default-image

২৫ মার্চ

সকাল সাতটায় দুলাভাই ফোন করেছেন। বললেন, ‘ডলি, বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি সবাইকে নিয়ে। কারণ, দেখলাম, পরিস্থিতি আমাদের পাড়ায় ভালো নয়। আর পাড়া কেন, গোটা দেশের পরিস্থিতি ভালো না।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় আছেন?’ বললেন, ‘আমার কলিগ হুদা সাহেবের বাসা পাথরঘাটায়। তোমরাও ওখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাও!’ আকস্মিকভাবে বাঙালিরা আজ মারমুখী হয়ে উঠল আমাদের পাড়ায়। অবাঙালি প্রতিবেশীরা তো প্রায় সবাই রোগী ডা. শফীর। অনেকেই প্রাণভয়ে ছুটে এল আমাদের বাসায়। বাঙালি প্রতিবেশীদের এই মারমুখী আচরণে আমি যেন প্রথমে একটু খুশিই হয়েছিলাম। গতকালের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দৃশ্য এখনো আমার চোখে। দেখছি সেই বুলেটগুলোও। কিন্তু পরক্ষণেই মনের পরিবর্তন হলো। মনে হলো এ অন্যায়।

ওরা তখন অনেকেই আমাদের হাত ধরে কাঁদছে ‘বাঁচান, বাঁচান’ বলে। ও আশ্বাস দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল বাইরে। আমিও গেলাম ওর পেছনে। বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে দা, কিরিচ, হকিস্টিক, লোহার রড। আগেই বলেছি, আমাদের পাড়ায় বিহারি নয়, বেশির ভাগই আগাখানি ও বোহরা সম্প্রদায়ের বোম্বাইয়া অবাঙালি। ডা. শফীকে কখনো আমি বক্তৃতা করতে দেখিনি। কিন্তু আজ উন্মাতাল মানুষের সামনে দুই হাত ওপরে তুলে প্রচণ্ড জোরে হুংকার দিয়ে বলল, ‘অসহযোগ আন্দোলনে মানে অবাঙালিদের হত্যা করা নয়। আপনারা কি আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনেননি? তিনি কখনোই এ কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, আমরা অসহযোগ আন্দোলন করছি পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে। এখানে যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁরা যে ধর্মেরই হোন না কেন, যে ভাষাতেই কথা বলুন না কেন, আমাদের লড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে নয়। তাঁরা আমাদের ভাই, আমাদের লড়াই সরকারের বিরুদ্ধে।’ বিক্ষুব্ধ জনতার চোখের আগুন তবু নেভে না। বলে, ‘না, ওরা অনেক বাঙালিরে মেরেছে। এবার আমরা ওদের নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ব এই মাটি থেকে।’ ভয়ে আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। এবার আমি হঠাৎ চিৎকার করে বললাম, ‘বলুন তো আমাদের নেতা কে?’ আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন উঠল, ‘শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।’ আবার বললাম, এভাবে তিনবার বলার পর বললাম, ‘এবার বলুন কার আহ্বানে আমরা অসহযোগ আন্দোলন করছি?’ জনতা বলল, ‘আমাদের নেতা শেখ মুজিবের আহ্বানে।’ তাহলে এখন আপনারা যা করতে যাচ্ছেন, তা কি তাঁর কথার বরখেলাপ নয়? দেখলাম, এ কথায় কিছুটা কাজ হলো। তবু এর মধ্যে কয়েকজন মারমুখী হয়ে বলল, ‘না না ডাক্তার সাহেব, আপনি সরে যান, আমরা রক্তের বদলে রক্ত নেব।’ তখন ও হঠাৎ ওদের আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তাহলে মারতেই যদি হয়, আগে আমাকে মারো, তারপর আমার অবাঙালি প্রতিবেশীদের মেরো।’ এবার আগুন যেন দপ করে নিভে গেল। কারণ, এদের মধ্যে অনেকেই তার রোগী ছিল। ডা. শফীর অনেক গুণের মধ্যে যা আমাকে মুগ্ধ করত, তা হলো দরিদ্র শ্রমজীবী প্রতিবেশীদের আর রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে কখনোই চিকিৎসার ফি নিত না। যাহোক, আমি ওকে আর কোনো দিন বক্তৃতা করতে দেখিনি। আজ ওর বক্তৃতায় মারমুখী জনতা শান্ত হয়ে ফিরে গেল।

বিজ্ঞাপন

বিকেল পাঁচটা থেকে অশান্ত আমরা—একটি উড়ো ফোন

আমাদের পাড়ায় আজ সকালের এই ঘটনার পর থেকে মনটা খারাপ হয়ে আছে। গতকাল হাসপাতালের ওই দৃশ্য, আজকের এসব ঘটনা-সব মিলিয়ে তিক্ততায় মনটা ভরে আছে। রান্না হয়ে গেছে। মিনু আপা, রানু, জিন্নু সবাই মিলে বাচ্চাগুলোকে বকে বকে গোসল করিয়ে খাইয়ে দিয়েছে, আমাদের কারও মন ভালো নেই, তাই খেতেও ইচ্ছে করছে না। আমার তো গা গুলে কেমন বমি আসছে। তবু সবার পীড়াপীড়িতে অল্প করে খেয়ে নিলাম। কর্মহীন অলস দিন। খাওয়ার পর সবাই এঘরে-ওঘরে বসে গেছে তাস, লুডু, ক্যারম নিয়ে। ইতিমধ্যে খবর রটে গেছে, ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। মুজিব প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আর যাবেন না। ডা. শফী মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গে তাস খেলতে বসে যায়, আজ বসল না। এক খিলি পান মুখে দিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে সিগারেট টানছে। আমি ওর পায়ের কাছে বসলাম। আমাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘শেখ সাহেব কেন যে ওদের মিষ্টি কথা বিশ্বাস করে আলোচনায় বসতে গেলেন। এখন কী যে হয় বলা যায় না।’ ভয়ে আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল।

বিকেল পাঁচটা। ফোন বেজে উঠল। আমাদের বেডরুমে ফোন, তাই আমি উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম। ও প্রান্ত থেকে পুরুষ কণ্ঠ অত্যন্ত ব্যস্তভাবে বলল, ‘আপনারা কি শুনেছেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে?’ আমার হাত কেঁপে উঠল। রিসিভার প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বললাম, আপনি কে? কে বলছেন?

তা জেনে কী করবেন। ‘তাড়াতাড়ি চাল, ডাল, নুন কিনে রাখুন, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’ বলেই লোকটা রিসিভার রেখে দিল। কথাটা সবাইকে বললাম। কাশেম হেসে বলল, বোগাস। দেশের পরিস্থিতি এখন অন্য রকম কি না, তাই কতজনে কত কী বলবে।’ বেলাল ভাই বললেন, কিন্তু কথাটা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।’

সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। আবার ফোন। এবারও ধরলাম আমি। এবার ঢাকা থেকে ফিরোজার কণ্ঠ। অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। বলল, ‘আপা, আপনারা কেমন আছেন, ঢাকার অবস্থা কিন্তু ভালো না, আজ রাতে কী জানি কী হয়। সৈন্য নেমেছে রাস্তায়। সবাই বলছে আজ রাতে কিছু একটা ঘটতে পারে। চিটাগাংয়ের অবস্থা কী? শুনেছি পাহাড়তলী, ঝাউতলায় বাঙালি-বিহারি খুব মারামারি হয়েছে? আমি বললাম নিজের চোখে দেখে আসা হাসপাতালের কথা। শুনে ও প্রায় কেঁদে ফেলল। ‘আপা, আমার আব্বার বাসা তো ঝাউতলায়, দুলাভাইকে বলেন আমার আব্বার একটু খোঁজ নিতে।’ ওকে আশ্বাস দিয়ে ফোন রেখে দিলাম। ডা. শফী শোনামাত্রই বলল, ‘হ্যাঁ, যাওয়া উচিত।’ আমি আঁতকে উঠলাম। ‘তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? এই রাতের বেলা যাবে তুমি ঝাউতলা?’ কিন্তু ও কারও নিষেধ শুনল না, বেরিয়ে গেল। এদিকে দুশ্চিন্তায় আমি ছটফট করতে লাগলাম।

default-image

ফিরোজা ‘বান্ধবী’র নিয়মিত লেখিকা। চট্টগ্রাম কলেজে বাংলায় অনার্স পড়াকালে ওর সঙ্গে পরিচয়। ওর বাবা রেলওয়ের কর্মচারী। অনেক ভাইবোনের সংসারে ফিরোজা বড়। লেখাপড়ার প্রতি দারুণ আগ্রহ। কিন্তু অর্থাভাবে পেরে ওঠে না। আমরা লেখার পারিশ্রমিক দিই। লেখার সম্মানী ছাড়াও আরও নানাভাবে ফিরোজাকে অর্থসংস্থান করে দিতাম। ডা. শফী ওকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করে। ও বিয়ে করল তৎকালীন সময় সিনে পত্রিকা পূর্বাণীর রিপোর্টার এ টি এম গিয়াস উদ্দিন আহমদকে। (বর্তমানে সমাজকল্যাণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী)।

