default-image

মুক্তিযুদ্ধের সময় কখনোই মাগুরার শ্রীপুর অঞ্চলে স্থায়ী ঘাঁটি গাড়তে পারেনি পাকিস্তানি বাহিনী। ক্যাম্প করতে পারেনি রাজাকাররাও। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা একটি বাহিনীর বীরত্বের কারণে শ্রীপুর ছিল একপ্রকার মুক্তাঞ্চল। ফলে শ্রীপুর হয়ে ওঠে ভারতে শরণার্থী যাওয়ার জন্য নিরাপদ রুট। এমনকি পাশের ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর জেলার বেশকিছু এলাকায় ছিল ওই বাহিনীর দাপট।

স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল ‘আকবর বাহিনী’ হিসেবে। পরে ‘শ্রীপুর বাহিনী’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আকবর হোসেন মিয়া। ২০১৫ সালে মারা যান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শ্রীপুর উপজেলার টুপিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তৎকালীন শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও শ্রীকোল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছিলেন আবকবর। সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন বাহিনী থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে ধাপে ধাপে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুশৃঙ্খল ওই বাহিনী। স্থানীয় একটি বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধে এমন সফলতার ঘটনা বিরল।

আকবর হোসেন মিয়ার লেখা মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী বই ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জাহিদ রহমান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী: শত যোদ্ধার স্মৃতিকথা বই থেকে জানা যায় আকবর বাহিনীর কার্যক্রমের নানা তথ্য। এপ্রিলের শেষ দিকে মাগুরায় পৌঁছায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা মূলত মাগুরা শহর ও আশপাশের এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। পাকিস্তানিরা আসার পর রাজাকারদের মনোবল বেড়ে যায়। কিন্তু শুরু থেকেই শ্রীপুর এলাকায় হানাদার ও তাদের দোসরদের সামনে তীব্র প্রতিরোধ গড়েন আকবর ও তাঁর অনুসারীরা। এই দলে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক তুখোড় নেতা মোল্লা নবুয়ত আলী, খামারপাড়ার মৌলভী খোন্দকার নাজায়েত আলী, খন্দকার সুজায়েত আলীসহ অনেকে। তাঁদের সম্মিলিত পরিকল্পনায় গড়ে ওঠে আকবর বাহিনী। শুরুর দিকে সম্বল বলতে ছিল মাত্র কয়েকটি রাইফেল।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে মাগুরা, শ্রীপুর ও শৈলকুপায় ভীতিকর এক অবস্থা তৈরি করে চোর-ডাকাত ও দস্যুরা। তাদের তৎপরতায় বিশেষ করে হিন্দুপল্লিতে মহা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আকবর হোসেন ও মোল্লা নবুয়ত আলী সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ডাকাত-দস্যু দমনে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেন। এতে জনমনে স্বস্তি ফেরে। এভাবে আকবর বাহিনীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে তরুণেরা এসে ভিড়তে থাকে এই বাহিনীতে।

মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহের বড় ভরসা ছিল ভারত।

সবাই ছুটতে থাকেন ভারতের প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোতে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আকবর হোসেন ও তাঁর বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি দিনের জন্যও এলাকা ছেড়ে ভারতে যাননি তিনি। স্থানীয়ভাবেই প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহের কৌশল অবলম্বন করেন আকবর হোসেন। শ্রীপুরে খামারপাড়া ও খালিয়া খড়িচাইল এলাকায় গড়ে তোলেন প্রশিক্ষণ শিবির।

১৯৭১ সালের ৫ জুন প্রথম সম্মুখযুদ্ধে নামে আকবর বাহিনী। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি থানায় রামদিয়া এলাকায় ওই যুদ্ধ হয়। আকবর হোসেন তাঁর বইয়ে লিখেছেন, রামদিয়ায় ছিল পাকিস্তানিদের অন্যতম সহযোগী বিহারী চাঁদ খাঁর বাড়ি। ওই বাড়িতে সেদিন ১৮টি রাইফেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আকবর বাহিনীর যোদ্ধারা। পরবর্তী সময়ে এই বাহিনী অন্তত ২৭টি যুদ্ধে অংশ নেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল একাধিকবার শ্রীপুর থানা দখল, শৈলকুপা থানা আক্রমণ, ইছাখাদা ও মাগুরা আনসার ক্যাম্পে হামলা, বিনোদপুর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ। এ ছাড়া কাজলী, নাকোল, গোয়ালপাড়া, মাশালিয়া, খামারপাড়া, আলফাপুর রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি হয় আকবর বাহিনী। নিজ এলাকা নিরাপদ রেখে এই বাহিনী রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ও পাংশা, মাগুরা সদর ও মহম্মদপুর এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপাতেও বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সহায়তা করে আকবর বাহিনী। এসব এলাকায় অন্তত ছয়টি ছোট বাহিনী গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখে আকবর বাহিনী। ১৬ ডিসেম্বরের পর রাজবাড়ী মুক্ত করার যুদ্ধেও অংশ নেন এই বাহিনীর সদস্যরা।

