default-image

১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশ-সংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের সামাজিক ভিত্তি সমের্ক আপনাদের কাছে কিছু বলতে চাই। প্রশ্ন উঠতে পারে, এখন যেখানে এসব মূলনীতির বড়রকম হেরফের হয়ে গেছে, সেখানে আর এ-বিষয়ে আলোচনা করে লাভ কী! লাভক্ষতির বিবেচনা মুলতবি রেখে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বা তার আগে দেশের যে-সম্ভাব্য রূপটি আমাদের মনে ধরা হয়েছিল, তার সঙ্গে এসব মূলনীতির সাযুজ্য কতটা ছিল, সে-সন্ধান প্রাসঙ্গিক। তাহলে আমাদের স্বপ্নের বা কল্পনার বাংলাদেশের কত কাছে বা তার থেকে কত দূরে আমরা চলে এসেছি, তা পরিমাপ করা সহজ হয়। অন্য একটি কারণেও বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। দেশী-বিদেশী পণ্ডিতদের অনেকে এইসব মূলনীতিকে আরোপিত বলে যে-ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করেছেন, তারও নিরসন হওয়া দরকার। যেমন কেউ কেউ বলেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সরকার যেহেতু সে-সময়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং স্বাধীনতা লাভের জন্য যেহেতু তারা ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন, সেহেতু বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সংস্রবহীন দুটি নীতি-ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র-তারা নিজেদের আদর্শ বলে প্রচার করতে একরকম বাধ্য হয়েছিলেন, কিংবা এক ধরনের আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ ওই নীতিদুটি তারা সংবিধানে গ্রহণ করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এসব নীতির সঙ্গে আমাদের জনসাধারণের সমঙ্ৃক্ততার বিষয়টিই আজ আমার বলবার মুখ্য বিষয়। তবে তার আগে ভারতের সংবিধান সমের্ক একটি কথা বলে নিই। স্বাধীনতালাভের পর থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত ভারতীয় নেতারা দেশের লক্ষ্য হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে এসেছেন, একটা বড় রাষ্ট্রায়ত্ত খাত গড়বার চেষ্টা করেছেন এবং সামঙ্রদায়িকতা রোধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে যখন ভারতের সংবিধান রচিত হয়, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশক নীতিগুলোর মধ্যে সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ ছিল না। সংবিধানের প্রস্তাবনায় দেশের রূপ স্থির হয়েছিল সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র (ঝড়াবত্বরমহ ফবসড়পত্ধঃরপ ত্বঢ়ঁনষরপ) বলে। কেবল দ্বিচত্বারিংশ সংশোধনীর দ্বারা ১৯৭৭ সালে তা বদল করে সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র (ঝড়াবত্বরমহ ংড়পরধষরংঃ ংবপঁষধত্ ফবসড়পত্ধঃরপ ত্বঢ়ঁনষরপ) করা হয়। আশা করি, কোনো গবেষক এ কথা বলবেন না যে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ভারতের এক পদক্ষেপমাত্র।

