default-image

এইচ টি ইমাম তাঁর বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ বইয়ে লিখেছেন, ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণার অব্যবহিত পরেই শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ আত্মনিয়োগ করেন সরকার গঠনে এবং সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনায়। এপ্রিলের সেই প্রথম দিকে, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ আর নির্বিচারে গণহত্যায় মেতে উঠেছে, কারও থাকা-খাওয়া-নিরাপত্তা কিছুই ভালোভাবে বন্দোবস্ত হয়নি, সেই সময় শহীদ তাজউদ্দীন ঠান্ডা মাথায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিন্তা করেছেন, সমাধানের পথ খুঁজেছেন, অন্যদের উৎসাহিত করেছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।...

তিনি নিজে সৎ ও ভালো মানুষ ছিলেন, অন্যদেরও তা-ই মনে করতেন। তার খেসারতও দিয়েছেন। প্রচণ্ড চাপের মুখেও সহজে মেজাজ খারাপ করতেন না। কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন না। কথা বললেই বোঝা যেত পারিবারিক ঐতিহ্য ও আভিজাত্য আছে তাঁর।...

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। সরকারের কাজকর্ম সুশৃঙ্খল করতে তিনি মন্ত্রিপরিষদের সভায় আলোচনার জন্য বহু বিষয় ঠিক করতেন। আলোচ্যসূচির এসব বিষয় মনে রাখার জন্য তিনি সেগুলো প্রায়ই নোট আকারে লিখে রাখতেন তাঁর ডায়েরিতে। তাঁর নিজ হাতে লেখা এসব নোটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই এই গ্রন্থে নোটের কিছু কিছু এখানে উল্লেখ করা হলো।...

প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুক্ত সিদ্ধান্তে এবং ছোট ছোট নোট থেকে বোঝা যায় যে তিনি কত বিচক্ষণ ছিলেন। দেশ পরিচালনায় তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয় মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর প্রদত্ত ভাষণে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিটি ভাষণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়ে বলতে কখনো ভুলতেন না।

বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে উপস্থিত কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনলেন, পরিস্থিতি বুঝে নিলেন এবং এক ঐন্দ্রজালিক আবহ সৃষ্টি করে তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যের মাধ্যমে সবার মন জয় করে সুন্দরভাবে পরিস্থিতি শান্ত করে দিলেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, মহাপুরুষদের কথা কাছে থেকে দেখা বইয়ের ১৪৫ থেকে ১৭৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মার্কিন মুলুকে ছিলাম।...অসহযোগ আন্দোলন যখন চলে, তখন শুনতে পাই যে এর রূপকার হলেন তাজউদ্দীন আহমদ আর তাঁর সঙ্গে আমার অনেক সহযোগী ও বন্ধুরা কাজ করেছেন। যাঁরাই গভীর অভিনিবেশসহকারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন-দেশি বা বিদেশি, তাঁদের সবার মুখেই এই ব্যক্তির দক্ষতা সম্বন্ধে প্রশংসা শুনি। চাপের মুখে ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি নাকি বিশেষ তৎপর এবং তাঁর কথাবার্তায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক উত্তেজনা মোটেই নেই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কিছুদিনের মধ্যেই তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বের চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে গেল। তিনিই দিল্লিতে গিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁকে ঘিরেই জমে উঠল রণক্ষেত্র তৎপরতা।...

‘আমরা ঠিক করলাম যে আমাদের একজন প্রতিনিধিকে কলকাতায় গিয়ে সরেজমিনে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আসা উচিত হবে। আমাদের সহযোগী এবং তখন বিশ্বব্যাংকে কর্মরত হারুন-অর-রশিদ (সিএসপি অফিসার) আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা রওনা হলেন ১৩ এপ্রিল।...তিনি ওয়াশিংটনে প্রত্যাবর্তন করেন ২৪ এপ্রিলে। তাঁর মুখে তাজউদ্দীনের কর্মতৎপরতা, সমস্যা বিশ্লেষণ ও অঙ্গীকারের বিষয়ে আমরা সম্যক অবহিত হই। কিছুদিন পরে মে মাসে ওয়াশিংটনে এলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান এবং অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। তাঁরা ছিলেন তাজউদ্দীনের গুণগ্রাহী এবং অসহযোগ অন্দোলনের সময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন, তাঁদের মুখে তাজউদ্দীন আহমদের আরও পরিচয় পাই।