বিশেষ করে বারবার শ্রীপুর থানা দখলে আকবর বাহিনীর সফলতা ব্যাপক আলোচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে তিনবার শ্রীপুর থানা দখল করে এই বাহিনী। ২১ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো তারা শ্রীপুর থানা দখল করে। ওই ঘটনার দু-তিন দিন পর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে ঘোষণা করা হয় ‘শ্রীপুর থানা মুক্ত’। এমনকি শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে আকরাম হোসেন নামের এক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়োগ দেয় আকবর বাহিনী। এই ঘটনাকে একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

প্রতিটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানি ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে বড় সফলতা পেলেও আকবর বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হয় সামান্যই। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ে বাহিনীর একমাত্র যোদ্ধা শহীদ হন। অক্টোবরে বিনোদপুরের যুদ্ধে আকবর বাহিনীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা শ্রীপুরের জহরুল আলম মুকুল গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। অন্যদিকে এই বাহিনীর হাতে পাকিস্তানি অনেক সেনা হতাহতের তথ্য আছে আকবর হোসেনের বইটিতে।

এ বিষয়ে আকবর বাহিনীর অন্যতম সদস্য মাগুরা সদর উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মো. বদরুল আলম বলেন, ‘আকবর বাহিনীর যুদ্ধে সফলতার অন্যতম কারণ ছিল কৌশল। আমাদের কৌশলের মূলে ছিল “হিট অ্যান্ড রান” (আক্রমণ করেই সরে পড়া)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেন এমন সিদ্ধান্ত কখনোই নেননি, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বড় কোনো চাপ আসে। পেশাগত জীবনে আমি অনেকগুলো দেশে যুদ্ধ করতে গেছি। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ দিয়ে গঠিত একটি বাহিনী যে এত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা আসলে বিরল।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম ছিলেন সেনাবাহিনীর নায়েক। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পালিয়ে এসে আকবর বাহিনীতে যোগ দেন। বদরুল আলমের মতো আকবর বাহিনীতে ১০০ জনের বেশি যোদ্ধা ছিলেন বিভিন্ন সরকারি বাহিনী থেকে আসা। বিশেষ করে সেনাবাহিনী, ইপিআর ও পুলিশের ছুটিতে থাকা বা পালিয়ে আসা সদস্যরাই ছিলেন এই বাহিনীর সম্মুখসারির যোদ্ধা। আকবর বাহিনীতে বিভিন্ন সময়ে সহযোগীসহ এক হাজার যোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৩৩ জনের তথ্য আকবর হোসেনের লেখা বইটিতে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

ভারতে শরণার্থী যাওয়ার শ্রীপুর রুট

আকবর বাহিনীর কারণে শ্রীপুরে মুক্তিযুদ্ধের বেশির ভাগ সময় উড়েছে বাংলাদেশের পতাকা। মূলত এ কারণেই শ্রীপুর হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের ভারতে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তা। যাঁরা ভারতে যেতে এই পথ ব্যবহার করেন, তাঁদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আবদুল জব্বার। বর্তমানে তিনি রাজবাড়ী জেলা পরিষদের চেয়রাম্যান।

ফকির আবদুল জব্বার বলেন, ‘তখন আমি রাজবাড়ী কলেজের ভিপি (সহসভাপতি)। ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ভারত যাচ্ছিলাম। তখন সারা দেশে হানাদার ও রাজাকারদের জয়ধ্বনি। এর মধ্যে যখন শ্রীপুর পৌঁছালাম, একটা বিচিত্র অনুভূতি হলো। দেখলাম, এখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। একটা মুক্ত এলাকার স্বাদ পেলাম। ওই সময় আমার মনে হলো, কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো স্বাধীন হবে বাংলাদেশ।’ কীভাবে বিভিন্ন স্তরে পাহারা বসিয়ে শ্রীপুর এলাকাকে আকবর বাহিনী সুরক্ষিত রেখেছিল, সেই বিষয়ে স্মৃতিচারণা করেন তিনি।

জাহিদ রহমান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে আকবর বাহিনী: শত যোদ্ধার স্মৃতিকথা বই থেকে জানা যায়, শ্রীপুরের টুপিপাড়ার কৃতী সন্তান মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) এ টি এম আবদুল ওয়াহ্হাব আকবর বাহিনীকে রণকৌশল ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করেন। এই বাহিনীর জন্য অস্ত্র পেতে ভারতে জোর তদবির করেছেন তিনি। আকবর বাহিনীকে ‘শ্রীপুর বাহিনী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার আবুল মঞ্জুর। এ ছাড়া মেজর এম এন হুদা এই বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রবাসী সরকার, স্বাধীন বাংলা বেতার, বিবিসি ও পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে শ্রীপুর বাহিনীর বীরত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জাহিদ রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় বাহিনীগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, তখন এই বাহিনীগুলোই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আর আকবর বাহিনীর বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা নিজেদের অঞ্চলকে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় হানাদার ও রাজাকারদের হাত থেকে মুক্ত ও সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিল। আর যেকোনো যুদ্ধে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুরা। আকবর বাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সফলতা এখানে। এই বাহিনী নিজ এলাকায় এ ধরনের মানুষগুলোকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছিল। শ্রীপুরে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ছিল হাতে গোনা।