প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম
প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আমি আমার সুইপারের দল নিয়ে দায়িত্ব পালন করে সন্ধ্যায় ৪৫/১ প্রসন্ন পোদ্দার লেনে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। আকাশফাটা গোলাগুলির ভীষণ গর্জন শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে ওঠে দেখলাম, রাজধানীর উত্তরে বস্তি এলাকা জ্বলছে। আমি নয়াবাজার সুইপার কলোনির দোতলায় দাঁড়িয়ে চারদিকে গোলাগুলির ভীষণ গর্জন শুনলাম।

২৬ মার্চ অতি প্রত্যুষে আমি সুইপার কলোনির দোতলা থেকে দৌড়ে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম, ফাঁড়ির প্রবেশপথ, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ১০ জন পুলিশের ইউনিফর্ম পরা গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। আমি ফাঁড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম, ফাঁড়ির চারদিকে দেয়াল হাজারো গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে। দেয়ালের চারদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে, দেখলাম কেউ জিব বের করে পড়ে আছে, কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে, প্রতিটি লাশের পবিত্র দেহে অসংখ্য গুলির আঘাত। দিনের শেষে বিকেল পাঁচটার সময় তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার এবং কোর্ট হাউস স্ট্রিট এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে বৃষ্টির মতো অবিরাম গুলিবষর্ণ। সারা রাত পাকিস্তানি সেনারা তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়ালনগর এলাকায় অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ২৮ মার্চ সকালে রেডিও মারফত অবিলম্বে কাজে যোগদানের নির্দেশ পেয়ে পরদিন আমি সকাল ১০টার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটি রিপোর্ট করলে পৌরসভার তৎকালীন কনজারভেন্সি অফিসার মি. ইদ্রিস আমাকে ডোম নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন। ২৯ মার্চ আমার দল ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর থেকে দুই ট্রাক লাশ তুলেছে। অধিকাংশই ছিল সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও পাওয়ারম্যানদের খাকি পোশাক পরা বিকৃত লাশ। লাশ তুলতে তুলতে এক উলঙ্গ যুবতীর ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখলাম, তার দেহে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, তার বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে, লজ্জাস্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, পেছনের মাংস তুলে নেওয়া হয়েছে। তার দুই গালে আঘাতের চিহ্ন দেখলাম। পরক্ষণেই দেখলাম ১০ বছরের এক কিশোরীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ। সারা দেহে বুলেটের আঘাত। ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনাদের মেজর পৌরসভায় টেলিফোনে সংবাদ দেন, রোকেয়া হলের চারদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে সেখানে বসা যাচ্ছে না, অবিলম্বে ডোম পাঠিয়ে লাশ তুলে ফেলা হোক। আমি ছয়জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে সব কক্ষ তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোনো লাশ না পেয়ে চারতলা ছাদের ওপর গিয়ে এক ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখতে পেলাম। আমার সঙ্গে দায়িত্বরত জনৈক পাকিস্তানি সেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই ছাত্রীর দেহে গুলির কোনো আঘাত নেই, দেহের কোনো স্থানে কোনো ক্ষত চিহ্ন নেই অথচ মরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে কেন? সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল, ‘আমরা সব পাকিস্তানি সেনা মিলে ওকে ধর্ষণ করতে করতে মেরেছি।’ আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে নামিয়ে নিয়ে আসি। রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে প্রবেশ করে মালির স্ত্রী-পরিজনের পাঁচটি লাশ এবং আটটি পুরুষের লাশ (মালি) পেয়েছি। লাশ দেখে মনে হলো, মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সবাই শুয়ে ছিল। আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ির তিনতলা থেকে জনৈক হিন্দু অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী ও দু্ই ছেলের লাশ তুলেছি। স্থানীয় জনতার মুখে জানতে পারলাম, তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন।

বিজ্ঞাপন

৩০ মার্চ ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগ ফেলেছি। পাকিস্তানি সেনারা কুলি দিয়ে আগেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল। পরদিন আমরা মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোনির কাছ থেকে সাতটি পচা-ফুলা লাশ তুলেছি। ইকবাল হলে আমরা কোনো লাশ পাইনি। পাকিস্তানি সেনারা আগেই ইকবাল হলের লাশ পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা ১০ নর-নারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর থেকে চারজন ছাত্রের উলঙ্গ লাশ তুলেছি।

১ এপ্রিল আমরা কচুক্ষেত, ড্রাম ফ্যাক্টরি, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, দ্বিতীয় রাজধানী এলাকার ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তর, ঢাকা স্টেডিয়ামের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকজন ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। (সংক্ষেপিত পরিমার্জিত)

মো. সাহেব আলী: ১৯৭১ সালে সুইপার ইন্সপেক্টর, ঢাকা পৌরসভা (বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন), ঢাকা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, দলিলপত্র, অষ্টম খণ্ড (তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার) থেকে