‘যাঁরাই বাংলাদেশ থেকে আসেন, তাঁদের মুখেই শুনি এই ব্যক্তির ত্যাগ, তিতিক্ষা, দেশপ্রেম ও দৃঢ়তার কাহিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের এমন কঠিন ব্রত খুব কম নেতাই গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এমন অনুগত সাগরেদও আর ছিলেন না। তিনি পুরান কাহিনি প্রমাণ করে বাস্তবে ৯ মাস দেশ শাসন করেন বঙ্গবন্ধুর নামে, তাঁরই অনুগত প্রতিনিধি হিসেবে। স্বাধীনতার ব্যাপারে কোনো আপস স্বপ্নেও ছিল না।...হারুন রশীদ যখন কলকাতায় ছিলেন, তখন পরিস্থিতি ছিল খুবই অনিশ্চিত এবং অগোছাল। তাঁর বিবেচনায় একটি বিশৃঙ্খল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আশার আলো ছিল ধীতস্থ প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও বিশ্বাস। তিনি এপ্রিলের শুরুতেই একটি বিশ্বব্যাপী গণ-আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং চূড়ান্ত বিজয় সম্বন্ধে তাঁর কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না।

default-image

‘সেই তখনই প্রধানমন্ত্রী বলেন যে বিদেশে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিবিদদের আনুগত্য পরিবর্তন করে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দরকার।...ড. নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহান তাজউদ্দীন আহমদের আর একদিক আলোকপাত করেন। আর তা ছিল পঁচিশ দিনব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনায় তাঁর প্রয়োগবাদী দক্ষতা এবং প্রশাসনিক খুঁটিনাটি সম্বন্ধে অসাধারণ দখল। মোটাদাগে নির্দেশনা দিতেন বঙ্গবন্ধু কিন্তু তার বাস্তবায়নে খুঁটিনাটি স্থির করতেন তাজউদ্দীন। সেখানে বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও আমলাদের একত্র করে সমন্বিত কার্যক্রম প্রণয়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সার্থক। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ছিল একটি বিশেষ মাত্রায়। একের ভাষা বা ইঙ্গিত অন্যজন অত্যন্ত সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন। এম আর সিদ্দিকী তুলে ধরেন তাঁর সাহস, দৃঢ়তা ও ত্যাগের দিক। শত বাধাবিপত্তি এবং কোন্দলের মোকবিলায় তিনি একেবারে ধীরস্থির। বিপদে বিচলতা তাঁর স্বভাবেই নেই। একটি মত বা কৌশল ধরে রেখে ক্রমে ক্রমে সবাইকে প্রভাবিত করে মতৈক্যে পৌঁছানোতে ছিল তাঁর কৃতিত্ব।

‘পাকিস্তানিদের মুখে সদাসর্বদা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। তারা বলতে শুরু করে যে এই লোকটি শেখ মুজিবকে বিপথগামী করেছে ও ছাত্রদের উসকে দিয়েছে। এই ব্যক্তি ভারতের চর এবং পাকিস্তানের চিরশত্রু। সংলাপ এই লোকের অনমনীয়তার জন্যই ভেঙে যায়। তারা আরও প্রচার করে যে তিনি আসলে বর্ণহিন্দু-কুলীন ব্রাহ্মণ, ধোঁকাবাজি করে মুসলমানদের ভোল ধরেছেন। রাও ফরমান আলী তার প্রকাশিত একটি বাইয়েও এ অভিযোগ তুলেছেন। তারা ঠিক ঠিকই বুঝেছিল যে এই নেতার দৃঢ়তা তাদের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে​ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের যত অগ্রগতি হতে থাকে, তাজউদ্দীন আহমদের সুনাম ততই বাড়তে থাকে।...

‘তাজউদ্দীন আহমদের লক্ষ্য ছিল একটি দেশকে স্বাধীন করতে হবে, পাকিস্তানি দখলদারকে উৎখাত করতে হবে। এই লক্ষ্যে অটুট থেকে কোনো অপ্রিয় পদক্ষেপ নিতে তিনি কখনো পিছপা হননি। মুক্তিবাহিনীর তিনি ছিলেন নিতান্তই আপনজন। তিনি প্রায়ই রণক্ষেত্রে হাজির হতেন। সেনাপতিদের নিজেদের কোন্দল-বিরোধিতার তিনিই সমাধান করতেন। তাঁর সাহস, একনিষ্ঠা, সহমর্মিতা ও অঙ্গীকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের অতিপ্রিয় নেতায় পরিণত করে। সব বিপদে, ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি ছিলেন একমাত্র নির্ভরস্থল, ভরসার পাত্র। মুক্তিযুদ্ধকালে তাজউদ্দীন আহমদের আরও কাহিনি শুনি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যেসব প্রতিনিধি বাংলাদেশ থেকে আসেন, তাঁদের মুখে।...আর একটি সূত্রের সংবাদ পাই এবং সেই সূত্র ছিলেন মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভা পরিষদ সচিব হোসেন তওফিক ইমাম।...

