default-image

১৯৭১ সাল। সময়টা এপ্রিলের মাঝামাঝি। মেহেরপুরের অজপাড়া গাঁ ভবেরপাড়ার বৈদ্যনাথতলা আমবাগানে গুটি গুটি আম ধরেছে। দুই দিন আগের বৃষ্টিতে মাটি ভেজা ভেজা। রাস্তায় কাদা।

এরই মধ্যে ১৬ এপ্রিল আম্রকানন ঘিরে শুরু হলো চাঞ্চল্য। মঞ্চ তৈরি হলো, টেবিল এল, চেয়ার এল। পরদিন এলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় নেতারা। জড়ো হলেন বিদেশি সাংবাদিক ও হাজার হাজার মানুষ। শপথ নিলেন প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। পাঠ করা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এরপর ৯ মাসের মরণপণ যুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো রক্তে রঞ্জিত বিজয়। বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করল।

বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। আজ ১৭ এপ্রিল, শনিবার ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস, প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ নেওয়ার ৫০ বছর পূর্তি।

সেদিন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশ প্রশাসক (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে আনসারের ১২ জনের একটি দল গার্ড অব অনার দেয়। তার তিন সদস্য সিরাজ উদ্দিন, আজিম উদ্দিন শেখ ও হামিদুল হক এখনো বেঁচে আছেন। তাঁরা থাকেন এখনকার মুজিবনগরে। এই তিনজন গতকাল শুক্রবার মুজিবনগরের শহীদ স্মৃতিসৌধে গিয়ে স্মরণ করেন অস্থায়ী সরকারের শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানের দিনের কথা। ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করেন মূলত আজিম উদ্দিন শেখ ও সিরাজ উদ্দিন।

বিজ্ঞাপন

আজিম উদ্দিন শেখের বয়স ৭০ পেরিয়েছে। কিন্তু সেদিনের কথা পুরোপুরি মনে আছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আমবাগানে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ হবে, এ কথা ঘটনার আগে এলাকার মানুষ জানতে পারেনি। মেহেরপুরের অনেকেই হানাদারের হামলার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যাঁরা এলাকায় ছিলেন, তাঁদের বলা হয়েছিল ১৭ এপ্রিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা আমবাগানে আসবেন। সবাই যেন সেখানে যায়।

আমবাগানটির মালিক ছিলেন জমিদার রামনারায়ণ চক্রবর্তী। তাঁর ছোট ছেলে বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর নামে দুই হাজার গাছের বাগানটি বৈদ্যনাথতলা নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৪৫ সালে দেশ ছাড়েন রামনারায়ণ চক্রবর্তী। আমবাগানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে আধা কিলোমিটারের মতো দূরে। পরে জানা গিয়েছিল, কৌশলগত কারণেই বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের জন্য এই আমবাগান বেছে নেওয়া হয়।

আনসার দলের সদস্য আজিম উদ্দিন শেখ বলেন, তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী স্থানীয় আওয়ামী লীগের সংগ্রাম কমিটির সদস্য মোমিন চৌধুরীকে বৈদ্যনাথতলায় একটি মঞ্চ তৈরির কথা বলেন। সে অনুযায়ী সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যুক্ত জজ মাস্টার, আইয়ুব ডাক্তার, সৈয়দ মাস্টার, রফিক মাস্টার, জামাত মাস্টার, সুশীল কুমার বিশ্বাসসহ অনেকের উদ্যোগে মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হয়। এতে সহায়তা করে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। মঞ্চ তৈরি শুরু হয় রাত ১০টার পর।

আনসার দলটির খোঁজ কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল, তা জানান আনসার সদস্য সিরাজ উদ্দিন। তিনি বলেন, বৈদ্যনাথতলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) একটি ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পের ইনচার্জ ইউনুস আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তাঁর অধীনে থাকা পুরো ব্যাটালিয়ন নিয়ে কুষ্টিয়ায় চলে যান। যাওয়ার আগে স্থানীয় আনসার সদস্যদের হাতে ক্যাম্পের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘১৬ এপ্রিল রাতে ক্যাম্পের সামনে দিয়ে একের পর এক গাড়ি বাংলাদেশে ঢোকে। আমরা ক্যাম্প থেকে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। ভোরের দিকে দেখি শত শত বিএসএফ সদস্য। তারা সাদাপোশাকে বৈদ্যনাথতলার পুরোটা ঘিরে রেখেছে।’

বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের মঞ্চ তৈরির কাজে আনসারের দলটিও যুক্ত হয়েছিল। তারা গ্রাম থেকে মঞ্চ তৈরির জন্য কাঠের তক্তা ও বাঁশ সংগ্রহ করে। সেগুলো দিয়ে প্রাথমিক একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। আজিম উদ্দিন শেখ বলেন, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী পরিদর্শনে এসে মঞ্চ ও তোরণ তৈরির জন্য কাপড়, দড়ি, বাঁশ ও দেবদারুর পাতা জোগাড় করার জন্য বলেন। সে অনুযায়ী দুটি বাঁশ পুঁতে দেবদারুর পাতা দিয়ে তোরণ তৈরি করা হয়। চেয়ার, টেবিল ও মাইক আনা হয় ভারত থেকে। সঙ্গে কিছু মিষ্টিও এসেছিল। এ ছাড়া ইপিআর ক্যাম্প থেকে আনা হয় চৌকি।

