default-image

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা চান। বিশেষ করে ভারতে আগত মানুষদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রদানের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা সহায়তা পেতে একটি আইনানুগ কাঠামো প্রয়োজন। সহযাত্রী আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করে তাজউদ্দীন ঠিক করলেন সরকার গঠন করবেন।

কাদের নিয়ে সরকার হবে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলের হাইকমান্ড নিয়ে। তখনো তাজউদ্দীন জানতেন না বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন। ইন্দিরা গান্ধীই তাঁকে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এরপর ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে ছয় সদস্যের বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। অন্য তিন সদস্য হলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ (পররাষ্ট্র), এম মনসুর আলী (অর্থ) ও এইচ এম কামারুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র)।

একই দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি হয়। ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার আগ পর্যন্ত এই ঘোষণাই ছিল বাংলাদেশ সরকারের আইনি ভিত্তি।

বিজ্ঞাপন

সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ১০ এপ্রিল দেশবাসীর উদ্দেশে যে ভাষণ দেন, তা ওই দিন ও পরদিন ভারতের কোনো গোপন কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়। ভাষণে তিনি বলেন, ‘আজ প্রতিরোধ আন্দোলনের কথা গ্রাম–বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে। হাজার হাজার মানুষ আজকের এই স্বাধীনতাসংগ্রামে যোগ দিয়েছেন। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বীর বাঙালি যোদ্ধারা এই স্বাধীনতাসংগ্রামের যে যুদ্ধ, তার পুরোভাগে রয়েছেন এবং তাঁদের কেন্দ্র করে পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, ছাত্র, শ্রমিক ও অন্য হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এঁদের সমর কৌশলে পারদর্শী করা হয়েছে ও শত্রুদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে বাংলার এ মুক্তিবাহিনীকে শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। সাগরপারের বাঙালি ভাইয়েরা যে যেখানে আছেন, আমাদের অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য পাঠাচ্ছেন।’

১৭ এপ্রিল বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও তাঁর মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন। স্থানটি ছিল তৎকালীন মেহেরপুর মহাকুমার আম্রকুঞ্জঘেরা বৈদ্যনাথতলা। সাংবাদিকেরা বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী কোথায়, জিজ্ঞেস করলে তাজউদ্দীন বলেন, মুজিবনগর। সেই থেকে ২২ ডিসেম্বর ঢাকায় স্থানান্তর না হওয়া পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল বাংলাদেশের ঘোষিত রাজধানী। আর সরকারও পরিচিতি লাভ করে মুজিবনগরের নামে। তার সবটাই ছিল প্রতীকী অর্থে। আসলে সরকার পরিচালিত হতো কলকাতা হতে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রথম কর্তব্য হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায় এবং ভারতের সহায়তা নিশ্চিত করা।

default-image

২৪ এপ্রিল ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রথম চিঠি লেখেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। চিঠিতে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এর ফলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে মুজিবনগর সরকার যেমন বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সহায়তা পেয়েছে, তেমনি ভেতরে-বাইরে বিরোধিতারও মুখোমুখি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম দেশগুলো সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। একাত্তরে চীন-মার্কিন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় দূতিয়ালির কাজ করে পাকিস্তান। ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গঠনের নজির ছিল না। নাইজেরিয়ার বায়াফ্রা আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে।

সেই জটিল ভূ-রাজনীতিতে অন্যতম বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন জরুরি ছিল। একই সময় মুক্তিযুদ্ধকে বহুদলীয় চরিত্র দিতে আওয়ামী লীগ, ন্যাপের দুই অংশ, কমিউনিস্ট পার্টি ও জাতীয় কংগ্রেসকে নিয়ে গঠন করা হয় উপদেষ্টা পরিষদ। যদিও এর কোনো ভূমিকা ছিল না। ভারত-সোভিয়েত সহযোগিতা চুক্তি সই হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তাও বাড়তে থাকে। মুজিবনগর সরকার রণাঙ্গনের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য পায়। কয়েক মাসের মধ্যে অধিকাংশ বাঙালি কূটনীতিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করতে থাকেন। লন্ডনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্ব প্রবাসী বাঙালিদের আন্দোলন আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁকে করা হয় মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানমালা মুক্তিযোদ্ধা ও অবরুদ্ধ জনপদের মানুষকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আগস্টেই কলকাতার মার্কিন মিশনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আপসরফার প্রস্তাব দেন। তিনি ও তাঁর সহগামীরা প্রস্তাব দেন মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে স্বাধীনতার দাবি ছেড়ে দিতেও তাঁরা রাজি। তাজউদ্দীন বললেন, স্বাধীনতা ও মুজিবের মুক্তি দুটোই চাই। কিছুদিন আগে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু করলে ইন্দিরা গান্ধী এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেন। ১২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে চিঠি লেখা ছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন।

ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা পিএন ধর লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যোগাযোগের বিষয়টি আমাদের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি জানার পর তাজউদ্দীন আহমদও খুব ভীত ছিলেন যে তাঁর সহকর্মী হয়তো একটা বিপদ সৃষ্টি করবেন।’ ( সূত্র: মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় প্রশাসনের অন্দরমহল। ১৯৭১: শত্রু–মিত্রের কলাম)।

আওয়ামী লীগের যুবনেতারা শুরু থেকে সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাঁরা নিজেদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিয়োগপ্রাপ্ত দাবি করে সরকারের বাইরে গিয়ে গঠন করেন মুজিব বাহিনী। তাঁদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে মুজিব আদর্শের সৈনিকদের নিয়ে আলাদা বাহিনী গঠন করা জরুরি। জেনারেল উবানের অধীনে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নেন এবং দেশের ভেতরে গেরিলা যুদ্ধ করেন। কোনো কোনো স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীকে বিচলিত করে। তিনি বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নজরে এনেও ফল মেলেনি। তাঁরা চাননি এক ঝুড়িতে সব ডিম থাকুক। তবে তাঁরা এই নিশ্চয়তা দেন যে মুজিব বাহিনী সরকারের কোনো কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করবে না।

বিভিন্ন দলিল ও গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুত মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম প্রসারিত করা এবং বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সমর্থন আদায়ে তাজউদ্দীন আহমদ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মোশতাক ছাড়া মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যদের সহযোগিতা পেয়েছেন। বিশেষভাবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সব কাজেই তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছেন।

তাজউদ্দীন আহমদ নিশ্চয়ই ভারতীয়দের আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তিনি দেশের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি। দুটো উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ভারত ১৬ ডিসেম্বরের পর প্রশাসন চালানোর জন্য তাঁদের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠাতে চেয়েছিল। যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ সরকারে যাঁরা আছেন তাঁরা কনিষ্ঠ কর্মকর্তা। তাজউদ্দীন তাদের এ প্রস্তাবে নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তারা ভালোভাবেই সরকার চালিয়েছেন। বাইরের লোক নেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জে এন দীক্ষিত, যিনি একাত্তরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ড গঠন নিয়ে একটি সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে একই মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সেনাবাহিনীর আপত্তি ছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, সরকারের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের শৃঙ্খলা ও আনুগত্য বজায় রাখতে হলে ওসমানীসহ মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের যৌথ কমান্ডের উচ্চপদে রাখতে হবে। ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপে ভারতের সেনা কর্মকর্তারা এই প্রস্তাব মেনে নেন। (সূত্র: ভারত যুক্ত হলো: ১৯৭১ শত্রু–মিত্রের কলাম।)

ভারতের বিএসএফের তৎকালীন প্রধান কে এফ রুস্তমজি আরেকটি তথ্য দিয়েছেন। দিল্লি যাওয়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ সীমান্তে যান তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিকে দেখার জন্য। সেখানে যশোর সেক্টরের ইপিআর কর্মকর্তা মেজর ওসমানের সঙ্গে কথা বলেন। ওসমান ও তাঁর সহযোগীরা অস্ত্র ও গোলাবারুদের দাবি জানিয়ে বলেন, অন্যথায় পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। তাঁদের চাহিদা মোতাবেক বিএসএফ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেয়। ওসমানের দল চলে গেলে তাজউদ্দীন বলেন, ‘তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেলেন। সেই সঙ্গে নিয়ে গেলেন আমাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো।’

মুজিবনগর সরকারের অন্য সদস্যরা কলকাতায় সপরিবার বাস করলেও তাজউদ্দীন ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ৮ থিয়েটার রোডে নিজের অফিসের পাশে একটি ছোট্ট কক্ষে থাকতেন। নিজের কাপড় নিজে ধুতেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এক অর্থে একজন সাধারণ জীবন যাপন করেছেন।

সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক