default-image

অবিশ্বাস্য! অলৌকিক! এমনই মনে হতে পারে সিনেমাকেও হার মানানো গল্পটা। ফারুকুল ইসলাম তখন ১৫ বছরের কিশোর। অপর দুই ভাই মোশারফ হোসেন ওরফে সানু (২৩) ও নাসির উদ্দীনের (২০) সঙ্গে তিনিও যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বরগুনার ওয়্যারলেস অফিসের বেতারযন্ত্রটি যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করত রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা। যন্ত্রটি অকেজো করতে গিয়ে ধরা পড়েন ফারুকুল ও তাঁর দুই ভাই। পরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাঁদের গুলি করা হয়। দুই ভাই মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যান ফারুকুল। পরদিন ফারুকুলকে আবার হত্যার চেষ্টা চলে। হানাদারেরা একে একে দুটি গুলি ছোড়ে। কিন্তু একটিও ফারুকুলের শরীর ভেদ করল না। এমন অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি প্রথম আলোকে শোনাচ্ছিলেন এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালের ২৮ মের ঘটনা। বরগুনা জেলখানার পেছনের মৃত্যুকূপ (গণকবর)। সেখানে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে অনেককে হত্যা করা হয়। ওই সারিতে ছিলেন ফারুকুল ও তাঁর দুই ভাইও। গুলির আঘাতে অনেকের দেহ নিথর হয়ে গেছে। কেউ মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। রক্তের দিঘিতে ভাসছিলেন ফারুকুল। দেখলেন, গুলিতে তাঁর ভাই নাসির উদ্দীনের পেট এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। নাড়ি–ভুঁড়ি বের হয়ে এসেছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।

নাসির উদ্দীন তখনো জীবিত। কাতরাতে কাতরাতে বললেন, ‘ফারুক তুই আছিস?’ ফারুকুল ‘হ্যাঁ’ জবাব দেন। ‘তোর গায়ে গুলি লাগে নাই?’ বলেন নাসির। ফারুকুল ‘না’ বলতেই তিনি বলে ওঠেন, ‘আরে লাগছে। তুই ভালো কইর‌্যা দ্যাখ। তোর সারা শরীরে তো রক্ত।’

বিজ্ঞাপন

ততক্ষণে পাকিস্তানিরা জেলখানার নারী বন্দীদের ওয়ার্ডের দিকে চলে গেছে। ফারুকুল নিজ হাতে ভাইয়ের পেটে নাড়ি-ভুঁড়ি ঢুকিয়ে দেন। নাসির তখন বলেন, ‘কাজ হবে না রে ভাই। তোরে হয়তো আল্লায় ফিরাইয়্যা দেতে পারে। তুই নিজে বাঁচ, আমার চিন্তা করিস না।’ পরক্ষণে বলেন, ‘একটু পানি দিবি?’ ফারুকুল চারদিকে তাকান। পানি কোথায়? বারুদ আর রক্তের গন্ধে নিশ্বাস নেওয়াই দায়। ভাইয়ের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকান। নাসির উদ্দীন বলেন, ‘ঠিক আছে। লাগবে না। আমি আর নিশ্বাস নিতে পারছি না। তুই পালা। মায়রে দেইখ্যা রাখিস।’

এমন সময় রাইফেল হাতে রাজাকাররা ওই মৃত্যুকূপে হাজির। ওদের মধ্যে পরিচিত একজন বলে, ‘তুই এহনো বাইচ্যা আছিস? তোর গুলি লাগে নাই?’ কয়েকজন দ্রুত ছুটে যায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কাছে। অবিশ্বাস্য এই ঘটনা জানায়। পাকিস্তানি সেনারা দৌড়ে এসে ফারুকুলকে ঘিরে দাঁড়ায়। যেন ওরা অদ্ভুত চোখে চিড়িয়াখানার কোনো জন্তুকে দেখছে। সেনাদের মধ্যে যার হাতে টমিগান ছিল, তার নাম ইকবাল। সে বলে, ‘ওঠ।’ ফারুকুল উঠতে পারেন না। জমাটবাঁধা রক্তে আটকে গেছে তাঁর শরীর।

হানাদারেরা ফারুকুলকে ধরাধরি করে তোলে। তাঁকে নিয়ে যায় জেলখানার ওয়ার্ডে। সেখানে গোসল করায়। বিস্কুট খেতে দেয়। রাতে পাকিস্তানিরা মদ খায়। নারী ওয়ার্ড থেকে অনেক মেয়েকে ধরে নিয়ে যায় পাশের ডাকবাংলোয়।

default-image

পরদিন ১৭ জন হিন্দু তরুণকে গুলি করে মারে পাকিস্তানিরা। এরপর ফারুকুলের পালা। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাপ্টেনের কাছে। তাঁকে দুরু দুরু বুকে ফারুকুল বলেন, ‘স্যার, আমার দুই ভাইরে মাইর‌্যা হালাইছেন। আমার মায় একা। আমারে মায়ের কাছে থাকতে দ্যান।’

ক্যাপ্টেন কিছু বলার আগেই পাকিস্তানি সেনা ইকবাল বলে, ‘ওকে বাঁচিয়ে রাখলে আমাকে মেরে ফেলুন, স্যার।’ বিহারি ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্যার, ওকে বাঁচিয়ে রাখলে পরে ও-ই আমাকেই মেরে ফেলবে।’

