default-image

পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে হামিদুল ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে। বাবার চাকরিসূত্রে থাকতেন নীলফামারীর সৈয়দপুরে। একাত্তরের ২৫ মার্চ ভোরে যখন পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের বাসায় আক্রমণ করল, তখন তরুণ হামিদুলের হাতে অস্ত্র তুলে দেন বাবা আবদুল হামিদ। সেই যে যুদ্ধের হাতেখড়ি হলো, এরপর হামিদুল থেমেছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পর। মাঝের পুরোটা সময় তিনি কাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রণাঙ্গন। সাহসী সেই ভূমিকার জন্য ১৯ বছর বয়সেই ‘বীর বীক্রম’ খেতাব পান এ টি এম হামিদুল হোসেন তারেক।

হামিদুল হোসেনের বয়স এখন ৭০। তাঁর বাড়ি বগুড়ার সদর উপজেলার রজাকপুর গ্রামে। যুদ্ধের পর যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। এখন সারদা পুলিশ একাডেমি ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মুক্তিবাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে উত্তাল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রণাঙ্গনের দুঃসাহসিক যুদ্ধকাহিনি এবং বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই দিনগুলোর কথা। সম্প্রতি রজাকপুর গ্রামে তারেক ভিলায় বসে কথা হয় হামিদুল হোসেনের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে যুদ্ধে যান হামিদুল

সৈয়দপুর তখন ছিল অবাঙালি–অধ্যুষিত এলাকা। একাত্তরের ২১ মার্চ। বাঙালিদের ওপর শুরু হলো বর্বর হামলাযজ্ঞ। বাঙালিদের ধরে ধরে তখন রেলওয়ে ওয়ার্কশপের জ্বলন্ত বয়লারে জ্যান্ত নিক্ষেপ করা হতো। হামিদুল হকের বাবা আবদুল হামিদ ছিলেন সৈয়দপুর তথা নীলফামারী সাবডিভিশনের ডেপুটি সুপার অব পুলিশ (এসডিপিও)। হামিদুল হক বলেন, ‘২৫ মার্চের ভোরবেলা হঠাৎ গুলির শব্দ। আমাদের কোয়ার্টার তখন ছিল হাউস কাম অফিস। বিহারিদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভোরে বাড়ির চতুর্দিকে আক্রমণ করে বসল। বাবা তখন আমার হাতে একটি রাইফেল তুলে দিলেন। সেটা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো।’ সেই যে রাইফেল তাঁর কাঁধে উঠেছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগপর্যন্ত আর কাঁধ থেকে নামেনি।

‘সেদিন ৩০ জন পুলিশ নিয়ে আড়াই ঘণ্টা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রাণপণ যুদ্ধ করলাম। পাশের বাড়িতে থাকতেন রেলওয়ে পরিদর্শক এমদাদ আংকেল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জাভেদ ইউনুসের নেতৃত্বে রেলওয়ের ওই কর্মকর্তার মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে জিম্মি করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হলো। এরপর আমার গোটা পরিবারের ওপর নেমে এল নির্মম নির্যাতন। সেই নির্যাতনে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। একবার চোখ খুলে দেখলাম, পরিবারের সবাই রক্তাক্ত। একপর্যায়ে সবাইকে ট্রাকে তুলে নেওয়া হলো সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের বন্দিশালায়,’ বলছিলেন হামিদুল হক।

সেখান থেকে এপ্রিলের কোনো এক রাতে পুলিশের সহযোগিতায় ছোট ভাই খালেদকে নিয়ে বন্দিশালা থেকে পালিয়ে ডাঙ্গারহাট সীমান্ত হয়ে ভারতে যান মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। সেখানে দিনাজপুরের সাংসদ আবদুর রহিমের সঙ্গে দেখা হলো। পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে হওয়ায় তিনি তাঁকে একটি মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্ব দিলেন। ক্যাম্পের অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান (পরে মেজর জেনারেল)। হামিদুল হলেন উপ–অধিনায়ক। একদিন ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৬ গার্ড রেজিমেন্টের একজন কর্মকর্তা। তিনি বললেন, ট্যাংক এবং পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এখান থেকে ১২০ জনকে নিয়ে একটা ‘বিশেষ বাহিনী’ গঠন করা হবে। প্রশিক্ষণ হবে দার্জিলিংয়ে। ৭ সেক্টরের অধীনে প্রথমে পানিকাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে কাজী কিউ এম জামানের নেতৃত্বে প্রায় এক মাস চলল প্রশিক্ষণ। এরপর দার্জিলিংয়ে নেওয়ার পর ৬ গার্ড রেজিমেন্টের তত্ত্বাবধানে আরও তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ হলো। আঙ্গিনাবাদ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের অধীনে ‘বড়াহার অপারেশন ক্যাম্প’ পরিচালনা করত ৬ গার্ড অপারেশন। ক্যাম্প অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন থাপা। তাঁর অধীনে মিত্রবাহিনির হয়ে রণাঙ্গনে নানা গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন।

default-image

রণাঙ্গনে নামলেন হামিদুল

একদিন নির্দেশ এল, সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সেনাছাউনির ওপর গেরিলা আক্রমণ করতে হবে। পানিকাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে কয়েকজনকে বাছাই করা হলো। হামিদুল বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার হিসেবে সৈয়দপুর-পার্বতীপুরে কয়েকটি রেলসেতু উড়িয়ে দেওয়ারও পরিকল্পনা করলাম। এক সন্ধ্যায় বড়াহার ক্যাম্প থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাইন ও বিস্ফোরক নিয়ে সহযোদ্ধার সঙ্গে রওনা দিলাম। দ্বিতীয় দিনে রাত দুইটার দিকে পৌঁছালাম ট্রাস্কেরহাট নামের এক গ্রামে। সেখানে রেলসেতু উড়িয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হলো। কিন্ত ভোর পাঁচটায় ট্রেন পারাপার। সিদ্ধান্ত হলো, আজ নয়, পরের রাতে রেলসেতু উড়িয়ে দেওয়া হবে।’

এরপর তাঁরা সেতু থেকে কিছুটা অদূরে এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিদন দুপুরে তাঁরা যখন খাওয়ার জন্য বসেছেন, তখন হঠাৎ চারদিকে জি থ্রি গুলির শব্দ। বুঝলেন, স্থানীয় রাজাকারদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পাকিস্থানি সৈন্যরা গ্রামে ঢুকেছে। খাবার ফেলে তাঁরা রাইফেল হাতে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নেন।

