default-image

একাত্তরের ২৬ মার্চ। রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) দায়িত্বে তখন মামুন মাহমুদ। রাজশাহী পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগারের চাবি হস্তান্তর করে আত্মসমর্পণের জন্য রাজশাহী সেনানিবাস থেকে তাঁকে চাপ দিতে থাকেন এক পাকিস্তানি মেজর। কিন্তু চাপে নত হননি মামুদ মাহমুদ। ওই দিন সন্ধ্যায় কৌশলে তাঁকে রংপুরে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এরপরও পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ পায়নি পাকিস্তানিরা। রাজশাহী ইপিআর সদর দপ্তর অবাঙালি অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও পুলিশ লাইনসের পরিস্থিতি ছিল অন্য রকম। অস্ত্রাগারের চাবি ছিল হাবিলদার রমজান আলীর কাছে। মূল নেতৃত্বে ছিলেন হাবিলদার আতিয়ার রহমান। শেষ পর্যন্ত ২৮ মার্চ ‘শান্তির বার্তা’ দিয়ে পুলিশ লাইনসে নির্মম এক হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাকিস্তানি সেনারা। সেদিন অবাঙালি আর্মড এসআই এনায়েত খানসহ ২১ পুলিশ সদস্য শহীদ হন। যদিও গণকবরের স্মৃতিফলকে ১৭ শহীদের নাম লেখা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক তদন্তে ২১ শহীদের পরিচয় উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী ১০ বছর ধরে এই প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদদের অবদান নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণায় পাওয়া তথ্য, প্রামাণ্য দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে রাজশাহী পুলিশ লাইনস ট্র্যাজেডির একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।

২৬ মার্চ সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সেনারা সম্পূর্ণ সামরিক সাজে সজ্জিত হয়ে পুলিশ লাইনসের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তবে পুলিশ সদস্যদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে সরে আসে। পুলিশ লাইনস থেকে সারা রাত বিক্ষিপ্তভাবে গুলিবর্ষণ হতে থাকে।

২৭ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সেনারা পুলিশ লাইনসের পাশের বাঁধের ধারে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেয়। সকাল ১০টার দিকে তাদের একজন অফিসার মাইকের মাধ্যমে ‘ভাইয়ে ভাইয়ে আত্মঘাতী যুদ্ধ বন্ধের’ অনুরোধ করেন। পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের আহ্বান জানান। তাঁর এই কূটকৌশল বুঝতে না পেরে পুলিশ সুপার আহ্বানে সাড়া দেন। আপসরফা হয়, উভয় পক্ষের কেউ আক্রমণ করবে না। এই ফাঁকে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা পুলিশ লাইনসের দুই দিক থেকে ডিফেন্স নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশকে চাপ দিতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহীর পুলিশ সুপার শাহ আবদুল মজিদ ইপিআরের ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে তাঁর সাহায্য চান। নওগাঁ থেকে তিনি তাঁর ফোর্স নিয়ে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু কাঁচা রাস্তায় মুক্তিসংগ্রামীদের দেওয়া ব্যারিকেড অতিক্রম করে রাজশাহী পৌঁছাতে গিয়াস উদ্দিনের অনেক দেরি হয়। ইতিমধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাবর্ষণের পরই পুলিশ লাইনস থেকে হাবিলদার আতিয়ারের নেতৃত্বে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু হয়। একনাগাড়ে তিন ঘণ্টা গোলাগুলি চলে। সেই রাতে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

default-image

২৮ মার্চ আরেক কূটকৌশল। সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন মেজর রাজশাহীর তদানীন্তন এডিসিসহ সাদা পতাকা উড়িয়ে গোলাগুলি বন্ধ করার জন্য মাইকে আহ্বান করতে থাকেন। এতে গোলাগুলি বন্ধ হয়। পাকিস্তানিরা পাঁচ-ছয়জন সঙ্গী নিয়ে পুলিশ লাইনসের ভেতরে এসে ‘ভাইয়ের দোহাই দিয়ে’ পরস্পরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আশ্বাস দিয়ে চলে যান। পুলিশ সদস্যরা মেজরের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে ব্যারাকে ফিরে আসেন। কিছু সদস্য বাংকারে ডিউটিতে থাকেন। দুপুরে পুলিশ সদস্যরা আহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অনেকেই খেতে বসেছিলেন। এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী মর্টার শেলিং ও মেশিনগান থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থান নেন। হানাদারেরা সেদিক দিয়ে আক্রমণ করতে পারেনি। দক্ষিণ দিকটা অরক্ষিত ছিল। পাকিস্তানি সেনারা সেদিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাংকারে প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশ সদস্যদের তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

