default-image

কাঠ ও কাচের তৈরি আলমারি, বাক্স। তাতে শহীদ মোসাদ্দারুল হকের ব্যবহৃত পোশাক ও ব্যাগ এখনো অক্ষত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ অধ্যাপক হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমদ্দার, মীর আব্দুল কাইয়ুমসহ আরও অনেকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নও সযত্নে সাজানো। রাজশাহীতে ওড়ানো প্রথম জাতীয় পতাকা কিংবা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া গুলি, রকেট লঞ্চার, শহীদের হাড়গোড়েরও দেখা মেলে।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের এমন সব সম্পদ সংরক্ষিত রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’য়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর দেশের প্রথম সংগ্রহশালা হিসেবে এটি পরিচিত।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী নানা আন্দোলন–সংগ্রামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা নানাভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অবদান রেখেছেন। অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী শহীদ ও আহত হয়েছেন। এসব বীর সন্তানের আত্মত্যাগ আর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন স্মরণীয় করে রাখতে যাত্রা শুরু হয় সংগ্রহশালার। যেখানে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাস, নতুন প্রজন্মের কাছে এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতিঘর। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে ৬ হাজার ৬০০ বর্গফুটের তিনটি গ্যালারিতে অবস্থান এই সংগ্রহশালার।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালের ২ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসানের সভাপতিত্বে এক সভায় শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। একই বছরের ৬ মার্চ তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংগ্রহশালা উদ্বোধন করেন। এরপর ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তিন শিক্ষকের সহধর্মিণী বেগম ওয়াহিদা রহমান, বেগম মাস্তুরা খানম ও শ্রীমতী চম্পা সমদ্দার সংগ্রহশালার তিনটি প্রদর্শনী গ্যালারি উদ্বোধন করেন।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে সংগ্রহশালা

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলে সামনে পড়ে জোহা চত্বর। এর ডান দিকের রাস্তা ধরে এগোলে শহীদ মিনার চত্বরে চোখে পড়ে একতলা ভবন, নামফলকে লেখা ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’। প্রবেশপথেই সংগ্রহশালা ঘেঁষে রাখা হয়েছে একটি ভাঙাচোরা গাড়ি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা এই গাড়িতে করেই বিশ্ববিদ্যালয়, আশপাশের মুক্তিযোদ্ধাসহ মানুষজনকে ধরে এনে হত্যা ও নির্যাতন করত। সংগ্রহশালায় প্রবেশ করতেই প্রথম গ্যালারির সামনে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উঁচু করা ছবি। তার পাশে লেখা আছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।...’ করোনার সময়েও দু-চারজন দর্শনার্থীর দেখা পাওয়া গেল সংগ্রহশালায়। খুব পরিপাটি করে সাদা দেয়ালে থরে থরে সাজানো–গোছানো ইতিহাস সংগ্রামের নানা আলোকচিত্র, কাচের আলমারি, বাক্সে বর্ণনাসহ রয়েছে নানা উপকরণ। এগুলোয় চোখ বোলালেই যেন মুক্তিযুদ্ধের সেই সব দিন ছুঁয়ে যাবে যে কাউকেই।

তিন গ্যালারিতে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম

বাঙালির সব প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে সংগ্রহশালার তিনটি গ্যালারিতে। প্রথম গ্যালারিতে ঢুকতেই হাতের ডান পাশে দেয়ালজুড়ে রয়েছে দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক শামসুজ্জোহার স্মৃতিচিহ্নের নানা আলোকচিত্র। তাঁর এক আলোকচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে ‘তুমি আমাদের অন্তহীন প্রেরণার উৎস’। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের ছবি, উনসত্তরের উত্তপ্ত দিনগুলোর প্রতিরোধ সংগ্রামের বিভিন্ন আলোকচিত্র এখানে রাখা রয়েছে। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে ১৮৮ ধারা ভেঙে গায়েবি জানাজা পড়ার প্রস্তুতির ছবি। এক গ্যালারিজুড়ে পাওয়া যাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদয় শংকর বিশ্বাসের সংগ্রহ করা ডাকটিকিটে বঙ্গবন্ধুর ও মুক্তিযুদ্ধের ছবি। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে নির্মিত রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনারের ছবি। রাজশাহীতে উত্তোলিত প্রথম জাতীয় পতাকাটিও সংরক্ষিত আছে এই গ্যালারিতে।