সেই যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে হামিদুল হোসেন বললেন, ‘ইয়াহিয়া নামে একজন যোদ্ধার নেতৃত্বে রেলব্রিজে শত্রুকে মোকাবিলার জন্য পাঠানো হলো। ছোট ভাই খালেদের নেতৃত্বে টাস্কেরহাটের রাস্তায় অ্যামুনেশন নিতে বললাম। দোহা ও মোফাজ্জলের দায়িত্ব ছিল আমবাগানে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। তাদের এলএমজি ও এসএমজি থেকে বৃষ্টির মতো গুলি বের হতে লাগল। শাহনাজ প্রতিরোধ গড়ল রেলব্রিজে। পেছনে বিরাট বিল। শত্রুকে মোকাবিলা ছাড়া দিনের বেলা পালানোর উপায় নেই। কৌশল নিলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের ঠেকিয়ে রাখতে হবে। ওসমান মর্টার বসিয়ে আমবাগানে ফায়ার করতে লাগল।’ তিনি বলেন, বৃষ্টির মতো গোলাগুলির মধ্যেই হঠাৎ হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে এলেন এক নববধূ। আঙুল দিয়ে পুকুরপাড় দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ওদিক দিয়ে খানসেনারা আসছে। নিরাপদে যেতে চাইলে তাঁর সঙ্গে আসতে বললেন। এবাড়ি–ওবাড়ি ঝোপঝাড় মাড়িয়ে গ্রামের পেছনে নিয়ে এলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আশ্রয়দাতা সেই বাড়ির গৃহকর্তা মাওলানা। দেখামাত্র চিৎকার করে তিনি খানসেনাদের ডাকতে শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ছিলেন মনসুর। পার্বতীপুরের মানুষের কাছে তিনি ‘ডাকাত সর্দার’ নামে পরিচিত। ডাকাতি ছেড়ে দলের ৩০ জন সদস্যকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। মনসুর তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতেন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনসুর কোমরের খাপ থেকে তরবারি বের করে বনবন করে ঘোরাতে লাগলেন। এরপর ‘জয় বাংলা’ বলে এক কোপে মাওলানার মাথা দেহ থেকে আলাদা করলেন। সেই নববধূ অবাক করে দিয়ে মাওলানার মণ্ডুবিহীন দেহে থুতু ছিটিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এই লোকটা আমার শ্বশুর, রাজাকার। তিনিই খানসেনাদের খবর দিয়ে গ্রামে ডেকে এনেছিলেন।’ এরপর জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে গ্রাম ছাড়েন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

এক কিশোরের অসমসাহস

যুদ্ধদিনে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন হামিদুল হোসেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এক কিশোরের অসমসাহসের গল্প শোনান তিনি।

হামিদুল হোসেন বলেন, ‘একদিন ক্যাম্পের যোদ্ধারা সোলায়মান নামে এক কিশোরকে ধরে নিয়ে এলেন। কেউ কেউ দুয়েকটা চড়থাপ্পড়ও মারলেন। কেউ একজন বললেন, এরা বাবা–ছেলে দুজনই চোর। ক্যাম্পে চুরি করতে এসেছে।’ কিশোর ছেলেটি হামিদুল হোসেনের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘স্যার, আমি চুরি করতে আসিনি। আমার বাবাকে খানসেনারা মেরে ফেলেছে। আমি মুক্তিযুদ্ধ করব, প্রতিশোধ নেব।’ এরপর কিশোর তাঁদের সঙ্গী হলো। ২২ নভেম্বর নির্দেশ এল, মিত্রবাহিনীর সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে বাংলাদেশ মুক্ত করতে।

ফুলপুর-দিনাজপুর সড়কের ওপর মোহনপুর ব্রিজ ছিল। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের ৪৫ ডিফেন্স। সামনে এগোতে হলে তাদের আক্রমণ করতে হবে। অন্ধকার রাতে ৪০ জনের ভারতীয় বাহিনী এবং ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা মিলে অপারেশনে বের হন। পথ দেখানোর জন্য সঙ্গী সেই কিশোর সোলায়মান। ব্রিজের কাছাকাছি এসে মিত্রবাহিনীর মেজর সবাইকে থামিয়ে দিলেন। বাইনোকুলার দিয়ে তিনি শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। পাকিস্থানি সৈন্যদের মাইনফিল্ড ডিফেন্স, এলএমজি লাগানো আছে, শত্রুর ওপর আক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ। সোলায়মান এসে হামিদুলকে বলে, ‘স্যার, আমি শত্রুর অবস্থান দেখে আসি।’ মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক বললেন, ‘নিশ্চিত মাইন বিস্ফোরণে ছেলেটা মারা পড়বে।’ কিন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে কিশোর সোলায়মান ৪০ মিনিট পর অন্ধকারে অক্ষত ফিরে এল। সঙ্গে পাকিস্তান সেনাদের দুটো রাইফেল এবং একটি ট্রানজিস্টর। কীভাবে কী হলো, জানতে চাইলে সোলায়মান হেঁসে বলে, ‘স্যার, চুরির অভিজ্ঞতা আছে না?’

