসেবে পাকিস্তানের গুরুত্ব ছিল, সে কথাও ঠিক, কিন্তু ইয়াহিয়া সে যোগাযোগের একমাত্র সূত্র ছিলেন, এ কথা মোটেই সত্য নয়। ১৯৬৯ সালে তেমন যোগাযোগের সম্ভাবনা নিক্সন খুঁজে দেখা শুরু করেন, তখন তিনি শুধু যে ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন তা-ই নয়, রুমানিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই চশেস্কুকেও করা হয়েছিল। বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদ করায় পাকিস্তান যদি চীনের সঙ্গে দূতালিতে আপত্তি করত, তাহলে রুমানিয়ার মাধ্যমে সে যোগাযোগ অনায়াসে রক্ষা করা সম্ভব হতো। জুলাই মাসে ইয়াহিয়ার ব্যক্তিগত তদারকিতে কিসিঞ্জারের পক্ষে পিকিং সফর সমঙ্ন্ন হয়, এ কথা ঠিক। কিন্তু একবার সে যোগাযোগ সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সে ব্যাপারে ইয়াহিয়ার আর কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করার জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওপর তিনি চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

এ কথা ঠিক, ১৯৭১-এ রুশ-ভারত আঁতাত গড়ে ওঠে, আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য তা ছিল হুমকিস্বরূপ। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না, আমেরিকা চীনের সঙ্গে গোপন আঁতাতের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং পাকিস্তান তাতে মদদ যোগাচ্ছে, সে কথা ফাঁস হওয়ার পরই ভারত সোভিয়েতের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভারত স্বাভাবিকভাবেই সে চুক্তি রাজনৈতিক-সামরিক ফায়দা আদায়ের তালে ছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ছাড়া আর সবাইকে ঝেড়ে ফেলতে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ভ্যান হলেন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর তাসখন্দ চুক্তির সময় থেকে পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সমর্ঙ্ক ধরে রাখার ব্যাপারে সোভিয়েতরা আগ্রহী ছিল। ১৯৭১-এ তারা অবশ্যই ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বন করে, বিশেষত জাতিসংঘের ভেতর তারা একের পর এক ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি জিইয়ে রাখে। কিন্তু একবার ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর পতনের পর সোভিয়েতরা ভারত যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে আক্রমণ অব্যাহত না রাখে এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় সম্মত হয়, সে ব্যাপারে নয়াদিলির ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করে (দেখুন : ভ্যান হলেন, পৃষ্ঠা. ৩৫৫-৩৫৬)

১৯৭১-এ বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন কূটনীতির ব্যর্থতা প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা কিসিঞ্জারের জন্য ছিল প্রবল পরাজয়। কিন্তু সে পরাজয় শুধু যে নীতিগত ছিল তা-ই নয়, তাদের দুজনের জন্য তা ছিল এক রীতিমতো ব্যক্তিগত বিপর্যয়স্বরূপ। সেইমোর হার্শ লিখেছেন, চীনের সঙ্গে দরজা খোলা নীতি অনুসরণ করতে যেয়ে একসময় যে নীতি শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের প্রতি পক্ষাবলম্বন-টিলট হিসেবে, তা-ই শেষমেশ হয়ে দাঁড়াল আমেরিকার জাতীয় নীতিতে। ভারতীয় ব্রাহ্মণবাদের বিরুদ্ধে তার অপছন্দ দিয়ে যে নীতির শুরু, তা-ই শেষ পর্যন্ত উন্নীত হলো ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিশোধপরায়ণতায় (হার্শ, পৃ. ৪৫৬)।

আমরা জানি নিক্সন বা কিসিঞ্জার কেউই বাংলাদেশের সৃষ্টি চাননি, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতেও পারেননি। কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টি ঠেকাতে ব্যর্থতার চেয়েও বড় ব্যর্থতা ছিল তাদের পেশাদারি যোগ্যতার অভাব ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাদের নৈতিক ভারসাম্যতা প্রদর্শনে ব্যর্থতা। বাংলাদেশ প্রশ্নে পাক-ভারত যুদ্ধ একটি আঞ্চলিক সমস্যা, তাকে বিশ্বসমস্যা পর্যায়ে নিয়ে যেয়ে একটি আণবিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার মতো হঠকারিতা যারা দেখাতে পারে, তাদের আর যা-ই হোক রাষ্ট্রনায়ক বলা যায় না।

বাংলাদেশ নিয়ে এই বিপর্যয় নিক্সন-কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত সমের্কও চিড় ধরে। নিক্সন সব দোষ চাপাতে চাইলেন কিসিঞ্জারের ওপর। ব্রেজনেভের সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠক বাতিলের যে ইঙ্গিত কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের কাছে করেন, নিক্সন তাতে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছিলেন। এমন কোনো সিদ্ধান্ত তখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি, অথচ তার সঙ্গে কোনো মতবিনিময় ছাড়াই ১৪ ডিসেম্বর কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের কাছে সে কথা বলে বসেন। কিসিঞ্জার লিখেছেন, এর পর থেকে ব্যর্থতার সকল দায়ভার ফেলা হয় তার ঘাড়ে। মার্কিন নীতি হয়ে দাঁড়াল কিসিঞ্জারের নীতি। পত্রপত্রিকায় যখন এ রকম লেখালেখি শুরু হয় যে, কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্টের কাছে তার সমর্থন হারিয়েছেন, তার প্রতিবাদেও হোয়াইট হাউস থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তার সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ করে দেন নিক্সন। তার নিরাপত্তা উপদেষ্টার ওপর নিক্সনের বিরাগ এতটা প্রবল হয়ে ওঠে যে, তিনি এ রকম কানাঘুষাও শুরু করেন যে, কিসিঞ্জার মানসিক বৈকল্যের শিকার। তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি তার চিফ অব স্টাফকে নির্দেশও দিয়েছিলেন। অবশাদগ্রস্ত ও হতাশ কিসিঞ্জার তার ওপর এই অব্যাহত চাপ সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ করতে চান বলে এ সময় তার একাধিক সহকর্মীদের কাছে মন্তব্য করেন।

কিন্তু একাত্তরের বাংলাদেশ প্রশ্নে নিক্সন-কিসিঞ্জারের আসল ব্যর্থতা, একটি সঙ্ষ্ট ও সর্বাত্মক গণহত্যার মুখে তার প্রতিবাদের বদলে সে গণহত্যার জন্য দায়ী এক স্বেচ্ছাচারী সামরিক শাসকের পক্ষাবলম্বন। ভ্যান হলেন একে ‘আন্তর্জাতিক সমের্কর ক্ষেত্রে মানবিক সমীকরণ অনুধাবনে ব্যর্থতা’ বলে বর্ণনা করেছেন। ‘মানবিক সমর্থনের বদলে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে নীতি নিক্সন-কিসিঞ্জার গ্রহণ করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় তার বিপর্যয়কারী ফলাফল থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি আর কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারেনি।