শিল্প নির্দেশনা: তৌফিক এলাহী
আঁকা: শামীম আহমেদ ও সব্যসাচী মিস্ত্রী
শিল্প নির্দেশনা: তৌফিক এলাহী আঁকা: শামীম আহমেদ ও সব্যসাচী মিস্ত্রী

শতকের পর শতক ধরে চলা বহিরাগত ও অগণতান্ত্রিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের একটি রূপান্তরমূলক প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। স্বাধীনতা আমাদের সর্বস্তরের জনগণের অনাবিষ্কৃত শক্তিকে অবমুক্ত করে দিয়েছে, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে চাঙা করতে ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের এই আবির্ভাব জরাজীর্ণ কোনো ঔপনিবেশিক শাসনের বিদায়ী উপহার ছিল না, বরং এটি জনগণের প্রবল অবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফসল, যা ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে। যুদ্ধ অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যার শিকার সাধারণ মানুষকে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় শামিল করেছে। ফলে জনগণের প্রতি আমাদের রক্তের ঋণ হলো, আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যে সমাজ এই বিপুল আত্মত্যাগ আর নির্যাতনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

default-image

বিগত দুই দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য অবস্থার উন্নতিসহ মানুষের জীবনমানে লক্ষণীয় উন্নতি প্রত্যক্ষ করছি। আবার দুর্ভাগ্যবশত একই সঙ্গে দেখেছি অসমতা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্যের বিস্তার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ত্রুটিবিচ্যুতি এবং সমাজের ভেতরে অন্তর্ভুক্তিবিরোধী শক্তির শিকড় গেড়ে থাকা। এগুলো স্বাধীনতার কল্যাণে প্রাপ্ত আমাদের স্পৃহাগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতাসংগ্রাম

ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এবং ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাদেশের মানুষকে রুদ্ধ করে রাখা হয়। নিপীড়ক জমিদার, ঋণদাতা আর বাজারব্যবস্থার অন্ধশক্তি আমাদের কৃষকদের দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা আর অকালমৃত্যুর বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের কল্যাণে আমরা অর্জন করেছি আমাদের জাতিসত্তা। তবে এই মুক্তিসংগ্রামের আরও যে সুদূরপ্রসারী ও গভীর প্রভাব আছে, সেটি তখনো স্পষ্ট বোঝা যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের অনাবিষ্কৃত উদ্যোক্তাসুলভ সক্ষমতার যে প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, তার ক্ষেত্র ছিল জাতীয় মুক্তির জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব আর রাজনৈতিক উদ্যোগের অসামান্য গুণের স্বাক্ষর রেখেছেন, যা ভোটের বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের মানুষকে একতাবদ্ধ হতে এবং ঝাঁপিয়ে পড়তে সক্ষম করে তুলেছে।

default-image

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন গণহত্যা শুরু করে, বাংলাদেশের মানুষ তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের অভিযান হিসেবে দেখেনি, বরং দেখেছে সার্বভৌম বাংলাদেশের ভূখণ্ড আর জনগোষ্ঠীকে পুনরায় দখল করে নেওয়ার অভিযান হিসেবে; যা রুখতে সর্বস্তরের প্রতিরোধ প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু মানুষকে জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন, যা ১৯৭১-এর মার্চে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এই চেতনা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকার শপথ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভঙ্গ করতে এবং নতুন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনে অস্ত্র ধরতে উদ্বুদ্ধ করে। এই সংগ্রামে বাঙালি যোদ্ধাদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন প্রশাসক, পুলিশ, শিক্ষক-ছাত্র, সর্বোপরি বাংলাদেশের শ্রমিক ও কৃষক। অজস্র বছর ধরে এই মানুষগুলোকে কখনো সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের বড় একটি অংশ গুলির শব্দটিও শোনেনি এর আগে। সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই, বন্দুকের সঙ্গে পরিচয়হীন এই একই মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অস্ত্র হিসেবে যা পেয়েছেন, তাই-ই হাতে তুলে নিয়েছেন। সামরিক প্রশিক্ষণ কিংবা অস্ত্র চালনার অভিজ্ঞতা ছাড়া হাজারো তরুণ যোগ দিয়েছেন মুক্তিবাহিনীতে, যেখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও অন্য বেসামরিক লোকজন।

বিজ্ঞাপন
default-image

স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই অস্ত্রধারণের সাহস ও উদ্যোগের প্রদর্শন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জরুরি ছিল, যা স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দেওয়া আমাদের পেশাদার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যরা নবগঠিত মুক্তিবাহিনীর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের জনগণের এই সামরিক উদ্যোক্তাসুলভ পদক্ষেপের কারণেই পাকিস্তান সৈন্যদের স্থানীয় পর্যায়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড একটি পূর্ণমাত্রার গণহত্যায় রূপান্তরিত হয়। অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা টের পায়, তাদের হত্যাযজ্ঞ শুধু আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রসমাজ বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমিত রাখলে চলবে না, বরং বাংলাদেশের পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর তা চালাতে হবে।

