default-image

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের তিন দিন পর গোলক [মজুমদার] তাঁর পরিচিতদের কাছ থেকে জানতে পারেন যে কিছু জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা, সম্ভবত মুজিবসহ [শেখ মুজিবুর রহমান] দরিদ্র কৃষকের বেশে কুষ্টিয়ার দিকে আসছেন।

৩০ মার্চ একজন ইপিআর কর্মকর্তা একটি চিরকুট পাঠান, সম্ভবত এটি ছিল তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম চিরকুট; এতে আমাদের কাছে তাঁরা সাহায্যের আবেদন জানান। ৭৬ ব্যাটালিয়নের কর্নেল চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে গোলক কৃষ্ণনগর যান। বানপুর-গেদে সীমান্তে তাঁরা মেহেরপুরের সাব-ডিভিশনাল কর্মকর্তা তৌফিক [তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বীর বিক্রম, পরে বাংলাদেশ সরকারের সচিব। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা] এবং সাব-ডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবের [মাহবুবউদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম, পরে ঢাকার এসপি] সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানান, টেলিফোন ব্যবস্থা তখনো সচল থাকায় তাঁরা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পেরেছিলেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে তাঁদের কী ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন এবং আমরাই বা তাঁদের জন্য কী করতে পারি, তাঁরা তখন পেট্রল, তেল, কেরোসিন, টাকাপয়সা, গোলাবারুদসহ সব ধরনের সাহায্যের আবেদন জানান।

বিজ্ঞাপন

গোলক তাঁদের জিজ্ঞেস করেন যে তিনি আন্দোলনের কয়েকজন স্বীকৃত নেতার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কি না। কিছুক্ষণ পরই তাজউদ্দীন আহমদ, যাঁকে শেখ মুজিব তাঁর উত্তরাধিকারী করে গিয়েছিলেন, অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমীর-উল ইসলাম [ব্যারিস্টার]। তাঁরা উভয়েই ছিলেন খালি পায়ে, দুশ্চিন্তায় চোখ-মুখ বসে যাওয়া, তাঁদের পরনে ছিল লুঙ্গি ও গেঞ্জি। তাঁরা সুদূর ঢাকা থেকে হেঁটে এসেছিলেন।

‘আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি হলাম গোলক মজুমদার।’

‘অবশ্যই আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।’ তাজউদ্দীন বলেন, ‘আমাদের নেতা, মুজিব ভাই আমাদের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে গিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। মুজিব নিজে গ্রেপ্তার এড়াতে পারেননি। তিনি আমাদের বারবার সতর্ক করে দেন, আমরা যেন এমন কিছু না করি, যার দরুন ভারত বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, চীনকে ক্ষুব্ধ করে, অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থানে আঘাত হানে।’

সীমান্তে তাজউদ্দীন

গোলক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি আমাদের কাছ থেকে কী চান এবং আমরাই বা আপনাদের জন্য কী করতে পারি? আপনি কি আমার সঙ্গে কলকাতায় আসতে পারেন?’

তাজউদ্দীন এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তিনি তাঁর লোকজনসহ আড়ালে থাকতে চান। গোলক তাঁকে বলেন যে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হতে পারে। কারণ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে খুঁজছে এবং তাঁকে একসময় খুঁজে বের করবে। এরপর তিনি তাঁর লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করতে যান এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলেন যে তিনি যেতে রাজি আছেন।

গোলক আমাকে এসব খবর দিলে আমি নিজেও কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করি। যখন আমি সেখানে অবতরণ করি, তখন ৩০-৩১ মার্চের রাত ১২টার বেশি হয়ে গেছে। গোলক যথারীতি তাঁর হাসিমুখসহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আমাকে কলকাতায় স্বাগত জানালেন। তিনি আমাকে একটু ফাঁকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আন্দোলনের দুই নম্বর ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে এসেছেন। আপনি কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান?’

