default-image

ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ কুমিল্লা ডায়াবেটিক হাসপাতালে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন হাসপাতালটিতে চিকিত্সাধীন ছিলেন কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকার এই বাসিন্দা। ফলে হাসপাতালে বিল জমে ৩০ হাজার টাকার বেশি। ওই টাকা পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না দেলোয়ারের পরিবারের। এ অবস্থায় ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ হাসপাতালে পড়ে ছিল। এই খবর পান বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিউল আহমেদ বাবুল, যিনি সবার কাছে ‘কমান্ডার বাবুল’ নামে পরিচিত। তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা বিলের একাংশ নিজেই পরিশোধ করেন। বাকিটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মওকুফের ব্যবস্থা করেন। এরপর লাশ নিয়ে ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

২০১৬ সালের ৭ জুলাই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ডেপুটি কমান্ডার ও আদর্শ সদর উপজেলার সুবর্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন খান হৃদ্‌রোগে মারা যান। তিনি ছিলেন সফিউল আহমেদের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা। গিয়াসের বড় মেয়ে মাহমুদা আক্তারের বিয়ে হয় দুই বছর আগে। বিয়ের খরচের বড় একটা অংশ দেন সফিউল আহমেদ।

বিজ্ঞাপন

এভাবে গত চার দশকে অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের পরিবার, স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সফিউল আহমেদ। এর মধ্যে রয়েছে পড়াশোনা ও চিকিত্সার খরচ প্রদান, বিয়ের ও চাকরির ব্যবস্থা করা, টিনের ঘর তৈরি করে দেওয়া এবং চাল, কম্বল, সেলাই মেশিন ও রিকশা বিতরণ। এ ছাড়া বিভিন্ন বধ্যভূমি সংস্কার, বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর পাকাকরণ ও শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন তিনি। এর বাইরে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের জমির ব্যবস্থা করে দেওয়া, করোনাকালে ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করে চলেছেন ‘কমান্ডার বাবুল’।

বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে ইশরাত জাহান বলেন, ‘বাবুল কাকা আজ পর্যন্ত আমাদের পরিবারের পাশে আছেন। আমার মেয়ের বিয়ে হয় চলতি মার্চে। তখনো তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।’ গিয়াস উদ্দিন খানের মেয়ে আফরোজা মুন বলেন, তাঁর পরিবারে অর্থের টান পড়লেই বাবুল কাকা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

আর্থিক সংকটে পড়ে বিপাকে ছিলেন বুড়িচং উপজেলার চড়ানল গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহানের মেয়ে পান্না আক্তার। পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ তেতাভূমি এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের মেয়ে ফাহিমা আক্তার। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছিল না কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আলীর মেয়ে মাফিয়া বেগমের। সবাইকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন সফিউল আহমেদ। এভাবে তাঁর মাধ্যমে উপকৃত ব্যক্তি ও পরিবারের তালিকা অনেক দীর্ঘ।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কুমিল্লা শাখা কার্যালয়টি নগরের গোয়ালপট্টি এলাকায় অবস্থিত। দুই কক্ষবিশিষ্ট চৌচালা টিনের ঘরের পশ্চিম পাশে বসেন কমান্ডার সফিউল আহমেদ। সেখানে সারা দিনই বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যরা সহযোগিতার আবেদন নিয়ে আসেন।

কার্যালয়ের অফিস সহকারী মাহাদী হাসান বলেন, তিনি (সফিউল আহমেদ) পুরোটাই নিজস্ব তহবিল থেকে অনুদান দেন। কাউকে কখনো ফেরান না। তাৎক্ষণিক সহায়তা করতে না পারলে পরের দিন আসতে বলেন।

সফিউল আহমেদের এসব কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ আছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে রাখা হিসাব বইয়ে। সেগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৪০ বছরে ১০০ জন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে ও নাতনির বিয়েতে অবদান রেখেছেন সফিউল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাতটি ঘর করে দিয়েছেন। ১৫ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার থাকার জন্য জমি বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধার কবর পাকা করে দিয়েছেন। বেলতলি ও লাকসাম বধ্যভূমি সংস্কার করেছেন। কটকবাজার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মোতাহার হোসেন মাহবুরের লেখা যুদ্ধদিনের কথা বইয়ে সফিউল আহমেদের বীরত্বগাঁথা তুলে ধরা হয়েছে। ওই বইয়ের তথ্য মোতাবেক, ১৯৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা শহরের টমছমব্রিজ এলাকায় জন্ম নেন সফিউল আহমেদ। সৈয়দ আহমেদ ও রেজিয়া বেগমের ১১ সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ১৯৭১ সালে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশমাতৃকার টানে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সফিউল আহমেদ ১ এপ্রিল সহযোদ্ধাদের সঙ্গে চৌদ্দগ্রাম থেকে কাঁঠালিয়ায় যান। পরে ত্রিপুরা যাওয়ার পথে কোটেশ্বর যান। সেখানে অস্থায়ী ক্যাম্প হয়। ৩ এপ্রিল সফিউল তাঁর ভাই লে. (পরে ক্যাপ্টেন) রেজাউর আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি কটকবাজার যুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। এরপর ক্যাপ্টেন আকবর হোসেনের নেতৃত্বে ধনপুরে এক মাস যুদ্ধ করেন। পরে বুড়িচং উপজেলার চড়ানলে ক্যাম্পে থেকে যুদ্ধ করেন। সবশেষে নভেম্বর মাসে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নির্ভয়পুরে যান। ৮ ডিসেম্বর সকালে তিনি ত্রিপুরা থেকে দেশে ফেরেন। সেদিনই কুমিল্লা হানাদারমুক্ত হয়। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সফিউল আহমেদ কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার হন। ১৯৭৯ সালে ডেপুটি কমান্ডার ও ১৯৮০ সালে ভারপ্রাপ্ত কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। ১৯৮১ সালে কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। আজ পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে আছেন।

১৫ মার্চ সকালে সফিউল আহমেদ এই প্রতিবেদককে নিয়ে যান কটকবাজার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধে। সেখানে আলাপচারিতায় তিনি স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেন। সফিউল আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে এক টুকরো কাগজ নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খবর নেওয়া। তাঁদের পরিবারের পাশে থাকা। নিজের ঠিকাদারি ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ ও বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীর সহযোগিতায় চার দশক ধরে সেই কাজটা করে যাচ্ছি। এই ক্ষেত্রে প্রশাসনও সহযোগিতা করছে।’

কুমিল্লার সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘তিন বছর আমি কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ছিলাম। এই সময়ে দেখেছি, কমান্ডার বাবুল সাহেব বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারগুলোকে কীভাবে অকাতরে সেবা দিয়ে গেছেন। তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’