সংগ্রহশালার মাঝের কক্ষটি দুই নম্বর গ্যালারি। ঢুকেই হাতের বাম পাশে দেয়ালজুড়ে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর বাঁধাই করা ছবি চোখে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে ১১টি সেক্টর ও বিভিন্ন ফোর্সের দলনেতাদের ছবি এখানে সংরক্ষিত আছে। এই গ্যালারিজুড়ে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। কাচের বাক্স ও আলমারিতে এগুলো বর্ণনাসহ যত্নসহকারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রথমে দেখা মেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদ হবিবুর রহমানের ব্যবহৃত কোট, জুতা, প্যান্ট, ছাতা ও লাঠি। এই গ্যালারিতে ২৫ মার্চ কালরাতসহ পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার নানা চিত্র সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এগুলো দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হিংস্রতা কতটা ভয়াবহ ছিল। তবে এই আলোকচিত্রের সমান্তরালে রয়েছে বাঙালি জাতির ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করার নানা ছবি।

তিন নম্বর গ্যালারি জুড়ে রাখা হয়েছে একাত্তরে গণহত্যায় নিহত অসংখ্য অজ্ঞাত শহীদের মাথার খুলি আর হাড়। এগুলোর বেশির ভাগই উদ্ধার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলের পাশে অবস্থিত গণকবর থেকে। এগুলো ২০০৩ সালের ৩১ মে ওই গণকবর থেকে উত্তোলন করা হয়। চোখে পড়বে পাকিস্তানি বাহিনীর মাথার খুলি ও হেলমেটও। রয়েছে বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত পাকিস্তানি বাহিনীর সেল, দিনাজপুরের মহেশপুর গ্রামের সংগৃহীত মাইনের অংশবিশেষ, পরিত্যক্ত গ্রেনেড, বুলেট। একাত্তরে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও বিজয়ী মুক্তিসেনাদের ছবিও এখানে রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন প্রজন্মের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ দর্শন

শুক্র ও শনিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সংগ্রহশালাটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতিদিনই এখানে কয়েক শ দর্শনার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন। দেশি-বিদেশি গবেষকদেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। তবে এই বছর করোনার কারণে দর্শনার্থী অনেক কমে গেছে।

গত ১৬ মার্চ সংগ্রহশালা ঘুরে দেখছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী রিমসা (৮)। সে তাঁর মায়ের সঙ্গে রাজবাড়ী থেকে এসেছে। তার বড় বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। রিমসার অনুভূতি, সে এগুলো বইতে দেখেছে। আজকে এখানে অনেকগুলো একসঙ্গে দেখেছে। বগুড়ার একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে মো. ফয়সাল আহমেদ। রাজশাহীতে তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে সংগ্রহশালা ঘুরতে ঘুরতে সে বলল, ‘জীবনের এই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ওপর এতগুলো জিনিস একসঙ্গে দেখলাম। কতটা ভয়াবহ ছিল সেই সময়টা। অনেক কষ্ট করে আমাদের স্বাধীনতা এসেছে।’ এখানে আসা ব্যক্তিরা ঘুরে দেখে খাতায় মন্তব্য লিখে যান। আবরার আবিদ নামে এক শিশু খাতায় লিখেছে, ‘আমার অনেক কষ্ট লেগেছে এসব দেখে।’ আশা নামে এক দর্শনার্থী লিখেছে, ‘মর্মান্তিক বিষয়গুলো শুধু মনের ভিতরে নাড়া দেয়নি। এক ফোঁটা অশ্রু ফেলতে সাহায্য করেছে। এসব স্মৃতি না দেখলে হয়তো বুঝতে পারতাম না যুদ্ধের রূপ কতটা ভয়াবহ ছিল।’

সংগ্রহশালা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালাটি দিন দিন আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। দেশের যেখানেই মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো দলিল, সম্পদ পাওয়া যায়, তা তারা সংগ্রহ করছেন। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর এখানে বঙ্গবন্ধু কর্নারে প্রায় সাড়ে চার হাজার বই রাখা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা বলেন, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা শিক্ষার্থীরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা এখানে এলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সম্যক একটা ধারণা নিয়ে যেতে পারবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষকদের সবচেয়ে বেশি চাহিদা পূরণ করবে এটি।