default-image

দিনাজপুর হানাদারমুক্ত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাতে। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা বিরলের বহলা গ্রামে গণহত্যা চালাতে চালাতে পিছু হটে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুর শত্রুমুক্ত হওয়ার কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ১৪ ডিসেম্বর দিনাজপুরের আকাশে দেখা দেয় মুক্তির নতুন সূর্য। দিনভর ভারতীয় সীমান্তসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজয়ের আনন্দে ক্রন্দনরত মানুষ শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। এরপর ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় এবং ১৮ ডিসেম্বর শহরের গোড়-এ-শহীদ ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোন-১-এর চেয়ারম্যান এম আবদুর রহিম।

১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকায় পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষিত হয়। এরপর একে একে আপন ঠিকানায় ফিরতে শুরু করেন তাঁরা। ছেলের পথ চেয়ে তখনো অনেক মায়ের চোখ তাকিয়ে থাকে দূর পানে। চোখে তাঁর পানি নেই, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ছেলে যে তাঁর তখনো ফেরেননি।

দীর্ঘ ৯ মাস জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার স্বাদ পাননি। কেউ শহীদ হয়েছেন রণাঙ্গনেই। কেউ বিজয়ের পতাকা তোলার সাক্ষী হয়েও ঘরে ফিরতে পারেননি। দিনাজপুরে তেমনই এক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের ২১ দিন পর ৬ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে।

দেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া, পুঁতে রাখা অস্ত্র, গোলাবারুদ, বোমা তখনো ভীতির সঞ্চার করে রেখেছিল। এসব মারণাস্ত্র উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় ট্রানজিট ক্যাম্প। দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে করা হয় ভারতীয় সেনাদের ক্যাম্প। অন্যদিকে মহারাজা গিরিজানাথ স্কুল ভবনে করা হয় মুক্তিবাহিনীর ট্রানজিট ক্যাম্প। দেড় থেকে দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে এ ট্রানজিট ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। এই ক্যাম্পকে অনেকেই বলত ‘মিলিশিয়া ক্যাম্প’। ট্রানজিট ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ার রশিদ।

বিজ্ঞাপন

শহরের বালুবাড়ি এলাকায় রাজপ্রাসাদের আদলে করা ১৪ কক্ষবিশিষ্ট মহারাজা গিরিজানাথ স্কুলের একতলা ভবন। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে এসে জড়ো হতে থাকেন। স্কুলমাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বাংকার তৈরি করা হয়। প্রায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে করে উদ্ধার করা অস্ত্রসামগ্রী এনে সেই বাংকারে রাখা হয়। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে ছিল অ্যান্টিট্যাংক মাইন, অ্যান্টিপারসোনেল মাইন, জ্যাম্পিং মাইন, মর্টার শেল, গ্রেনেড, গোলাবারুদ, বোমা ও বিভিন্ন প্রকার রাইফেল।

৬ জানুয়ারি ১৯৭২ দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। স্বাধীন ভূমিতে প্রতিটি নতুন সূর্যের আলো তখন নতুন উন্মাদনা নিয়ে হাজির হচ্ছিল। মহারাজা স্কুলমাঠে ‘ফল-ইন’ (সারিবদ্ধ) হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্যারেড, রোল কল, সকালের নাশতা করে যে যার মতো অলস সময় পার করছেন ক্যাম্পে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। গোধূলির লাল আভা তখনো কাটেনি। মাঠের পশ্চিম কোনায় মসজিদে নামাজের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন কেউ কেউ। মাগরিবের আজানের সময় হঠাৎ বিকট শব্দ। অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয় আকাশ। থমকে যায় শহরবাসী। ছুটতে শুরু করে যে যার মতো। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—যুদ্ধ কি তবে শেষ হয়নি?

ওই দিনের ঘটনার বিবরণ দেন ওই ক্যাম্পে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একজন ফরহাদ আহমেদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্প থেকে বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে কমান্ডারের নিষেধ ছিল। আমার পরিবার ছিল ভারত সীমান্তের চান্দহর শরণার্থীশিবিরে। দুপুরে জানতে পারি, মা দক্ষিণ বালুবাড়িতে বাড়িতে ফিরে এসেছে। পরে কমান্ডারের কাছে ছুটি নিয়ে

আমিসহ ছয়জন ক্যাম্প থেকে বের হই। আমরা যখন স্কুলগেট পার হচ্ছি, তখন একটি ট্রাক থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র খালাস করা হচ্ছিল। ট্রাক থেকে বাংকারের দূরত্ব ছিল ১০০ গজের কম। পশু হাসপাতাল মোড়ে পৌঁছামাত্রই বিকট শব্দ শুনতে পাই। আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম। একটুখানি আসতেই আমরা আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। একে তো সন্ধ্যার অন্ধকার, তার ওপর ধোঁয়া। তা ছাড়া চোখ জ্বালা করছিল। আমরা চোখ খুলতে পারছিলাম না।’

কেমন করে এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল, এর সঠিক ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে এবং অনেকের লেখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণে মহারাজা স্কুল উড়ে যায় সেদিন। দুর্ঘটনার সময় সঠিক কতজন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিভিন্নজনের কাছ থেকে জানা গেছে, সকালে রোল কলের সময় ৭৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন। তারপর অনেকেই দু-এক দিনের ছুটি নিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ক্যাম্প ছেড়ে যায় কতজন? তা-ও জানেন না কেউ।

অনেকের ধারণা, সেদিন ৪০০ থেকে ৫০০ মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে আসা প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক, এম এ আজাদ, মকবুল হোসেনের স্মৃতিচারণা এবং প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাজাহান শাহর ‘৬ জানুয়ারি স্মৃতিস্মরণ’ নিবন্ধ সূত্রে জানা যায়, ট্রাক থেকে অস্ত্র খালাসের কাজ শুরু হয় ওই দিন বিকেল চারটার দিকে। এরই মধ্যে অসাবধানতাবশত কোনো ল্যান্ড মাইন হাত ফসকে হয়তো পড়ে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণ এতই শক্তিশালী ছিল যে স্কুলের আশপাশের বাড়িঘরের দরজা-জানালা শব্দের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছিল। স্কুলের সীমানাসহ আশপাশে মানুষের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ পড়ে ছিল। দালানের ছাদ ধসে পড়ে মেঝের ওপরে। আহতদের দিনাজপুর সদর হাসপাতাল, মিশন হাসপাতালসহ রংপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাত বাড়তে থাকে। ঘন অন্ধকারে উদ্ধারকাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে, টর্চলাইট, হ্যাজাক লাইট ও লন্ঠনের আলোয় রাতভর উদ্ধারকাজ করেন। ১২ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেই স্কুলের মাঠে সেদিন রক্তের স্রোত বয়ে গিয়েছিল। ঘটনা বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল শহরবাসীর।

মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলী (৭২)। বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে বসবাস করছেন। আক্কাস আলী বলেন, তাঁর বাড়ি পঞ্চগড়ে। সর্বশেষ বগুড়ায় যুদ্ধ করেন। ১৬ ডিসেম্বরে মহারাজা ক্যাম্পে এসে রিপোর্ট করেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে তিন দিনের ছুটিতে যান। ছুটি শেষে ৪ জানুয়ারি আবার ক্যাম্পে ফিরে আসেন। ঘটনার দিন সকালেও তাঁর রোল কল করা হয়েছিল। বিকেলে অস্ত্রবোঝাই দুটি ট্রাক আসে। কমান্ডার হুইসেল দিয়েছিলেন অস্ত্রগুলো নামানোর জন্য। সন্ধ্যায় মসজিদে অজু করতে বসেছেন মাত্র। উল্টো দিকে মালামাল আনলোড চলছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো মিলিশিয়া ক্যাম্প বিস্ফোরিত হয়। আক্কাস আলী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। গভীর রাতে জ্ঞান ফিরলে দেখেন, তিনি হাসপাতালের বিছানায়। শরীর তখনো রক্তে মাখা। তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, কী হয়েছে? হাসপাতালে মানুষের ভিড়ে কেউ কথা শুনছে না।

মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে স্কুল প্রাঙ্গণে ১২০ জন এবং চেহেলগাজী সমাধিস্থলে ১৭৭ জনের নামফলক নির্মিত হয়। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে প্রায় ১৬ বছর পর ১৯৮৮ সালে দিনাজপুরের তিনটি ক্ষুদ্র সংগঠন অমৃত সাহিত্য গোষ্ঠী, হোমিও মেডিকেল ছাত্র ঐক্য পরিষদ দিনাজপুর শাখা এবং পাটুয়াপাড়া জাগরণী ক্লাব প্রথম শোকসভা করে। সেই বছর থেকে ৬ জানুয়ারি দিনটি মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি দিবস পালন করে আসছে দিনাজপুরবাসী।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোড়-এ-শহীদ ময়দানে এক জনসভায় মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে মাইন বিস্ফোরণে শহীদদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে এম আবদুর রহিমের উদ্যোগে স্মৃতিসৌধ বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম এম আবদুর রহিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আকতার এবং সাংবাদিক আজহারুল আজাদ জুয়েলের প্রচেষ্টায় ৬ জানুয়ারি নিহত ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হয়। উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিহত ১২২ জন এবং আহত ৪৪ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম সংগ্রহ করা যায়। এম আবদুর রহিমের উদ্যোগে সেই সব আহত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামাঙ্কিত একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয় ২০০০ সালের ৬ জানুয়ারি। নামের ফলক উন্মোচন করা হলেও কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি। সর্বশেষ গত ১৪ মার্চ মহারাজা স্কুল মাঠের পশ্চিম প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরের নতুন ভবনের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম।

মুক্তিযুদ্ধের পর এতজন বীর মুক্তিযোদ্ধার একসঙ্গে প্রাণহানি আর দেশের কোথাও ঘটেনি। ওই ঘটনায় নিহতরা পাননি স্বাধীনতার সুফল। কত মায়ের অপেক্ষা, কত বোনের অপেক্ষা, কতজনের আহাজারি এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কারও পরিবার হয়তো জানতেই পারেনি, যুদ্ধ শেষ করে পরিবারের সদস্যটি ফিরে এসেছিলেন কি না। মুক্তিযোদ্ধাদের তাই প্রাণের দাবি, দিনটিকে জাতীয়ভাবে স্মরণ করাসহ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সেই সঙ্গে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও গবেষণায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।