default-image

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাইলফলক কয়েকটি তারিখের একটি ১৮ এপ্রিল। আগের দিন (১৭ এপ্রিল) প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ নেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। এর রেশ না কাটতেই কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ঘটে বড় ঘটনা। এদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় পাকিস্তানের উপহাইকমিশনে কর্মরত উপহাইকমিশনার হোসেন আলী এবং তাঁর সঙ্গে প্রায় সব বাঙালি কর্মকর্তা–কর্মচারী বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন।

কলকাতার ৯ নম্বর পার্ক সার্কাস অ্যাভিনিউর এই উপহাইকমিশন কার্যালয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে হোসেন আলী উত্তোলন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বিদেশের মাটিতে এটাই ছিল প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন। এরপরই উপহাইকমিশনের নাম পাল্টে করা হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, কূটনৈতিক মিশন’।

অবশ্য এর আগে দিল্লিতে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আরেক ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন দুই তরুণ বাঙালি কূটনীতিক কে এম শেহাবউদ্দিন ও আমজাদুল হক। ৭ এপ্রিল (মতান্তরে ৬ এপ্রিল) তাঁরা বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে প্রথম বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার গঠন হওয়ার আগে তাঁরা দুজনই ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশকারী প্রথম কূটনীতিক। শেহাবউদ্দিন ও আমজাদুল হক দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনে যথাক্রমে দ্বিতীয় সচিব ও সহকারী প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পক্ষত্যাগের পর তাঁরা দুজন দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অন্যায়-অত্যাচারের তীব্র নিন্দা জানান।

বিজ্ঞাপন
default-image

১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় পাকিস্তানের উপহাইকমিশনার হোসেন আলীর সঙ্গে দেখা করেন বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেওয়া নড়াইল মহকুমার (বর্তমানে জেলা) এসডিও (সাব-ডিভিশনাল অফিসার) কামালউদ্দিন সিদ্দিকী। তিনি হোসেন আলীকে অনুরোধ করেন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের।

এরপর ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় হোসেন আলী নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা পার্ক সার্কাস ময়দানে মিলিত হন। তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ছিলেন বিএসএফের কর্মকর্তা শরবিন্দু চট্টোপাধ্যায়। সেখান থেকে তাঁরা আউটরাম ঘাটে গিয়ে গেলর্ড রেস্টুরেন্টে এ বিষয়ে আলোচনায় করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য হোসেন আলীকে অনুরোধ করেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, ১৮ এপ্রিল হোসেন আলী বাঙালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে উপহাইকমিশনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করবেন।

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনার পর হোসেন আলী উপহাইকমিশনে ফিরে এসে বিষয়টি বাঙালি কর্মকর্তাদের জানান। তাঁরা এ ব্যাপারে সম্মতি দেন। উপহাইকমিশনে তখন চারজন বাঙালি কর্মকর্তা ও ৩০ জন অবাঙালিসহ প্রায় ৯০ জন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। চার বাঙালি কর্মকর্তা ছিলেন প্রথম সচিব রফিকুল ইসলাম, তৃতীয় সচিব আনোয়ারুল করিম চৌধুরী ও কাজী নজরুল ইসলাম এবং সহকারী প্রেস অ্যাটাশে বা প্রেস সচিব মকসুদ আলী।

পরিকল্পনামতো ১৮ এপ্রিল সকাল সাতটার দিকে হোসেন আলীসহ বাঙালি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা হাইকমিশনে সমবেত হন। সবার সামনে হোসেন আলী বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বন ও উপহাইকমিশনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ঘোষণা দেন। এটা শুনে বাঙালি কর্মচারীদের একটি অংশ দ্বিধান্বিত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় হোসেন আলীর আনুগত্য প্রকাশ ও পতাকা উত্তোলন কিছুটা বিলম্বিত হয়।

default-image

হোসেন আলীর পরিকল্পনা পরোক্ষভাবে সফল করতে সকাল থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রধান কে এফ রুস্তমজি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলোক মজুমদার, রাজ গোপালসহ অনেকে উপহাইকমিশনের আশপাশে গোপনে অবস্থান নিয়ে সতর্ক নজর রাখছিলেন। পতাকা উত্তোলনে বিলম্ব হওয়ায় তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

এর মধ্যে হোসেন আলী দুবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করেন। এভাবেই দুপুর প্রায় ১২টা বেজে যায়। এ সময় হঠাৎ শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। ঝড়ের দাপটে উপহাইকমিশন ভবনের ছাদে টাঙানো পাকিস্তানি পতাকা ছিঁড়ে ঝুলে পড়ে। ততক্ষণে কর্মচারীদের বেশির ভাগের দ্বিধা কেটে যায়। সব মিলে ঘটনা যেন বাংলাদেশের পক্ষেই চলে যায়। হোসেন আলীও তাঁর সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে অবশেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ওই ভবনের ছাদে বাংলাদেশের পতাকা টাঙিয়ে দেন।

হোসেন আলী পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বিএসএফের সদস্যরা পাকিস্তান উপহাইকমিশনের নামফলক সরিয়ে বাংলাদেশের নামফলক লাগিয়ে ফেলেন। প্রায় একই সময়ে হোসেন আলী কয়েকজন কর্মচারীর সহায়তায় তাঁর অফিস কক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কবি ইকবালের ছবি নামিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি টাঙান।

বিজ্ঞাপন
default-image

খবর পেয়ে কিছু সাংবাদিক উপহাইকমিশন এলাকায় আগেই সমবেত হয়েছিলেন। বেলা একটার দিকে হোসেন আলী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘এখন থেকে আমি আর পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার নই। আমি এখন থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি। বাংলাদেশ সরকার আমাকে যে নির্দেশ দেবে, আমি সেইমতো কাজ করব।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা কলকাতা শহরে। তারপর দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করে বাংলাদেশ মিশনে। তাঁরা হোসেন আলী ও মিশনের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানাতে থাকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগপর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতাতেই এবং হোসেন আলী ছিলেন ভারতে বাংলাদেশ মিশনের প্রথম প্রধান। স্বাধীনতার পরও তিনি কিছুদিন ওই পদে কর্মরত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালি কূটনীতিকদের বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পাকিস্তানের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে তাঁরা যে দেশে কর্মরত ছিলেন, সেসব দেশেও কিছুটা হলেও চাপ সৃষ্টি করে।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা (কলকাতা, ভারত) ও দ্য ব্রিটিশ, দ্য বেন্ডিট অ্যান্ড বর্ডারম্যান। কে এফ রুস্তমজি।