রাত প্রায় আটটায় ফিরোজার আব্বাকে নিয়ে ও ফিরে এল। কিন্তু তিনি থাকলেন না। কেবল একটা ট্রাংক রেখে চলে গেলেন। ফিরোজার মা, ভাইবোনদের আগেই ফরিদপুর তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অনেক অনুরোধ করেও তাঁকে রাখতে পারলাম না। বললেন, ‘রেলের দুই কামরার ছোট ঘর গরিবের সংসার হলেও মা, টুকিটাকি কম জিনিস তো নাই। না থাকলে লুট হয়ে যেতে পারে।’ তিনি চলে গেলেন। (পরে শুনেছিলাম, তার দুই দিন পরেই অবাঙালিরা তাঁকে গুলি করে মেরেছে)।

বিকেলের ভুয়া ফোন, ফিরোজার ফোনে ঢাকার অবস্থার কথা ইত্যাদিতে দুশ্চিন্তা যেন ক্রমেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধছে আমাদের। কাশেম বলল, ‘আপা, এক কাজ করুন, এম আর সিদ্দিকী সাহেবকে ফোনে জিজ্ঞেস করলে হয়তো তিনি বলতে পারবেন সঠিক পরিস্থিতির কথা।’ বেলাল ভাই বললেন, ‘খালেদ সাহেবকেও জিজ্ঞেস করতে পারো। এ সময় তিনি আজাদী অফিসে আছেন।’

ফোন ঘুরালাম। সিদ্দিকী সাহেবের বাসায় কে একজন ধরে বলল, ‘ডইংরুমে অনেক লোক এসেছে, তিনি কথা বলছেন।’ বললাম, তাহলে মিসেস সিদ্দিকীকে দিন। কোহিনুর সিদ্দিকী ফোন ধরলেন। আমার পরিচয় দিয়ে দুটো ফোনের কথাই তাঁকে বললাম এবং এ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কি না, জানতে চাইলাম। মিসেস সিদ্দিকী বললেন, ‘না, তেমন কিছু তো শুনিনি! ওকে এখন জিজ্ঞেস করাও যাবে না। রাজনৈতিক কয়েকজন নেতা এসেছেন। জরুরি মিটিং করছে।’ এবার আজাদী অফিসে ফোন করলাম। স্বয়ং খালেদ সাহেব ধরেছেন। তাঁকেও বললাম, ‘এ রকম দুটো ফোন পেয়েছি, বেশ ভয় হচ্ছে মনে। তাই ফোন করলাম আপনি কিছু জানেন কি না?’ তিনি হেসে বলেন, ‘না না, সব বাজে কথা। ও রকম কিছু একটা হলে আগে আমরাই তো জানব।’ বললাম, ‘সে কারণেই তো ফোন করলাম। আপনাদের মুখ থেকে ভরসা পেলে নিশ্চিত হই।’ তিনি বলেন, ‘এখন কত কী শুনবেন, ওসব গুজবে কান দেবেন না।’ এ সময় চট করে আরেকটা কথা জানতে চাইলাম, আজ বিকেলেই ছড়িয়েছে শহরময়, বাবর আর সোয়াত নামে দুটি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে, মাল খালাস করতে বলা হলে শ্রমিকেরা বুঝতে পেরে বিদ্রোহ করেছে, মাল খালাস করেনি। এ কারণে শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। তাতে বেশ কজন শ্রমিক নাকি মারা গেছে। এই সংবাদের সত্যতা কতটুকু আমি জানতে চাইলাম খালেদ সাহেবের কাছে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, কথাটা সত্যি, তবে শ্রমিক মারা যায়নি। কিছু আহত হয়েছে।’ তখন আমি বললাম, ‘যাহোক খালেদ ভাই, আপনাদেরই মুখ চেয়ে আমরা আছি। তেমন কোনো পরিস্থিতি দেখলে আমাকে একটু জানাবেন।’ তিনি আশ্বাস দিলেন।

রাত ক্রমেই বাড়ছে। এখন সাড়ে ১০টা। খালেদ সাহেবের কথায় দুশ্চিন্তা ভারমুক্ত হলেও পুরোপুরি অস্বস্তি কাটেনি। তাই আবার ফোন ঘুরালাম সিদ্দিকী সাহেবের বাসায়। ভাগ্য ভালো, এবার সিদ্দিকী সাহেবই ধরলেন। তাঁকে সেই বিকেলে পাওয়া ফোনের কথা এবং ঢাকা থেকে ফিরোজা যা বলেছিল সব বললাম এবং জানতে চাইলাম পরিস্থিতির কথা। সিদ্দিকী সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এ রকম কিছু আমিও শুনেছি, তবে এক্ষুনি সঠিক করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে বোন, আমাদের সবারই প্রস্তুত থাকা উচিত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য।’ আমি চুপ করে রইলাম। তিনি আবার বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনার নাম্বারটা আমাকে দিন। তেমন কোনো অবস্থা দেখলে আপনাকে জানাব।’