মুজিবনগর সরকার গঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের লেখা থেকে জানা যায়, ঢাকায় ২৫ মার্চের কালরাতে হত্যাযজ্ঞের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। দু-এক দিন আত্মগোপনে থেকে তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় নেতারা একে একে ভারতে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানেই মুজিবনগর সরকার গঠনের পরিকল্পনা হয়।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় আম্রকাননে অতিথিরা আসতে থাকেন। তাঁদের সঙ্গে শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। জাতীয় নেতারা মঞ্চে ওঠার পর পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে বেলা ১১টায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তানে কারাগারে বন্দী থাকায় উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। শপথ গ্রহণ শেষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের নাম ঘোষণা করেন। মন্ত্রিসভায় ছিলেন ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। শপথের পরই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

গার্ড অব অনার পর্ব নিয়ে আনসার সদস্য সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আনসার দলের সদস্য ইয়াদ আলীকে কমান্ডে দিয়ে পেছনে ১১ জন দাঁড়াই। এ সময় এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমদ এসে আমাদের ১২ জনকে পেছনে দাঁড় করিয়ে নিজে কমান্ড নেন। আমরা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালাম দিই।’ তিনি জানান, এ সময় ফকির মোহাম্মদ, নজরুল ইসলাম, মফিজ উদ্দিন, অস্থির মল্লিক, মহিম শেখ, কিসমত আলী, সাহেব আলী, লিয়াকত আলী, ইয়াদ আলী প্রমুখ ছিলেন। তাঁরা এখন আর কেউ বেঁচে নেই।

আনসার সদস্যদের যে গার্ড অব অনার প্রদানের কাজটি করতে হবে, তা জানিয়েছিলেন তৎকালীন এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমদ। গার্ড অব অনারে মাহবুব উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে আসার ঘটনার মধ্যেও ছিল নাটকীয়তা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী যখন সবাইকে অভ্যর্থনা জানাতে ব্যস্ত, তখন এক ফাঁকে এসে বলেন, আবু ওসমান চৌধুরীকে (সেক্টর কমান্ডার) সদলবলে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য আসতে বলা হয়েছিল। তিনি তখনো পৌঁছাননি। কিছুক্ষণ পরে মাহবুব উদ্দিন আহমদকেই গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য বলা হয়। তিনি কয়েকজন সৈনিক ও আনসার সদস্যকে নিয়ে গার্ড অব অনার দেন।

বিজ্ঞাপন

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী যাঁকে শপথের মঞ্চ তৈরির জন্য বলেছিলেন, সেই মোমিন চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন ভবেরপাড়ার কেদারগঞ্জ এলাকার সংগ্রাম কমিটির সদস্য। তাঁর বাড়ি এখনকার মুজিবনগরে, সেখানেই থাকেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ছাড়াও কয়েক হাজার লোক শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি স্লোগান দেন। তাজউদ্দীন আহমদ সেদিনই বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করেন মুজিবনগর।

মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধ পরিচালনা ও বিদেশে বাংলাদেশের সংগ্রামের পক্ষে বৈশ্বিক জনমত গড়তে মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ সরকার সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘আমরা যা করছি, সবই শেখ মুজিবের নির্দেশে।’

মুজিবনগর এখন

মেহেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ৬৬ একর জায়গাজুড়ে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। ঢুকতেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধু তোরণ। কমপ্লেক্সজুড়ে নানাভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ঘটনাপ্রবাহ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। তৎকালীন এরশাদ সরকার স্বাধীনতার স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ স্তরের স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিবনগর কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯৯৮ সালে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়।

স্মৃতিসৌধটি উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিতে নির্মিত। সেখানে একটি স্থান সিরামিক ইট দিয়ে চিহ্নিত। এখানেই শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ।

পুরো কমপ্লেক্সে একটি মোটেল, আধুনিক মসজিদ, পোস্ট অফিস, ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, প্রশাসনিক ভবন, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়, আনসার ও ভিডিপি অফিস, রেস্টহাউস ও ব্যারাক, পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড, অফিস ভবন, হেলিপ্যাড, পিকনিকের জায়গা, গাড়ি পার্কিং, গণশৌচাগার, লন টেনিস কোর্ট প্রভৃতি রয়েছে। এ ছাড়া আছে ছয় ধরনের ছয়টি বিশাল বাহারি গোলাপবাগান, যা বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফাকে উল্লেখ করে।

আনসার সদস্য আজিম উদ্দিন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাঁদের কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। পত্রিকায় লেখালেখি হওয়ার পর আনসার সদর দপ্তর থেকে তাঁদের খোঁজ করা হয়। এরপর সরকার তাঁদের দুই ঘরের আধা পাকা বাড়ি করে দিয়েছে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে প্রত্যেককে দুই লাখ করে টাকা দেন। এ ছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁরা ভাতা পান।