রাষ্ট্র গঠন

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর এত সমস্যা আমাদের ঘিরে ধরেছিল যে জন্মের পরই সেগুলো আমাদের গলা টিপে মেরে ফেলতে পারত। এই রক্তস্নাত জন্ম-পরবর্তীকালে টিকে থাকার জন্য দরকার ছিল নেতৃত্ব আর উদ্যোক্তাসুলভ অসামান্য গুণ। উপনিবেশোত্তর বেশির ভাগ দেশেই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রশাসনকাঠামো এবং ঔপনিবেশিক সময়ের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যায়, যা সচল রাখে অর্থনীতির চাকা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কপালে সেই সুবিধা ছিল না। পাকিস্তান দেশটির গড়ন এমন অদ্ভুত ছিল যে তাতে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের নাগপাশ থেকেই আমরা শুধু মুক্তি খুঁজিনি, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী বছরগুলোয় এ দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণকারী পাকিস্তানকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক স্বার্থগুলোর সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী) ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করার পরপরই তাদের ব্যবসায়িক সম্প্রদায় সম্পদ ফেলে এই ভূখণ্ড ছেড়ে পালিয়ে যায়। ফলে অর্থনীতির প্রতিটি খাতে প্রবেশ করা একটি বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য চালিয়ে নেওয়ার দায়ভার বর্তায় এই দেশটির ওপর। এই ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে এমন একটি পর্যায় পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে ন্যূনতম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার শুরু করা যায়। শতকের পর শতক বিদেশিরা নিয়ন্ত্রণ করেছে এ দেশের অর্থনীতি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের উদ্যোক্তাসুলভ কর্মকাণ্ডে এমন এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়িক মালিকানা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, এমনকি উৎপাদন সক্ষমতা বা রেল পরিচালনায় কারিগরি দক্ষতা—সবই ছিল বিদেশনির্ভর।

কিন্তু দিন শেষে বাংলাদেশিরা নিজেদের ভেতরের সুপ্ত রাষ্ট্রপরিচালনা ও উদ্যোক্তাসুলভ গুণাবলি আবিষ্কার করেছে। আগে যেমনভাবে তারা আবিষ্কার করেছে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার অকল্পনীয় সক্ষমতা। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকারের যখন মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান এবং ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি প্রশাসন গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়েছে, তখনই রাষ্ট্রপরিচালনার সক্ষমতার কিছু বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে পরিত্যক্ত হাজারো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা অথবা সেগুলো আত্তীকরণের জন্য তিন মাসের মধ্যে একটি ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো ও জাতীয় নীতি প্রণয়ন করতে হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের পেশাদার লোকেরা, যাঁদের অধিকাংশই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন, আত্তীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নেন। এই ব্যবস্থাপকদের বেশির ভাগই সেই স্তরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যা তাঁদের অতীত অভিজ্ঞতারও অতীত। তবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দুই বছর তাঁরা স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ের সমান উৎপাদনে যেতে পেরেছিলেন। এর পেছনে ছিল তাঁদের কঠোর শ্রম। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও খুব কম পারিশ্রমিকে নিবেদিত হয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় শাসনব্যবস্থার আরও বড় উদ্যোক্তাসুলভ সক্ষমতার প্রয়োজন ছিল। বহু বছর ধরে বহিঃশক্তির পদানত থাকার ফলে নিজেদের শাসনের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না বাংলাদেশের। এমনকি পাকিস্তান রাষ্ট্রেও সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, নীতি এবং সরকারের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো পাকিস্তানি শাসকেরাই নিয়ন্ত্রণ করেছে। কাজেই নতুন সৃষ্ট রাষ্ট্রটিকে তার নিজের ভেতরে সুপ্ত সরকার পরিচালনার অসামান্য সক্ষমতা আবিষ্কার করতে হয়েছে।

যুদ্ধকবলিত একটি দেউলিয়া দেশে জাতি গঠনে এই অনুশীলন ওই সময়—এমনকি পরবর্তী বছরগুলোয়ও—খুব একটা প্রশংসা পায়নি। অপর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অসুস্থ জরায়ু থেকে রক্ত আর আগুনের ভেতর দিয়ে ভূমিষ্ঠ নতুন একটি রাষ্ট্রের এমন অনেক অনাবিষ্কৃত গুণের প্রয়োজন হয়েছে, যেগুলোর জন্য কোনো প্রশিক্ষণ পুস্তিকা নেই। কাজেই বাংলাদেশ গঠনে নেতা এবং জনগণ—সবারই উদ্যোক্তার ভূমিকা নিতে হয়েছে। ক্লেশ আর ভুলের মাধ্যমে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে প্রথমে তাঁদের শিখতে হয়েছে, রাষ্ট্র কীভাবে গঠন করতে হয়। পরে জানতে হয়েছে সেই রাষ্ট্র পরিচালনার কলাকৌশল।