সিদ্দিকী সাহেবের কথাগুলো সবাইকে বললাম। শুনে অনেকেরই বুক হালকা হলো, সবাই শুতে গেল। আমি বসে রইলাম ড্রইংরুমে। সাড়ে ১০টাতেই রাত নিঝুম হয়ে এসেছে। রাস্তায় একটিও লোক নেই। সারা শহর অন্ধকার। ডা. শফী গোসল করে এল। (ওর চিরদিনের অভ্যাস শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই ভোরে এবং রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা)। আমাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে বোধ করি আমার মনটাকে আরও একটু হালকা করার জন্য গিটার এনে আমার হাতে দিল। সামান্য হেসে বলল, ‘অনেক দিন তুমি এই যন্ত্রটা স্পর্শ করোনি। আজ একটু বাজাও না। আমি প্রায় রেগে গেলাম। ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? গানবাজনা করার মতো মনের অবস্থা আছে?’ ওর মুখ প্রসন্নতায় ভরা। বলল, ‘তুমি ভয় পাচ্ছো ডলি? আমার কিন্তু আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে বাঙালির বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা এবার পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তুমি দেখে নিয়ো, এবার ওরা (পাকিস্তান) পাততাড়ি না গুটিয়ে পারবে না। যাকগে, একটু বাজাও না।’

আমাকে আবার সহজ করতে চাইল। কিন্তু আমি সহজ হতে পারছি না। বুক কাঁপছে। হাতও কাঁপছে। কী বাজাব? সুর যেন সব ভুলে গেছি। তবু একটা নজরুলের গানের সুর বাজাতে চেষ্টা করলাম-‘হে অশান্তি মোর এসো এসো...।’ বেসুরো হচ্ছে। ও থামিয়ে দিল। অত কঠিন সুর বাজাচ্ছ কেন? রবীন্দ্রনাথের ওই গানটা বাজাও, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়...।’ আমি বাজালাম। একে একে সবাই জড়ো হয়েছে ড্রইংরুমে। ঘুম আসছে না বোধ করি কারও চোখে। শেষ হলে ওরা আরও অনুরোধ করল। আরও দু-তিনটি সুর বাজিয়ে উঠে পড়লাম। আর পারছি না।

রাত প্রায় ১২টা, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বেলাল ভাই, ডা. শফীসহ কয়েকজন আমার বেডরুমে বসে তখনো আলোচনা করছি। একটা প্রচণ্ড শব্দে আমার চারতলা ফাউন্ডেশন বাড়িটা ঝমঝম করে কেঁপে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কিছু রাইফেলের ঠট ঠট শব্দ শোনা গেল।

ঘুমন্ত কাক পাখিদের ভয়ার্ত কলরব, কুকুরের ঘেউ ঘেউ চিৎকার আর ঘুমন্ত বাচ্চাদের অন্ধকারে ছোটাছুটি, কান্নায় আরেক অবস্থার সৃষ্টি হলো। সবাই এসে এক কামরায় জড়ো হয়েছে। আমার সাত ছেলেমেয়ে আমাকে আর ওদের বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। আবার প্রচণ্ড শব্দ গুড়ুম। আমরা সবাই অনুমান করলাম, এ গোলা আসছে বন্দরে নোঙর করা বাবর ও সোয়াত জাহাজ থেকে। লক্ষ্য ষোলশহর ও ক্যান্টনমেন্ট। কারণ, আজ আরও শোনা গেছে, মেজর জিয়ার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য বিদ্রোহ করে বেরিয়ে গেছে এবং ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে আছে। কারণ, ব্রিগেডিয়ার আনসারি আজ আট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের হাতিয়ার জমা দিতে বলেছে।

ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের নিখোঁজ এবং বাঙালি সৈন্যদের হাতিয়ার জমা দিতে বলায় সন্দেহ ঘনীভূত হয় বাঙালি অফিসারদের মনে। তাই তারা অস্ত্র মজা না দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এবং ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে রেখেছে। অবশ্য তার আগে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই নাকি কিছু গোলাগুলিও হয়েছে। এগুলো সবই আজ সারা দিনের শোনা কথা।

