default-image

মুক্তিযুদ্ধ প্রায় শেষ। তবু কুষ্টিয়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে পাকিস্তানি সেনারা। জেলাকে হানাদারমুক্ত করার অভিযানে অংশ নিতে চান মুক্তিযোদ্ধারাও। তাতে ‘না’ ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের। তাঁরা একাই গেলেন কুষ্টিয়া অভিযানে। দুই দিনের যুদ্ধে কুষ্টিয়ায় বিজয় পতাকা উড়ল ঠিকই। তবে এক ভুলের খেসারতে গেল শতাধিক ভারতীয় সেনার প্রাণ। মিত্রবাহিনীর সেই আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয় ‘মুক্তিমিত্র’ স্মৃতিস্তম্ভ। একটি ট্যাংকের ওপরে বসানো একটি যুদ্ধবিমান।

কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড় রয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানটা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মিলনস্থল। এখানে মিলেছে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ মহাসড়ক। সেখানে গোলচত্বরে তৈরি করা হয়েছে ‘মুক্তিমিত্র’।

১৯৯০ সালে চৌড়হাস মোড়ে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু দফায় দফায় নকশা পরিবর্তন, অর্থসংকটসহ নানা জটিলতায় কেটে যায় প্রায় ২৫ বছর। অবশেষে ২০১৫ সালে আলোর মুখ দেখে ‘মুক্তিমিত্র’। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তৎকালীন গভর্নর তথাগত রায় এটি উদ্বোধন করেছিলেন।

তথাগত রায় সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনারা অসাধারণ লড়াই করে স্বাধীনতা পেয়েছেন। সেই লড়াইয়ে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকতে পেরেছি, সে জন্য আমরা গর্বিত। আজকে একটা অসাধারণ আবেগ আমার মধ্যে উঠে আসছে। আপনাদের দেশকে প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এ ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও ভালো করবে।’

চৌড়হাস এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনীর সেদিনের যুদ্ধের আগে–পরের ঘটনাগুলো যাঁরা খুব কাছে দেখেছেন, তাঁদের একজন জাহিদ হোসেন জাফর। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) কুষ্টিয়া পূর্বাঞ্চলের (কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা ও ঝিনাইদহের শৈলকুপার কিছু অংশ) ডেপুটি কমান্ডার। প্রথম আলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেন জাহিদ হোসেন।

বিজ্ঞাপন

৯ ডিসেম্বর ভোরে শৈলকুপা ওয়াপদা ভবনে এক বৈঠক হয়। মূলত মিত্রবাহিনীর একজন কর্নেল ও কয়েকজন মেজর ওই বৈঠকে অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহিদ ও বিএলএফ কুষ্টিয়া পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার মির্জা জিয়াউল বারীও। তাঁদের কাছে ওই কর্নেল জানালেন, মিত্রবাহিনী কুষ্টিয়াকে হানাদারমুক্ত করতে অভিযান চালাবে। কুষ্টিয়া সম্পর্কে কে ভালো জানেন, তাঁদের কাছে জানতে চাইলেন কর্নেল। টেবিলের ওপর একটি মানচিত্র বের করে দেখালেন। কর্নেল জানালেন, কুষ্টিয়ার চৌড়হাস সেতুর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের বাংকার আছে।

জাহিদ হোসেনের মতে, ভারতীয় সেনাদের ম্যাপিংয়ে ভুল ছিল। তাঁদের ধারণা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের অ্যামবুশ ছিল চৌড়হাস মোড়ে। বাস্তবে ওই স্থান থেকে আরও কয়েক শ মিটার দূরে অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানিরা।

৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে কর্নেলের নেতৃত্বে কয়েক শ ভারতীয় সেনাসদস্য কয়েকটি ট্যাংক নিয়ে কুষ্টিয়ার দিকে অগ্রসর হন। তাঁদের সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন জাহিদসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু ভারতীয় সেনারা তাতে রাজি হননি। ফলে ৭০–৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন চৌড়হাস থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে।

১০ ডিসেম্বর ভোরে চৌড়হাসের কাছে পৌঁছান ভারতীয় সেনাসদস্যরা। সেখানে তাঁদের লক্ষ্য করে তীব্রভাবে গোলা ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। ফলে ভারতীয় সেনারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চৌড়হাস সেতু ভেঙে পড়ে। এতে আটকা পড়ে ভারতীয় সেনাদের কয়েকটি ট্যাংক। ওই স্থানে চার–পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। এরপর আসে ভারতীয় যুদ্ধবিমান। আকাশ থেকে ঘণ্টাব্যাপী বোমা ফেলা হয় পাকিস্তানিদের অবস্থানে। যুদ্ধবিমানের গোলায় কুষ্টিয়া শহরের পৌর মার্কেটসহ কয়েকটি জায়গায় বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে যুদ্ধ থেমে যায়। ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। জাহিদ হোসেন তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে ওই দিনই কুষ্টিয়া শহরে বড় বাজার এলাকা দিয়ে প্রবেশ করেন। দেখতে পান, আমলাপাড়া এলাকায় সেই ভারতীয় কর্নেল জিপগাড়িতে বসা। তাঁর সঙ্গে আবার কথা হয় জাহিদের।

জাহিদ জানতে পারেন, চৌড়হাসের যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর শতাধিক সেনা নিহত হয়েছেন; আহত হন অনেকে। মরদেহগুলোর সৎকার করা হয় চৌড়হাসের পাশে কুমারগাড়া এলাকায়। সেনাসদস্য হতাহতের পাশাপাশি ওই যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল কয়েকটি ভারতীয় ট্যাংক ও একটি যুদ্ধবিমান। হানাদারমুক্ত করার পর ১১ ডিসেম্বরই কুষ্টিয়া ছেড়ে যায় মিত্রবাহিনী।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে শুধু মিত্রবাহিনীর এমন আত্মত্যাগ দেশের আর কোথাও কোনো যুদ্ধে স্বীকার করতে হয়েছে কি না, তাঁর জানা নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চৌড়হাসের যুদ্ধে দেশের কোনো মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হননি। কেননা, ওই যুদ্ধে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে সরাসরি অংশ নিতেই নেয়নি। নতুন প্রজন্মকে জানানোর স্বার্থে চৌড়হাস যুদ্ধের বিষয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার এবং প্রয়োজনে ভারতীয় সেনাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন