default-image

মুক্তিযুদ্ধকালে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল থানা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। তারা রাজাকার, আলবদর বাহিনী সঙ্গে নিয়ে আশপাশের এলাকার মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালাত। এরপর ভান্ডারা গ্রামের দিঘির পাড়ে নিয়ে রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের শরীর থেকে রক্ত ঝরাতে ঝরাতে উৎসব করত। শেষে দিঘির পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। শহীদের রক্তে দিঘির পানি রক্তলাল হয়ে উঠত।

রানীশংকৈলের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলছিলেন এসব স্মৃতিকথা। তিনি বললেন, ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে রানীশংকৈলের ঘুনিয়া গ্রাম থেকে একই পরিবারের পাঁচজনকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। তাঁরা সবাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলীর স্বজন। পরে নির্যাতন করে ওই পাঁচজনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা ১২ জনকে খুনিয়াদিঘিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি বলতে বলতে থেমে যান তিনি। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরে কয়েক ফোঁটা জল। চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, খুনিয়াদিঘিতে নারকীয় নির্যাতন করে ইসাহাক আলীর চাচা মশরত আলী, তাঁর দুই জামাই তসলিম উদ্দিন ও সাদেক আলী এবং ছোট ভাই ইসলাম উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। আর ফুফাতো ভাই সোনা বকশ আলীর শরীরে গুলির আঘাত নিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে সেদিন ভাগ্যচক্রে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর কাছেই আবু সুফিয়ান রানীশংকৈলের সেনাক্যাম্প ও খুনিয়াদিঘির নির্যাতনের কথাগুলো শুনেছেন।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে মাস থেকে বিজয়ের আগপর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর বহন করছে খুনিয়াদিঘি। ক্যাম্পে নির্যাতন চালিয়ে যাদের হত্যা করা হতো, তাদের পাশাপাশি ওই দিঘির পাড়ে হত্যা করা লোকজনকেও পানিতে ফেলে দিত পাকিস্তানি সেনারা।

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে ক্যাম্প থেকে ১২ জনকে ধরে এনে যখন তাঁদের গুলি করা হয়, তখন সোনা বকশ আলীর ডান বুকের ওপরের দিকে একটি গুলি লাগে। সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চারদিকে ভাসতে থাকা পচাগলা লাশ আর কচুরিপানায় ঢেকে যায় তাঁর শরীর।

ওই ঘটনার পর খুনিয়াদিঘির পানির লাশের স্তূপের মধ্যে সোনা বকশকে নড়াচড়া করতে দেখে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় লোকজন। এরপর তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ভারতের একটি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এক মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠেন সোনা বকশ। সেই নির্যাতনের চিহ্ন দীর্ঘদিন বহনের পর আট বছর আগে তিনি মারা যান।

সোনা বকশের ছেলে গোলাম মোস্তফা জানান, তাঁর বাবা মাঝেমধ্যে খুনিয়াদিঘির ওই বর্বরতার ঘটনা শোনাতেন। তিনি বলতেন, ক্যাম্প থেকে প্রতিদিন লোকজনকে চোখ বেঁধে সেনারা বাইরে নিয়ে যেত। কিছুক্ষণ পরই শোনা যেত গুলির শব্দ। যারা যেত, তারা আর ফিরে আসত না।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে উপজেলার নেকমরদ বাজার থেকে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রহমানের ছোট ভাই আব্দুর সহমান বাধা দিলে তাঁকেও তুলে নিয়ে যায় তারা। রানীশংকৈল ক্যাম্পে রেখে চালাতে থাকে পাশবিক নির্যাতন। নির্যাতনের পর খুনিয়াদিঘিতে নিয়ে হত্যা করা হয় তাঁদের। খুনিয়াদিঘি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞের শিকার রহমান ও সহমানের ভাতিজা ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সদস্য আব্দুল করিম এ কথাগুলো জানান।

খুনিয়াদিঘির হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন হরিপুর উপজেলার সূর্য মোহন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বেঁচে যাওয়ার লোমহর্ষ কাহিনি বলেন। দিঘির পাড়ে অন্যদের সঙ্গে সারি করে দাঁড় করানো হয় সূর্য মোহনকেও। রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের শরীর থেকে রক্ত ঝরাতে থাকে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। আর তা উপভোগ করে অন্যরা। পরে তাদের ওপর গুলি ছোড়া হয়। গুলি সূর্য মোহনের বুকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। দিঘির কচুরিপানার মধ্যে মরার মতো পড়ে থাকেন তিনি। পরে সেখান থেকে কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন তিনি।

রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন, খুনিয়াদিঘিতে মোট কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল, তা নিরূপণের জন্য ১৯৯৭ সালের দিকে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরে সেই কাজ বেশি দূর এগোয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মানুষের রক্তে দিঘির পানির রং গাঢ় খয়েরি হয়ে ছিল অনেক দিন। দিঘির উত্তর দিকে পাওয়া যায় শত শত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড়। ওই হাড়গোড়ের সংখ্যা দেখে অনুমান করা যায়, ১৯৭১ সালে খুনিয়াদিঘিতে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দিঘি থেকে উদ্ধার করা মানুষের হাড়গোড় একটি গর্ত করে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। পরে ওই জায়গাটিতে স্থাপন করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। ১৯৭৩ সালে খুনিয়াদিঘি স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন জাতীয় চার নেতার একজন এ এইচ এম কামারুজ্জামান। স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে, ‘মনে রেখ আমরা আমাদের বর্তমানকে তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করে গেলাম।’

বিজ্ঞাপন