কৃষক সমাজের সংগ্রাম

স্বাধীনতার সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। আমাদের কৃষির প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল ছিল ক্ষুদ্র চাষিদের ওপর, যাঁরা খুব কম জমি চাষ করে কোনো রকমে জীবন ধারণ করতেন। প্রত্যন্ত এলাকার ৫০ শতাংশ পরিবার ছিল ভূমিহীন। যে বছর ভালো ফলন হতো, সে বছর আমাদের কৃষকেরা প্রায় এক কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে পারতেন, যা দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য ছিল অপ্রতুল। ফলে ভূমিহীন, স্বল্প জমির মালিক এবং নগরের জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে আমাদের অতিমাত্রায় খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো।

এই ক্ষুদ্র চাষিরাই—যাঁরা ১ থেকে ৫ একর জমি চাষ করেন—গত ৪৭ বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ চার গুণ বাড়িয়ে চার কোটি টনে উন্নীত করেছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া আর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং উৎপাদন ও পারিবারিক পেশাগত কাঠামোয় বৈচিত্র্য এনে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন তাঁরা। বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনীতিতে এখন বৈচিত্র্য এসেছে। হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশু পালন, চিংড়ি চাষ ছাড়াও খামার কার্যক্রমের বাইরে বিস্তৃত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেও এসব অকল্পনীয় ছিল। এগুলো সম্ভব হয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উদ্যোগের ফলে। আর গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কমেছে এসব উদ্যোগের প্রকাশ ঘটার পর। গ্রামীণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার মতো কর্মসূচিও দারিদ্র্যের হার কমানোয় ভূমিকা রেখেছে। তবে পল্লি এলাকার জীবনমান উন্নয়নে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং উৎপাদন সক্ষমতার রূপান্তর ভূমিকা রেখেছে সবচেয়ে বেশি।

উদ্যোক্তা বিপ্লব

বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদের সীমাহীন সক্ষমতা কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই এক বিস্ময়। স্বাধীনতার সময় আমরা শুধু একজন বাঙালিকেই উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছিলাম—এ কে খান। পাকিস্তানের ব্যবসা খাতকে নিয়ন্ত্রণকারী ২২ প্রভাবশালী পরিবারের একটি ছিল এ কে খানের পরিবার। ষাটের দশকে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় পাট ও বস্ত্র খাতে ছোট পরিসরে একটি বাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময় বাঙালিদের মধ্যে শীর্ষ মেধাবীরা হয় সরকারি চাকরি, নতুবা পেশাজীবিতার দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে ১৯৭১-এ বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশনের (ইপিআইডিসি) মাধ্যমে। বাঙালি উদ্যোক্তারা ছিল উৎপাদন সক্ষমতার ৩ শতাংশের মালিক, বাকি ৬২ শতাংশের মালিকানা ছিল পাকিস্তানিদের হাতে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য, ব্যাংক, বিমা, এমনকি বড় খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল অবাঙালিদের মালিকানায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারি খাতের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্যোক্তাসুলভ গুণের ঘাটতি আছে এবং কেবল রাষ্ট্রীয় বড় পৃষ্ঠপোষকতাতেই এর অগ্রগতি সম্ভব।

তবে কার্যক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ অর্থায়নে একটি বড় উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। তবে এটি অর্জিত হয়েছে নতুন এই বেসরকারি উদ্যোক্তা শ্রেণির বিশাল ঋণখেলাপের বিনিময়ে। বছরের পর বছর এই খেলাপি ঋণ জিইয়ে রাখা হয়েছে। আজ অবধি চেপে আছে খেলাপি ঋণের বোঝা, যা পরিচিতি পেয়েছে ‘খেলাপি সংস্কৃতি’ হিসেবে।

তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি) সম্ভবত প্রথম বেসরকারি খাত, যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বিকশিত হয়েছে, যদিও রাষ্ট্রের নীতি এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। নুরুল কাদের খানের পথিকৃৎ প্রচেষ্টা এ স্থলে স্মরণযোগ্য। পাবনার ডেপুটি কমিশনার থাকা অবস্থায় নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজের উদ্যোগ প্রদর্শন করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৈশ্বিক মাল্টিফাইবার চুক্তির (এমএফএ) আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যবহৃত কোটার সুযোগ নিতে রাজি করান। অভিজ্ঞতা কম হলেও বহু পেশাদার এরপর নুরুল কাদেরের দেখানো পথে হেঁটে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করালেন।

