default-image

রংপুর নগরের মুন্সিপাড়া কেরামতিয়া স্কুল মোড় থেকে বাস টার্মিনার যাওয়ার সড়কটির কাগুজে নাম শহীদ মিলি চৌধুরী সরণি। কেরামতিয়া স্কুল মোড়ের পাশে সড়কে এর একটি নামফলক রয়েছে। হেলে পড়া ফলকটি লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি সড়কের নামফলক।

এই সড়কের মতোই রংপুর নগরের বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের নামে। শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় ৩৫ বছর আগে নেওয়া উদ্যোগটি বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখনো এসব সড়ক শহীদদের নামে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পায়নি। সেই সময় সড়কের দুই পাশে লাগানো নামফলকের এখন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মিলি চৌধুরীর ছোট ভাই কাজী মোহাম্মদ জুননুন। তিনি রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় এসব নামফলক বেশ ভালোই ছিল। বর্তমানে এসবের অস্তিত্ব নেই বললে চলে।’ কাজী মোহাম্মদ জুননুন আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এ বছরেই মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের নামফলকগুলো পুনঃস্থাপন করা হোক। স্বাধীনতার এত বছর পরে হলেও প্রতিটি এলাকার তরুণ প্রজন্ম ইতিহাসটুকু জানতে ও শিখতে পারবে।’

বিজ্ঞাপন

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের অনেকেই শহীদ হয়েছেন। সেই বীর শহীদদের নামে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর নামকরণের উদ্যোগ নেন সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আফজাল। ১৯৮৪-৮৫ সালে এই ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা পৌরসভায় রেজল্যুশনের মাধ্যমে সড়কগুলোর নামকরণ করেন। এরপর বিভিন্ন সড়কের মোড়ে নামফলক স্থাপন করা হয়। কিন্তু সময়ের আবর্তে এসব নামফলক নষ্ট হয়ে যায়। এখন দু–একটি ছাড়া কোনো নামফলক নেই বললেই চলে।

মোহাম্মদ আফজাল বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এসব সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল। এসব রাস্তার নামকরণের মাধ্যমে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস জানতে পারবে। কিন্তু এখন জানতে পেরেছি, কে বা কারা নামকরণের ফলক নষ্ট করে ফেলেছে। এসবের স্মৃতিচিহ্ন নেই বললে চলে।’ নতুন করে এসব নামফলক স্থাপনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সদিচ্ছা হলেই হয়তো এই কাজ হতে পারে। একটু উদ্যোগের বিষয়।’

default-image

সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নগরের জিলা স্কুলের মোড় থেকে সিটি বাজার পর্যন্ত প্রধান এই সড়ক জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জররেজ সরণি নামকরণ করা হয়। সিটি বাজার থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত সড়কটি শহীদ খোন্দকার মুখতার ইলাহীর নামে নামকরণ করা হয়। নগরের প্রধান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেতপট্টি সড়কটি শহীদ ওমর আলী সরণি, সেন্ট্রাল রোডটি শহীদ মোবারক সরণি, গোমস্তাপাড়া থেকে পালপাড়া সড়কটি শহীদ রনি রহমান সরণি, দেওয়ান বাড়ি রোড থেকে মুলাটোল যাওয়ার সড়কটি নাম শহীদ অশ্বিনী কুমার ঘোষ সরণি, বেতপট্টি থেকে সেনপাড়ামুখী সড়কটি শহীদ ভিকু চৌধুরী সরণি নাম দেওয়া হয়। স্টেশন রোড থেকে দরদী সিনেমা হলের বিপরীত দিয়ে আজিজ নগর কলোনির ভেতরের মূল সড়কটির নামকরণ করা হয় শহীদ চিকিৎসকের নামানুসারে শহীদ মর্তুজা সরণি। কলেজ রোডের মুরগি খামার মোড় থেকে পীরপুর অভিমুখী সড়কের নাম শহীদ ইসমাইল হোসেন বসু মিয়া সরণি, নগরের হনুমান তলায় একটি সড়কের নাম শহীদ রাজ্জাক সরণি, মুন্সিপাড়া কেরামতিয়া স্কুল মোড় থেকে বাস টার্মিনার যাওয়ার সড়কটি শহীদ মিলি চৌধুরী সরণি নামকরণ করা হয়।

নগরের এসব এলাকা সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলাকায় নামফলকের কোনো চিহ্ন নেই। তবে দু–একটি স্থানে নামফলক থাকলেও তা–ও আবার বিধ্বস্ত অবস্থা। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এই সড়কের নামকরণের নামফলক এটি।

রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সদরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময় দাবি জানানো হলেও সিটি করপোরেশন এখনো এসব সড়কের নামফলক পুনঃস্থাপন করেনি। আশা করছি, সিটি করপোরেশন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাববে।

বিজ্ঞাপন

রংপুর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার আট বছর অতিবাহিত হয়েছে। সড়কগুলো অনেক প্রশস্ত হয়েছে। এসব সড়কের দুই দিকে এবং কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়কের নামকরণের ফলক স্থাপন করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন নগরের বাসিন্দারা। বিভিন্ন পক্ষের এই দাবির বিষয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন পর্যন্ত আর গড়ায়নি।

এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘বর্তমানে সড়কগুলোর সংস্কারকাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে রাস্তার নামকরণ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে অবশ্যই করা হবে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়। খুব শিগগির এর বাস্তবায়ন সিটি করপোরেশন করবে।’