অন্যদিক দিয়ে মূল বিষয়টি বিচার করা যাক। মুক্তিযুদ্ধকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আমাদের রাষ্ট্রের তিনটি নীতি বা আদর্শের কথা বলেছিলেন বারবার-গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে বঙ্গবন্ধু এই তিন নীতির সঙ্গে যোগ করেন আরো একটি-জাতীয়তাবাদ। এখনো অবশ্য কেউ বলেননি যে, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার ফলে পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত ভারতের থেকে স্বাতন্ত্র্যসূচক এই জাতীয়তাবাদের মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন তিনি।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার উত্স সন্ধান করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭১-এরও অনেক আগে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসের মধ্যেই তার সূত্রগুলো নিহিত আছে। ভারতীয় মুসলমানেরা স্বতন্ত্র জাতি এবং তাদের পৃথক বাসভূমি চাই-এই প্রত্যয় ও দাবির ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানের। কিন্তু পাকিস্তান-সৃষ্টির আগেই-মাউন্টব্যাটেন-পরিকল্পনা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই-বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার যে-দাবি ওঠে, তার মধ্যেই ছিল স্বতন্ত্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের অঙ্কুর। আর এ ব্যাপারটিও আকস্মিক ছিল না। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা যে উর্দু নয়-বাংলা, সমাজে এ-সত্য প্রতিষ্ঠা করতে অনেকদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে এসেছিলেন বাঙালি মুসলমান লেখক-সাংবাদিকেরা। সে-চেষ্টায় তারা সফলও হয়েছিলেন। ১৯১৮ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বলেছিলেন যে, ইতিহাসের সূচনা থেকেই বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা ছিল, আছে এবং থাকবে। একই সময়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলার প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। আর আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, বাংলা কেবল বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা নয়, হিন্দু-মুসলমান মিলিত বাঙালির জাতীয় ভাষা। ‘জাতীয় ভাষা’র প্রশ্নে অনেক বিতর্ক হয়েছিল-কেউ বলেছিলেন, আমাদের জাতীয় ভাষা আরবি, আবার কেউ বলেছিলেন, আরবি মুসলমানের বিশ্বজনীন ভাষা, কিন্তু আমাদের জাতীয় ভাষা বাংলাই। ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জাতীয়তার এই মেলবন্ধনের আরেকটি প্রয়াস দেখা যায় সোহ্রাওয়ার্দী-শরত্ বসুর অখণ্ড ও সার্বভৌম বঙ্গ গঠনের দাবিতে। যে-সোহ্রাওয়ার্দী শুদ্ধ বাংলা বলতে পারতেন না, তিনিও তখন বাঙালি সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছিলেন এবং তাদের পরিকল্পিত রাষ্ট্রকে অভিহিত করেছিলেন এক ভাষাভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র (সড়হড়ষরহমঁরংঃরপ ঁহরভরবফ ংঃধঃব) হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বঙ্গবিভাগ যখন অবশ্যম্ভাবী বলে প্রতীয়মান হলো, তখন-পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার আগেই-আবদুল হক, মাহবুব জামাল জাহেদী ও ফররুখ আহমদের মতো তরুণ লেখক এবং মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল মনসুর আহমদের মতো প্রবীণ সাহিত্যিক বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোর কলম চালিয়েছেন। পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার পরে তো আরো অনেকে এই দাবি জানান। কেউ কেউ অবশ্য পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষার কথা বলেছিলেন। অর্থাত্ এই প্রদেশের সরকারি কাজকর্ম ও শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাভাষার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন, কেন্দ্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা দাবি করতে সাহসী হননি। তবে বাংলাভাষার পক্ষে মনোভাব যে কত প্রবল ছিল, তার একটি উদাহরণ দেব। আমরা সবাই জানি যে, ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে আনীত এক সংশোধনীতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন গণপরিষদের দাপ্তরিক ভাষারূপে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং প্রসঙ্গক্রমে বাংলার জন্য রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দাবি করেন, তখন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় তার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে ১০ কোটি মুসলমানের জন্য, মুসলমানের ভাষা উর্দুই হবে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং যারা বাংলার দাবি তুলছেন, তারা এই নবীন রাষ্ট্রের মুসলমান নাগরিকদের ঐক্য নষ্ট করতে চাইছেন। এই প্রসঙ্গে ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক আজাদের সমঙ্াদকীয়তে বলা হয় :

পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পূর্ব্ব হইতেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে, তাহা লইয়া অনেক বাদানুবাদ শুরু হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই বাদানুবাদের তীব্রতা বৃদ্ধি হয় এবং পূর্ব্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত মহলে,-বিশেষ করিয়া ছাত্র ও যুবক মহলে এই আশঙ্কা জাগে যে, পাকিস্তানে বাংলাভাষা উপেক্ষিত হইবে। কিন্তু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিমান মানুষ এই আশঙ্কাকে অমূলক মনে করিয়াছিলেন, কারণ পাক-গণপরিষদের সদস্যগণের সংখ্যাগুরু অংশ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬১ ভাগেরও অধিক পূর্ব্ব-পাকিস্তানের, ও তাহাদের শতকরা ৯৯ জনেরও অধিক বাংলাভাষী। এমতাবস্থায় বাংলাভাষা তো উপেক্ষিত হইতেই পারে না, অধিকন্তু ইহা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু পাক-গণপরিষদের সিদ্ধান্তে পূর্ব্ব-পাকিস্তানের আশাবাদী বিদগ্ধ সমাজের সকল স্বপ্ন ধূলিসাত্ হইতে চলিয়াছে। পাক-গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করার দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় এই আশঙ্কাই বদ্ধমূল হইতেছে যে, পূর্ব্ব-পাকিস্তানের জনগণের ভাষা আজাদ পাকিস্তানে কোন স্থান পাইবে না এবং ইহার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পূর্ব্ব-পাকিস্তানের সর্ব্বাঙ্গীণ অগ্রগতি আশঙ্কাজনকভাবে ব্যাহত হইবে।

