default-image

মায়ের কোলে নিহত মুক্তিযোদ্ধা। ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যের নাম ‘গণহত্যা ১৯৭১’। হামিদুজ্জামান খানের এই ভাস্কর্য আছে খুলনার ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন, আর্কাইভ ও জাদুঘরের’ ফটকে। মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখ আটকে যায় মোটরসাইকেলে। নম্বরপ্লেটে এখনো লেখা ‘যশোর এ-৭৭’। সাদামাটা দুই চাকার এক যানবাহন। কিন্তু সঙ্গে লিখে রাখা ইতিহাসটা পড়লে মনে হবে, মোটরসাইকেলটি যেন শহীদদের রক্তে ভেজা।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন গিরিন্দ্রনাথ ঘোষ। তাঁর বাড়িটি দখল করে নেয় রাজাকাররা। সেটিকে বানায় ‘টর্চার সেল’। গিরিন্দ্রনাথের ছেলে অনীল কুমার ঘোষের ছিল মোটরসাইকেল। সেটির দখল নেয় রাজাকাররা। ওই গাড়িতে চড়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাত। অনীল ঘোষের দুই ছেলে বিপ্লব কুমার ও দেবাশীষ কুমার মুক্তিযুদ্ধের ওই নিদর্শন হস্তান্তর করেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে।

এভাবে মানুষের মাথার খুলি-হাড়গোড়, মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে ব্যবহৃত প্লাটিনাম জুট মিলের বয়লার বা নিয়াজির গণহত্যার নীলনকশার অনুলিপি দেখে কারও চোখ ভিজে আসে। আবার ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণে ব্যবহৃত মাইক, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত টেলিফোন সেট, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র ও পোশাক, শরণার্থীশিবিরের ট্রানজিস্টর, স্ত্রীকে লেখা তাজউদ্দীনের চিঠি—এমন সব নিদর্শন মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনে শিহরণ জাগায়।

এমন কত কী যে ধারণ করে আছে ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন, আর্কাইভ ও জাদুঘর’। বিশেষায়িত এই জাদুঘরের গ্যালারিগুলো দেখলে দর্শনার্থীদের চোখে ভেসে ওঠে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তের বেদনার দিনগুলো। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি বাঙালির মুক্তি, স্বাধীনতার স্পৃহা আর মুক্তিযুদ্ধকালের সবচেয়ে মর্মন্তুদ পর্ব গণহত্যার ইতিহাসকে মেলে ধরেছে দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এবং একমাত্র গণহত্যা জাদুঘরটি।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৪ সালের ১৭ মে এই জাদুঘর যাত্রা শুরু করে। জাদুঘরের প্রথম গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কাচঘেরা কয়েকটি বাক্স। একটি বাক্সে আছে স্ত্রী জোহরাকে লেখা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি। সেই সময়ের জনপ্রিয় বক মার্কা (king stork) সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো পিঠে মাত্র দুই লাইনের সেই চিঠি। তাতে লেখা ‘জোহরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেয়ো। ঐ মতো ব্যবস্থা (দুই)।’

‘শহীদ গ্যালারিতে’ রয়েছে গণহত্যার নানা স্মারক, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম। গণহত্যার নির্মম নিদর্শন খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের বয়লার। এই বয়লারে বাঙালিদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। আছে পঞ্চগড় থেকে সংগৃহীত বাঙালি হত্যায় ব্যবহৃত মর্টার শেলের খোসা, রাজাকারদের ঘুঙুর, বিভিন্ন জেলার শান্তি কমিটির প্রচারপত্র, রাজাকারদের প্রতি মুক্তিবাহিনীর আবেদনের লিফলেট, হানাদার বাহিনীর মেজরের ব্যবহৃত ক্যামেরা, মানচিত্রও। আছে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি, শহীদুল্লা কায়সারের দুটি টাই ও ডায়েরি, বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দীন আহমেদের কোট, শহীদ সাংবাদিক ও নির্মম নির্যাতনের শিকার সেলিনা পারভীনের কলম ও শাড়ি, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও পাণ্ডুলিপি, আছে শহীদজননী জাহানারা ইমামের ডায়েরি, ছবি, তাঁর হাতের লেখা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার লেখা বই, ডা. আলীম চৌধুরীর ভিজিটিং কার্ড, কলম, ল্যাম্প, ডেন্টাল টুলকিট ও ডায়েরি, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গিয়াসউদ্দীন আহমদের বই, সেই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী শহীদ শামসুজ্জামানের কোট, শার্ট, শহীদ সার্জেন্ট এস কে খানের বস্ত্র।

জাদুঘরটি চলে ১১ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে। জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ সহযোগী অধ্যাপক শংকর কুমার মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শুরুটাই ছিল গণহত্যা। বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায় অনেকটা উপেক্ষিত রয়ে গেছে। জাদুঘরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা একাত্তরে গণহত্যা বিশ্ববাসীকে জানানোর চেষ্টা করছি। গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’