বিজ্ঞাপন

‘...১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংকের সভায় যোগ দিতে এলেন যখন, তখন সমাজতন্ত্রে বাংলাদেশের উত্তরণ নিয়ে একদিন তাঁর সঙ্গে খুব লম্বা এবং গভীর এক আলোচনা চলে। তাঁর মূল কথা ছিল যে আমরা সবাই সেই সমাজতন্ত্রের বৈষম্যহীন সমাজে আকৃষ্ট কিন্তু কী করে সেই সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলব, তা জানি না। পণ্ডিত নেহরু তো যৌবনেই সমাজতন্ত্রে আকৃষ্ট হন, এরপর সতেরো বছর ছিলেন ভারতের কর্ণধার। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ভারত তো তিনি গড়ে যেতে পারেননি। শুধু পূর্ব ইউরোপেই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বহাল আছে, চীনেও প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু সে প্রক্রিয়া তো কঠোর এবং আমরাও সে সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নই। পশ্চিমের শিক্ষালয় থেকে আহরিত সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বকথা দিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা মোটেও সহজ নয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তো সরকারি খাতে উদ্বৃত্তই হবে বিনিয়োগের উৎস। সেখানে প্রত্যক্ষ করের কোন কোন ভূমিকা থাকবে? প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যদি কারও হাতে না থাকে, তাহলে প্রত্যক্ষ করের অবকাশ কোথায়? বাংলাদেশে কিন্তু বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন প্রত্যক্ষ কর অথবা বাণিজ্য কর। এই প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্রের রাস্তাটি কেমন হবে? বাংলাদেশ তো সত্যিকার অর্থে বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা আহরণ করেনি। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শুধু সৈনিকদের মধ্যেই সমতা সৃষ্টি করতে পারেনি। বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী চূর্ণবিচিূর্ণ হয়ে একাকার হয়ে যায়নি। কায়েমি স্বার্থ অক্ষুণ্ন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দের যে আগুনে জ্বলে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন তা নয়, এঁদের দিয়ে সামাজিক বিপ্লব কত দূর যেতে পারে। আমার মনে হলো স্বপ্ন ও বাস্তবের সংঘাত এবং আদর্শ ও প্রয়োগবাদের মধ্যে ফারাক নিয়ে তিনি ছিলেন গভীরভাবে চিন্তিত। তাঁর সংবেদনশীল মনস্তত্ব ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে ছিল ক্ষতবিক্ষত।...

default-image

সাবেক সচিব সা’দত হুসাইনের মুক্তিযুদ্ধের দিন-দিনান্ত বইয়ের ৮৪ থেকে ৮৬ পৃষ্ঠায় তিনি তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, ‘...এর মধ্যে একদিন অফিসে এসে দেখলাম সচিবালয়ের পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত।...পরে জানা গেল ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে জনাব নূরুল কাদের খানের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হইচই থামল-তবে সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুখ গোমড়া করে বসে রইল, কাজকর্ম প্রায় থেমে গেল।...কিছুক্ষণ পর শোনা গেল আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হবেন।...তিনি একে একে সবার পরিচয় জানতে শুরু করলেন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে উপস্থিত কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনলেন, পরিস্থিতি বুঝে নিলেন এবং এক ঐন্দ্রজালিক আবহ সৃষ্টি করে তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যের মাধ্যমে সবার মন জয় করে সুন্দরভাবে পরিস্থিতি শান্ত করে দিলেন। আবার উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সবাই কাজ শুরু করে দিলেন।...কাছে থেকে দেখা জনাব তাজউদ্দীনকে শ্রদ্ধা করবে না, এমন লোক বাংলাদেশে তো দূরের কথা, ভূ-ভারতে আছেন বলে মনে হয় না।...তাজউদ্দীন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। যারা মুক্তিযুদ্ধে রাজনীতিবিদদের অবদান, আত্মত্যাগ, মেধা ও দক্ষতাকে খাটো করে দেখার প্রয়াস পান, তারা জনাব তাজউদ্দীনকে দেখেননি। এ রকম একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিকে কাছ থেকে দেখতে পাওয়া এক দুর্লভ সৌভাগ্যের ব্যাপার।...চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তিনি যে দক্ষতা, প্রজ্ঞা, কৌশল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, তার তুলনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাঁর পরিবার কলকাতাতে অবস্থান করলেও জনাব তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থিয়েটার রোডে ক্যাম্পে জীবন যাপন করেছেন। প্রখর মেধাসম্পন্ন এই নেতা নীতি-নিষ্ঠার এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিত রচনা করেছিলেন। তাঁর অতি সুন্দর হাতের লেখা, সাবলীল বক্তব্য উপস্থাপন, যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং প্রখর নীতিবোধ তাঁকে উচ্চতর এমন এক চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছে যে তাঁকে ভালোভাবে দেখতে হলে বা বুঝতে হলে দর্শককেও অনুশীলনের মাধ্যমে সমতল থেকে কিছু উঁচুতে অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর মন কাঁদলেও সাধারণ মানুষের জন্য পরিপূর্ণভাবে নিবেদিতপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ দৃষ্টিতে দেখে জনাব তাজউদ্দীনকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। নিজের দৃষ্টিকে একই সঙ্গে প্রসারিত এবং তীক্ষ্ণ করতে পারলে তবেই তাঁর প্রকৃত রূপ দেখা সম্ভব। যে রূপ নিরাভরণ, নিখাদ, বিদ্যুৎ প্রবাহে সৃষ্ট চুম্বক প্রকৃতির।’

সিমিন হোসেন রিমি তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে; বর্তমানে সাংসদ।