শ্রীযুত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাক-গণপরিষদে বাংলাভাষাকে পরিষদের অন্যান্য ভাষার সহিত সমানাধিকার দানের প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছিলেন। পাক-ডোমিনিয়নের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ নাগরিকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা বলিয়া দাবি করার মধ্যে অযৌক্তিকতা কোথায়, তাহা আমাদের বোধগম্য হইতেছে না।

পাক-ডোমিনিয়ানের প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খাঁ শ্রীযুক্ত দত্তের প্রস্তাবের বিরোধিতা করিতে যাইয়া যে উক্তি করিয়াছেন, তাহাও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করিয়াছে। তিনি বলিয়াছেন, পাকিস্তান হইতেছে মোছলেম রাষ্ট্র এবং মুছলমানের জাতীয় ভাষা উর্দ্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে। জনাব লিয়াকত আলী পাকিস্তানকে মোছলেম রাষ্ট্র বলিয়া ঘোষণা করিলেও কায়েদে আজম বহুবার তাঁহার ঘোষণায় ও বিবৃতিতে পাকিস্তানকে ঝবপঁষধত্ ঝঃধঃব (ধর্ম্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র) বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন, সুতরাং জনাব লিয়াকত আলীর [বক্তব্যের] প্রথমাংশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিব না-কিন্তু শেষোক্ত অংশটী আমাদের হাস্যোদ্রেক করিয়াছে। উর্দ্দু মুছলমানের জাতীয় ভাষা হওয়ার অধিকার কবে এবং কোথায় অর্জ্জন করিল? ...বর্ত্তমানে জনাব লিয়াকত আলী যে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সেই রাষ্ট্রের এক নগণ্যসংখ্যক লোক উর্দ্দু ভাষাভাষী। সিন্ধু, সীমান্ত ও পাঞ্জাব উর্দ্দু-ভাষী নহে। কাজেই পাকিস্তানের মুছলমান জনসাধারণের জাতীয় ভাষা উর্দ্দু বলিয়া দাবির মধ্যে কোনো যুক্তির সন্ধান পাওয়া যায় না!

এই সব অযৌক্তিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার দাবিকে অগ্রাহ্য করিয়া পূর্ব্ব-পাকিস্তানের জনগণের মনোভাবের উপরে নিষ্ঠুর আঘাত হানা হইয়াছে। দুইশত বত্সরের সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসন যে কাজ করিতে সাহস পায় নাই, আজাদ পাকিস্তান তাহা অনায়াসে করিয়া বসিল। বৃটিশ আমলে মুদ্রা, নোট ও মনিঅর্ডার ফরমের উপর বাংলা সসম্মানে স্থান পাইয়াছে, কিন্তু পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু নাগরিকদের মৌলিক অধিকারে এরূপ নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ আজাদ পাকিস্তানে সম্ভবপর হইবে তাহা কেহ কল্পনা করে নাই। এবং ইহা সম্ভবপর হইল গণপরিষদে পূর্ব্ব-পাকিস্তানের নির্ব্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিকাংশের অক্ষমতার জন্য।

গণপরিষদের সিদ্ধান্তে পূর্ব্ব-বাংলা আজ বিক্ষুব্ধ। ছাত্র, যুবক ও জনগণ তাহাদের ন্যায্য দাবির প্রতি উপেক্ষায় মর্ম্মাহত। এই অবস্থায় গণপরিষদের পূর্ব্ব-পাকিস্তানের প্রতিনিধিগণের এখন হইতে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাহাতে বাংলাভাষার অধিকতর অসম্মান তাঁহাদের নিষ্ক্রিয়তায় না ঘটে।...