‘অবশ্যই আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং এক্ষুনি।’

আমরা জিপের কাছ হেঁটে গেলাম, যেখানে তিনি বসে ছিলেন, দুজন লোক তাঁর পাহারায় ছিলেন। আমরা আমীর-উল ইসলামসহ তাঁকে অসম হাউসে নিয়ে গেলাম। স্নানপর্ব সেরে পরিধান করার জন্য তাঁদের আমি কোর্তা ও পাজামা দিলাম। গোলক তাঁদের জন্য ওমলেট তৈরি করলেন। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজগোপাল [ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও রুস্তমজির বইয়ের লেখক] নিশ্চিত করলেন যে তিনিই আন্দোলনের দুই নম্বর ব্যক্তি এবং আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন।

পরবর্তী দুই দিন ধরে আমরা তাঁর কাছ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমঝোতামূলক আলোচনার পূর্ণাঙ্গ গল্প শুনলাম। তাজউদ্দীন সমস্ত কিছু ভেস্তে যাওয়ার জন্য ভুট্টোকে দুষলেন। ইয়াহিয়া রাজি হতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু তিনি ভীত ছিলেন সামরিক জান্তা ও ভুট্টোর জন্য। ফলে ইয়াহিয়া সমঝোতামূলক আলোচনা ভেঙে দিয়ে ফিরে চলে যান, সম্ভবত সঠিক হবে না জেনেও। আমি তাঁর কাছে আওয়ামী লীগ নেতাদের ইচ্ছা ও মনোভাব সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম আওয়ামী লীগ নেতাদের ইচ্ছা ও মনোভাব কীরূপ ছিল। তিনি ছিলেন পরিষ্কার। তাঁরা স্বাধীনতা চান। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার যাবতীয় পরিকল্পনা তিনি ব্যাখ্যা করলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত বাঙালি জনগণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত আছে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে তাজউদ্দীন ও অন্য নেতাদের দিল্লি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। গোলক তাঁদের সঙ্গে যাবেন। গোলক ও আমি নিউ মার্কেটে গিয়ে তাঁদের জন্য যাবতীয় পরিধেয় বস্ত্র (অন্তর্বাসসহ) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, যেমন বাক্সপেটরা ও প্রসাধন ক্রয় করি।

বিজ্ঞাপন
default-image

তাজউদ্দীনের দিল্লি যাত্রা

১ এপ্রিল রাতের বেলায় গোলক তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলামকে নয়াদিল্লি নিয়ে যান। সেখানে তাঁদের বিএসএফের সহকারী পরিচালক এস চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। গোলক দ্রুত কলকাতায় ফিরে আসেন অন্য নেতাদের খুঁজে বের করতে।

৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। [সাক্ষাতের সময় আমীর–উল ইসলাম ছিলেন না] তাঁরা সেখানে ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেই যে কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন প্রায় এক সপ্তাহ দিল্লিতে কাটিয়ে তাঁরা ৯ এপ্রিল কলকাতা ফিরে আসেন তাঁদের দৃঢ় প্রত্যয় ও উদ্যমকে পাকাপোক্ত করে।

৬ ও ৭ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার আলোচনায় মনে হয়েছিল, তিনি একটি আনুষ্ঠানিক প্রবাসী সরকার গঠন ও তার কার্যক্রম যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে আরম্ভ করার বিষয়ে চিন্তিত আছেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর থেকে নির্বাচিত কিছু জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আমাদের সাহায্য চান। তিনি ধারণা করেন যে সম্প্রতি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রবাসী সরকার অধিক গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা অর্জন করবে। তাঁর এই চাহিদা যথাসময়ে পূরণ করা হয়।

আমরা অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তাঁদের চলে আসার অনুরোধ জানাই। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ময়মনসিংহ), কর্নেল এম এ জি ওসমানী (সিলেট), ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (পাবনা), খন্দকার মোশতাক (কুমিল্লা) এবং কামারুজ্জামান (নোয়াখালী) [প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী]। পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানী ধুবরি এলাকার কাছে তাঁর নৌকাঘর থেকে (বোট হাউস) যোগ দেন।

রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারপদ্ধতি-সংবলিত একটি সংক্ষিপ্ত সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করেন কর্নেল এন এস বেইনস। এ সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী এবং একটি কেবিনেটের ব্যবস্থা রাখা হয়। কর্নেল এন এস বেইনস ছিলেন বিএসএফের আইন বিষয়ের কর্মকর্তা। সংবিধানটি যথারীতি কলকাতার ব্যারিস্টার সুব্রত রায় চৌধুরীকে দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখিয়ে নেওয়া হয়। তারপর এটি তাজউদ্দীন ও তাঁর সহকর্মীদের দেওয়া হয়। তাঁরা আলোচনা করে সামান্য কিছু সংশোধনীসহ এটির অনুমোদন দেন।

প্রথমেই যে বিষয়টি উত্থাপিত হয় তা হলো, যুদ্ধজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের নাম কী হবে। কেউ কেউ প্রস্তাব করেন ‘পূর্ববঙ্গ’, কেউ কেউ বলেন, ‘বঙ্গভূমি’, অন্য কেউ কেউ বলেন নাম হবে কেবল ‘বঙ্গ’, কেউ কেউ বলেন ‘স্বাধীন বাংলা’। পূর্ববঙ্গ নামটি প্রত্যাখ্যান করা হয় এ জন্য যে স্বাধীন দেশ হিসেবে এটি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে জট পাকিয়ে ফেলতে পারে। ‘বঙ্গভূমি’ নামটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, কারণ, বিদেশিদের পক্ষে এ নাম মনে রাখা কঠিন। ‘বঙ্গ’ নামটি বাতিল করা হয় এ জন্য যে এটির উচ্চারণে বিকৃতির আশঙ্কা আছে। ‘স্বাধীন বাংলা’ নামটি নেওয়া হয়নি এ কারণে যে ‘স্বাধীন’ শব্দটি সময়ের আবর্তে এর প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারে। তাজউদ্দীন প্রস্তাব করেন ‘বাংলা দেশ’, কারণ, এ নামটি একদা মুজিব বলেছিলেন। এটা বলা হয় যে দেশটি হলো ভাষাভিত্তিক—যে ভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কিছু যুবক প্রাণ দিয়ে শহীদের মর্যাদা অর্জন করেছেন। অন্য সব নেতা এ নামটি গ্রহণে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হন।

একই সভায় রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বাছাই করা হয়। দুটি কবিতা বিবেচনা করা হয়। একটি হলো দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ এবং অন্যটি হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’। সোনার বাংলা শব্দটিতে সোনালি পাট ও ধানের ছবি স্মৃতিতে চলে আসে—যা বাংলার অর্থনীতির প্রধান অংশ। প্রথম কবিতাটি জাতীয় সংগীত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পক্ষে প্রবল যুক্তি থাকার পরও অনেক আলাপ-আলোচনার পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে যেহেতু দ্বিতীয় গানটি মুজিব ভাইয়ের খুব প্রিয়, সেহেতু নতুন জাতির জন্য এটিই হবে জাতীয় সংগীত।

শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি

তাজউদ্দীন খুব করে চাইছিলেন যে আমি যাতে ব্যক্তিগতভাবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ভার নিই। আমি তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হই যে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মাটিতে এবং বিশ্বের সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া খুব জরুরি।

অনুষ্ঠানের জন্য আমি বাংলাদেশের দুটি স্থানের কথা ভেবেছিলাম। এর একটি ছিল রাজশাহীতে, অন্যটি চুয়াডাঙ্গার কাছে। যেহেতু দ্রুত ঘটনার পরিবর্তন হচ্ছিল এবং পাকিস্তানিরা বেসামরিক এলাকায় বোমাবর্ষণ ও আক্রমণ শুরু করেছিল, এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর আশপাশের এলাকাও ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে রাজশাহীর কাছাকাছি অনুষ্ঠান করা হবে না।