চীনের পর বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। নতুন প্রজন্মের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বাজারে স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গত শতকের আশির দশকে যেখানে এই খাত থেকে ২৫ শতাংশ আয় আসত, এখন আসে ৭৫ শতাংশ।

বিগত ৩০ বছরে তৈরি পোশাক খাতের গতিশীল উৎপাদন ওষুধ ও জুতাশিল্প, জাহাজ নির্মাণ, ইস্পাত উৎপাদন এবং বর্তমানে নির্মাণ খাতকে প্রভাবিত করেছে। বহুতল ভবন নির্মাণ প্রযুক্তি তো ঢাকা আর চট্টগ্রামের চেহারাই বদলে দিয়েছে।

নতুন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এখন ব্যাংক অর্থায়নের উৎস হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। শিল্প বিনিয়োগে তারাও দিচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদের ঋণ। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে স্বাধীন উৎস হিসেবে কাজ করছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। তবে উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও রয়েছে।

উদ্যোক্তা সৃষ্টি এখন আর মেট্রোপলিটন কেন্দ্রগুলোর করপোরেট খাতেই সীমিত নেই। বিভিন্ন খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানও (এসএমই) বাংলাদেশজুড়ে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তা বিপ্লবে নারীর ভূমিকা

উদ্যোক্তা বিপ্লবে লক্ষণীয় যে সর্বস্তর থেকেই নারী উদ্যোক্তাদের উত্থান ঘটেছে। ১৯৭১-এর আগে এটি ছিল অকল্পনীয়। এমনকি আজকের পাকিস্তানেও তা একপ্রকার অসম্ভবই। এটি তর্কসাপেক্ষ যে এই বিপ্লবের উৎস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূস এবং ব্র্যাকের মাধ্যমে ফজলে হাসান আবেদের ক্ষুদ্রঋণ বিপ্লবে প্রোথিত কি না। ক্ষুদ্রঋণ তেমন কোনো নতুন উদ্যোগ না হলেও গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাকের বিশেষত্ব হলো তাদের ঋণ অর্থায়নের মূল সুবিধাভোগী এবং পরিবারে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি হলেন নারীরা। গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং ব্র্যাক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উচ্চপর্যায়ের বেসরকারি সংগঠনে (এনজিও) পরিণত হয়েছে।

এসবের কিছুই সম্ভব হতো না, যদি না গ্রামীণ নারীরা—যাঁদের অধিকাংশ হতদরিদ্র—উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রদর্শন করতে পারতেন। এই গুণ ওই সব নারীকে নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে আয় করে ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের জীবনমান পরিবর্তনে সক্ষম করেছে। তাই বলে এই ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকাকে প্রয়োজনাতীত বড় করে দেখানো এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ ও গ্রামীণ জীবনের মান পরিবর্তনে জাদুকরী কিছু ভাবা ঠিক হবে না। নারীর জীবনে পরিবর্তন আনতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পুরুষশাসিত সমাজের স্বৈরতন্ত্রসহ আরও অনেক কিছু চিহ্নিত করতে হবে। তবে নির্ভরযোগ্য গবেষণার তথ্যমতে, চরম দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনতে, নারীদের মধ্যে উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করতে এবং এসএমই খাতে বড় পরিসরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় ক্ষুদ্রঋণ যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

শিল্প খাতে, বিশেষত বৃহত্তর ব্যবসায়িক খাত ও তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক হিসেবে নারীর আবির্ভাবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখের মতো নারী এখন কর্মরত। লজ্জাজনক কম মজুরিতে তাঁদের কঠোর পরিশ্রম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান জটিলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যন্ত্রপাতি চালানোর মতো কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই শ্রেণির সক্ষমতাও করপোরেট বসদের মতোই উদ্যোগের বহিঃপ্রকাশ।

এক প্রজন্ম আগেও ঘরে বন্দী ছিলেন নারীরা। বিনা পারিশ্রমিকে পরিবারে তাঁরা প্রায় সমপর্যায়ের শ্রম দিতেন। তাঁদের জনসমক্ষের বাইরে রাখত সমাজ। কাজেই তাঁদের ঢাকায় এসে কারখানায় কাজ করা ছিল চিরকালের জন্য নরকের টিকিট কাটার মতোই। ওই একই কৃষক পরিবারের মেয়েরা—যাঁদের অনেকেই এখনো অবিবাহিত—আজ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে আমাদের আরএমজি খাতকে ধরে রাখতে পুরোমাত্রায় ভূমিকা রাখছেন। অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে নারীকে যেতে হয়েছে সাংস্কৃতিক এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। গ্রামীণ পরিবারে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে অচেনা-অজানা নগরে জনসমক্ষে জায়গা করে নিতে হয়েছে, যেখানে কিনা তাঁর সামাজিক প্রয়োজন ও সুরক্ষায় খুব বেশি কিছু করা হয়নি। একদিন যা অগ্রহণযোগ্য ছিল, আজ গ্রামীণ ও নগর সমাজ তা গ্রহণ করে নিয়েছে। আমাদের রপ্তানিশিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে টিকিয়ে রাখতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে কাজ করছেন অল্পবয়সী নারীরা। নারীদের এই একক উদ্যোগকে তাঁদের কর্মপ্রচেষ্টার সমমাত্রিক পুরস্কার দিতে আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন।

