default-image

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল, রবিবার। দুপুর সাড়ে ১২টা। স্থান ৯, সার্কাস অ্যাভিনিউ, কলকাতা। বিশ্ব ইতিহাসে ঘটে গেল নজিরবিহীন ঘটনা। কলকাতার পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশন অফিসের সব বাঙালি কর্মকর্তা–কর্মচারী একযোগে আনুগত্য প্রকাশ করল বাংলাদেশ সরকারের প্রতি। কার্যালয়ের নাম পাল্টে হয়ে গেল ‘গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। কূটনৈতিক মিশন।’ মিশনের ছাদে ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ হোসেন আলীর নেতৃত্বে ওড়ানো হলো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে শুরু করল।

হোসেন আলী ছিলেন পাকিস্তানের কলকাতা দূতাবাসে ডেপুটি হাইকমিশনার। হোসেন আলীর রোজনামচা থেকে জানা যায়, ৩০ মার্চ তিনি পাকিস্তান মিশনকে বাংলাদেশ মিশনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। রোজনামচার অপর স্থানে উল্লেখ ছিল যে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে তিনি সেই সরকারের আনুগত্য ঘোষণা করবেন।

বিজ্ঞাপন

সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠক

১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১২ এপ্রিল বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেওয়া নড়াইলের সাবডিভিশনাল অফিসার কামালউদ্দিন সিদ্দিকী হোসেন আলীর সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জোর সুপারিশ করেন। ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় হোসেন আলী নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পার্ক সার্কাস ময়দানে মিলিত হন। তাজউদ্দীনের সঙ্গে ছিলেন বিএসএফের কর্মকর্তা শরবিন্দু চট্টোপাধ্যায়। সেখান থেকে তাঁরা আউটরাম ঘাটে গিয়ে গেলর্ড রেস্টুরেন্টে আলোচনায় বসেন। তাজউদ্দীন মিশনের সব বাঙালি সদস্যকে নিয়ে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য হোসেন আলীকে জানান এবং ১৮ এপ্রিল মিশনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের কথা বলেন। হোসেন আলী তখনো জানতেন না যে ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করবে। মিশনে ফেরত এসে হোসেন আলী বিষয়টি কর্মকর্তাদের জানান এবং তাঁদের সম্মতি গ্রহণ করেন। এ সময় দূতাবাসে চারজন বাঙালি কর্মকর্তা এবং প্রায় ষাটজন বাঙালি ও ত্রিশজন অবাঙালি কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।

১৭ এপ্রিল সকালে মিশনের সাত লাখ টাকার মধ্যে চার লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে আনা হয়, আর তিন লাখ টাকা হোসেন আলীর ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে এই অর্থও তুলে আনা হয়। রাত আটটার দিকে হোসেন আলী মিশনের সেভরলেট (শেভ্রোলে) গাড়ির চাবি অবাঙালি চালকের কাছ থেকে তাঁর নিজের কবজায় নেন। রাতে প্রেস সচিব মাকসুদ আলী বাংলাদেশের একটি পতাকা সংগ্রহ করে আনেন। কিন্তু পতাকাটি বেশ বড় ছিল এবং সঠিক মাপেরও ছিল না। হোসেন আলীর স্ত্রী রাতারাতি পতাকাটি ঠিক করেন।

আনুগত্য পরিবর্তন

১৮ এপ্রিল সকাল সাতটায় হাইকমিশনের সব বাঙালি কর্মকর্তা–কর্মচারী মিশনের মধ্যে একত্র হন। এ পর্যন্ত আনুগত্য পরিবর্তনের পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমিত ছিল। হোসেন আলীর কাছ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ঘোষণা শুনে কর্মচারীদের অনেকেই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে হোসেন আলী দুই দফা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করেন। এদিকে সকাল থেকে বিএসএফের মহাপরিচালক কে এফ রুস্তমজী, ডেপুটি ডিরেক্টর গোলাক মজুমদার ও রাজ গোপাল, মেজর জেনারেল নরেন্দর সিং দলবলসহ মিশনের আশপাশে গোপনে অবস্থান নিয়ে চারদিকে সতর্ক নজর রাখছিলেন। মিশনের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা দেখে তাঁরাও অস্থির হয়ে পড়েন। এভাবেই দুপুর প্রায় ১২টা বেজে যায়।

এরই মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। ঝড়ের দাপটে মিশনের ছাদে টাঙানো পাকিস্তানের পতাকা ছিঁড়ে ঝুলে পড়ে। এ ঘটনা হোসেন আলীর জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দেয়। তিনি সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা মিশনের ছাদে টাঙিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

পতাকা ওড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিএসএফের সদস্যরা মিশনের নেমপ্লেট সরিয়ে বাংলাদেশের নেমপ্লেট লাগিয়ে ফেলেন। হোসেন আলী তাঁর অফিস কক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কবি ইকবালের ছবি নামিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও কবি নজরুল ইসলামের ছবি টাঙান।

বেলা একটার সময় হোসেন আলী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘এখন থেকে আমি আর পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার নই। আমি এখন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি। আমার বাংলাদেশ সরকার যে নির্দেশ দেবে, আমি সেইমতো কাজ করব।’

দলে দলে মানুষ মিশনে আসতে শুরু করেন এবং হোসেন আলী, বেগম হোসেন আলী ও মিশনের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানাতে থাকেন।

তথ্যসূত্র:

দৈনিক যুগান্তর (কলকাতা),

দ্য ব্রিটিশ, দ্য বেন্ডিট অ্যান্ড বর্ডারম্যান। কে এফ রুস্তমজী।

দ্য ডায়েরি অব হোসেন আলী।