স্থান বাছাইয়ের বিষয়ে আমি চিন্তায় ছিলাম। কারণ, বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো অনুষ্ঠানটিতে চোখ রাখবে। তাই দেশের ব্যাপকসংখ্যক মানুষ যেন দর্শক হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। আরও একটি বিষয় বিবেচনায় ছিল, পাকিস্তান বিমানবাহিনী নির্দয়ভাবে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বিমান হামলা করত; সুতরাং স্থান বাছাইয়ের বেলায় সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়েছিল। এসব বিবেচনা করে ত্রিভুজ আকৃতির একটি ভূমি, যা ভারতীয় সীমান্তের নিকটবর্তী; চমৎকারভাবে আমবাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি গ্রাম—যার আদি নাম হলো বৈদ্যনাথতলা, নির্বাচন করা হয় (এ নামটি বদলিয়ে পরে মুজিবনগর করা হয়েছে)। নতুন জন্ম নিতে যাওয়া একটি জাতির প্রথম সরকার মানুষের তৈরি কার্পেট-মোড়ানো সুসজ্জিত ও আলোকিত এবং ঝাড়বাতি লাগানো ঘরের ছাদবিশিষ্ট দালানে অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এমন একটি জায়গায়, যেখানে আকাশ মাথার ওপর শামিয়ানার কাজ করেছে এবং এর সাজসজ্জায় ছিল গাছ। অনেক দশক বা শতাব্দী পর বাংলাদেশের নাগরিকেরা যখন তাদের দেশের জন্মলগ্নের দিকে তাকাবে, বিয়োগান্ত পরিস্থিতির মধ্যে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কথা ভাববে, তখন তারা ন্যায়সংগতভাবেই এটা ভেবে গর্ববোধ করতে পারবে যে তাদের প্রথম সরকার যেখানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের শপথ নিয়েছিল, সেখানে প্রকৃতি অকৃপণ হাতে সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছিল। এই অনুষ্ঠানটি শুধু অনবদ্যই ছিল না, বরং এর পরিকল্পনাই ছিল দুঃসাহসী এবং অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা ছিল সাহসী কাজ।

আমাদের জনসংযোগ কর্মকর্তা এস সি বসু যথেষ্ট ঝুঁকির মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে আমন্ত্রণ জানান। এদের প্রায় সবাই পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরের ঘটনাবলি কাভার করার অভিপ্রায়ে কলকাতায় জড়ো হয়েছিল। ১৬ এপ্রিল, অর্থাৎ অনুষ্ঠানের আগের দিন রাতের শেষ প্রহরে তাদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়, যাতে করে খবরটি পাকিস্তানি কতৃ‌র্পক্ষের কাছে না পৌঁছায়। অনুষ্ঠান কোথায় হবে, সে খবর বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। বসু নিজে তাদের সেখানে নিয়ে যান।

সফলভাবেই সম্পন্ন হলো শপথ অনুষ্ঠান

কলকাতা শহরের নকশালদের দৃষ্টি এড়াতে বাংলাদেশ ও বিএসএফ কর্মকর্তারা ভোর চারটার আগেই কলকাতা ত্যাগ করেন। সেসময় নকশালদের কর্মকাণ্ড ছিল তুঙ্গে এবং রাস্তায় জনসাধারণ তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বোধ করতেন না। যাত্রা শুরুর সিগন্যাল দেবার আগমুহূর্তে মোটরযানগুলো এক সারিতে দাঁড় করানো হয়। আমি এক সেকেন্ডের জন্য শিহরিত হই—পুরো সংকটের মধ্যে ওটাই ছিল একমাত্র সময়, যখন আমি নিজের সম্পর্কে একটু অনিশ্চিত ছিলাম। এই ধরনের শিহরণ জাগে যখন কেউ সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—এ সত্যটি হলো একটি জাতির জন্ম। উত্তেজনার জন্য শিহরণ হচ্ছিল, যার কারণ ছিল আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশেষভাবে উপমহাদেশের জাতিগুলোর ওপর সুদূরপ্রসারী হবে।