অভিবাসী শ্রমিকদের উদ্যোক্তা সুলভ

যাঁরা সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী দেখেছেন, উনিশ শতকের বিশের দশকের বাংলার একটি গ্রামীণ চিত্র তাঁদের সামনে ফুটে ওঠে। ছবিটিতে অপুর আকাঙ্ক্ষা ছিল তার বোনকে গ্রাম থেকে দূরের রেলপথের কাছে নিয়ে যাওয়া, যেখান থেকে তারা কলকাতার উদ্দেশে ছুটে যাওয়া যাত্রীবাহী ট্রেন দেখতে পাবে। আজকের বাংলাদেশের অপুদের সঙ্গে তাদের বোনেরা গ্রাম ছেড়ে ট্রেনে চেপে বসছে। তারা কেবল ঢাকায় নয়, কলকাতা, মুম্বাই, করাচি, এমনকি মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের সব জায়গায়। আজ বলিভিয়ার জঙ্গল পরিষ্কারক দলে, সৌদি আরবের মরুভূমিতে খামারের কাজে, রোমের সড়কে ঠেলাগাড়ি নিয়ে, নিউইয়র্কে ট্যাক্সি ক্যাব চালনায়, উত্তর ফিনল্যান্ডে রেস্তোরাঁর পরিচারক হিসেবে—পৃথিবীর সব কোণে বাংলাদেশি শ্রমিকের দেখা মেলে। আমাদের নারীরা জর্ডানের তৈরি পোশাক খাতে, আরব উপদ্বীপে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন, নিউইয়র্কের সড়কে বিক্রি করছেন ফল। বাংলাদেশের তরুণেরা নিজেদের গ্রামকে আর নিজেদের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু বা একমাত্র কাজের জায়গা ভাবছেন না। গোটা বিশ্ব যেন তাঁদের কাছে মুক্তা আহরণের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে; এবং বাড়ির তুলনায় উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা দানকারী যেকোনো সুযোগ নিতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পাড়ি জমাতে, যেকোনো ঝুঁকি নিতে, যেকোনো মূল্য পরিশোধে তাঁরা প্রস্তুত।

এই তরুণদের সাহস আর উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ বছরে দাপ্তরিক হিসাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করছে; এ আয় সম্ভবত আরও ৫০০ কোটি ডলার বেশি, যা দাপ্তরিক হিসাবে নেই। এই বৈদেশিক আয় আমাদের বিদেশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য এনেছে, মোট দেশজ সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়িয়েছে, দেশের ভেতরে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে আর দারিদ্র্য দূরীকরণে পালন করেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উদ্যোগে নতুন প্রজন্ম

বাংলাদেশের স্বাধীন উদ্যোক্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিকতম চালকেরা হলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বিপ্লবী। পারস্পরিক এবং বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়গুলোয় পরিবর্তন আনছেন তাঁরা। মুঠোফোনের বিস্তৃতির হারের দিক থেকে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। এটি অকল্পনীয় নয় যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ বাংলাদেশি তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত হবেন এবং বেশির ভাগ মানুষের কাছে মুঠোফোন, এমনকি স্মার্টফোন, আইপ্যাডের মতো আরও আধুনিক উপকরণ থাকবে।

এ ধরনের সংযোগ ক্রমান্বয়ে আর্থিক সেবাদানকারী শিল্প, জ্ঞানের প্রসারের উপায়, শিক্ষার ধরন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির উপায়গুলোয় পরিবর্তন আনছে। সরকার যেহেতু এ ক্ষেত্রে উৎসাহী, কাজেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবার বিষয়গুলো নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপরিচালনায় বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত এরই মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রাখছে। তবে এই খাতকে বড় রপ্তানি শিল্পে পরিণত করা এবং এর সম্ভাবনা ব্যবহার করে দুর্নীতি মোকাবিলা, পরিচালনা প্রক্রিয়াসহ সবক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছি।

অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন: বাংলাদেশ কূটাভাস

অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের অংশ হয়ে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অবমুক্ত হওয়া সর্বস্তরে এই উদ্যোগের উত্থানের একটি মিশ্র ফল তৈরি করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্র বদলে দিয়েছে এটি। খাদ্য উৎপাদনের হার চার গুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন খাতের বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করছি আমরা, যা রপ্তানি খাতে বিস্ফোরক উন্নতিতে অবদান রেখেছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে ৬ শতাংশের বেশি বর্ধিত হয়েছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক আয় তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও রয়েছে। টাকার মূল্য স্থিতিশীল হয়েছে এবং রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বিপুল পরিমাণে, এ কারণে জনগণের ব্যয়ের সক্ষমতা বেড়েছে। বাংলাদেশ আর বিদেশি সহায়তানির্ভর অর্থনীতির দেশ নেই। বিদেশি সহায়তা এখন জিডিপির ২ শতাংশের কম। এই ইতিবাচক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো মানব উন্নয়ন সূচকগুলোর সঙ্গে খাপ খেয়েছে। এসব অর্জনে নীতি ও উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের অবদান উপযুক্ত ক্ষেত্রে স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন।

উদ্যোক্তা সক্ষমতা অবমুক্ত করার মাধ্যমে প্রাপ্ত এসব অর্জনের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আমাদের উন্নয়নের এই অর্জনে জোয়ারের সৃষ্টি হলেও এর সুযোগ নিয়ে নিকৃষ্ট প্রবৃত্তির কিছু লোক বড় মাপের দুর্নীতিতেও জড়িয়ে পড়ছে। ঋণখেলাপ, আর্থিক শঠতাসহ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্যও উঠে আসছে। জবরদস্তির মাধ্যমে অপরাধপ্রবণতা ভুল পথে পরিচালিত উদ্যোগেরও ইঙ্গিত বহন করে।

বলা হয়, উদ্যোগের ভুল পথে গমনের এই চিত্র তথাকথিত বাংলাদেশ কূটাভাসের অংশ, যেখানে উন্নয়নমূলক সাফল্যের পাশাপাশি অসৎ পরিচালনা পদ্ধতি যুগপৎ অবস্থান করার সুযোগ পেয়েছে। এমন একটা পরিবেশে উদ্যোগ শিকারে পরিণত হয়। রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টসের ভয়াবহতা এবং ভূমি ও জলাশয় দখলের মতো বিষয়গুলো কেবল ইতিবাচক অর্জনের জন্যই হুমকি নয়, রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের অশান্ত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা

আমাদের শাসনসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর উৎস রাজনৈতিক বলয়ের কিছু হতাশাজনক ঘটনা। গণতান্ত্রিক সংহতি যা স্বাধীনতাসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে, তা অর্থনীতির উন্নয়নের তুলনায় অসম কক্ষপথে আবর্তিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ঘাটতি আমাদের উন্নয়ন দক্ষতাকে পূর্ণ সম্ভাবনার চেয়ে পিছিয়ে রেখেছে, অপশাসন প্রশ্রয় দিয়েছে দুর্নীতিকে এবং অসম আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি করেছে সামাজিক অসমতা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাজাত। গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের মাধ্যমে যে জাতির জন্ম হয়েছে, সে জাতি গণতন্ত্র রক্ষায় এবং তা শক্তিশালীকরণে প্রতিশ্রুত থাকবে, এই-ই প্রত্যাশিত। স্বাধীনতা অর্থনৈতিক সুযোগগুলোর পরিসর বাড়ালেও জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই রয়ে গেল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ঐতিহ্যের অনুসরণে ১৬ বছর এই জাতিকে সেনানিবাস থেকে শাসিত হতে হয়েছে। ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৮৬ আর ১৯৮৮ সালের রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি, উপরন্তু নির্বাচনগুলো ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার মেয়াদই কেবল বাড়িয়েছে।

১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্বৈরাচারী এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৯১-এ এই সরকার অপেক্ষাকৃত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়। ১৯৯৫-৯৬ সালেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেখা যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর জোটের প্রধান হিসেবে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ফলে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সরকারে পরিবর্তন এসেছে।

default-image

দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তন অপরিহার্যভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। আমাদের নির্বাচিত সংসদ অকার্যকর হওয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে, কারণ বিরোধী দলগুলো নিজেদের দাবি আদায়ে ব্যাপকভাবে সংসদ বয়কট করেছে। নির্বাচিত সরকার বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জবিহীন শাসন এবং সংসদে আইন প্রণয়ন করতে পেরেছে। লাগামহীন নির্বাহী ক্ষমতার বিপরীতে তুলনামূলক মুক্ত গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের কিছু কণ্ঠস্বর এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুতির ভয়ের কারণে কিছুটা হলেও ভারসাম্য ছিল।

এই ক্ষমতাচ্যুতির আতঙ্কের কারণে বিএনপি ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মধ্যে কারসাজি করে, যা আরেক দফা রাজনৈতিক সংঘাতের জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতি সেনানিবাস থেকে সামরিক নেতৃত্বে দুই বছরের শাসনের সূচনা ঘটায়। সৌভাগ্যবশত সেনা সমর্থিত সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার অপেক্ষাকৃত অবাধ নির্বাচনের আয়োজন করে, যাতে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসে। পাকিস্তানে ১৯৫৮ ও ১৯৬৯ সালে এবং বাংলাদেশে ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালে যেমনটি হয়েছিল, তার বিপরীতে গিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছেড়ে সেনানিবাসে ফিরে যায়।