সম্প্রতি পুলিশ লাইনসের ওই স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ছোট সীমানাপ্রাচীর দিয়ে গণকবরটি ঘেরা। তার দক্ষিণ পাশের প্রাচীর ভেঙে গেছে। কবর পর্যন্ত যাওয়ার কোনো রাস্তাও তৈরি করা হয়নি। ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশের আইজি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভের একটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই স্মৃতিস্তম্ভ এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তবে ভেতরের ছোট ছোট রাস্তা শহীদদের নামে করা হয়েছে। শহীদ ডিআইজি মামুন মাহমুদের নামে পুলিশ লাইনস স্কুল ও কলেজ করা হয়েছে। এর মাঠের এক পাশে শহীদদের নামফলকসহ একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

‘যাঁদের রক্তে স্বাধীন এ দেশ’ নামের ওই স্মৃতিস্তম্ভে মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহীর ৫৬ শহীদ পুলিশ সদস্যের নাম দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষণায় বেরিয়ে আসছে, রাজশাহীর তৎকালীন ডিআইজি, এসপিসহ পুলিশের মোট ৭৯ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বাদ পড়া শহীদদের মধ্যে একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, প্রামাণ্য দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে স্মৃতিফলকে নাম না থাকা ২৩ শহীদ পুলিশ সদস্যের নাম তিনি পেয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান রাজা বলেন, গণহত্যার স্মৃতিফলক নির্মাণ করার জন্য সরকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা ও আইসিটি) প্রধান করে গণহত্যার সঠিক চিত্র তুলে আনার জন্য একটি কমিটি করে দেয়। সেই কমিটির তিনি সদস্য। গত কয়েক দিন আগে তাঁরা এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাতে তাঁরা ২৮ মার্চে নিহত ২১ শহীদের পরিচয় পেয়েছেন।

২৮ মার্চ পুলিশ লাইনস পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দখলে নিলে কনস্টেবল তৌহিদ আলী মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। ২৩ এপ্রিল গোদাগাড়ীর অভয়া ব্রিজ অপারেশনে তিনি শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর নামটিও রাজশাহীর স্মৃতিসৌধে নেই। গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, তিনি খোঁজ পেয়েছেন বীর বিক্রম তৌহিদ আলীর কবর রয়েছে ভারতের লালগোলার কোনো একটি স্কুলে।

একাত্তরে রাজশাহী পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগারের চাবি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন হাবিলদার রমজান আলী। প্রতিরোধযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। পরে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা কর হয়। লাশটি পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের পেছনে মাটিচাপা দেওয়া হয়। তাঁর কবরটি আজও চিহ্নিত করা হয়নি।

রমজান আলীর ছেলে আব্বাস উদ্দিন শেখ এখন পুলিশ লাইনসের সামনে একটি ছোট দোকান নিয়ে বসে থাকেন। তিনি বলেন, ২৮ মার্চ ট্র্যাজেডি তাঁর নিজের চোখে দেখা। তখন তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। পুলিশ লাইনস প্রতিরোধযুদ্ধের পর ১০ এপ্রিল তাঁর বাবা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। ২৪ এপ্রিল তাঁরা খোঁজ পান যে তাঁর বাবা আর বেঁচে নেই। তাঁরা তাঁর বাবার লাশটিও পাননি।

আবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দিলশাদ বিশ্বাসের নামে রাজশাহী জেলা পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগারের নামকরণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা নামক গ্রন্থেও তাঁর নাম রয়েছে অথচ এই অর্ধশত বছরেও দিলশাদ বিশ্বাসের নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়নি। দিলশাদের মেয়ে দেলোয়ারা বেগম বলেন, তাঁর বাবাকে তাঁর চোখের সামনে গোদাগাড়ী থানা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁর বাবা যাঁদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, তাঁরা এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর বাবার লাশটিও তাঁরা পাননি। তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর বাবার স্বীকৃতি চান।