default-image

যেকোনো নির্বাসিত বা প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে অনেক সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। তাজউদ্দীন সাহেবকে বোধ হয় তার চেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ায় পুরো যুদ্ধ সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেওয়ার দায়দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। প্রবাসের একটি শহর কলকাতায় বসে জনসমর্থন ব্যতীত অন্য কোনো সম্পদ ছাড়া ২ হাজার কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে তাঁকে গেরিলাযুদ্ধ সংগঠিত করতে হচ্ছিল। আর এমন এক বাহিনীর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ করতে হচ্ছিল, যে বাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ। প্রথম দিকে তো পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ ছিল অসম্ভব ব্যাপার। আর প্রতিটি পদক্ষেপে ভারত সরকারের সঙ্গে মতৈক্য ছিল অপরিহার্য। ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশের সমস্যাটি ছিল গুরুতর ও বহুমাত্রিক। ভারত নিজস্ব নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে ছিল। আমেরিকা, চীন ও বেশির ভাগ মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

তাজউদ্দীনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়া। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গি। জানি না, কজন এর সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন। আমার মনে হয়, প্রথম পর্যায়ে তাজউদ্দীনের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপই তাঁর প্রতি ভারত সরকারের আস্থা সৃষ্টি করে।

দিনের বেলা অফিস চলার বেশির ভাগ সময়ই প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত থাকতেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায়। ফলে আমি দিনের নিয়মিত কাজ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ কম পেতাম। সাধারণত দুপুরের খাবারের সময় কথাবার্তা হতো। আর সন্ধ্যার পরপর মাঝেমধ্যে আলাপ হতো।

বিজ্ঞাপন

প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সম্পদগত সামর্থ্য ছিল সীমিত। তাই কাজ ও দায়িত্বও ছিল সীমিত। ভারতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ বাঙালি উদ্বাস্তুর জন্য কোনো সেবা দেওয়াই যাচ্ছিল না। সরকারের কোষাগারে মাত্র ৭ কোটি রুপি ছিল, যা সীমান্ত এলাকার জেলা ও মহকুমাগুলোর কর্মকর্তা ও ব্যাংকাররা সংগ্রহ করে কোষাগারে জমা করেন।

বিদেশ থেকে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, যেমনটা এরকম ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতের সমাজতান্ত্রিক নেতা জে পি নারায়ণ, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বি পি কৈরালা এবং হেলসিংকি-ভিত্তিক সোভিয়েত ইউনিয়ন-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র। সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাঁরা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। সীমান্ত এলাকায় জঙ্গলের ভেতরে গোপন সরকারের ঘাঁটি স্থাপনের কোনো জুতসই জায়গা ছিল না, যেখান থেকে সরকার পরিচালনা করা যায়। থিয়েটার রোডের কার্যালয়ের নিরাপত্তাও তেমন ছিল না। বস্তুত, আমাদের অনেকেই চেয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভেতরে গোপন কোনো স্থান থেকে সরকার পরিচালনা করুন। তবে এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে মুজিবনগর সরকার একটি বিপ্লবী সরকার ছিল। তাজউদ্দীন নিজে এবং আমরা অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসে আবার একত্র হয়েছি ও বিপ্লবে যোগ দিয়েছি। এটা ছিল আমাদের জন্য একধরনের লংমার্চ। তাজউদ্দীনের তরুণ ভক্ত ও গুণগ্রাহীরা তো তাঁর নাম দিয়েছিল ‘তাও’ (সে-তুং)।

দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে অনেকেই মনে করতেন যে তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য দাবিদার। এ জন্য তাঁদের নিজস্ব যুক্তিও ছিল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল—অন্তত প্রথম দিকে। অনেক প্রভাবশালী এমএনএ তাজউদ্দীনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খন্দকার মোশতাক ও মিজানুর রহমান চৌধুরী। অধ্যাপক ইউসুফ আলী উত্তরবঙ্গের একটি অংশের নেতৃত্ব দিতেন, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছিলেন। তবে তাঁরা অত সরব ছিলেন না। সিলেটের এমএনএ দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং চট্টগ্রামের এমপি জহুর আহমেদ চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের সমালোচক ছিলেন। জহুর আহমেদ আগরতলায় নিজের দপ্তর খুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি দু-একবার কলকাতায় এসেছিলেন। ফরিদ গাজীকে একবার থিয়েটার রোডে আসতে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। বরিশালের তরুণ এমএনএ নূরুল ইসলাম মনজুও সরকারের তীব্র সমালোচক ছিলেন। এরকম আরও কয়েকজন ছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব একাধিকবার বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। এর সমস্যাও অনেক বড়।’ তিনি তাঁর এই মন্তব্যের বিষয়ে খুব নিশ্চিত ছিলেন।

বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে, সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে দেশ কতটা বাসযোগ্য হবে, সে নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল। তিনি যখন বিষণ্ন থাকতেন, তখন মাঝেমধ্যেই আমাকে বলতেন, ‘আমি জানি না, তুমি দেশে বাস করতে পারবে কি না।’ আমি তাঁকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তাতে সফল হইনি। ‘তুমি দেখে নিয়ো’ বলেছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যেভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, আসলেই সেটা খুব কঠিন কাজ ছিল। চার দশক পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক বাঙালিকে একই মনোভাব পোষণ করতে দেখি। তাদের এই মনোভাবের কারণ হয়তো ভিন্ন।

তবে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় হুমকি ছিলেন শেখ মুজিবের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি। বয়সে তরুণ হলেও তিনি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে হিসেবে নির্বাসিত সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার কেবল তাঁরই আছে।

কলকাতায় আওয়ামী লীগের মধ্যকার অনৈক্য প্রবল হলেও তা অতটা ভয়াবহ ছিল না। সে সময় আমার সেরকমই মনে হয়েছিল। আর এ বিষয়ে আমি ভালোভাবে বিস্তারিত কিছু লিখতেও পারব না। তবে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকগুলো প্রায়ই বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠত। ভাষার ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে অশোভন ছিল। আর তাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক সময়ই বৈঠকের কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করতেন না। তবে শেষের মাসগুলোয় যখন যুদ্ধপ্রস্ত্ততি পুরোদমে চলছে এবং এমএনএ ও এমপিরা মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন থেকে দলের অভ্যন্তরে উদ্বেগ-বিভেদও অনেক কমে যেতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয় শিলিগুড়িতে। সেটা ছিল ৫ জুলাই। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটা ছিল একটা কঠিন পরীক্ষা। তিনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। কেননা, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলের মধ্যে তাঁর অবস্থান তখনো দৃঢ় ছিল না। অনেকেই তাঁর তীব্র সমালোচক ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এই বৈঠকে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবতই কিছুটা উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত ছিলেন। তবে নিজের অবস্থান রক্ষা করা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তিনি গ্রহণ করেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা আনার একটা প্রয়াস ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ অবশ্য তা আর করেনি। বিদেশের মাটিতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়ে এবং শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা যখন লড়াই করছি, তখন নিজেদের মধ্যে অনৈক্যের প্রকাশ মোটেও শুভ কিছু বয়ে আনত না। আওয়ামী লীগের মধ্যে তাজউদ্দীন-বিরোধীরা এই প্রচারণা চালাচ্ছিল যে তিনি বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং যত দিন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তত দিন ভারত আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন দেবে না। বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী চলমান মুক্তিযুদ্ধের পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম ও যুদ্ধ-পরিস্থিতিও তুলে ধরেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন তরুণ এমএনএ আমাকে বলেছিলেন, বৈঠকে কয়েকজন সদস্য তাঁদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে চান। সরকার যেন তাঁদের সময় সময় চলমান সবকিছু সম্পর্কে অবহিত করে, তা-ও বলেন। এই বৈঠকের পর সরকারের অবস্থান শক্তিশালী হয়। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পদ থেকে অপসারণে ব্যর্থ হয়। সরকারের জন্য এটা ছিল একটা সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা। পরের কাউন্সিল সভাটি হয় ২০-২১ অক্টোবর কলকাতায়। প্রবাসে এটাই ছিল শেষ বৈঠক এবং তা খুব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাকে সেই বৈঠকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সভার কার্যক্রমের আংশিক দেখতে পেয়েছিলাম। শিলিগুড়ির বৈঠক সম্পন্ন করে কলকাতায় ফেরার পর সরকার ভালোভাবে সংহত হয়। (সংক্ষেপিত)

ফারুক আজিজ খান: একাত্তরের জুনের মাঝামাঝি তিনি তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব হিসেবে যোগ দেন। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) থেকে ১৯৮৫ সালে অবসর নেন।

বসন্ত ১৯৭১, ফারুক আজিজ খান, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আসজাদুল কিবরিয়া (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫) গ্রন্থ থেকে