সেনানিবাসভিত্তিক এই শাসনব্যবস্থার পরিণতি ভালো হয়নি, যা বড় দুটি রাজনৈতিক দলে সংস্কার ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রবল চেষ্টা করেছিল, যা অবিবেচক ও অবাস্তবায়নযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের সংস্কৃতির রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হতে পারে, বাইরের চাপে নয়। সেনানিবাসের যে নেতৃত্ব এই সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তবে এই অধ্যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ২০১১ সালে সেই একই দল—যারা ঐতিহাসিকভাবে কারচুপির নির্বাচনের শিকার হয়েছে এবং ১৯৯৪ /৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছে—তারাই সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের এই ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাম্প্রতিকতম এই অধ্যায়ের ফলাফল আমরা জানি। ২০১৪-তে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা প্রধান বিরোধী জোট বর্জন করেছিল। ক্ষমতাসীন জোট আবারও ক্ষমতায় আসে, তবে মোট ভোটারের একটা অংশের ভোট পেয়ে। অর্ধেকের বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়ায় কোনো ভোট ছাড়াই এই জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এই নৈরাশ্যজনক ফল হয়তো বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জনের কারণে হয়েছে এবং এই বর্জনকে টিকিয়ে রাখতে অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে সহিংসতা হয়েছে। এই রাজনৈতিক নাটকের ফলে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এটি অনিশ্চিত যে কবে, কীভাবে ক্ষমতাসীন দল আমাদের অবাধ, সুষ্ঠু এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া ফিরিয়ে দেবে, আদৌ দেবে কি না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আওতায় ২০১৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো এই ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, রাজনৈতিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়া এই দল সাংগঠনিকভাবেও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। বড়জোর সব দল ও ভোটাররা অপেক্ষাকৃত বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনের আয়োজন করবে বলে আশা করতে পারে।

ক্ষমতাসীন দল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করে যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে, তার ওপর ভর করে অপেক্ষাকৃত অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে বিজয় পাওয়ার ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে কি না, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। তবে মনে রাখতে হবে, জাতীয় পর্যায়ের এসব অর্জন সংসদীয় পর্যায় পর্যন্ত না-ও পৌঁছাতে পারে। প্রতিটি সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন সাংসদকে কেবল বিরোধীদের চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করতে হবে না, একই সঙ্গে নিজের দলের ভেতরকার প্রতিযোগিতাও মোকাবিলা করতে হবে। এসবই হবে ক্ষমতাসীন দলের সামনে চ্যালেঞ্জ।

যেসব পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত

আমরা যদি আমাদের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালনকারী সমৃদ্ধ উদ্যোক্তাসুলভ সম্পদগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে নিজেদের অর্জনগুলোকে আর ততটা অত ছোট বলে মনে হবে না। শাসনসংক্রান্ত সংকট এখানে উদ্যোগের গতিরোধ করতে পারেনি বটে, তবে তা আমাদের ব্যয় বাড়িয়েছে, ফললাভে ঘাটতি পড়েছে। আমরা যদি বাংলাদেশকে এমন এক সম্ভাবনার দেশে রূপান্তর করতে চাই, যে দেশ চীনের সঙ্গে না হোক, অন্তত ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, তাহলে শাসনের ক্ষেত্রে আমাদের এসব ঘাটতি পূরণ করতে হবে। আরেকটি ভিয়েতনাম হয়ে ওঠার স্বপ্নকে অতিক্রম করে আমাদের যদি আরও দূরে যেতে হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নির্মাণ করতে হয়, তাহলে বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকা উদ্যোক্তাসুলভ গুণাবলি অর্গলমুক্ত করতে হবে। এসব প্রস্তাবকে দুটি শিরোনামের অধীনে আনা যায়: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক।

রাজনৈতিক ক্ষেত্র

রাজনৈতিক ও জনপর্যায়ে আমাদের মতামত গড়ে তুলতে হবে, যাতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়। এই নির্বাচনপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণ এখানে নিশ্চিত করতে হবে। একটি প্রকৃত স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের পক্ষে জনমত তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাছাই করতে হবে এ কমিশন, যাতে এটি সর্বজনীন বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে। নির্বাচনী ও রাজনৈতিক দল পরিচালনার ব্যয় সরকারি তহবিল থেকে মেটানো হবে, তবে তাতে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যয়ের তথ্য যে কেউ চাইলেই পেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাই এমনভাবে করবে, যাতে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় সরাসরি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব অর্জিত হয়। সংসদে কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণির জোরালো প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বও আনুপাতিক হারে নিশ্চিত করার ব্যাপারে জনমত তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো যদি বাদ পড়া জনগোষ্ঠীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে এসব জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর ধারণ করতে সক্ষম রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন পড়তে পারে।

অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি

বঞ্চিত গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে এসব গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আওতায় এনে তাদের সম্মিলিত শক্তিমত্তা বৃদ্ধির মাধ্যমে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের টেকসই উদ্যোগের অনুপস্থিতিতে এ ধরনের বাজেট থেকে অর্থায়নকৃত কর্মসূচি জরুরি। তবে এটি কোনো কাঠামোগত সমাধান নয়।

সামাজিক অবিচার প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য সম্পদহীন গোষ্ঠীর সম্মিলিত শক্তিমত্তাকে সংহত করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বাজারে বৃহদায়তন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে এবং বাজারের ওপরের স্তরে প্রবেশের সুযোগ পায়।

শ্রমজীবী মানুষ, বিশেষত তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা যাতে শেয়ার মালিকানার অধিকারবলে নিজ নিজ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশীজনে পরিণত হওয়ার সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

দিনমজুর, রিকশাচালক, ঝাড়ুদার, মাঝি ইত্যাদি ক্ষুদ্র পর্যায়ের সেবাদাতাদের এমনভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁরা বাজারের প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারেন। ঢাকায় আমাদের রিকশাচালকদের মালিকানায় এমন একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে হবে, যাদের অধীনে থাকবে রিকশার বিশাল এক বহর। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের থাকবে ব্যাংকঋণের সুযোগ, আইনি সেবা ও স্বাস্থ্য বিমা।

প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষমতাহীন ব্যষ্টি থেকে রূপান্তর ঘটিয়ে বিদেশে সেবা রপ্তানিকারক বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানের অংশীদারে পরিণত হরতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণার হাত থেকে তাঁরা রক্ষা পান।

বৃহদায়তন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তারা ওপরের নতুন ধারার উদ্যোগগুলোকে অর্থায়ন করতে পারে।

গণতন্ত্র: সমাজ গঠনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন

জবাবদিহিবিহীন শাসন দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে উৎসাহিত করে। তাই ভালো শাসন নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। এ জন্য যেসব সাংসদ ভোটারদের কাছে দেওয়া তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেন না বা অপকর্ম করেন, তাঁদের সাংসদ পদ রি-কলের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা পৃথিবীর কিছু দেশ করেছে। গণমাধ্যমের টেকসই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বের পদে আসীনদের নাগরিক, ভোটার ও সেবাগ্রহীতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ব্যক্তি খাতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শেয়ারহোল্ডার/জামানতকারী ও ক্রেতার কাছে জবাবদিহি থাকতে হবে।

পরিপূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে তথ্যের অধিকারকে আরও শক্তিশালী ও বিশদ করতে হবে। ইন্টারনেট/ওয়েব প্রযুক্তির সহায়তায় সরকারি তহবিলের ব্যয়ের হিসাবনিকাশ জনসমক্ষে তুলে আনতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সব ধরনের টেন্ডার ও দরপত্রের নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার তথ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত নয় এমন সব ধরনের সরকারি ফাইল। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনগণ চাইলেই যেকোনো মন্ত্রী, সাংসদ, স্থানীয় কর্মকর্তা, সরকারি কর্মী প্রমুখের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও করের তথ্য দেখতে পাবেন।

উপসংহার

ওপরে যেসব প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো কঠিন মনে হতে পারে। তবে আমার প্রস্তাবগুলো সম্ভব বলে মনে হয় কেবল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে লুক্কায়িত বিপুল সম্ভাবনার কারণে। এই সম্ভাবনার অনেকখানি প্রকাশ ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের জীবনমানের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়নের মাধ্যমে। চরম বৈরী পরিস্থিতিতেও এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

আমাদের যে মানবসম্পদ আছে, তা কেবল পরিবর্তনের বিপুল সম্ভাবনাই ধারণ করছে না, আমাদের উদ্যোক্তারা এক বিশাল গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যারা পুরাতনের শিকল খুলে ফেলে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রণোদনা গ্রহণ করতে উদ্‌গ্রীব। এই গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে এবং সমাজ পরিবর্তনের উপকরণ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

রেহমান সোবহান অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের প্রতিষ্ঠাতা।

৩০ জানুয়ারি ২০১৭ সালে প্রদত্ত ‘বাংলাদেশের পার্মানেন্ট লিবারেশন স্ট্রাগল: কন্সট্রাকটিং এন্ড ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেটিক সোসাইটি’ শিরোনামে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক স্মারক বক্তৃতার সংক্ষেপিত বাংলা অনুবাদ।