আজাদ তখনো মুসলিম লীগের মুখপত্র।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী প্রস্তাব বাতিল হওয়া নিয়েই পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে এবং তার পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মদান শুধু একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে উর্দুকে চাপিয়ে দিতেই বাধা দেয়নি, আরবি হরফে বাংলা লেখা, বাংলা ভাষায় অনাবশ্যকভাবে অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দের আমদানি এবং সামঙ্রদায়িক ভিত্তিতে বাঙালি সংস্কৃতির বিভাজন প্রভৃতি সরকারি উদ্যোগকেও সমঙ্ূর্ণ পর্যুদস্ত করেছিল। পাকিস্তানি শাসকদের আঘাতে আঘাতে ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত আত্মপরিচয় সমের্ক আমরা ক্রমে সচেতন হয়েছি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ ততই আমাদের মধ্যে ঘটেছে। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্যদিয়েই শুধু এ-ভাবধারা পুষ্ট হয়নি। বাংলা নববর্ষ-উদযাপন, ঋতু-উত্সব-পালন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা প্রভৃতি ক্ষেত্রে যত বেশি সরকারি বাধা এসেছে, রোমান হরফে বাংলা লেখার কিংবা বাংলা বর্ণমালা-সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে আমাদের যত দূরে সরাবার চেষ্টা হয়েছে, ততই আমরা নিজেদের বাঙালিত্বকে সজোরে আঁকড়ে ধরেছি।

এর বিরুদ্ধে একটি পক্ষও ছিল যারা বলেছিলেন, আমরা বাঙালি নই, পাকিস্তানি। কিন্তু তাদের কণ্ঠ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। একসময়ে এঁদের বক্তব্যের জবাবে আমরা নিজেদের বাংলাভাষী পাকিস্তানি বলে চিহ্নিত করেছিলাম, কিন্তু পরে পাকিস্তানের বৃহত্তর পরিমণ্ডলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মেলানোর চেষ্টা অসার্থক, অসম্ভব ও অপ্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের কালে উদ্ভাবিত কিছু ্পোগানে জনমানসের গভীরে প্রোথিত এই বাঙালিত্বের অসংকোচ প্রকাশ লাভ ঘটেছিল : ‘তোমার-আমার ঠিকানা/পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘জাগো, জাগো, বাঙ্গালি জাগো’, ‘একটি বাংলা অক্ষর/একটি বাঙালির জীবন’ এবং ‘জয় বাংলা’। ১৯৭০-এর নির্বাচনী প্রচারের সময়ে ‘জয় বাংলা’র সঙ্গে আমরা শুনেছি ‘আমার দেশ, তোমার দেশ/বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’; ঘূর্ণিঝড়ের পরে সব জাতীয় দৈনিকের শিরোভাগে পড়েছি : ‘কাঁদো, বাঙালি কাঁদো’। আর ১৯৭১ সালে, অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে ডাক শুনেছি : ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। সেদিন কাউকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে হয়নি, এসব ক্ষেত্রে বাঙালি বলতে কাদের বুঝিয়েছে এবং বাংলাদেশের সীমানাই-বা কোথায়।

বাঙালিত্বের এই চেতনার সঙ্গে অসামঙ্রদায়িকতার যোগ ছিল অনিবার্য। তাই দেখা যায়, ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের পরেই অসামঙ্রদায়িকতার প্রতি সচেতনভাবে গুরুত্ব আরোপিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম, ১৯৫৩ সালে গণতন্ত্রী দলের প্রতিষ্ঠা, ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দের বর্জন-এসবই এক্ষেত্রে একেকটা মাইলফলকের মতো। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনার কালে আওয়ামী লীগের নেতারা রাষ্ট্রের ইসলামি প্রজাতন্ত্র নামকরণে আপত্তি জানান এবং দেশে যুক্ত নির্বাচন প্রথা-প্রবর্তনের দাবি জানান। শাসনতন্ত্র চূড়ান্তভাবে গৃহীত হওয়ার আগে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদে দেশের পূর্বাংশের জন্যে যুক্ত নির্বাচন প্রথার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং অনুরূপ বিধান শাসনতন্ত্রে সংযোজিত হয়। যে-দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সৃষ্টি, পূর্ববঙ্গে সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে এভাবে।