‘অপারেশন বগুড়া’

২২ নভেম্বর বগুড়া অভিমুখে গেরিলা অপারেশন শুরু হলো। ১২টি ট্যাংক নিয়ে মিত্রবাহিনীর ৬ গার্ড রেজেমেন্টের ২০ মাউনটেন ডিভিশনের সঙ্গে হামিদুল হোসেনরা বগুড়া অভিমুখে রওনা দেন। ২০ মাউনটেন ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল লচমন সিং। কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শর্মা। মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার ছিলেন হামিদুল হোসেন তারেক। ট্যাংক নিয়ে মিত্রবাহিনীর হয়ে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে হামিদুল হোসেন বলেন, ‘ফুলবাড়ী, চরখাই, নবাবগঞ্জ মুক্ত করার পর পীরগঞ্জে এসে জানলাম, পাকিস্তানি সেনাদের কনভয় (বহর) গেছে। জেনারেল লচমন সিং রাস্তায় অ্যামবুশ বসানোর নির্দেশ দিলেন। কনভয়ে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ। বিকেলে এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনির কনভয় অ্যামবুশের ভেতরে পড়ে গেলেন।’ এই সাহসী কাজের জন্যই পরবর্তী সময়ে ১৯ বছর বয়সে ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পেয়েছিলেন হামিদুল হোসেন।

পীরগঞ্জ ও গাইবান্ধা মুক্ত করার পর গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়ায় অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত কাটিখালি সেতুতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পড়েন তাঁরা। বাধ্য হয়ে গাইবান্ধায় ফিরে যেতে হয়। সেখান থেকে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে গাবতলীর সুখানপুকুর হয়ে বগুড়ায় আক্রমণের পরিকল্পনা হয়। পথে পথে গেরিলাযুদ্ধ হলো। বগুড়া পুলিশ লাইনস দখলে ছিল পাকিস্তান বাহিনীর। সেখানে আক্রমণের সিদ্ধান্ত হলো। মাঝিড়ায় ট্যাংক নিয়ে মুখোমুখি সম্মুখযুদ্ধ হলো। পাকিস্তানি সেনারা তিনটি ট্যাংক ফেলে পালাল। এখনো সেনানিবাসে একটি ট্যাংক সংরক্ষিত আছে। সেখানে হামিদুল হোসেনের নামও লেখা আছে।

বগুড়া শহরে তখন পাকিস্তান সেনাদের শক্তিশালী দখল ছিল। বনানী সিনেমা হলের সামনে তাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিল। পরে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশল পাল্টে সরকারি আজিজুল হক কলেজ হয়ে, স্টেশন সড়ক হয়ে শহর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

বিজয়ের আগমুহূর্তের ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে হামিদুল হোসেন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। বলেন, ‘১৪ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের চারদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী। সুরক্ষিত অবস্থানে থেকে পাকিস্তানি সেনারা প্রতি আক্রমণ চালায়। শহরের সুবিলের সিঅ্যান্ডবি রেস্টহাউস থেকে পুলিশ লাইনস পর্যন্ত শত্রুপক্ষের ঘাঁটি। বাসাবাড়ির ছাদে বালুর বস্তা আর রাস্তায় বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি সেনারা। বগুড়ার আকাশে ওই দিন ওড়ে মিত্রবাহিনীর মিগ-২১ যুদ্ধবিমান। শত্রুপক্ষের অবস্থান লক্ষ্য করে বোমা ফেলা হয়। গোটা শহর কেঁপে ওঠে। যৌথ বাহিনীর আক্রমণের মুখে সুবিল রেস্টহাউস, আজিজুল হক ও মহিলা কলেজ ছেড়ে কটন মিল এলাকায় অবস্থান নেয় পাকিস্তানিরা।’