নিজেকে সংশয়মুক্ত করার অভিপ্রায়ে আমি রাজগোপাল ও গোলককে নিয়ে আয়োজনটি অবলোকন করলাম। সেখানে একটি মঞ্চ ছিল (ডায়াস), যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ বসবেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের ব্যবস্থা হলো। শপথ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য বিএসএফ কৃষ্ণনগর থেকে কিছু ভালো গায়ক জোগাড় করে। মুক্তিফৌজের একটি বাহিনী গার্ড অব অনার প্রদান করে, যদিও তারা খুব ভালো ইউনিফর্ম পরিহিত ছিল না, তবু তা ছিল চলনসই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে শপথ অনুষ্ঠানের চারপাশে মুক্তিফৌজ অবস্থান গ্রহণ করে।

মূল অনুষ্ঠান আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়, প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে এ সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সদস্য ও টিভির চিত্রগ্রাহকেরা উপস্থিত থাকবেন। আমি সকাল সাড়ে আটটায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করি এবং কলকাতায় ফিরে আসি। সেখানে রেখে এসেছিলাম গোলক ও রাজগোপালকে। আমি উদ্গ্রীব ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় অনুষ্ঠানের খবর জানার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমি জানতে পারি যে ৮২ জন ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিক, ছবি সংগ্রাহক ও টিভি চিত্রগ্রাহক ১৮টি জিপ ও কার এবং দুটি বাসে করে ওই এলাকায় বেলা ১১টায় প্রবেশ করেন। অনুষ্ঠানের স্থানে প্রায় ১৫ হাজার লোক সমবেত হয়েছিল।

বাংলাদেশের পতাকা উন্মোচিত করা হয় এবং নতুন জাতীয় সংগীত প্রথমবারের মতো গাওয়া হয়। গোলকের ভাষ্যমতে, এটি উপস্থিত সমগ্র জনতাকে বিদ্যুতায়িত করে ফেলে এবং তখন কারও চোখই শুষ্ক ছিল না। একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। নেতৃবৃন্দ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় কলকাতায় ফিরে আসেন।

আমার মতে, সফলভাবে শপথ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার পেছনে ছিল সপ্তাহব্যাপী উদ্বেগপূর্ণ উদ্যোগ। এর চূড়ান্ত পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা আমি কোনো পর্যায়েই আগাম ধারণা করতে বা বলতে পারছিলাম না; কারণ, এর সঙ্গে জড়িত ছিল অনেক অজানা নিয়ামক আর কর্মকাণ্ড। আমি নিজ থেকেই বিষয়গুলোর প্রতি নজরদারি করছিলাম এবং যৌক্তিকভাবেই। কারণ, আমার মনে হয়েছিল, যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী আক্রমণ করে, তাহলে প্রবাসে অবস্থিত সামনের সারির রাজনীতিবিদদের পুরো দলই নিঃশেষ হয়ে যেত এবং এ জন্য সারা বিশ্ব এমনকি বাংলাদেশও আমাকে ক্ষমা করত না। কেননা, এই মানুষগুলোই ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছিল। (সংক্ষেপিত)

কে এফ রুস্তমজি (খসরু ফারমোরজ রুস্তমজি): ১৯৭১ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রধান ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি বিএসএফ থেকে অবসরে যান। ১৯৭৬ সালে চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি লেখালেখি শুরু করেন।

অনুবাদ: মোহাম্মদ আবদুর রশীদ

১৯৭১, শত্রু ও মিত্রের কলমে (সম্পাদনা মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন ২০২০) গ্রন্থ থেকে

বিজ্ঞাপন