১৯৬৪ সালে সামঙ্রদায়িক দাঙ্গা-প্রতিরোধে এখানে সকলে যে-সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিলেন, এ-প্রসঙ্গে তা উল্লেখযোগ্য। একথাও স্মর্তব্য যে, তারপর পাকিস্তান আমলে আর সামঙ্রদায়িক দাঙ্গা ঘটতে পারেনি। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট যে-আইনগত কাঠামো আদেশ (খবমধষ ঋত্ধসবড়িত্শ ঙত্ফবত্) মান্য করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন, তার ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যে-শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবেন, তাতে (ক) পাকিস্তান পরিচিত হবে ইসলামি প্রজাতন্ত্ররূপে (খ) পাকিস্তান সৃষ্টির মূলে যে-ইসলামি ভাবাদর্শ ক্রিয়াশীল ছিল তা রক্ষিত হবে এবং (গ) রাষ্ট্রপ্রধান হবেন একজন মুসলমান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে-অর্থাত্ সাধারণ নির্বাচনের আগেই-ছাত্রলীগ এই ধারা বাতিল করার আহ্বান জানায় এবং ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র ইউনিয়ন সর্বসমক্ষে প্রস্তাব করে যে, ‘রাষ্ট্র হইবে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র।’

তবে তখন-এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পরেও-ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমরা সবাই একই কথা বুঝেছি কিনা সন্দেহ। ধর্মনিরপেক্ষতা অনেক সময়ই অসামঙ্রদায়িকতার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। অথচ পাশ্চাত্যদেশে সেক্যুলিয়ারিজমের একটা সুসঙ্ষ্ট অর্থ আছে : রাষ্ট্র ও ধর্মের সংস্রবহীনতা (ংবঢ়ধত্ধঃরড়হ ড়ভ ঃযব পযঁত্পয ধহফ ঝঃধঃব)। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না-এরকম বললেও একরকম অর্থ হয়। কিন্তু আমরা অধিকাংশই ধরে নিয়েছি, রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে কোনো পক্ষপাত করবে না, বরঞ্চ সব ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। কাজেই বেতার-টেলিভিশনে-রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যেখানে কেবল কোরআন তেলাওয়াত হতো (এখনো তাই হয়), সেখানে আমরা তার সঙ্গে গীতা-ত্রিপিটক-বাইবেল পাঠ জুড়ে দিয়েছিলাম। এতে বিশেষ কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাত রইল না বটে, কিন্তু ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া দূরের কথা, রাষ্ট্র আরো জড়িয়ে গেল ধর্মের সঙ্গে। ধর্ম যে ব্যক্তিগত ব্যাপার, রাষ্ট্রের কোনো সমর্ঙ্ক নেই তার সঙ্গে-৪০০ বছরের এই ধারণাটি আমরা যথাযথ গ্রহণ করতে পারলাম না।

আবার আগের কথায় ফিরে যাই। তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে পূর্ববাংলায় শুরু হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন। অবিভক্ত বাংলায় ১৯৪৫-৪৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী পূর্ববঙ্গীয় প্রার্থীরা ছিলেন পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য। তারপর ১৯৪৯ সালে একটিমাত্র উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে সরকারদলীয় প্রার্থী পরাজিত হন। কিন্তু একটি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এই উপনির্বাচনের ফল বাতিল করে এবং সেই থেকে পরিষদের ৩৫টি আসন শূন্য থাকা সত্ত্বেও আর কোনো উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তান-আন্দোলনকালে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ছিল মুসলিম লীগের দাবি ও প্রতিশ্রুতির অপরিহার্য অঙ্গ, কিন্তু পাকিস্তানলাভের পরে শাসকগোষ্ঠী তা সমঙ্ূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন। তাই গণতন্ত্রের জন্যে আমাদের আন্দোলনের ছিল দুটি দিক : স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্য।