১৫ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে চতুর্মুখী আক্রমণ শুরু করে। দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। ‘শহরের পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ চালাতে মিত্রবাহিনীকে গাইড করার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর,’ বললেন হামিদুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর রেলস্টেশন দখলের পর সাতমাথার দিকে এগোতেই শত্রুপক্ষের রকেট লাঞ্চার এসে পড়ল ট্যাংকের সামনে। পাল্টা আক্রমণের মুখে জিলা স্কুলে পালাল ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা। জিলা স্কুলে স্নাইপার নিয়ে অবস্থান একজন পাকিস্তানি সৈনিকের। শত্রুদের মারা হলো। কেউ আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে জিলা স্কুলে ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।’

মিত্রবাহিনীর বগুড়া আক্রমণের আগেই মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ বাঙালি অসমসাহসে মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই সম্মুখযোদ্ধারা উজ্জ্বল হয়ে আছেন স্বাধীনতার স্বপ্নে, আত্মত্যাগের মহিমায়।

বগুড়ায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ

১৮ ডিসেম্বর বগুড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রম। তিনি বলেন, ‘কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। পুলিশ লাইনসে ক্যাম্প করেছিলাম আমরা। সকাল আটটায় খবর এল পাকিস্তানি বাহিনী আজ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে। ১১টায় সুবিল রেস্টহাউসে মিত্রবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে পৌঁছালাম। বিকেল সাড়ে চারটায় ঘনিয়ে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মিত্রবাহিনীর সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমিও সেখানে উপস্থিত।’

হামিদুল হোসেন জানান, যুদ্ধবন্দী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহকে নাটোর থেকে আনা হয়। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকেও যুদ্ধবন্দী কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আজিজুল হক কলেজের পুরোনো ভবন-সংলগ্ন তৎকালীন ওয়াপদা রেস্টহাউজমাঠের মাঝখানে চাদরে ঢাকা একটি টেবিল। টেবিলের এক পাশে দাঁড়িয়ে ২০ মাউনটেন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল লচমন সিংসহ মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তারা। আর অন্য পাশে যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানি সেনারা। একপর্যায়ে নজর হোসেন শাহ কোমর থেকে রিভলবার বের করে দুই হাতে তা মিত্রবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল লচমন সিংয়ের সামনে বাড়িয়ে ধরলেন। লচমন সিং রিভলবারটি নিয়ে টেবিলে রেখে দিলেন। তখন সারিবদ্ধ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা কোমরের বেল্ট খুলে মাটিতে রাখলেন। এরপর আত্মসমর্পণের লিখিত দলিলে পরপর সই করলেন দুই অধিনায়ক।

বগুড়ায় সেদিন ৫ জন পাকিস্তানি কর্মকর্তা, ৫৬ জন জেসিও, ১ হাজার ৬১৩ জন বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা ও ৩৩ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযুদ্ধকালে ইস্টার্ন জোনের ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সুখওয়ান্ত সিংয়ের লেখা ইন্ডিয়াস ওয়ারস সিন্স ইনডিপেনডেন্টস: দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ (ভলিউম: ওয়ান) বইয়েও এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।

১৯ বছর বয়সে ‘বীর বিক্রম’ খেতাব

হামিদুল হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯ বছর বয়সে বীর বিক্রম খেতাব পেলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হলাম। তরুণ বয়সে খেতাব পাওয়ায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনেকেই উৎসাহিত করলেন। আইএসএসবিতে অংশ নিলাম।’

হামিদুল হোসেন বলেন, সেনাবাহিনীর প্রথম দীর্ঘমেয়াদি ব্যাচে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতে কমিশনড লাভ করেন। তবে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মেজর থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। পরে আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক এবং কিছুদিন পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। এখন সারদা পুলিশ একাডেমি ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

হামিদুল তারেক বলেন, ‘বছরের বেশির ভাগ সময় গ্রামেই কাটে। খেতে ধান, পুকুরে মাছ চাষাবাদ করছি। দেশ ও মাটির জন্য যুদ্ধ করেছি। শিকড় ও মাটির গন্ধের টানে গ্রামেই পড়ে আছি।’

বিজ্ঞাপন