default-image

মধ্যভাগটা মণিকোঠার মতো। সেখানে অস্পষ্ট অবয়বে অপেক্ষারত এক মা। এই অপেক্ষা যুদ্ধে যাওয়া সন্তানের ফেরার। বুকটা তৃষ্ণার্ত মা ডাক শোনার। শুনতে পারেননি মা ডাক, তাতে কী? থরে থরে সাজানো ‘মা’ শব্দটি। শুধু বাংলায় নয়, নানা ভাষায় লেখা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সূর্যডুবির আলোকচ্ছটায় অন্য এক রূপ চারদিকে। তখন নানা ভাষার মা বর্ণমালা চিকচিক করে ওঠে। এ যেন সমস্বরে মা ডাক, এতেই বুঝি তেষ্টা মেটে শহীদমাতার!

শহীদমাতায় মনে এ রকম ব্যাকুলতা ছড়ানো একটি স্থাপনা ঘিরে। বড় পরিসরের স্থাপনাটি আসলে সদ্য নির্মিত এক শহীদ মিনার। সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের এই অবাক করা স্থাপত্যকর্ম ভাষাসংগ্রাম থেকে স্বাধীনতাসংগ্রামের সব শহীদমাতার জন্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা দিবস ও মহান বিজয় দিবসসহ সব জাতীয় দিবস ও রজনীর গুরুত্ব ধারণ করে আছে শহীদ মিনারটি। নির্মাণের নান্দনিকতায় এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মা, অবাক আলোর লিপি’।

এই স্থাপনার মূল অংশে অপেক্ষায় থাকা মায়ের অবয়ব মূর্ত করে রাখা। শহীদমাতার ছাপ এখানেই। ৩৮ ফুট উঁচু আর ৬০ ফুট চওড়া শহীদ মিনারটি। একেবারে ওপরের অংশে মাঝখানে লেখা ‘মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো’। জাতীয় সংগীতের এই চরণ দিয়ে শুরু দেশটান। এরপর পুরো শহীদ মিনারটাই মা-ময়। বাংলা, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা, মণিপুরি, জনজাতিসহ পৃথিবীর ৫২ ভাষার ‘মা’ স্থান পেয়েছে। একেক ভাষার একেকটি মা ডাক যেন ভাষাশহীদ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব শহীদমাতাকে সম্মান জানাচ্ছে। শহীদমাতাদের সুউচ্চ স্থানে রেখে তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণের মধ্যে রাখতেই শহীদ মিনারের এই নির্মাণ ভাবনা স্থপতি রাজন দাশের। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে শহীদমাতা স্মরণে এই স্থপতির নকশায় সপ্তম স্থাপত্যকর্ম এটি।

বিজ্ঞাপন

১৫ শতক জায়গাজুড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনারটি। নির্মাণের প্রধান পৃষ্ঠপোষক লিডিং ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সৈয়দ রাগীব আলী। মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লেগেছে ছয় মাস। এরপর আরও ছয় মাসে শহীদ মিনারে বিভিন্ন ভাষার মা বর্ণমালা স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারটির উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনকালে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান একনজর দেখে শহীদ মিনারটি আন্তর্জাতিক মানের বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে নির্মিত এ শহীদ মিনার সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্বাধীন সব ভূমির প্রতি সম্মান জানাতে আমাদের মনকে প্রসারিত করে দেয়।’

নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতায় পৃষ্ঠপোষক সৈয়দ রাগীব আলী বলেছিলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। শিক্ষাদীক্ষায় সেই ঋণ স্মরণে রাখতেই এই শহীদ মিনার।’ নির্মাণ শেষে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় তৃপ্তির সুর। তিনি বলেন, ‘একটি উন্নত শহীদ মিনার নির্মাণের চেষ্টা থেকেই এ কাজে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করেছি। সুন্দর হয়েছে। মানুষ দেখতে আসছে, আমি খুশি।’

লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেটের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। নগরের কেন্দ্রস্থলের মধুবন মার্কেট এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্পাসের মাধ্যমে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। ২০১৮ সালের মে মাস থেকে শহরতলির কামালবাজার এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর স্থায়ী ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু হয়। শহীদ মিনার সব উঁচুতে ও বড় পরিসরে হওয়া উচিত—এমন ভাবনা থেকে স্থপতি রাজন দাশ এই শহীদ মিনারের নকশা করেছেন। তাঁর নকশায় আগের সাতটি শহীদ মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভেও ওই ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেছে।

টিলার চূড়ায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার সেই ভাবনারই ছাপ। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের টিলাগড় এলাকায়। ওই এলাকায় মহাসড়কের পাশের সিলেট সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আশ্রয়’। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা ছিল নিরাপদ। শরণার্থী হয়ে মানুষ ছুটছে সীমান্ত এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলার মহেষখলা সীমান্ত। সেখানে হয়েছে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও’ নামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে স্মৃতিস্তম্ভের কাজটি করেছেন স্থপতি রাজন। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নির্মিত হয়েছে ‘সাত আকাশ’ নামের স্মৃতিস্তম্ভ। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠকে আকাশসম সম্মান জানানোর অভিপ্রায় এতে স্পষ্ট।

বিজ্ঞাপন
default-image

রাজন দাশ লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের প্রধান। শহীদমাতা স্মরণে মা-ময় শহীদ মিনার নির্মাণের কর্মযজ্ঞে তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। নির্মাণকালে স্থপতি তাঁর এই স্থাপত্যকর্মের নাম দিয়েছিলেন ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব মাদার’। তখন রাজন দাশের ভাষ্য ছিল, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মরণে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হলেও এর মধ্য দিয়ে মা শব্দটি সংরক্ষণের উদ্যোগ আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মায়েদের আত্মত্যাগকে স্মরণের মধ্যে রাখতে বড় পরিসরে এত উঁচু শহীদ মিনার দেশে খুব একটা নেই। এই উচ্চতা শুধু মাকে সবার ওপরে রাখার ইচ্ছে থেকে করা। ৫২ ভাষায় মা শব্দ বসানোর একটাই লক্ষ্য, শহীদমাতাদের আত্মত্যাগের মহিমা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া।

নির্মাণ শেষে শহীদ মিনারটির নান্দনিকতা আগের নামটি বদলে অনুপ্রেরণা জোগায়। নতুন নামকরণ করা হয় ‘মা, অবাক আলোর লিপি’। সম্প্রতি শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে স্থপতি রাজন দাশের সঙ্গে কথা হয়। বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতের আবহে শহীদ মিনারটি ভিন্ন রূপ নেয়। তিন সময়ের তিন রূপে শুধুই অবাক হওয়ার পালা। রাজন বললেন, ‘এই অবাক হওয়া থেকেই নতুন নামকরণ।’

লিডিং ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ দপ্তর বলছে, কোনো দিবস বা উপলক্ষ নয়, প্রতিদিনই মানুষ দেখতে আসছেন শহীদ মিনারটি। গত এক বছরে সব জাতীয় দিবসেই এখানে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। এভাবে ছড়িয়ে পড়েছে শহীদ মিনারটির গল্প। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে অনেকে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। রুবি রহমান নামের একজন দর্শনার্থী লিখেছেন, ‘মা-মাটি-দেশ কথাটির সঙ্গে শহীদমাতাদের অনন্য উচ্চতায় স্থান দেওয়া হয়েছে এই শহীদ মিনারে।’

এক স্থপতির এমন কর্মযজ্ঞে অন্য স্থপতিরা কী বলছেন? এমন প্রশ্নে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি) সিলেট শাখার সভাপতি স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন। তিনি এই শহীদ মিনারকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে শ্রেষ্ঠ উপহার বলে মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক স্থপতি কাজী আজিজুল মাওলা লিডিং ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পদে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তাঁর। শহীদ মিনারের স্থপতি রাজন দাশ তাঁর সরাসরি ছাত্র। ছাত্রের কাজটা শিক্ষকের চোখে কেমন, জানতে চাইলে কাজী আজিজুল মাওলা বললেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সব শহীদ মিনার এ রকম হওয়া চাই, আমার ছাত্র রাজন সেটা দেখিয়ে দিয়েছে। আই অ্যাম প্রাউড অব হিম।’