১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলায় প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো বটে, কিন্তু যুক্তফ্রন্টের অমন অসাধারণ বিজয় নস্যাত্ হয়ে গেল প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রে। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানে সর্বপ্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা দেখা দেয় কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক শাসন প্রবর্তিত হলে সে-সম্ভাবনা একেবারে দূরীভূত হয়। তবে অল্পকাল পরেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় এবং তার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় জনগণের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার পক্ষে এবং পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পূর্ব বাংলায় দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্য। সেই দাবির পরিণাম দেখা যায় ছয় দফায়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনকে বঙ্গবন্ধু অভিহিত করেছিলেন ছয় দফার পক্ষে গণভোট হিসেবে। জনসাধারণ সেদিন তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল।

সমাজতন্ত্রের কথাটা প্রথম সুসঙ্ষ্টরূপে উচ্চারিত হয় ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র-সমির্কত প্রথম জাতীয় মহাসম্মেলনে। সোহ্রাওয়ার্দী-শরত্ বসুর পরিকল্পনায় অখণ্ড বঙ্গে ভাবী রাষ্ট্রকে যেমন ঝড়পরধষরংঃ জবঢ়ঁনষরপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল, মনে হয়, তারই অনুসরণে সেখানে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে, টহরঃবফ ঝঃধঃবং ড়ভ চধশরংঃধহ ংযধষষ নব ধ ঝড়াবত্বরমহ ঝড়পরধষরংঃ জবঢ়ঁনষরপ অর্থাত্ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দাবি করা হয়েছিল। তবে দেশের অর্থনৈতিক রূপ সমের্ক চিন্তাভাবনা চলে আসছিল তার বেশ আগে থেকে।

১৯৪৮ সালে গণতান্ত্রিক যুবলীগ বিদেশী পুঁজি বাজেয়াপ্ত করার এবং বড় শিল্প, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রস্তাব করে। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ চায় প্রধান প্রধান শিল্পের জাতীয়করণ। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ বিদেশী পুঁজি বাজেয়াপ্তির এবং বৃহত্ শিল্পের জাতীয়করণ দাবি করে। যুক্তফ্রন্টের একুশ দফায় পাটশিল্প জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি ছিল। ১৯৬৪ সালে প্রণীত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চৌদ্দ দফায় এবং ১৯৬৯ সালে উপস্থাপিত ছাত্রসমাজের এগারো দফায় ব্যাংক, বীমা, পাট ও বৃহত্ শিল্প জাতীয়করণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা প্রথমে বলে বোধহয় ১৯৬৬ সালের দলীয় ঘোষণাপত্রে। ১৯৬৯ সালে প্রচারিত ‘নীতি ও কর্মসূচি’তে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য হিসেবে বর্ণিত হয় ‘অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজতন্ত্র কায়েম।’ ১৯৭০-এ নির্বাচনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রধান প্রধান ক্ষেত্রকে জনগণের মালিকানায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপরে গুরুত্ব আরোপ করেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ করাচির ডন পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন যে, দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি-প্রতিষ্ঠায় তিনি দৃঢ়সংকল্প।

১৯৭২ সালের বাংলাদেশ-সাংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোর সামাজিক ভিত্তি সমের্ক এর অধিক আমার কিছু বলার নেই। আমি যা বলেছি, তা থেকেই আশা করি বোঝা যাবে, এসব নীতি বাইরের প্রভাবে দেশের মানুষের ওপর আরোপিত হয়েছিল কিনা।