এখন আমরা কজন অন্ধকারে বসে ভাবলাম, যা শোনা যায়, তার সবই মিথ্যে নয়। আমি ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘এখন আরেকবার ফোন করে দেখি সিদ্দিকী সাহেবকে?’ বেলাল ভাই বলল, ‘হ্যাঁ করো।’ ডা. শফী হারিকেনের আলোটা উসকে ফোনের কাছে নিয়ে এল। আমি ডায়াল ঘুরালাম। রিং বাজছে, কেউ ধরছে না। ৫-৬ মিনিট পর একজন ফোন ধরেই বলল, ‘সাহেব বাসায় নেই।’ বললাম, বেগম সাহেবকে দিন। বলল, ‘তিনিও নেই, কেউ নেই।’ বললাম, তাঁরা কখন গেছেন? বলল, ‘এই তো এক ঘণ্টাও হয়নি।’ হতাশভাবে ফোন রেখে দিলাম। বুঝলাম, সেই ফোন, ফিরোজার কথাসহ আজ সারা দিন যা যা শুনেছি, তা কোনোটাই নিছক গুজব নয়।

আমার বাড়ির কাচের জানালা দিয়ে দেখছি অন্ধকারের ভেতর আগুনের হলকার মতো কিছুক্ষণ পরপর সারা শহর কাঁপিয়ে গোলা ছুটে যাচ্ছে। এর একটি যদি আমার বাড়িতে এসে পড়ে, এই আতঙ্ক নিয়ে সারা রাত বসে কাটালাম সবাই।

বিজ্ঞাপন
default-image

২৬ মার্চ, সকাল ৭টা, আকাশবাণীর ঘোষণা

রাতের গোলাগুলি ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে। অনেকে তখনো ঘুমে। কারণ, সারা রাত জেগেছে। ডা. শফী তার নিয়মমতো সিগারেট নিয়ে বাথরুমে, গোসল সেরে বেরোবে। আমি ড্রইংরুমে এসে রেডিও খুললাম। ঢাকা স্তব্ধ। চট্টগ্রাম অনেক দিন থেকেই বন্ধ ছিল। কেবল ঢাকা রিলে হতো গানের মাঝে মাঝে সামরিক আইন ঘোষণাসহ, আজ তা-ও নেই। নব ঘুরিয়ে আকাশবাণী কলকাতায় নিতেই শুনলাম জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবির সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বাজছে। গান শেষ না হতেই গম্ভীর স্বরে ঘোষিত হলো, ‘একটি ঘোষণা। পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক জনগণের প্রচণ্ড লড়াই চলছে ঢাকার রাজপথে।’ ঘোষণাটি শেষ হলো। আবার সেই গান। আমি চিৎকার করে ডাকলাম সবাইকে। হুড়মুড় করে সবাই এল। আবার সেই ঘোষণা। ডা. শফী আনন্দে টেবিলে কিল মেরে বলল, এইবার দেশ স্বাধীন হবেই। বলতে গিয়ে আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

রাস্তায় লোকের ভিড়, জটলা। এহসান, জালাল, কাশেম, আলমগীর অনেকেই চা না খেয়েই বেরিয়ে গেল বাইরের খবরাখবর জানতে। অল্প পরেই একে একে ফিরে এল সবাই খবর নিয়ে। গত রাতে ঢাকা ম্যাসাকার হয়ে গেছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হল, ইকবাল হল আর সুলিমুল্লাহ হল কামান দেগে ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। ট্যাংক রাস্তায় নামিয়ে চারদিকে গোলা মেরে বাড়িঘর ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। হাজার হাজার লোক মারা গেছে ইত্যাদি। সবার মুখ থমথমে। এখন কী করা যাবে, সেটাই ভাবনা। কিন্তু ভেবে তো লাভ নেই। কপালে যা আছে, তা হবেই। এখন চা খেয়ে নেওয়া যাক। ডা. শফীকে নিয়ে আমিও খেয়ে নিলাম। এমন সময় আরেক খবর নিয়ে ছুটে এল বাবুর্চি। স্টেশন রোডের রেলওয়ে ট্রেজারি ভেঙে সবাই বন্দুক নিচ্ছে।

শুনে এহসান, জালালসহ অনেকেই বেরিয়ে গেল, ‘দেখি আমরাও একটা পাই কি না’ বলে। তখন প্রায় সকাল নয়টা বেজে গেছে।


মুশতারী শফি নারীনেত্রী শহীদজায়া, লেখক

স্বাধীনতা আমায় রক্তঝরা দিন (অনুপম প্রকাশনী, পুনর্মুদ্রণ ২০০৮) গ্রন্থ থেকে