ফারুকুলকে আবার গুলি করার নির্দেশ দিলেন ক্যাপ্টেন। এবার তাঁকে নেওয়া হলো টমিগানের সামনে। বসানো হলো দেয়ালের সামনে। এরপর গুলি। প্রথম গুলিটি চলে গেল ফারুকুলের বাঁ কানের পাশ দিয়ে। ক্যাপ্টেনের চিত্কার, ‘এগেইন, এগেইন শুট!’ পরের গুলিটা বেরিয়ে গেল মাথার ডান পাশ দিয়ে। সবাই তাজ্জব হয়ে ফারুকুলকে দেখতে লাগল। ক্যাপ্টেন বললেন, ‘তোমহারা পাস তবজ হ্যায় (তোমার কাছে কবজ আছে)’? তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো ফারুকুলের শরীর। কোথাও কোনো কবজ মিলল না।

ধরা পড়ার ২৮ দিন পর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসককে (এসডিও) ধরাধরি করে ফারুকুলকে ছাড়িয়ে আনেন তাঁর মা অমেরুননেছা। বরগুনা শহরের উপকণ্ঠে মাইঠা এলাকার বাসিন্দা ফারুকুলরা। ১১ ভাইবোনের (৬ ভাই, ৫ বোন) মধ্যে ফারুকুল সবার ছোট।

বিজ্ঞাপন

ফারুকুল বলেন, দুই সন্তান হারিয়ে মা অমেরুননেছা তখন পাগলপ্রায়। তিনি বরগুনার তৎকালীন এসডিও আনোয়ার হোসেনের কাছে যান। ফারুকুলের মুক্তির জন্য কাকুতি–মিনতি করেন। এতে এসডিওর মন গলে। তিনি ঘটনাটি জানান পটুয়াখালীতে মেজর নাদের পারভেজের কাছে। ফারুকুলের মুক্তির জন্য অনুরোধ জানান। ২৮ দিন কারাগারে থাকার পর মুক্তি পান ফারুকুল।

ফারুকুলের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁদের তিন ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান থেকে শুরু করে নানা কাহিনি। পড়া শেষ হলে প্রতি রাতেই ছোট দুই ভাই নাসির ও ফারুকুলকে একাত্তরের প্রেক্ষাপট বোঝাতেন সেজ ভাই মোশারফ। একপর্যায়ে তিনজনই শপথ নেন, তাঁরা বরগুনার মাটিতে হানাদারদের ঘাঁটি গাড়তে দেবেন না।

একদিন মোশারফ জানালেন, বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকার ওয়্যারলেস স্টেশন থেকে রাজাকার-আলবদররা মুক্তিযোদ্ধাদের সব তথ্য পাঠিয়ে দেয় পটুয়াখালীর হানাদার ক্যাম্পে। তাই ওই অফিসটিই আগে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তাই ওয়্যারলেস যন্ত্রটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তাঁরা।

একাত্তরের ২১ মে। সকাল ৮টার দিকে তিন ভাই মিলে ওয়্যারলেস অফিসে যান। সঙ্গে অহিদুল ইসলাম ওরফে পান্না, গিয়াস উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ওয়্যারলেস অপারেটর মফিজ উদ্দীনের কাছে চাবি চান তাঁরা। তিনি চাবি দিতে অস্বীকার করেন। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ধরা পড়ে যান তিন ভাই। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় বরগুনা জেলখানায়। ২৮ মে জেলখানার পেছনের মৃত্যুকূপে ওই হত্যাযজ্ঞ চলে। সেই ঘটনার সাক্ষী ফারুকুল ২০১৪ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

একই স্থানে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল ৭৬ জন নিরীহ ব্যক্তির লাশ। তাঁদের ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ মে বরগুনা জেলখানায় হত্যা করা হয়। সবাইকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর আগে ২৭ মে মেজর নাদের পারভেজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রবেশ করে বরগুনায়। শহরের পাশে খাকদোন নদে তাদের গানবোটের ভারী শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শহরে গণপূর্ত বিভাগের ডাকবাংলোয় অবস্থান নেয় হানাদার বাহিনী। ২৭ মে রাত থেকেই শহরে শুরু হয় ধরপাকড়।

জেলখানা গণহত্যার তথ্য পাওয়া যায় বরগুনা জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা গ্রন্থে এবং এম এ হাসানের মুক্তিযুদ্ধ কোষ বইয়ের দ্বিতীয় ও চতুর্থ খণ্ডসহ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন বইপত্রে।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের বরগুনা জেলা সভাপতি ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আনোয়ার হোসেন মনোয়ার বলেন, ‘২৯ ও ৩০ মে জেলখানায় গণহত্যা চালায় হানাদারেরা। তাই আমরা এক প্রকার নিশ্চিত ছিলাম, ফারুকুলসহ তাঁর কোনো ভাই বেঁচে নেই। পরে ফারুকুলের বেঁচে থাকার খবর আমরা যখন পাই, তখন আমরা বিস্মিত হই। পরে ফারুকুলের কাছ থেকে সমস্ত ঘটনা আমরা জেনেছি। অন্যান্য মাধ্যমে খোঁজ নিয়েও তাঁর অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যাওয়ার ঘটনার সত্যতা পেয়েছি।’