তবে এখানেই থেমে গেলে আপনাদেরকে এবং নিজেকেও ফাঁকি দেওয়া হবে। এসব নীতির কী পরিণাম হয়েছে, তা আপনারা জানেন। সে-সমের্ক দু-একটি কথা না বলে পারা যায় না। কিন্তু তারও আগে একটি কথা বলতে হয়।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদ যখন সংবিধান-বিল উত্থাপন করা হয়, তখন এর ৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল : ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।’ সরকারদলীয় একজন সদস্য তখন একটি বেসরকারি সংশোধনী এনে এর সঙ্গে আরেকটি দফা যোগ করেন : ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালী বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী এ-সংশোধনী মেনে নেন, কিন্তু এতে প্রবল আপত্তি জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সদস্য মানবেন্দ্রনাথ লারমা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকরূপে তাঁরা বাংলাদেশী, তবে বাঙালি নন; বাঙালি বললে চাকমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। পাকিস্তানের ২৪ বছর ধরে নিজেদের বাঙালি সত্তা নিয়ে আমরা যে-রকম সংগ্রাম করেছিলাম, পাহাড়িদের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেনি। সুতরাং এ-ধরনের বক্তব্যের জন্যে আমরা একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না। মানবেন্দ্র লারমা নিজেও কতটা প্রস্তুত ছিলেন তা বলা শক্ত। কেননা তিনি যদিও বাংলাদেশের আরো দশটি উপজাতির উল্লেখ করেন, কিন্তু কথা বলেন চাকমাদের পক্ষ থেকে। তবু এই বক্তব্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম আমরা এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে বঙ্গবন্ধু বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেদিনের ব্যর্থতা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযানের ফলে। এখন পাহাড়ি জনসমষ্টি নিজেদের জুম্ম জাতি বলে অভিহিত করছেন। এরা একটি জাতি না বহু জাতিসত্তা, তা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য আমাদের স্বীকার করতে হবে। এঁদের বাইরেও বাংলাদেশের উত্তরে, উত্তরপূর্বে, পশ্চিমে আদিবাসী আছেন-তাঁরাও বাঙালি নন। একথা মানতে হবে যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। তেমনি একথাও মানতে হবে যে, বাংলাদেশ বহু জাতির দেশ।

মানবেন্দ্র লারমা যে বাংলাদেশী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তা পূরণ হয়েছিল তিন বছরের সামান্য কিছু বেশি সময়ের পরে, অবশ্য যেভাবে তিনি চেয়েছিলেন, বোধহয়, সেভাবে নয়। ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে, সামরিক শাসনকালে, এক প্রজ্ঞাপনবলে সংবিধানে ‘বাঙালী’ শব্দটি প্রতিস্থাপিত হলো ‘বাংলাদেশী’ শব্দ দিয়ে। তার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে, সে-বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বাংলা একাডেমীতে, সরকারি উদযোগে খোন্দকার আবদুল হামিদ ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামে যে-প্রবন্ধ পড়েন, তাতে এই পরিবর্তনের দার্শনিক ভিত্তি রচিত হয়। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বললে বাংলাভাষী অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীরা তার আওতায় পড়তে পারেন-তাই ওই অভিধা পরিত্যাজ্য। আর তিনি ৮৫ শতাংশ মুসলমান-অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করেন-তার পরিপ্রেক্ষিতে এদেশের জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলাই, তাঁর মতে সঙ্গত। তাঁর বক্তব্যের বিশদ আলোচনায় আমি যাব না, শুধু বলব, এই ধারণা অবাঙালি জনসমষ্টিকে কাছে টানতে পারেনি, অমুসলমান বাঙালিকে দূরে ঠেলেছে।

এই দূরে ঠেলার কাজটি আরেকটু সঙ্ষ্ট করে সমঙ্ন্ন হলো ১৯৭৭ সালে-যখন সামরিক আইনবলে ঘোষণাপত্রদ্বারা সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ তুলে দিয়ে তার জায়গায় বসানো হয় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং সংবিধানের গোড়ায় সংযোজিত হয় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধানের শপথ নেন যে-অমুসলমান, মনে হয়, তাঁকেও আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধ্য করা হলো। তারপর ১৯৮৮ সালে, সংবিধানে যুক্ত হলো রাষ্ট্রধর্মের বিধান : ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।’ এই অনুচ্ছেদের ভাষা থেকেও বোঝা যায় যে, অমুসলমান নাগরিকদের পরিণত করা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। এই মনোভাবকে উত্সাহিত করার ভয়াবহ পরিণতি আমরা দেখেছি ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালের সামঙ্রদায়িক নির্যাতনের কালে-২০০১ সালে যা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেল। এর ফলে নির্যাতিতদের মনে এমন অনিশ্চয়তা ও অনাস্থার ভাব দেখা গেল যে, তাঁদের অনেকে বাধ্য হলেন সামঙ্রদায়িক স্বার্থের কথা ভাবতে-ধর্মীয় সংখ্যালঘুর জন্যে জাতীয় সংসদে আসন-সংরক্ষণ, এমনকি, স্বতন্ত্র নির্বাচনের কথাও কেউ কেউ ভাবছেন। এমন ভাবতে তাঁদের উত্সাহিত করছেন অনেকে-তাহলে মুসলিম লীগের একদা প্রার্থিত সমঙ্রদায়ভেদ আবার রাষ্ট্রীয় জীবনে ফিরে আসতে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জিত হওয়ায় ধর্ম ও রাজনীতির সংযোগসাধনের ক্ষেত্রে সংবিধানের অন্যত্র যেসব বাধা ছিল-১২ অনুচ্ছেদে বা ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশে-সেসবও বর্জিত হলো। তাতে সামঙ্রদায়িক রাজনীতি ফিরে আসার পথ পেল। বাংলাদেশে আজ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানকেই শুধু আলাদা করে দেখা হচ্ছে না, প্রবল দাবি উঠেছে পাকিস্তানের মতো এখানেও আহমদিয়াদের অমুসলমান ঘোষণা করার। আহমদিয়ারা নির্যাতিত হতে শুরু করেছেন, শিয়ারাও স্বচ্ছন্দে নেই এবং আমাদের সবাইকেই ব্লাসফেমি আইন পাস করাবার ভয় দেখানো হচ্ছে।

এদিকে ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীতে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে আমরা গণতন্ত্রের ধারা থেকে সরে এলাম। তার কয়েক মাস পরেই এল সামরিক শাসন, তারপর গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে সামরিক শাসন, তারপর ছদ্মবেশ ছাড়া সামরিক শাসন, আবার ছদ্ম-সামরিক শাসন। সামরিক শাসন না এলে গণতন্ত্রই-বা ফিরিয়ে দেওয়া যায় কী করে! এমনি করে ষোল বছর কাটল। তারপর তিন তিনটি সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে, নির্বাচনে বিজয়ীরা সরকার গঠন করেছেন; কিন্তু গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি এবং সংবিধানের প্রতিশ্রুত মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করা আজও নিশ্চিত হয়নি।

১৯৭৭ সালে সামরিক আইনের অধীন ঘোষণাপত্রবলে সংবিধানের যে-সংশোধনী আনা হয়েছিল, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে গণতন্ত্রের গায়ে হাত পড়েনি, তবে সমাজতন্ত্রের পরে যুক্ত হয়েছিল ‘অর্থাত্ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার।’ তারপর আমরা এটি বজায় রেখেই প্রথমে বিরাষ্ট্রীয়করণের পথ ধরলাম এবং পরে মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তন করলাম। এখন, আর যাই হোক, ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’ আমাদের লক্ষ্য নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের খুবই কাম্য, কিন্তু সমেদর সুষম বণ্টনের প্রশ্নটি আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করি।

এখন মধ্যে মধ্যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার দাবি ওঠে। সে-দাবি যে কখনো পূরণ হবে আমার সে-ভরসা নেই। অবশ্য আমি জানি, ইতিহাস কখন কেমন মোড় নেয়, তা বলা দুঃসাধ্য, এবং সে-মোড় নেওয়ার সময়ে ইতিহাস আমার ভরসা-নির্ভরসাকে বিবেচনায় নেবে না। আজ, এই ২০০৪ সালে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ১৯৭১ থেকে আমরা দূরে, বহুদূরে, এবং ১৯৭১-এর পূর্ববর্তী ২৪ বছরের সংগ্রাম ও অর্জনের ধারার সঙ্গে তুলনা করলে তার পরবর্তী ৩৩ বছরের ধারাকে পশ্চাদপসারণ ও বিসর্জনের ইতিহাস বলতে হবে।

২২ মার্চ ২০০৪, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও স্বাধীনতার তৃতীয় দিন ২২ মার্চ ২০০৪ দেয়া বক্তৃতা